আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ন (ছোটগল্প)

গার্বেজ কোনরকমে একরকম কেটেই যায় রাসেলের দিনকাল, ব্যতিক্রমহীন, একঘেয়ে গ্রামীন জীবন, যার মৌলিক একক একটা দিনের সাথে আরেকটা দিনের তফাত করা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে রাসেলের ক্ষেত্রে। প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে মফস্বল শহরের স্কুলে যেতে হয়। আবার ঠিক দুপুরবেলা, যখন রাস্তার কুকুরগুলোও রোদের তীব্রতা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কোন গাছের ছায়ায় গিয়ে বিশ্রাম নেয়, তখন স্কুল থেকে ফেরে রাসেল। দুপুরবেলাটা নিরংকুশ ভাবেই বিরক্তিকর। অনেকদিন চেষ্টা করেও দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাসটা রপ্ত করতে পারেনি সে।

বিকালে মৌসুমভেদে ফুটবল, নাহলে ক্রিকেট, তা নাহলে পুকুর পাড়ে একা একা (যাকে খুব সহজেই বহুবচনে বলা যায় ব্যাং এবং পাখিদের গনণায় ধরে)বসে থাকা । রাতের বেলা অবশ্য কিঞ্চিত বৈচিত্রের উদ্ভব হয়, তাও আবার মহামতি কারেন্টের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন কারেন্ট থাকে, তখন তো মায়ের সেই একটাই বানী “রাসেল, পড়, পড়”, এত কিসের পড়া তাই রাসেল বোঝে না। অবশ্য সে এবার ক্লাস টেনে উঠেছে, সামনে মেট্রিক পরীক্ষা, পড়তে তো হবেই। তো সে পরীক্ষার আগে পড়লেই হবে।

এমনিতেও পড়তে ভালো লাগে না। কারেন্ট চলে গেলে অবশ্য ভালোই লাগে। মা তখন পড়তে বলে না, বললেও কারেন্টের অজুহাত দিয়ে পার পাওয়া যায়। তখন সে তার সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশ্যবিহীন, তার চিরপরিচিত রাস্তাসমূহ দিয়েই আর পকেটে রাখে তার মামার দেয়া চাইনিজ সেট। সজোরে হিন্দি গান চালিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে রাসেলের মনে হয়, ভালই আনন্দে কাটছে তার দিন।

মোবাইল সেটটা খুব ভাল, অনেক জোরে গান হয়, গান শোনা ছাড়া অবশ্য কোন কাজ রাসেল করে না সেট দিয়ে। সেও কাউকে কল করে না, অন্য কেউও তাকে কল করে না। তা না করলেও চলবে, গান শুনেই বেশ কেটে যায় লোডশেডিং এর সময়টা। মাঝে মাঝে অবশ্য ছোট বোন রীনার আবদারে লুডু খেলতে বসতে হয়। মোমবাতির আলোয় খেলা সেই লুডুতে রীনা সবসময় হারে রাসেলের কাছে।

তাতে রাসেলের ভারী আনন্দ হয়। অবশ্য রীনা আত্নবিশ্বাসী “আমি তো মোটে ক্লাস ফাইভ, তোর মত বড় হইলে তুই পারবি না আমার সাথে”, খুব নগ্ন ভাবেই সত্য যে রাসেলের জীবনযাত্রায় তার আব্বার কোন হাত নাই। আব্বা বাজারে একটা মুদির দোকান চালান। সোমবার হাটের দিন সাহায্যের জন্য রাসেল কে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হয় সেখানে। আর বাকি ছয়দিন আব্বাই দেখভাল করেন ব্যাপারটা।

সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত কলকাতার সিনেমা দেখেন বাজারের চায়ের দোকানে। তারপর বাসায় এসে খেয়েদেয়ে সুখী মানুষের ঘুম দেন। আব্বার সাথে সারাদিন যতটুকু কথা হয়, তা একেবারেই কথা না বলা থেকে খুব বেশী ভিন্ন নয়। এর পরেও রাসেলের মনে একটা বড় আফসোস। কোনদিন ঢাকা যায়নি সে।

ঢাকার জীবনটা যে কেমন?রাসেলদের বাড়ির কয়েকটা বাড়ি পরেই নান্নু ভাইদের বাড়ি। নান্নু ভাই ঢাকায় ভার্সিটিতে পড়ে, খুব ভাল ছাত্র। সবাই তার উদাহরণ দিয়ে রাসেলকে বলে “ভাল মত পড়ালেখা কর, তাহলে নান্নুর মত হতে পারবি। ” নান্নু ভাই বছরে তিন চার বার আসেন গ্রামে। তখন রাসেল তার কাছ থেকে ঢাকার গল্প শোনে, পড়ালেখার কথা শোনে, আরও কত কী।

এক কথায় বলতে গেলে নান্নু ভাই রাসেলএর এনসাইক্লোপিডিয়া, রাসেল যা যা সম্পর্কে জানতে চায় তাই নান্নু ভাই কে জিজ্ঞেস করে। এবং রাসেলের ভাগ্যই হোক কিংবা নান্নু ভাইয়ের মেধাই হোক কিংবা প্রশ্নের সরলতাই হোক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাসেলের প্রশ্ন একটা উত্তর পায়। নান্নু ভাই বাড়িতে আসলে রাসেল প্রায় প্রতিদিনই নান্নু ভাইয়ের রুমে যায়, নান্নু ভাইয়ের প্রত্যেকটা কথা তার কাছে অমৃত এর মত লাগে। নান্নু ভাইয়ের কাছ থেকে সে শুদ্ধ করে কথা বলা শিখেছে। পারতপক্ষে রাসেল শুদ্ধ করেই কথা বলে এখন।

গ্রাম্য টান টাই রয়ে গেছে কেবল, শব্দসমূহ কে আলাদা করে ফেলেছে। যদিও মাঝে মাঝে স্কুলের বন্ধুরা ঠাট্টা তামাসা করে, কিন্তু রাসেলকে নান্নু ভাই বলে দিয়েছেন “কেউ হাসি ঠাট্টা করুক, আর যাই করুক যা তোর কাছে ভাল মনে হবে, তাই সবসময় করবি। ” এখনো শুদ্ধ ভাষাকে খারাপ লাগেনি রাসেলের। সুতরাং গুরুর আজ্ঞা মেনে চলাটাই বহাল আছে। সবই ঠিক, কিন্তু একটা কিন্তু রয়ে যায়।

বছরখানিক ধরে রাসেল যে কুকর্ম সাধন করে আসছে, অভ্যস্ত হয়ে গেছে, অথবা নেশাগ্রস্থ হয়ে গেছে তা বলি বলি করেও সে নান্নু ভাই কে বলতে পারে না। হারামজাদা সুমন কেন যে তাকে গত ঈদের দিন ঐ সিডি টা দেখালো? কেনই বা স্বমেহনের অপার্থিব আনন্দের রেসিপি তাকে শিখালো? যদিও সুমনের প্রতি রাসেলের অনুভূতি আপাতদৃষ্টিতে রাগের, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে অনুরাগের। নিষিদ্ধ জগতের প্রতি, নগ্নতার প্রতি দুর্বার আকর্ষণের। এবার বাড়িতে আসার পর একদিন নান্নু ভাই পরিপূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই রাসেলকে হঠাত জিজ্ঞেস করলেন “আচ্ছা রাসেল, আমার নামটা তোর কাছে কেমন লাগে??” শিশ্নের কোন একটি প্রতিশব্দের সাথে অত্যধিক মিল থাকায়, ঠিক সেই শব্দটির ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত থাকায় এবং বন্ধুমহলে তা নিয়ে সুবিস্তর হাসাহাসি হওয়ার ফলে প্রশ্নটি শুনে রাসেলের ঠোঁটে একটু হাসির ঝলক দেখা দেয়। পরক্ষণেই হাসি মুছে ফেলে সে একটি দায়সারা জবাব এবং একটি পালটা প্রশ্ন করে “ভালোই তো ভাই, কেন?” নান্নু ভাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার ভঙ্গিতে বললেন “আমার নামে আছে তিনটা ন, তিন তিনটা ন, আর লক্ষ্য করে দেখ, ন ধ্বনিটা মূলত ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ সেন্সে, যেমন বাংলাতে না মানে নেগেটিভ, ইংরেজিতে নট কিংবা নো মানে নেগেটিভ, হিন্দি, উর্দু, জার্মান এইরকম অনেক অনেক ভাষাতেই দেখবি নেগেটিভ কিছু বোঝাতে হলে ন ধ্বনিটা ব্যবহার করতে হয়।

ইভেন, নেগেটিভ শব্দটাও শুরু ন দিয়েই, অনেক বাংলা শব্দের আগে ন বসালেই দেখবি তুই একটা নেগেটিভ অর্থবহুল শব্দ পেয়ে যাবি। আরো একটা মজার কথা কি জানিস? আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বশি ব্যবহার করি এই ‘না’ শব্দটাই, সুতরাং জাতিগত ভাবেই আমরা নেগেটিভ। আর আমার নামটা নেগেটিভনেসের চূড়ান্ত, দুইটাই লজ্জার ব্যাপার। " এতে লজ্জার কি আছে তা বুঝতে না পারলেও এই ব্যাখ্যাটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, ব্যাপারটা আসলেই মজার, লজ্জার হোক আর না হোক। পরেরদিন যথারীতি স্কুল, আর স্কুল মানেই সেই চিরাচরিত রাসেলের একঘেয়ে তপ্ত জীবন।

কিন্তু আজকে খুশীর ব্যাপার হল, সুমনকে খুব প্রফুল্ল দেখা যাচ্ছে। আর সুমনের হাসি তো ইদের চাঁদ, তা দেখলে সবাই বুঝতে পারে যে উতসব অপেক্ষমান। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে দু একটা ছোট ছোট প্রশ্ন এবং ততসংলগ্ন উত্তর ভাসে আশেপাশে। টিফিন টাইমের ঘন্টা পরলেই শুরু হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, রাসেল ও তার বন্ধুগণ, যারা মূলত সুমন ও তার নিজস্ব বাহিনী স্কুলের পিছের বাঁশবাগানে চলে যায়। এতদিন সুমন শুধু গল্পওয়ালা পুস্তিকাই নিয়ে আসত, কিন্তু আজকে রাসেল পুস্তিকাটির উপর দেখে বড় করে লেখা “১২ থেকে ৩০ পৃষ্ঠা রঙ্গীন ছবি।

” খুব সহজেই রাসেল তার এবং আশেপাশে আরো কিছু রাসেলের নিম্নাংশে উত্তেজনা টের পায়। এরপর, সবাই আরাধনার মত করে নগ্নতা গিলে খায়। তুলনামূলক ভাবে রাসেলের আগ্রহ বেশি থাকার ফলে সে পুস্তিকাটি হাতে নিয়ে গল্পগুলি সবাইকে পড়ে শোনায়। উফ, কতযে কাহিনী, কতযে উপমা, কি যে উত্তেজনা!!! পুরো আধাঘন্টা ঘোরের মাঝে কেটে যায় রাসেলের। ঘোর ভাঙ্গে টিফিন শেষ হবার ঘন্টার শব্দে।

তারপর আবার ক্লাস, আবার রোদ, আবার সাইকেল, সেই সনাতন জীবন। অনেক অনুরোধ করে সুমনের কাছ থেকে পুস্তিকাটি সে কয়েকদিন রাখার অনুমতি জোগাড় করেছে। খাদ্য বিহীন(কিংবা অন্য আঙ্গিকে বললে ভরপেট) টিফিনটাইম কাটানোর ফলে বাসায় আসার গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে রাসেলের। টিউবওয়েল থেকে পানি চাপার সময়ই সে নিম্নাঙ্গের উষ্ণতা টের পায়, আর পানি ঢালার সময় চোখ বন্ধ করেই চোখের সামনে বিশালবক্ষা রমনীর নগ্ন দেহ দেখতে পায়। বালতিতে মাছের পোনারা যেভাবে কিলবিল করে, তেমনি ভাবে তার মাথায় কিলবিল করে ভাবি আর দেবরের প্রণয় কিচ্ছা।

বাপ রে বাপ, কি মজাটাই না লুটলো দেবরটা!!! সঙ্গত কারণেই গোসল করতে এবং ভাত খেতে তার একটু বেশি সময় লাগে আজকে। তারপর আবার দুপুর, আবার বিকাল, আবারো সেই একই চক্রের মাঝে বন্দি একই রাসেল। চিন্তা করতেই রাসেলের দীর্ঘশ্বাস বের হয়। কিন্তু আজকের দিনটা সত্যিই ব্যতিক্রম। কারণ, আজ বিকালে সোমাদের বাসার (যা আসলে সোমার খালার বাসা এবং মালিকানা বিবেচনায় খালুর) দিকে তাকিয়ে রাসেল সোমাকে দেখতে পায়।

খুব আস্তে আস্তে কার সাথে যেন মোবাইলে কথা বলছে আর খুব হাসছে। রাসেল মন্ত্রমুগ্ধের মত কিছুক্ষণ জামগাছটার পিছে দাঁড়িয়ে সোমাকে দেখে। এত সুন্দরী কবে হল সোমা? রাসেলের মাথায় সোমার চেহারার সাথে সাথে বলিউডের বেশ কিছু নায়িকার ছবি ভেসে যায় একসাথে। অবশ্য সময়ের সাথে সাথে সময়ের ও বয়স বাড়ে। শেষ দেখা হয়েছিল ক্লাস এইটে থাকতে।

দুদিনের ঝটিকা ভ্রমণের মাঝে একদিন রাসেলের বাসায় এসে “কেমন আছিস?”, “মার্বেল খেলিস না আর?”, “পড়ালেখার কি অবস্থা?” এই জাতীয় আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আসলে গুরুত্বহীন ভদ্রতার প্রশ্ন, যে সকল প্রশ্নের উত্তরের তারতম্যে প্রশ্নকর্তার কোন বিকার ঘটেনা সেইসব প্রশ্ন করে চলে যায়। রাসেল অবশ্য তাতেই অনেক খুশি। কারণ এরও আগে সর্বশেষ বিচ্ছেদ টা সুখকর হয়নি। রাসেল ভেবেছিল সোমা সেই পুরনো রাগ ধরে রাখবে, কিন্তু সামান্য লুডু খেলার চৌর্যবৃত্তি যে আশরাফুল মাখলুকাতেরা মনে রাখে না, সেই বিষয়ে রাসেল সুনিশ্চিত ছিল না। সে যাই হোক, রাসেলের সাথে সোমার প্রথম পরিচয় ক্লাস ফাইভে থাকতে।

সোমার খালা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সোমা এক মাসের মত সময় ছিল ঐ বাড়িতে। সোমার খালাতো ভাই বোন গুলির বয়স সোমার থেকে অনেক বেশি, একটা ভাই চালের মিল চালায়, বোন দুটির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তার ও আগে। সুতরাং, খেলার সঙ্গী নাই, কথা বলার সঙ্গী নাই, মোদ্দাকথা বিনোদনের সুযোগ নাই। এত সব অভাব মেটানোর গুরুদায়িত্ব পড়েছিল রাসেলের উপর।

রাসেলের মায়ের সাথে সোমার খালার কিছুটা হাবভাব থাকাটাই সম্ভবত এর প্রধান কারণ। রাসেল এই সত্য আবিষ্কার করে এটা অনুধাবন করে যে, তাদের গ্রামে সোমার সমবয়সী বেশ কিছু ছেলে মেয়ে থাকা সত্ত্বেও তার ডাকটাই সবার আগে পড়ে, এবং সোমার খালা তাকে এবং সোমাকে বুঝিয়ে বলেন – তাকে তিনি ভরসা করেন, সে একজন ভালো ছেলে। সোমার খালার সাথে রাসেলের মায়ের খাতির ভালো হওয়ার ফলে এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে সোমাদের পরিবার রাসেলেদের পরিবার থেকে বেশ খানিকটা উপরে হবার ফলে সোমার সাথে রাসেলের খেলার ব্যাপারে রাসেলের মায়ের আপত্তি তো থাকেই না, বরং যা থাকে তাকে অতিরিক্ত আগ্রহ বললে অত্যুক্তি করা হয় না। প্রথম প্রথম অবশ্য রাসেল নিজেই সংকোচ অনুভব করে। কারণ, তার বন্ধুমহল ততদিনে অনেক গবেষণা করে বুঝে ফেলেছে যে, মেয়েরা পৃথিবীর সবচেয়ে ফালতু প্রজাতি এবং তাদের সাথে কথা বলাটা নেক্কারজনক কাজ।

দু’ একবার না না করে লাভ হয় না, রাসেলের মা তাকে বুঝিয়ে দেন যে, এতে কোন সমস্যা নাই, মেয়েটার সময়টা ভাল কাটবে, রাসেলেরও মজা হবে। কয়েকদিন রাসেলের বন্ধুরা তাকে ক্ষ্যাপানোর চেষ্টা করেছিল বটে। রাসেল তাতে কর্ণপাত করে নি। কারণ, সারাদিন খেলাধূলা করা , পড়ালেখা করার জন্য কোন রূপ আদেশবিহীন ভাবে দিন কাটানো, অনায়াশে দিনের পর দিন স্কুল না যাওয়া, এমন সুবর্ণ সুযোগ মানুষের জীবনে বারবার আসে না। সে একটা মাস গেছে বটে!!! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হয় মার্বেল, তা নাহলে লুডু, তা নাহলে সোমাদের বাসায় ক্যারাম খেলতো দুজন।

সোমা চলে যাওয়ার পর বেশ কয়েকদিন রাসেলের মন খারাপ ছিল। সোমার ও মন খারাপ হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে সে খুব ভাবতো, কিন্তু জিজ্ঞেস করার মত সুযোগ না পেয়ে সময়ের সাথে সাথে প্রশ্নটাই হারিয়ে গেছে। এই সেই সোমা, এই সেই মার্বেল খেলার সাথী। ভাবতেই রাসেল অবাক হয়, সেই সোমার সাথে এই সোমার মিল খুঁজে পাওয়া কতটা দুষ্কর তা সোমা নিজেও জানে না বোধহয়। জানলে সেই চিকন চাকন শ্যামলা বালিকা ক্লাস এইট থেকে টেন এ ওঠার স্বল্প সময়ের মধ্যে চারপাশ আলোকিত করে ফেলার মত সুন্দরী হয়ে যায় কিভাবে? গায়ে মাংসও লেগেছে বেশ।

রাসেল হঠাত করেই ‘তরুনী’ শব্দটি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। শহরে থাকলে বোধহয় এমন ই হয়, এই ভেবে রাসেল নিজের মনকে প্রবোধ দেয়। আগে থেকে পরিচয় না থাকলে আজকের সোমা খুব সহজেই রাসেলের কাছ থেকে একটি সালাম এবং আপনি সম্বোধন লুফে নেয়ার যোগ্যতা রাখে। সেই দিন বিকালে বিকাল কিংবা মাঠ, ফড়িং কিংবা ক্রিকেট এর চেয়েও সোমার সাথে কথা বলার প্রতি রাসেল আকর্ষণ বোধ করে অনেক বেশি। সোমাদের বাসার ঠিক পিছনের আমগাছটির নিচে উদাস হয়ে বসে থাকে রাসেল।

এই ঔদাসীন্য পুরোটাই মেকি, রাসেল এমন এক স্থানে বসে যার কিছু মৌলিক গুণ আছে। প্রথমত, সেখান থেকে খুব সহজেই সোমাদের বাসার সেই বারান্দা দেখা যায়, যেখানে সোমা মোবাইল কানে নিয়ে নির্লিপ্ত ভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, সোমার দৃষ্টিসীমানায় সহজেই আটকা পড়ে যায় অথচ সে যে সোমার উদ্দেশ্যেই এখানে বসেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় না। মূল কথা, রাসেল ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ জাতীয় একটা উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং সফলভাবে সফল হয়। কারণ, মিনিট দশেকের মাঝেই সে সোমাকে তার দিকে আসতে দেখে।

সোমাকে দেখে তার উঠে দাঁড়ানো উচিত কি অনুচিত তা নিয়ে কিঞ্চিত দোটানায় পড়ে রাসেল। দাঁড়ানো টা কি হাস্যকর হয়ে যায় না? কিন্তু না দাঁড়ানো টা কে যদি সোমা অপমান হিসাবে নেয়? কিংবা পরিপূর্ণ আকর্ষণের ঘাটতি মনে করে, যেই আকর্ষণ সোমা পুরো পুরুষ জাতির কাছ থেকেই দাবি করে? কিন্তু, এই দোটানায় রাসেলকে বিচলিত হবার তেমন সুযোগ সোমা দেয় না। কারণ, রাসেল পরক্ষণেই বুঝে ফেলে সোমা আসলে এসব নিয়ে অত ভাবে না, কারণ বেশ খানিকটা দূরত্ব থেকেই সোমা প্রায় চিতকার করে ওঠে “আরে, রাসেল না? আছিস কেমন?কতদিন পর দেখা! এর আগে তো বোধহয়… দুই বছর হয়ে গেল না? আমি তো …”। রাসেল শুধু অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে, কারণ তার মন তখন সোমার সৌন্দর্য গিলে খেতে এবং তাতক্ষণিক ভাবে তা হজম করতে ব্যস্ত। ঘড়ির কাঁটা চলে ঘড়িরই বেগে, কিন্তু রাসেলের ইন্দ্রীয় চলে বুলেট বেগে।

কারণ দু একটি সেকেন্ডের মাঝেই রাসেল অনুধাবন করে ফেলে সোমার সোমা হয়ে ওঠার অস্ত্র সমূহ। সোমার হাঁটা, সোমার পুরো শরীরের দোল, হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার মোহনীয় ভঙ্গি, রাসেল শুধু মুগ্ধই হতে থাকে। ঘিয়ের মত শরীরের রঙ সোমার, হাতে মেহেদীর সুনিপুণ কারুকাজ, কি গাঢ় তার রঙ, কি সুতীব্র সোমার শরীরের গন্ধ, চুলগুলো কতটা কালো। রাসেল পুংখানুপুংখুভাবে টের পায় সব, এবং তার কাছে মনে হয় অনেক টা সময় চলে গেছে। এই রূপ, এই বর্ণ, এই গন্ধে সে আটকে আছে অনেকক্ষণ ধরে।

কিন্তু তার সেই ভ্রম ভাঙ্গে যখন এক আকস্মিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয় সে “কিরে, তুই কি বোবা নাকি? কবে থেকে?”। রাসেল সেই হাসিতে আবারো ডুব দিয়ে সময়ের ফাঁদে পড়ে যেতে গিয়েও কোনরকমে নিজেকে রক্ষা করে। প্রথম দিকের প্রশ্নগুলি ছিল টিক চিহ্ন দেয়া, মাথা নেড়ে জবাব দেয়া যায়। কিন্তু এইটা বর্ণনামূলক। কথা না বললে পুরো ভুল উত্তর।

রাসেল যতটুকু ভদ্র হওয়া যায় ততটুকু উজাড় করে দিয়ে বলে “না, না, বোবা হব কেন? তোর খবর সবর কী?” “এইতো আছি, হঠাত ছুটি পেয়ে গেলাম এক সপ্তাহের জন্য, মা আর আমি চলে আসলাম, খালার বাড়ি তো আসাই হয় না প্রায়। রীনা কত বড় হল রে?” “এখন ক্লাস ফাইভ, পড়ালেখা করে না কিচ্ছু, খালি দুষ্টামি কইরা বাড়ায় । " রাসেল অত্যন্ত সাবলীল ভাবে নিজেকে মেধাবী, পড়ালেখা এবং সংসারের প্রতি মনো্যোগী হিসেবে ফুটিয়ে তোলে। তার কাছে মনে হয় এটা তার অত্যন্ত প্রয়োজন, অবশ্য কর্তব্য। “তুই তো অনেক স্মার্ট হয়ে গেছিস রাসেল, সেই গ্রাম্য ছেলেটা আর নাই, আর এত সুন্দর করে কথাই বা বলতে শিখলি কবে?”রাসেলের মুখে প্রায় এসে যাচ্ছিল সোমার স্মার্টনেস এবং সৌন্দর্য বর্ণনা করার মত স্তুতিবাক্য, কিন্তু পরক্ষণেই রাসেল বোঝে যে, এই সৌন্দর্য, এই রূপ বর্ণনা করার মত শব্দ তার শব্দ ভান্ডারে নাই, সে অল্পক্ষাণিকক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে পাখিদের কলকাকলি শোনে, তারপর খুব মৃদু স্বরে বলে “সেইদিন দেখলাম মোবাইলে কার সাথে খুব হেসে হেসে কথা বলছিস, অনেক বন্ধু বান্ধবী না তোর?” এর উত্তরটা হয় পুরোই অপ্রাত্যাশিত, রাসেল শুধু কথা বলার সময় সোমার হাতের নড়নটাই দেখে আসছিল।

কিন্তু এবার প্রায় পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে হেসে সোমা বলে “আমার বয়ফ্রেন্ড আআছে”, এই বাক্যের মাঝে আ ধ্বনিটার প্রলম্বন এবং কথাটি বলার সময় সোমার পুরো দেহ নাড়ানোটাকে খুব সহজেই একটা নাচের মুদ্রার কাতারে ফেলা যায়। অন্তত, রাসেল বোঝে যে, সোমা কথাটি নেচে নেচে বলেছে। সঙ্গে সঙ্গে রাসেল বিষণ্ণ হয়ে পড়ে নিজের সামর্থহীনতার সত্য অনুধাবন করে। প্রথমত, শরীর ঝাঁকিয়ে হাসা এবং নেচে নেচে কথাটি বলার অর্থ সে বুঝতে পারে নি। কিন্তু তারচেয়েও বড় এবং ভয়ংকর কথা যে, বয়ফ্রেন্ড শব্দের মানেই সে জানে না।

আর ও কিছুক্ষণ কথপোকথন চলে তাদের, সেইসব কথপোকথন যাদের কে গুরুত্বহীন ভদ্রতার কথপোকথন বললেই চলে। যেমন - “স্কুল কেমন লাগে?”, “সময় পেলে আসিস। ” “শহরে আসলে দেখা করিস। ” “আন্টিকে আমার সালাম দিস। ” “আমার নাম্বার নে, তোর নাম্বার দে” ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাসায় ফিরে আসার সময় রাসেলের মাথায় বয়ফ্রেন্ড শব্দটার অর্থ সংক্রান্ত অজ্ঞতা চড়কির মত ঘুরতে থাকে। বয়ফ্রেন্ড মানে কী? বয় এবং ফ্রেন্ড শব্দ দুটির অর্থ রাসেল খুব ভাল মতই জানে। সত্য বলতে কী, হয়তোবা যে কোন ইংরেজী দুটি শব্দ অর্থ সহ বানান লিখতে বললে এই মুহূর্তে সে এই দুটিশব্দকেই বেছে নেবে, কারণ এই দুটি শব্দের ব্যাপারে সে সুনিশ্চিত। কিন্তু, বয়ফ্রেন্ড মানে কী?সারারাত সে এই একটা শব্দ এবং ততসঙ্গলগ্ন সোমার আচরণ নিয়েই চিন্তা করে, পড়ালেখায় তার মন বসে না, লুডু খেলাতে কোন আগ্রহ পায় না। মন কে অন্যদিকে সরানোর জন্য সে সুমনের দেয়া পুস্তিকাটি নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নগ্নতার মাঝে হারিয়ে যেতে থাকে।

বিধাতার অশেষ কৃপায় এই ঘটনা ঘটার সময় রাসেলের এনসাইক্লোপিডিয়া নান্নু ভাই গ্রামে ছিলেন। পরেরদিন শুক্রবার সকালবেলা রাসেল নান্নু ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে এই কথা সেই কথা ইত্যাদি গুরুত্বহীন ভদ্রতার কথা বলার পর আসল প্রশ্নে আসে। “নান্নু ভাই, বয়ফ্রেন্ড মানে কী?” নান্নু ভাই খুব ঝটপট করে জবাব দেন “প্রেমিক বলতে পারিস। ” তারপর হঠাত রাসেলের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। রাসেলের মনে হয় যে তিনি সব বুঝে ফেলছেন, কী হয়েছে, কী হবে সব।

অস্বস্তি হতে থাকে রাসেলের। কিন্তু নান্নু ভাই সম্ভবত রাসেল যতটা জ্ঞানী মনে করে ততটা না। কারণ তিনি রাসেলের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে আস্তে বলেন “তোর তো বয়স হয়েছে, জানার কথা। আচ্ছা, শোন, অক্সফোর্ড ডিকশনারি মতে বয়ফ্রেন্ড মানে হল কোন মেয়ের প্রেমিক যার সাথে তার দৈহিক সম্পর্ক আছে। ” মুখে “ও আচ্ছা, ঠিকআছে” বললেও রাসেলের মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে থাকে।

সে উপলব্ধি করে কোন কিছুই ঠিক নাই, পুরো দুনিয়াটাই ভুল। রাসেলের কানে নান্নু ভাইয়ের আরও কিছু কথা ভেসে আসে, কিন্তু তার মাথা পর্যন্ত কিছু পৌঁছায় না। এর কিছুক্ষণ পর রাসেল বাসায় ফিরে আসে। জুম্মার নামাজ পড়তে যেতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি করে চলে যায় গোসলে। গোসল করতে যাওয়ার সময় রাসেলের মাথা ভারী ভারী লাগে, এলোমেলো বিক্ষিপ্ত ভংগিতে পা পড়ে মাটিতে।

যেন ঠিক মাটিতে না, মাটির কিছুটা উপর দিয়ে ভেসে ভেসে যায় রাসেল। আশ্চর্যজনক ভাবে চোখ দুটো বড় বড় করে অবাক হয়ে চারিদিক দেখে সে। এবং সবকিছুই তার কাছে অপরিচিত মনে হয়। ১৬ বছর ধরে এই একই মাটি, একই গাছগাছালি, একই পারিপার্শ্বিকের মাঝে বন্দী রাসেল কোন কিছুকেই আর আপন করে পায় না। হঠাত সূর্যটা মেঘে ঢেকে গেলে শরীরে পানি পড়ার সাথে সাথে ঠান্ডা লাগে তার।

কখন নিজের অজান্তেই হাত দুটো তার ব্যস্ত হয়ে ওঠে। রাসেলের মাথায় শুধু সোমার সাথে কথপোকথনের চুম্বক দৃশ্য টাই একবার, দুবার থেকে বারংবার লাটিমের মত চক্রাকারে ঘুরতে থাকে, একই লাটিম, একই জায়গায়, প্রচন্ড গতিতে। বয়ফ্রেন্ড? আজব ঘটনা, সোমার বয়ফ্রেন্ড থাকার পরও, এবং যারপরনাই বয়ফ্রেন্ড এর সাথে শারীরিক সম্পর্ক থাকার পরও সোমা এত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায় কিভাবে? এরপরও হেসে হেসে মানুষের সাথে কথা বলে কিভাবে? রাসেল কোন জটই খুলতে পারে না। ইতোমধ্যে গতরাতের টাটকা স্মৃতিসমূহ, সচিত্র পুস্তিকার রঙ্গীন ছবি ও বর্ণনা সমূহ রাসেলের চিন্তায় আঘাত হানে। রাসেল চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে সে সোমা ও তার সাথে দৈহিক মিলনরত তার বয়ফ্রেন্ড কে দেখতে পায়।

চোখ খুলেও লাভ হয় না। পরিপূর্ণ আলোকের মাঝেও রাসেল খুব ভালোমত বুঝতে পারে তাদের চেহারা। এত জীবন্ত কাউকে কখনো দেখেনি রাসেল । ঐ তো রক্তমাংসের সোমা, ঐ তো সোমার বয়ফ্রেন্ড। মাত্র দু এক হাতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে কংকর্তব্যবিমূঢ় রাসেল।

আশ্চর্য এই যে, কল্পিত বয়ফ্রেন্ডের চেহারাটা অবিকল রংগীন পুস্তিকায় দেখা বিশাল এক শিশ্নের অধিকারী পুরুষের মত। সোমার অনাবৃত শরীর গলে পড়ে মধু। রাসেলের হাত চলে দ্রুত থেকে দ্রুততর। মাথার মাঝে সাদা কালো ডোরাকাটা ছবির মত ঘোর, ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ফায়ারওয়ার্কস।

রাসেলের মুখ দিয়ে শুধু একটাই শব্দ খুব আস্তে মৃদু কন্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে বারবার “না, না, না। ” এত আস্তে যে শুধু ঠোঁট দুটোই নড়ে, রাসেলের কানেও ঐ শব্দ পৌঁছায় না। তার ও কিছুক্ষণ পর কোত্থেকে যেন একটা দমকা বাতাস আসে। রাসেলের ভেজা শরীর শিরশির করে কেঁপে ওঠে।  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।