আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

It's a Wonderful Life: যে মুভি প্রেরণা দেয় বেঁচে থাকার (মুভি রিভিউ)

চাই মাতৃভূমির সমৃদ্ধি। কত মুভিই তো আমরা দেখি। কত বিচিত্র কাহিনী, অভিনয়শৈলী আর অঙ্গসজ্জা নিয়ে মুভিগুলো আমাদের সামনে এসে ধরা দেয়। নানান ধরণের প্রেক্ষাপট আর পটভূমির সাথে চোখ ধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্ট আর স্তব্ধ করে দেবার মত সব টুইস্ট - কি নেই মুভিগুলোতে? অ্যাডভেঞ্চার, থ্রিলার, হরর, অ্যাকশন, ফ্যান্টাসি, কমেডি, ড্রামা - কত কত জনরার মুভি আমরা দেখি। অবস্থাটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে কোন মুভিটা দেখা উচিত তা ঠিক করার জন্য মুভি দেখার আগেই বেশ খানিকটা জানাশোনা করে নিতে হয়! মুভি দেখতে ভাল লাগে, মুভি দেখে আমরা টাইম পাস করি, মুভি থেকে নির্মল আনন্দের খোরাক নেই।

কিন্তু একবার ভাবুন তো, কয়টা মুভি পেরেছে আপনাকে প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করতে? কয়টা মুভির কথা আপনি আজীবন মনে রাখবেন? কোন মুভিটা আপনাকে নাড়া দিয়েছে এক্কেবারে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে? বিনোদন ছাপিয়ে জীবন দর্শন হয়ে আপনার মধ্যের মানুষটাকে জাগিয়ে তুলেছে কয়টা মুভি?? প্রিয় পাঠক, এই সংখ্যা খুব বেশী হবে না। অগণিত মুভি প্রতিবছর মুক্তি পায় সারা দুনিয়ায়। কিন্তু কালজয়ী সাহিত্যের মত কালজয়ী মুভিও খুব কম। আমি বলব, মুভি আছে অনেক কিন্তু দেখার সাথে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে মুগ্ধ হবার মত মুভি খুব কম। আমার এক শ্রদ্ধেয় বড় ভাই বলেছিলেন, মুভি দেখবি বুঝে শুনে - নইলে একটা ফালতু মুভির জন্য জীবন থেকে ২ ঘন্টা সময় হারিয়ে যাবে!! এর চেয়ে বড় সত্য কথা বোধ হয় আর কিছু নেই।

কিন্তু সমস্যা হলো বুঝে শুনে দেখার পরো খুব কম মুভিরই ক্ষমতা থাকে বহুদিনের জন্য আবেদন সৃষ্টি করার। তাই ভেবে চিন্তে ঠিক করেছি, আপাতত বেশ কয়েকটা পোস্ট দেব শুধুমাত্র অসম্ভব ভালো লাগা মুভিগুলো নিয়ে। সেই ধারায় আজকের মুভি হচ্ছে It's a Wonderful Life বহু পুরোনো মুভি এটা। ১৯৪৬ সালের সাদাকালো মুভি। সাদাকালো যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিরেক্টর Frank Capra র সেরা কাজগুলোর একটা।

৫ টা ক্যাটাগরীতে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল এই মুভি। অভিনয়ে হলিউড স্বর্ণযুগের প্রখ্যাত অভিনেতা James Stewart আর Donna Reed এই মুভিটা আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউটের (AFI) শ্রেষ্ঠ ১০০ মুভির তালিকায় ১১ তম স্থানে আছে। AFI এর করা তালিকায় এই মুভিতে জেমস স্টুয়ার্টের করা জর্জ বেইলী চরিত্রটি হচ্ছে সেরা ১০০ নায়কের তালিকায় ৯ম আর লায়োনেল ব্যারিমোরের করা মিঃ পটার চরিত্রটি সেরা ১০০ খলনায়কের তালিকায় ষষ্ঠ!! এসবই হচ্ছে খটোমটো পরিসংখ্যান। কিন্তু এই সব দাঁতভাঙা পরিসংখ্যান দিয়ে মুভিটার ভালো মন্দ যাচাই করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। রিভিউতে এসব তথ্য না থাকলেই নয় তাই দেয়া হল এগুলো! আসুন দেখি এই ড্রামা - ফ্যান্টাসি জনরার মুভিটা কেন অসম্ভব ভালো লাগার মত, বহুদিন মনে রাখার মত একটা মুভি।

মুভির শুরুতে আমরা দেখতে পাই স্বর্গে বসে হেড অ্যাঞ্জেল ফ্র্যাঙ্কলিন আর জোসেফ একজন নিন্মপদস্থ অ্যাঞ্জেলকে ডেকে পাঠিয়েছেন বিশেষ একটা কাজে। সেই অ্যাঞ্জেল মহোদয় আবার সেকেন্ড ক্লাসে আছেন - পাখা নেই তাঁর! ফার্স্ট ক্লাস হতে হলে তাঁর পাখার দরকার। তিনি যদি এই কাজটায় সফল হন তাহলে তাঁকে পাখা উপহার দিয়ে ফার্স্ট ক্লাসে উত্তীর্ণ করা হবে! তো কি সেই কাজ? কাজটা হচ্ছে তাকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসতে হবে। দুনিয়ার বুকে এক নাদান বান্দা জর্জ বেইলী আত্নহত্যা করতে যাচ্ছে - তাকে এই মহা পাপের কাজ থেকে বিরত করতে হবে, জীবনের মূল্য বুঝিয়ে। অ্যাঞ্জেল মহোদয় আবার নবীস কিনা, তাঁকে জর্জ বেইলীর ছোট্টবেলা থেকে পুরো জীবনের সব উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো দেখানো হয় যাতে তিনি বুঝতে পারেন কি কারনে জর্জ আত্নহত্যা করতে চাচ্ছে।

লোকটাকে যদি পুরোপুরি জানাই না হয় তাহলে তাকে আর সাহায্য করা কীভাবে?! অতএব, অ্যাঞ্জেল সেকেন্ড ক্লাস ক্ল্যারেন্স এর সাথে ফ্ল্যাশব্যাকে আমরা আম দর্শক দেখতে থাকি জর্জ বেইলীর জীবনের আমলনামা! জর্জ ব্যাংকার বাবার সন্তান। দুই ভাই তারা। সে আবার ছোট বেলা থেকে মারাত্নক স্মার্ট - মেয়েরা তার জন্য পাগল!!! জর্জের মা স্নেহময়ী জননী - আগলে রাখেন তার ছোট্ট সংসার। বাবা আর চাচা মিলে যে ব্যাংকের শাখাটা চালান - ' বেইলী বিল্ডিং এন্ড লোন' সেটা তাদের ছোট্ট শহর বেডফোর্ড ফলস এর জন্য একেবারে লাইফ লাইন। জর্জের বাবা আবার অতি সজ্জন মানুষ - ব্যাবসা করা থেকে মানুষের উপকার তার কাছে প্রাধান্য পায়! এলাকার বহু মানুষ তার কাছে থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়ে সাবলম্বী হয়েছে।

তো সব সজ্জন মানুষের যেমন শত্রু থাকে তেমনি তাঁরও শত্রু আছে - মিঃ হেনরী এফ পটার। এই লোক হচ্ছে একাধারে ভুস্বামী এবং বিল্ডিং এন্ড লোন অ্যাসোসিয়েসনের অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার। বেডফোর্ডের সব লোক সাবলম্বী হয়ে যাচ্ছে, তার বস্তি ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে উঠছে, ধর্ণা দিচ্ছে না তার কাছে - এসব কারণে বেইলী পরিবার তার চক্ষুশূল! এরকম একটা পরিবেশে জর্জ বেইলী বড় হয়ে উঠতে থাকে। ১২ বছর বয়সে সে তার ছোট ভাই হ্যারিকে বরফ শীতল পানিতে ডুবে মরা থেকে বাচায়। কিন্তু পরিণামে তাকে হারাতে হয় ডান কানের শ্রবণশক্তি।

জর্জ যে ফার্মেসীতে কাজ করত সেখানের ফার্মাসিস্টকে সে রক্ষা করে ভূল ঔষধ দিয়ে রোগী মেরে ফেলা থেকে। জর্জের স্বপ্ন, সারাদিনের ধ্যান - জ্ঞান, বড় হয়ে সারা দুনিয়া ঘুরে বেরাবে সে, নির্মাণ করতে চোখ ধাঁধান সব স্থাপনা। কিন্তু তার স্বপ্ন দিনে দিনে ফিকে হতে থাকে। বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। বাবার মত সেও ব্যাংকার, ধরে রাখে সে বাবার সুনাম।

তার জীবনে ভালবাসা আসে। ছোটবেলা থেকে যাকে সে ভালবাসত সেই মেরীর সাথে তার বিয়ে হয়, ঘর আলো করে আসে সন্তান। এর মধ্যে চলে আসে ২য় বিশ্বযুদ্ধ। জর্জের পরিচিত সবাই যুদ্ধে যায় যখন জর্জ আগলে রাখে তার পরিবার আর ছোট্ট শহরটাকে। জর্জের ভাই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পদক পায়।

ক্রিসমাসের ঠিক আগ দিয়ে ফেরার কথা তার ভাইয়ের - পুরো শহরে সাজ সাজ রব। ঠিক তখনি আকাশ ভেঙ্গে পরে জর্জের মাথায়। কেন? পুরোনো শত্রু পটার আছে না!! পটারের কারসাজি আর জর্জের আঙ্কেল বিলির বোকামিতে জর্জ পরে যায় বিশাল বিপদে। আর সেটাই তার আত্নহত্যা করাতে চাওয়ার কারণ। আর এই বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করার জন্যই অ্যাঞ্জেল মহোদয়কে তলব।

বিপদটা আর বিপদ থেকে জর্জের উদ্ধার পাওয়াটা আর নাইবা বললাম - দেখে নেবেন মুভিতেই! মুভির কিছুটা গল্প উপরে বললাম, খুব সাদামাটা মনে হচ্ছে না? এখানেই মুভির সার্থকতা। মুভিটা যখন দেখবেন তখন আপনি এর সাথে মিশে যাবেন। বহুদিনের চেনা আর পরিচিত মনে হবে মুভির চরিত্রগুলোকে। পরিবারের জন্য জর্জের ত্যাগ, স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট, আবার উঠে দাঁড়ানো এগুলো যেন চিরন্তন মানব জীবনের অনুষঙ্গ। ছোট ছোট আনন্দ, ব্যাথা আর সুখ - দুঃখ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনারই জীবনের কোন একটা মূহুর্ত।

বিপদের মূহুর্তের উদ্ভ্রান্ত জর্জ বা গ্রেট ডিপ্রেসনের সময়ে বুদ্ধিদীপ্ত জর্জ কিংবা প্রেমিক, স্বামী আর পিতা রূপী জর্জ - যেভাবেই আপনি দেখুন না কেন, আপনি খুঁজে পাবেন সত্যিকারের দুনিয়াটাকেই। জর্জের কষ্ট আপনাকে ছুঁয়ে যাবে, তার ব্যাকুলতায় আপনি ব্যাকুল হবেন, আবার তার আনন্দে আপনার চোখের কোনায় আসতে পারে দু'ফোটা পানি। নিষ্ঠাবান আর সৎ বাবার যোগ্য সন্তান জর্জ আপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে টাকা পয়সাই দুনিয়াতে শেষ কথা না। নিজের উপরে বিশ্বাস বাড়বে আপনার, বিশ্বাস বাড়বে সৃষ্টিকর্তার উপরেও। বন্ধু আর আত্নীয়-স্বজনদের প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছেন সে কথাও মনে পড়তে পারে হঠাৎ হঠাৎ!! ন্যায়ের সাথে যে সবসময়ই সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ থাকে আর ন্যায়বান যে অন্যায়ের সামনে কখনোই পরাজিত হয় না তাও আরো একবার দেখা যাবে এই মুভিতে।

মুভিটা দেখার পর হয়ত আরো একটু সংযত, আরো একটু স্থির আর শান্ত হবার কিছুটা হলেও অণুপ্রেরণা পাবেন আপনি। আর অতি অবশ্যই বিপদের মুখে ভেঙ্গে না পড়ে বরং শক্তহাতে বিপদকে একহাত দেখিয়ে দেবার ইচ্ছাটা আপনার বহু গুণে বেড়ে যাবে। প্রিয় পাঠক, এবার আপনারাই বলুন, ২ ঘন্টা ১০ মিনিটের একটা মুভি যদি এতটা আবেদন সৃষ্টি করতে পারে তাহলে না দেখে উপায় আছে?!! দেখে ফেলুন তাহলে, কথা দিচ্ছি দেখার পর পস্তাবেন না! ও ভাল কথা, মুভির অভিনয় নিয়ে কিছুই বলা হল না। আসলে বলার কিছু নেই ও। এক ফ্রেমে যখন দুজন শিল্পী অভিনয় করেছেন তখন মাঝে মাঝে আমাকে পজ আর রিউইন্ড করতে হয়েছে অন্য শিল্পির এক্সপ্রেশনটা একটু ভাল করে দেখার জন্য!!! এক কথায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন সবাই।

মুভির সেট, কস্টীউম একেবারে নিখুঁত। আর সব কথায় শেষ কথা, মুভির নায়িকা কিন্তু সিমপ্লি অসাম!! দেখুন মুভিটা। যারা দেখে ফেলেছেন শেয়ার করুন আপনার অনুভুতি। যারা দেখেন নি তারাও থাকুন সাথে। শীঘ্রি নিয়ে আসব অন্য কোন অসম্ভব ভালো লাগা মুভি নিয়ে এই টাইপের অখাদ্য রিভিউ!!!  ।


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।