আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গল্প: অশুভ গলির তিন প্রেত

বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক, হে ভগবান। বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ, পুর্ন হউক, পূর্ন হউক, পূর্ন হ্‌উক, হে ভগবান। রবীন্দ্রনাথ নন্দীপাড়ার সরু রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। শুক্কুরবার সকাল। মেঘহীন উজ্জ্বল দিন।

ঢাকা শহরের এ দিকটা বেশ ঘিঞ্জি। অনেকদিন এদিকটায় আমার আসা হয় নি। নন্দীপাড়ায় এসেছিলাম জমি দেখতে। আমার জমি পছন্দ হয়নি। তাছাড়া নিষ্কন্ঠক বলে মনে হল না।

আমি ব্যাঙ্কে চাকরি করি। জাল কাগজপত্র সহজে ধরতে পারি। দালালের সঙ্গে কিছুক্ষণ চোটপাট করে এখন রাগের মাথায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল- এদিকেই তো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ওয়াহেদরা থাকত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওয়াহেদের সঙ্গেই দু-একবার ওদের নন্দীপাড়ার বাড়িতে এসেছিলাম ।

যদিও ওয়াহেদ-এর সঙ্গে বহু বছর যোগাযোগ নেই। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করি তখনও মোবাইল যুগ শুরু হয়নি। এটা এক কারণ। অন্য কারণ হল, আমি এম.এ পাস করেই অনেকটা তাড়াহুড়ো করে বিদেশ চলে গিয়েছিলাম। দীর্ঘকাল প্রবাস জীবন কাটিয়ে এই বছর দশেক হল দেশে ফিরে এসেছি।

আমি ওয়াহেদের খোঁজ নেব ঠিক করলাম। ও যখন এদিকেই থাকে হয়তো সে আমাকে দস্তুরমতো এক টুকরো জমির খোঁজ দিতে পারবে। তাছাড়া ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা করার আরও একটা কারণ আছে। আমাদের সবারই বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। চুলে পাক ধরেছে।

হার্টের অসুখ আর ডায়াবেটিস নিত্যসঙ্গী। এই সময়টায় পুরনো বন্ধুবান্ধবের জন্য মন হু হু করে। সামান্য ঘোরাঘুরির পর ওয়াহেদরা যে গলিতে থাকত সেই গলিটা চিনতে পারলাম। গলির ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই আমার গা কেমন ছমছম করে উঠল।

এর কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না। অস্বস্তিকর অনুভূতি এড়াতে একটা সিগারেট ধরালাম। দু’পাশে আস্তর-ওঠা দেয়াল, নোংরা ড্রেন। দোতলা, তিনতলা সব বাড়ির লোহার গেট। ঝাঁপি-ফেলা মুদিদোকান।

সিগারেট টানছি। আর হাঁটছি। বাঁ পাশে কচুরিপানা ভরতি একটা পুকুর। বাতাসে পানার গন্ধ ভাসছে। শুক্কুরবারে এমনিতেই ঢাকা শহরটা ঝিম মেরে থাকে।

এই গলিতেও এই মুহূর্তে লোকজন তেমন চোখে পড়ল না। রোদটা কেমন মরাটে হয়ে এসেছে। তবে আকাশে মেঘ-টেঘ জমেনি। ভাবছি ওয়াহেদরা কি এখনও এখানেই থাকে। ও খুব প্রাণবন্ত ছেলে ছিল।

সারাক্ষণ বন্ধুদের মাতিয়ে রাখত। এম.এ পড়ার সময় হঠাৎই ওর বাবা মারা যান। তারপর ওয়াহেদ কেমন গুটিয়ে যায়। ভার্সিটি কম আসত। ওর মা বেঁচে ছিলেন না।

শিউলি নামে ওয়াহেদের এক বোন ছিল। আমরা ওয়াহেদদের বাসায় গেলে শিউলি পরদার ওপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মারত। ট্রেতে চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে খুব সেজেগুঁজে বসারঘরে আসত। শিউলি বেশ সুন্দরী ছিল দেখতে। ফরসা।

ক্লাস নাইন কি টেনে পড়ত সম্ভবত। (ওয়াহেদ রক্ষণশীল ছিল, ও বোনকে চোখে চোখে রাখত) মনে আছে ... ওয়াহেদদের বাড়িটা ছিল দোতলা। ওরা অবশ্য একতলায় থাকত। দোতলা ছিল ভাড়া। আর একটা ফার্মেসি ছিল ওদের।

ওর এক আত্মীয় বসত ফার্মেসিতে। তবে বাবা মারা যাওয়ার পর ওয়াহেদকেই ফার্মেসি দেখাশোনা করতে হত। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সুরভী নামে একটি মেয়ের সঙ্গে ওয়াহেদের ভালোবাসার সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল। তবে সুরভীর চরিত্রে অদ্ভূত এক দ্বৈততা ছিল। বেশ শান্ত, গম্ভীর, চশমা পরা সুরভী পড়ত সমাজকল্যাণ বিভাগে।

শ্যামলা রঙের ছিপছিপে সুরভী কথাও বলত কম। সুরভী ছিল রাজশাহীর মেয়ে। ওর এক কাজিন (চাচাতো ভাই) পড়ত লোকপ্রশাসন বিভাগে। কালো স্বাস্থবান, গোলগাল চেহারার শাহনেওয়াজ আর সুরভীকে প্রায়ই আমরা ক্যাম্পাসে, টিএসসিতে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। ওয়াহেদ, বরাবরই দেখেছি, শাওনেওয়াজকে একেবারেই সহ্য করতে পারত না।

সুরভী নাকি বলত, তুমি অহেতুক শাহনেওয়াজ ভাইকে সন্দেহ কর ওয়াহেদ। অবশ্য আমি সরাসরি এসব ঘটনায় যুক্ত ছিলাম না। দূর থেকে দেখতাম কেবল; আর পাত্রপাত্রীকে চিনতাম শুধু। আসলে এ রকম কত ঘটনার সাক্ষী ছিলাম ইউনিভারসিটি জীবনে। ওয়াহেদ-সুরভী আর শাহনেওয়াজ-এর ত্রিমূখী দ্বন্দটি ছিল সেরকমই একটি ঘটনা।

ওদের কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত? কথাটা ভাবতে ভাবতে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি- একটা শাটার-ফেলা একটা সেলুনের সামনে ওয়াহেদ। মাথায় ছোট ছোট করে ছাঁটা লালচে শক্ত চুলে পাক ধরেছে মনে হল। লম্বাটে ফরসা মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের পুরু লেন্সের চশমা।

পরনে খয়েরি রঙের বার্মিজ লুঙ্গি আর কুঁকচে যাওয়া গোলাপি রঙের শার্ট। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ গোটানো। ওকে দেখে সিগারেট ফেলে দিলাম। ওয়াহেদ আমাকে দেখেছে।

চিনতে চেষ্টা করছে বলে মনে হল। চিনতে পেরে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, এনামুল না? আমি হাসলাম। হ্যাঁ, দোস্ত। কেমন আছিস? ওয়াহেদ ফ্যাকাশে হাসল। উত্তর দিল না।

পুরু লেন্সের ফাঁকে ওর চোখ দুটি কেমন ঘোলা দেখালো। ঘোলা খুব শীতল মনে হল। মনে হল চোখ দুটি মার্বেলের তৈরি। হঠাৎ আমার কেমন শীত করতে থাকে। হঠাৎ বাতাসে আশটে গন্ধ পেলাম।

মনে হল কাছেই কোথাও বেড়াল বা ইঁদুর মরে পড়ে থাকবে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। বললাম, অনেক দিন পর। তাহলে তোরা এখানেই থাকিস? ওয়াহেদ মাথা নাড়ল। বলল, বাপদাদার বাড়ি।

চারিদিকে তাকিয়ে বললাম, এ দিকটা এখনও আগের মতেই আছে। তা এখন কি করছিস তুই? প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল ওয়াহেদ। বলল, আমরা এখনও ওই দোতলা বাড়ির এক তলায় থাকি । বলে হাত তুলে একটা হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি দেখাল। বাড়ির সামনে প্রাচীর।

খয়েরি গেইট। প্রাচীরের ওপাশে পেয়ারা গাছ চোখে পড়ে। বাড়িটা দেখেই চিনতে পারলাম। বেশ পুরনো দোতলা বাড়ি। মনে আছে ওয়াহেদ বলেছিল- ওরা ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী।

তবে কুট্টি নয়। পাশ দিয়ে একটা খালি রিকশা চলে যায়। আতরের গন্ধ ভুরভুর পেলাম। অবাক হলাম। রিকশাওয়ালা কি আতর মাখে নাকি? এনামুল ।

ওয়াহেদ খসখসে কন্ঠে বলে। কি? বল। দোস্ত। তুই এখন আমার বাড়ি গিয়ে বস। আমি একটু পরেই আসছি।

সে কী! তুই যাবি না? তুইও চল না। না, না। তুই যা। আমি এখটু পরেই আসছি। বলে হনহন করে হাঁটতে লাগল ওয়াহেদ।

ভাবলাম ওর হাতে বাজারের ব্যাগ। বাজার-টাজার করতে যাচ্ছে। আমার সামনে কেনাকাটা করতে লজ্জ্বা পাচ্ছে। আমি হাঁটতে-হাঁটতে ভাবলাম- আশ্চর্য! আমি কি করি বা কোথায় থাকি- সেসব ওয়াহেদ জানতে চাইল না। আর ওর হাতে মোবাইলও নেই দেখলাম।

তবে ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হল। ওয়াহেদ যদি এ দিকেই কোথাও দেড়-দুই কাঠার ওপর নিষ্কন্ঠক জমির খোঁজ দিতে পারে তো ভালো হয়। হাউজ বিল্ডিংয়ের লোন নিয়ে একটা বাড়ির কাজে হাত দেব। ফ্ল্যাটের এখন যা চড়া দাম। এদিকে নিজের একটা বাড়ির জন্য আমার বউ সঞ্চিতা বড় উতলা হয়ে উঠেছে।

সেই খালি রিকশাটা ওয়াহেদদের বাড়ির সামনে থেমে আছে। রিকশায় একটা মাঝবয়েসি লোক উঠল। মনে হল লোকটা ওয়াহেদদের বাড়ি থেকেই বেড়িয়ে এসেছ । কালো রঙের বেশ থলথলে শরীর। পরনে কালো প্যান্ট আর হলদে রঙের হাফ হাতা শার্ট।

ফোলা ফোলা গোলগাল মুখে দাড়ি। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। লোকটাকে কেমন চেনা চেনা লাগল। সহসা চমকে উঠলাম-শাহনেওয়াজ! আশ্চর্য! শাহনেওয়াজ এখানে কেন! তাহলে কি ওয়াহেদ সুরভী কে বিয়ে করেছে। সেই সূত্রে শাহনেওয়াজ এ বাড়িতে আসে।

আর ওদের মিটমাট হয়ে গেছে। কই, এসব কথা তো ওয়াহেদ আমাকে কিছু বলল না। মাথার ভিতরে অনেক এলোমেলো প্রশ্ন নিয়ে বারান্দায় উঠে এলাম। পুরনো আমলের রেলিং ঘেরা বারান্দার মেঝেটি লাল রঙের রেডঅক্সাইডের। এই বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে ওয়াহেদের বৃদ্ধ বাবা বসে থাকতেন।

ধবধবে ফর্সা ছিল বৃদ্ধের গায়ের রং । খুব কাশতেন। সেই বারান্দা এখন শূন্য। বারান্দার লাল মেঝেতে সাদা অলপনা আঁকা। কার বিয়ের? শিউলির না ওয়াহেদ-এর? শিউলী এখন কোথায়? ওকে ভালো বেসেছিল আমাদের এক সহপাঠী আফসার।

শিউলিকে নিয়ে গোপনে কবিতা লিখত আফছার। অবশ্য ওই পর্যন্তই। এটিও আমার ইউনিভারসিটি জীবনে দূর থেকে দেখা একটি ঘটনা। কলিংবেলে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটু পর যে মাঝবয়েসি মহিলাটি দরজা খুলে দিল তাকে দেখামাত্রই চিনতে পারলাম।

সুরভী আমাকে দেখেও চিনতে পারল । বলল, এসো, এনামুল । ভিতরে এসো। কন্ঠস্বর কেমন শীতল। আমি ভিতরে ঢুকলাম।

ঢুকেই কেমন একটা পুরনো গন্ধ পেলাম। ঘরের পরদা ফেলা। অল্প পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছিল। তবে ঘরটা আগের মতোই আছে দেখলাম। বেতের সোফার ওপর লাল মখমলের কাপড় বিছানো।

সাদা চুনকাম করা দেয়ালে মাওলানা ভাসানীর একটা ফ্রেমবন্দি সাদাকালো ছবি। উলটো দিকে একটা ক্যালেন্ডার। ১৯৯৩ সাল দেখে চোখ আটকে গেল। কি ব্যাপার? এরা ক্যালেন্ডার বদলায়নি কেন? ঘরের বদ্ধ বাতাসে আগরবাতির মৃদু গন্ধ ভাসছিল। বস।

এনামুল। বলে সুরভী সোফার ওপর বসল। ওর পরনে ছাই ছাই রঙের একটা ছাপা শাড়ি। ক্লালো ব্লাউজ। এত বছর পর আর শরীরের সেই ছিপছিপে গড়ন নেই।

থাকার কথাও না। বেশ মুটিয়েছে সুরভী। শ্যামলা রংটা মলিন আর শুষ্ক মনে হল। তবে চশমা ছাড়া লাবণ্যহীন মুখটা কেমন অদ্ভূত দেখাচ্ছিল ওকে। মুখটা কেমন রক্তশূন্য ফ্যাকাশে বলে মনে হল।

কেমন আছ বল? সুরভী জিজ্ঞেস করে। আছি। তোমরা? আমরা? আমরা আছি একরকম। একটু আগে আমি শাহনেওয়াজকে দেখলাম। সেই কথা আর বললাম না।

বরং বললাম, এদিকে আসছিলাম একটা কাজে। হঠাৎ মনে হল ওয়াহেদের কথা। ও। তুমি কি চাকরিবাকরি কিছু করছ? সুরভী মাথা নেড়ে বলল, আমি? না। আমি কি করি বা কোথায় থাকি সুরভী সেসব জিজ্ঞেস করল না বলে খানিকটা অবাক হলাম।

হঠাৎ সুরভী বলল, আচ্ছা এনামুল তুমি একটু বস । আমি চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে আসছি । বলে উঠে দাঁড়াল। ওদিকের দরজার কাছে যেতে না যেতেই সুরভী মিলিয়ে গেল। দরজার পর্দা দুলল না।

আশ্চর্য তো। চোখের ভুল দেখলাম মনে হল। সমস্ত বাড়ি নিরব হয়ে আছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শব্দ যেন ঘনিয়ে ওঠা রহস্যময়তাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে।

এই ঘরের আলো কিছুটা ম্লান। আর বেশ ঠান্ডা । হঠাৎ দেখতে পেলাম নিঃশব্দে একটা বেড়াল এসে ঘরে ঢুকল। মেঝের ওপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কালো রঙের বেড়াল।

চোখের মনি দুটি উজ্জ্বল হলুদ। বেড়ালটা একবারও ডাকল না। অচেনা মানুষ দেখে একবার অন্তত ডাকার কথা। অবশ্য আমি বেড়াল বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল।

ওয়াহেদ এখনও ফিরছে না কেন? সোফার ওপর খবরের কাগজ পড়ে ছিল। তুলে নিলাম। দৈনিক ইত্তেফাফ। আজকাল এই পত্রিকাটা আগের মতন যত্রতত্র চোখে পড়ে না। পাতা উল্টে তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি খবরে চোখ আটকে গেল।

রামপুরার একটি বাড়িতে ভৌতিক কান্ড। রাতের বেলা কীসব যেন দেখা যায়। ভাড়াটে বেশি দিন থাকে না। বাড়িওয়ালা নাকি উলটো ভাড়াটেকে দুষছে ...পড়তে পড়তে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসে । তুমি কেঠা বাবা? খনখনে কন্ঠ শুনে আমি চমকে উঠলাম।

মুখ তুলে দেখি আমার সামনে লাঠিতে ভর দিয়ে এক থুত্থুরে বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধ বেশ কুঁজো। চুল-দাড়ি- ভুরু সব পাকা। মাথায় কিস্তি টুপি। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা রঙের লুঙ্গি।

আশ্চর্য! কে ইনি? সুরভী কোথায় গেল? আমি বললাম, আমি ...আমি ... আমার নাম সৈয়দ এনামুল হক। আমি ... মানে আমি ওয়াহেদের বন্ধু। আমরা একসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালাম। সেই কালো বেড়ালটাকে কোথাও দেখলাম না।

ওটা গেল কোথায় ? আশ্চর্য! অ। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ আমার মুখে দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, হ। এইবার বুঝলাম। আমার নাম হইল মোশাররফ হোসেন।

ওয়াহেদে হইল গিয়া আমার চাচতো ভাইয়ের একমাত্র পোলা। তয় সুবহান ভাইয়ে মইরা গেলে পর আমি তার ফার্মেসিতে বসতাম। পরে ওয়াহেদের বোইনে বিদেশ থন আইসা দুকান বিক্রি কইরা দিল। আমি বুড়া মানুষ। আমি কই যামু বাবা কও।

তখন শিউলীর হাতেপায়ে ধইরা প্রতিমাসে একতলা দুইতলা ভাড়া তুইলা ব্যাঙ্কে জমা দিমু এই শর্তে শিউলী আমারে এই বাড়িত থাকতে দিল। কইলাম ভাড়া দিমু। তয় এই বাড়িত ভাড়াইট্টা বেশি দিন থাকে না। কথাটা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? এ বাড়িতে বেশি দিন ভাড়াটে থাকে না কেন?বলতে বলতে আড়চোখে ইত্তেফাক পত্রিকার দিকে তাকালাম।

পেপারটা যেখানে গুটিয়ে রেখেছিলাম পেপারটা সেখানে নাই। আশ্চর্য! পেপারটা কোথায় গেল! বৃদ্ধ যেন আমার প্রশ্ন শুনতে পান নি। কিংবা প্রশ্নের জবাব দিতে চান না। তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে অনেক কষ্টে সোফার ওপর বসলেন। তারপর বললেন, আইজ সকালে আমি কিছু মুখে দিয়া জায়নামাজে বসছিলাম।

আইজকাল আমার যখন তখন ঘুম পায় বাবা। আমি বাবা জায়নামাজের উপর ঘুমায় পড়ছিলাম । দরজা বন্ধ করতে মনে আছিল না। চাচা, দরজা তো খোলা ছিল না। বন্ধ ছিল।

বন্ধ ছিল? তয় তুমি ঘরের ভিতরে ঢুকলা কেমনে? কেন দরজা তো সুরভী ...মানে ওয়াহেদের বউই খুলে দিল। অ বুঝছি। তাইলে তুমিও তারে দেখছ। মাইয়াডারে রাইতবিরাইতে মাঝেমইধ্যে আমিও দেখি বাবা। মাইনষেরে ডাইকা কথাডা কইলে আমারে কয় মিছা কথা কইতাছি।

তারা আমারে কয় দূনঈয়ায় নাকি জিনভূত বইলা কিছু নাই । হায় আল্লা, দূনঈয়ায় জিনভূত না থাকলে এই বাড়িত ভাড়াইট্টা থাকে না কি দেইখা? জিনভূত! কি বলছেন আপনি? আমার কন্ঠস্বর সম্ভবত তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছিল। বৃদ্ধ ঘোলা চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর কাশতে লাগলেন। কাশির দমকে বৃদ্ধের চোখমুখ কীরকম কুঁচকে যাচ্ছিল।

চোখ দুটি বুজে যাচ্ছিল। তখন বৃদ্ধকে অদ্ভূত দেখাচ্ছি। যেন বৃদ্ধ কোনও রহস্যময় যাদুকর। কাশি থামার পর বৃদ্ধ বললেন, তুমি আসল ঘটনা মনে হয় কিছু জান না বাবা। কি ঘটনা চাচা? আমার কন্ঠস্বর কাঁপছিল।

আমি খেয়াল করিনি যে আমি আবার সোফার ওপর বসে পড়েছি। বৃদ্ধ বললেন, আইচ্ছা, তাইলে তুমি শুন বাবা। আমি বলতেছি। ওয়াহেদে সুরুভিরে বিয়া কইরা ঘরে তুলছিল। বিয়ার পরও সুরুভির চাচতো ভাই শাহনেওয়াজে এই বাড়িত মাঝেমইধ্যে আইত ।

ওয়াহেদে আর সুরুভির মইদ্যে এই লইয়া দিন রাইত কাইজ্জাকাটি লাইগাই থাকত। মাঝেমইধ্যে ওয়াহেদে রাগ কইরা বাড়িত থেইকা চইলা যাইত। চইলা গিয়া রাইতে থাকত রামপুরায় এক মসজিদে । তারপরও শাহনেওয়াজে মাঝেমইধ্যে আইত চাচতো বোইনের বাসায়। এই দুঃখে ওয়াহেদে একদিন গলায় দড়ি দিয়া মরল।

আমি শিউরে উঠলাম। কি বলছেন আপনি? হ। আমি ঠিকই কইতাছি বাবা। বৃদ্ধ ঠিক বললে তাহলে আমি তখন কাকে দেখলাম? বৃদ্ধ বলে চলেন, ওয়াহেদের মরণের পর শাহনেওয়াজে এই বাড়িত ঘনঘন আইতে লাগল। এই ঘরেই বইসা দুইজনে মিল্লা গল্পগুজব করত।

তয় তাগো কপালে সুখশান্তি বেশিদিন দেয় নাই আল্লায়। এক রাইতে খুব বৃষ্টি হইল। সুরুভি পাকের ঘরে খিচুরি পাকাইতেছে, শাহনেওয়াজে রাইতে খাইয়া যাইব। কাজের ছেমড়ি সব দেখছে ... চুলার থন কেমনে আগুন লাফ দিয়া সুরুভির শাড়িত পড়ল। সুরুভীর চিৎকার না শুইনা শাহনেওয়াজে পাকের ঘরে ছুইটা গেলে আগুন তারেও ধরল।

দুজনে পুইড়া কয়লা হইয়া গেল ...আগুনে আর কুন ক্ষতি হয় নাই। কাজের ছেমড়ির গায়ে আগুনের টোকাও লাগে নাই। আমার মাথা কেমন টলছিল। আর ভীষন অবশ লাগছিল। মুখে ঘাম টের পাচ্ছিলাম।

আমার কেবলই মনে হচ্ছিল ... তাহলে তখন রিকশায় কে উঠল? আর দরজা-ই বা তখন কে খুলে দিল? বৃদ্ধকে দেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন মনে হল। ছোট শরীরটা এক পাশে কাত হয়ে গেছে। মুখটা হা হয়ে আছে। অবশ্য তখনও শক্ত করে লাঠিটা ধরে আছেন। দৃশ্যটায় কী ছিল- আমার শরীর কেমন গুলিয়ে উঠল।

বৃদ্ধকে ঝাপসা দেখছি। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘরে আতরের গন্ধটা কীরকম তীব্র হয়ে উঠছিল। ওই বৃদ্ধও এই জগতের কিনা কে জানে। এই গলিটাই অশুভ।

আমার এই ঘরে থাকা উচিত নয়। আর কিছুক্ষণ এই ঘরে থাকলে ওরা তিনজন ফিরে আসবে। তখন আমার ভীষণ ক্ষতি হয়ে যেতে পারে ...বৃদ্ধের কাছ বিদায় নেবার আমার কোনও দায় নেই। এই বৃদ্ধও সম্ভবত এই অশুভ গলির প্রেতলোকের বাশিন্দা। আমি প্রায় এক লাফেই ঘরের বাইরে চলে এলাম।

বাইরে রোদের রং কেমন মরাটে। যেন অস্বচ্ছ কাচের ভিতর দিয়ে আসছে। গলির দু’ধারে পুরনো ফটোগ্রাফের মতন সাদাকালো ঘরবাড়ি। অনেক পুরনো দিনের ... আমি প্রায় দৌড়েই অশুভ গলিটা পেরিয়ে যখন রোদ ঝলমলে গলির মুখে এসে দাঁড়ালাম তখনও আমি ভীষণ কাঁপছিলাম ... ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.