আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কাশ্মীর-২

প্রবাসী ভারত বিভাগ এবং কাশ্মীর - ১৯৪৭ সালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে পাশ হল “ ইন্ডিয়া ইনডিপেন্ডেন্স এক্ট”(Indian Independence Act) বৃটিশরা ভারত ছাড়লো। । ৪৭ সালের ৩রা জুন তদানীন্তন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগের যে রুপরেখা দেন তাতে ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু অধ্যূষিত এলাকা গুলো হল ভারত, আর মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা গেল পাকিস্তানে। ভারতবর্ষে ঐ সময় ছিলেন ৫৬২ জন দেশীয় রাজা,মহারাজা, নওয়াব , নিজাম ইত্যাদি। এদের নিজস্ব রাজ্য ছিল।

তারা বৃটিশদের নিয়ন্ত্রাধীন হলেও সরাসরি বৃটিশ শাসনাধীন ছিল না। তাদের রাজ্যের ব্যাপারে রাজাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হল - ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে বা স্বাধীন রাজ্য হিসেবে থাকতে, কয়েকজন দেশীয় রাজা স্বাধীনভাবে থাকতে চেয়েছিলেন যেমন হায়দ্রাবাদের নিজাম, জুনাগড়ের নবাব চেয়েছিলেন পাকিস্তানে যোগ দিতে কিন্ত তার রাজ্যের চারদিক ছিল ভারত ঘেরা। কাশ্মীর ছিল বড় দেশীয় রাজ্য। ভারত এবং পাকিস্তানের নেতারা সবাই চাইছিলেন যে মহারাজা হরি সিং তাদের পক্ষে যোগ দেবেন। রাজা হরি সিং চেয়েছিলেন স্বাধীন রাস্ট্র।

ভৌগলিকভাবে পাকিস্তান সংলগ্ন এবং এই রাজ্যের জনগোষ্ঠী অধিকাংশ মুসলমান(৭৭%) হওয়াতে স্বাভাবিক ভাবেই তা পাকিস্তানের অংশ হবে এমনটাই ভেবেছিল সকলে। রাজা হরি সিং পাকিস্তানের সাথে “স্থিতাবস্থা” মেনে চলার চুক্তি করেন। ভারতের সাথে একই রকম চুক্তি চেয়েছিলেন রাজা, কিন্তু ভারত তা প্রত্যাখান করে। উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতিয় পাখতুন, কাশ্মীরের পশ্চিম অংশের বিদ্রোহীরা, দীরের অধিবাসীরা এবং কাশ্মীরের রাজার সেনাবাহিনীর অংশ বিশেষ সদ্য স্বাধীন রাস্ট্র পাকিস্তানের প্রচ্ছন্ন মদদে বিদ্রোহ শুরু করল। ঐ সময় যে স্লোগানটি পাকিস্তানীদের মুখে মুখে ফিরত তা হল “ হনসে লিয়া পাকিস্তান লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান” অর্থাৎ হেসে হেসে পাকিস্তান পেয়েছি এবার লড়াই করে হিন্দুস্থান নেবো।

বিদ্রোহীদের অভিযোগ ছিল এই যে মহারাজা হরি সিং ভারতে যোগদানের মতলব আটছিলেন। ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির দাবীতে যে আন্দোলন হয় তা দমনের উদ্দেশ্যে রাজার সেনারা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মিছিলকারীদের হত্যা করেন। পুঞ্চে বিদ্রোহীরা ঘোষনা করে “ আজাদ কাশ্মীর” পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল গ্রেসীকে কাশ্মীরে সেনা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিলেও গ্রেসী তা অগ্রাহ্য করেন। বিদ্রোহীরা মোজাফফরপুর, ডোমেল দখল করে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পৌছে গেল রাজধানী শ্রীনগরের উপকন্ঠে। পুঞ্চ এ হরি সিং এর বাহিনী হল বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ।

জয়ের সাথে সাথে সমানে চলল লুটপাট। রাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য চাইলেন। ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন রাজাকে জানালেন শুধুমাত্র ভারতে অন্তর্ভুক্তি’র শর্তেই রাজা এই সাহায্য পেতে পারেন। প্রান বাচাতে রাজা ভারতে অন্তর্ভুক্তির চুক্তি সই করলেন ২৬শে অক্টোবর’১৯৪৭.মহারাজা হরি সিং ছিলেন বৃটিশ শাসকদের নিয়োগকৃত এবং তার ভারতে যোগদানের কোন এক্তিয়ার ছিলো না এই অভিযোগ এনে পাকিস্তান অস্বীকার করে চলল হরি সিং এর ভারতে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিকে। ভারতীয় সেনাবাহিনী জড়িয়ে পড়ল যুদ্ধে।

বিমানে করে সেনাবাহীনি পৌছালো রাজধানী শ্রীনগরে। শুরু হল ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ। একে একে বিদ্রোহীদের কবল থেকে ভারতীয় বাহিনী দখল করে নিল অনেক এলাকা। যুদ্ধ চলল ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাস অবধি। মীমাংসার জন্য জাতিসঙ্ঘের দ্বারস্থ হল ভারত।

অবশেষে জাতিসঙ্ঘের তত্ববধানে যুদ্ধিবিরতি চুক্তি হল। জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবে যা যা ছিল১) যুদ্ধবিরতি এবং দুই দেশই তাদের সেনাবাহিনীকে সরিয়ে নেবে কাশ্মীর থেকে, ২) কাশ্মীরে জাতিসঙ্ঘের পর্যবেক্ষক সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হবে যারা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষন করবেন ৩) জাতিসঙ্ঘের তত্বাবধানে গনভোট এবং কাশ্মীরের জনগনই সিদ্ধান্ত নেবে কাশ্মীরের অবস্থা সম্পর্কে। দুই পক্ষ সে প্রস্তাব মেনে নিলেও সে গনভোট হয় নি, কোনপক্ষই সেনা প্রত্যাহার করে নি। কাশ্মীর থেকে গেছে অমীমাংসিত এলাকা(Disputed Territory)। যে এলাকা ভারত দখল করেছিল তা জম্মুর সাথে জুড়ে দিয়ে হল বারতীয় অঙ্গরাজ্য জম্মু এবং কাশ্মীর।

জম্মুর সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক হিন্দু । এভাবেই সমতা রক্ষা করা হল। কাশ্মীরকে বিষেষ মর্য্যাদা দিয়ে প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং পররাস্ট্রা ছাড়া অন্য সমস্ত ব্যাপারে সায়ত্ব শাসন দেওয়া হল। ১৯৫১ সালে প্রথম ভারতীয় কাশ্মীরে প্রাদেশিক পরিষদের ভোট হল। কাশ্মীর ন্যাশনাল কংরেস জয়লাভ করে ফারুক আব্দুল্লাহ’র নেতৃত্বে সরকার গঠন করল।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধবিরতি রেখা স্বীকৃতি পেল “ লাইন অফ কন্ট্রোল”(আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমারেখা নয়) হিসেবে ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তিতে। এরপর কাশ্মীরে এল চীন। এই এলাকার উত্তরপূর্ব অংশের উপর চীনের দাবী ছিল অনেক আগে থেকেই। বৃটিশ, আফগানিস্তান এবং রাশিয়ার মধ্যকার চুক্তি অনুসারে যে সীমানা চিহ্নিত হয় তা চীন মেনে নেয় নি। ১৯৬২ সালের ভারত চীন যুদ্ধের পর লাদাখ এবং কাশ্মীরের পূর্বাংশ দখল করে নিল চীন।

১৯৬৩ সালে পাকিস্তান তার বন্ধুত্বের নিদর্শন এবং চীনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কারাকোরাম এলাকা উপহার দিল চীনকে। ১৯৬৩ সালে হজরতবাল মসজিদ নিয়ে কাশ্মীর আবার অশান্ত হল। এরপর কাশ্মীর নিয়ে দ্বিতীয় ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হল ১৯৬৫ সালে। সীমানা নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের বিবাদ শুরু হয়েছিল দেশ দুটো স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই। সীমান্তে গুলিবিনিময় ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

রান অফ কচ্ছ এলাকা হল গুজরাটের এক অমীমাংসিত এলাকা। অনুর্বর হালকা জনবসতির এই এলাকা নিয়ে ১৯৬৫ সালের জুন মাসে ছোটখাট যুদ্ধ হল ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যা্রল্ড উইলসনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামল এবং গঠিত কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পাকিস্তান কচ্ছের প্রায় ৯০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পেল এবং বাদবাকী পেল ভারত। ৬২ সালে চীনের হাতে পর্যুদস্ত ভারতের হাত থেকে কাশ্মীর উদ্ধারের পরিকল্পনা করলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইউবখান। ৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ থেকে ২৩ শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলল যুদ্ধ।

অবশেষে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি এবং তাসখন্দ চুক্তি। এরপর ১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে শুরু হল স্বাধীনতা আন্দোলন। প্রায় ৫ লক্ষ সেনা ও নিরাপত্তা রক্ষী নিয়োজিত আছে ভারত অধীকৃত কাশ্মীরে। ১৯৯৯ সালে আবার যুদ্ধ হল কাশ্মীর নিয়ে যা “কারগিল যুদ্ধ” নামে পরিচিত। বৃটিশ ভারতের যে দেশীয় রাজ্য ছিল কাশ্মীর তার আজ কোন সতন্ত্র অস্তিত্ব নেই।

চীনের দখলে আছে ২০ ভাগ এলাকা- আকসাই চীণ, লাদাখ এবং কারাকোরাম স্ট্রেইট। পাকিস্তানের দখলে আছে আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিট বাল্টিস্তান এলাকা ৩৭% এলাকা, এবং ভারতের দখলে আছে মূল কাশ্মীর উপত্যকাসহ ৪৩% এলাকা। কাশ্মীর নিয়ে সহিংসতা বন্ধ হওয়ার কোণ লক্ষন আপাতত নেই । ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।