আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গত শতকের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির ২০ বছর!

Shams ভ্লাদিমির লেনিনের বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে পতন হয় জারদের রুশ সাম্রাজ্যের। ৭ নভেম্বর, ১৯১৭ উত্থান ঘটে তাত্ত্বিক দর্শনের ভিত্তিতে প্রথম বাস্তব সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। ইউএসএসআর, Union of Soviet Socialist Republics বা শুধু সোভিয়েত কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন, এই দেশ পরিচালিত হতো সেই নেতাদের হাতে, যাঁরা বিশ্বের সব থেকে বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্ব কার্ল মার্কসের সাম্যবাদকে সব থেকে ভালোভাবে বুঝতেন। বিবিসির সমীক্ষায় গত সহস্রাব্দের সবচেয়ে বিদগ্ধ মানুষ এই মার্কস। সে সময় মানচিত্র দেখলে মনে হতো গোটা বিশ্বের অর্ধেক অংশ জুড়ে যেন এই দেশটা (দুই কোটি ২৪ লাখ দুই হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার)।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে পৃথিবীর কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় পুঁজিবাদী মার্কিন পরাশক্তির বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি। মূলত চারটি প্রজাতন্ত্র থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের উৎপত্তি হলেও ১৯৫৬ থেকে ১৯৯১ সালে ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়ে ছিল ১৫ টিতে। এগুলো ছিল আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, এস্টোনিয়া, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভিয়া, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান। ভাঙনের পর ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ১১টি নিজেরা একটি শিথিল কনফেডারেশন সৃষ্টি করে, যা Commonwealth of Independent States বা সিআইএস নামে পরিচিত। তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্টোনিয়া এই কনফেডারেশনে যোগ না দিয়ে ২০০৪ সালে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঠাণ্ডা লড়াইও শেষ হয়ে যায়। দুই পরাশক্তির টানাপড়েন থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্ববাসী দেখতে চেয়েছিল এক নতুন বিশ্বকে। কিন্তু গত ২০ বছরে একক মার্কিন নেতৃত্বে সেটা কি সম্ভব হয়েছে? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনে প্রাপ্তিটা কী? সোভিয়েত ইউনিয়নকে বুঝতে হলে এর বিগত দিনগুলোর কথা ভেবে দেখতে হবে। তুলনা করতে হবে সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বড় আঁচ ইউএসএর গায়ে লাগেনি, কিন্তু ইউএসএসআরকে যুদ্ধের দগদগে ঘা ভরে তবে নতুন করে সেজে উঠতে হয়েছিল।

জিডিপির ৩৩ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হতো সামরিক খাতে। এর পরও ১৯৮৯ সালের 'ইউএসএ' ও 'ইউএসএসআরের মধ্যে তুলনা টানতে গেলে কোনো সিআইএ এজেন্ট বা ঐতিহাসিক এক বাক্যে স্বীকার করবেন, সেই সময়ের আমেরিকার চেয়ে সোভিয়েতের জীবনযাত্রার মান ৪০ শতাংশ বেশি উন্নত ছিল। পূর্ব ইউরোপের পূর্ব জার্মানি থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত দেশগুলোকে দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে রক্ষা করার ভার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের। মার্কিন নেতৃত্বের মতো শুধু স্বার্থের জন্য নয়, সোভিয়েত নেতৃত্ব দাঁড়িয়ে ছিল মানবতার পক্ষেও। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলাফলে সোভিয়েতের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ব্রেজনেভ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে জানতে চেয়ে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি দেন। সোভিয়েত প্রচেষ্টায় বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র চীন ছাড়া সবাই বাংলাদেশ ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মার খেয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নাস্তানাবুদ, ঠিক তখনই পাকিস্তানের বেগতিক অবস্থা দেখে কিসিঞ্জারের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট নিক্সন সপ্তম নৌবহরকে ভারত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। সোভিয়েত নেতারা পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়নের পর আর নীরব থাকতে পারেননি। তাঁরা ভ্লাদিভস্তকে অবস্থানরত পারমাণবিক মিসাইলবাহী সোভিয়েত নৌবহরকে (Pacific fleet) প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে অতিদ্রুত বঙ্গোপসাগরের মুখে অবস্থান গ্রহণ এবং সপ্তম নৌবহর শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করার নির্দেশ দেন।

সপ্তম নৌবহর যখন মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করছে ঠিক তখনই ভারত মহাসাগরব্যাপী সোভিয়েত নৌবহরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রস্তুত। ফলে মার্কিন সামরিক শক্তি পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াতে পারেনি। পাকিস্তানের পরাজয় এড়াতে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীনের যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়ার ভেটো মুক্তিযুদ্ধকে আরো বেগবান করতে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের একপর্যায়ে আমাদের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে অধিকাংশ সেক্টরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে পড়লে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধ বন্ধ হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ভূমিকা না রাখলে তখনকার পরিস্থিতি কী হতো তা গবেষণার বিষয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত আমাদের দেশটিকে পুনর্গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এগিয়ে আসে, চট্টগ্রাম বন্দরকে পাকিস্তানিদের পাতা মাইন মুক্ত করতে জীবন পর্যন্ত দেন সোভিয়েত নৌসেনারা। আমেরিকার সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক ও মহাকাশ প্রতিযোগিতা চালিয়ে গেছে সমানে। সাধারণ ভোক্তার সন্তুষ্টি থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণা সব কিছুতেই তারা সেদিন কৃতিত্ব রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এত খরচ সামলেও ওখানকার কোনো অপুষ্টিতে ভোগা শিশু দেখা যায়ানি।

এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সরকার থেকে পায়নি। এটাই হলো ইউএসএসআর, যে বিশ্বময় পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যের করালগ্রাস থেকে রক্ষাকারীর ভূমিকায় বারবার অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর গত ২০ বছরের মধ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভয়াল রূপের কত ধরনের প্রকাশ দেখা গেল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান ও লিবিয়ার আজ কী অবস্থা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ও সোভিয়েতের পতনপরবর্তী সময়ের মধ্যে এই পার্থক্যটা খুব বেশি করে চোখে পড়ে। বিশেষ করে গত ২০ বছরে যুদ্ধ জিনিসটাই যেন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে উঠেছে।

ইতিহাস সত্যিই অন্যভাবে লেখা যেত ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টা বেজে ২০ মিনিটে। যখন মিখাইল গর্বাচেভ, যাঁকে অনেকেই মনে করেন তিনি আসলে সিআইএর এজেন্ট ছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন। বেতারে তাঁর পদত্যাগের কথা সরাসরি সম্প্রচার করা হলো। এ কথা ঘোষণা হওয়ার মিনিটখানেকের মধ্যেই ক্রেমলিনে চূড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতাকা নামিয়ে দিয়ে তুলে ধরা হলো রাশিয়ার নতুন তিন রঙের পতাকা। আর এভাবেই রাতারাতি গোটা পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে গেল।

এ শুধু তো কোনো দেশের পতন নয়, এ হলো দীর্ঘদিন কোটি কোটি মানুষের আত্মত্যাগে মহান একটি রাজনৈতিক মতাদর্শকেই বিফল করে দেওয়া। ৭৪ বছর ধরে মাসিহা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালকায় সোভিয়েত ইউনিয়ন হারিয়ে গেলে ইউনাইটেড স্টেটস ও তার সহযোগী এবং এ ধরনের নতুন নতুন কথার মধ্যে। মিখাইল গর্বাচেভ পারলেন না আর ধরে রাখতে। পুঁজিবাদের ঢেউয়ে তলিয়ে গেল সাম্যবাদ, অনেক জায়গায় এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বরিস ইয়েলৎসিন। পরে প্রমাণ হয়ে গেল কোনো মতাদর্শ নয়, রাশিয়া পরিচালিত হচ্ছে কোনো এক মত্ত মজাপ্রিয়-নেশাপ্রিয় মানুষের মতো।

নতুন রাশিয়ায় এই বরিস ইয়েলৎসিনই হলেন প্রেসিডেন্ট। সেই দেশটা, যা এত দিন ধরে পরিচালিত হচ্ছিল চরমভাবে তত্ত্বগত আদর্শ আঁকড়ে থাকা নেতাদের হাতে, তার জায়গায় এসে পড়লেন বরিসের মতো মানুষ। আগেকার কর্তাব্যক্তিরা শুধু নিজের দেশ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে চুপ থাকতেন না, তাঁদের কাছে গোটা বিশ্বই ছিল সমান প্রাসঙ্গিক। লৌহ আবর্তে দৃঢ়বদ্ধ, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র বেঁধে রেখেছিল গোটা দেশটাকে। তাকে ভেঙে ফেলে গর্বাচেভ সংস্কারের নামে নিয়ে আসেন পেরেস্ত্রৈকা (পুনর্গঠন) এবং গ্লাস্তনস্ত (উদারীকরণ)।

১৯৮৫ সাল থেকে এ ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৮৫-৮৬ সালে তেলের দাম হঠাৎ করে খুবই কমে যায়। এতে দেশের আয় এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারেও ঘাটতি সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় আমদানির সংকটাবস্থা।

খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দেয়, সাধারণ মানুষ তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দেশের আয়ের সংস্থান কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ফেল করতে থাকে। একটা দীর্ঘ জামানা শেষ করে দেওয়া হয় এমন পরিকল্পিতভাবে। আর এই খোলসের ভেতরে অপেক্ষা করছিল ইউএস মদদপুষ্ট পশ্চিমা দেশগুলোর ঝাঁ চকচকের প্রতি সাধারণ মানুষ থেকে সর্বস্তরে দুর্নিবার আকর্ষণ। আর এ কাজই সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যান ইয়েলৎসিন_সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে সেখানে গণতন্ত্র নিয়ে আসার অন্যতম যোদ্ধা।

অদ্ভুতভাবে একটা বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে যখন বরিস ইয়েলৎসিনসহ অন্যরা গণতন্ত্রের দাবি করছেন তখন মিখাইল গর্বাচেভ নানাভাবে চেষ্টা করেছেন সোভিয়েতকে কোনোভাবে ধরে রাখার। এর জন্য গর্বাচেভ নাকি চেয়েছিলেন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার ঘটাতে। কিন্তু ইয়েলেৎসিন চাইছিলেন দ্রুত পরিবর্তন। এর ওপর ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার ক্রমাগত চাপ। চীন যেভাবে সাম্যবাদ থেকে আবার পুঁজিবাদে ফিরে আসার রূপান্তরটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, সোভিয়েত তা পারেনি।

গর্বাচেভ ১৯৯১ সালের ২১ আগস্ট বারবার বলেছিলেন এই নীতি প্রণয়ন করার কথা। কিন্তু পুরনো দল নতুন পন্থায় নিয়ে গ্রুপ অব এইট গঠন করে অসন্তোষ চাপা দিতে চায়। যদিও তার স্থায়িত্ব হয়েছিল মাত্র দুই দিন। দাবানলের মতো এই পতন অবশ্যম্ভাবী গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। কমিউনিস্ট পার্টির কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুঁকে দেয় এরা।

সোভিয়েত পতনের পর ২০ বছর কেটে গেছে, কিন্তু এখনো তো সেখানে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বরিসের জামানায় নিত্যনতুন দল গড়ে উঠেছে। গণমাধ্যমগুলোকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তখন এসব পরিবর্তনই হয়েছে সাময়িকভাবে। পুতিন ক্ষমতায় এসে সেই পুরনো ইউএসএসআরের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন।

তবে সেই আগের মতো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়। পুতিন ঠিক সোভিয়েতের সেই পুরনো একনায়ক; তবে এখন নেই কোনো রাজনৈতিক দায়বোধ বা আদর্শ। সম্ভবত রাশিয়ার ইতিহাসে পুতিনই নিকৃষ্ট নেতা। পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর এতটাই গভীর সম্পর্ক যে ভোগবাদী দুনিয়ার মুখপত্র টাইম ম্যাগাজিনে তাঁকে 'ম্যান অব দ্য ইয়ার' নির্বাচন করা হয়। গত ১০০ বছরে হয়তো পুতিনের মতো কোনো নেতাও দেখেনি রাশিয়া।

রাষ্ট্রীয় রূপান্তরকে তিনি নিজের স্টাইলে গড়ে তোলেন, সেখানে না পাওয়া যায় পুরনো সমাজবাদ, না আছে গণতন্ত্র। সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর তাঁর এতটাই নিয়ন্ত্রণ যে তিনি উন্মুক্ত শরীর দেখান বা নারীঘটিত বিষয়_কোনোটা নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেন না। বরং এটাই হয়ে ওঠে তাঁর নিজস্বতা। এখনকার ক্রেমলিন নিয়ন্ত্রিত হয় পুতিন ও মেদেভেদেভের সঙ্গীদের হাতে। রাশিয়ার নির্বাচন শুধুই লোকদেখানো নাটক ছাড়া কিছু নয়।

কাজেই দুই দশক কেটে যাওয়ার পরও রাশিয়ান ফেডারেশন এখনো তার স্বাধীনতার স্বপ্ন বা পশ্চিমের সোনালি জীবনযাত্রার ইচ্ছাও পূরণ করতে পারেনি। ইউএসএসআরের পতন কয়েকটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। এর পর থেকেই এ রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজের নিজের পথ ধরে সে স্বপ্নকেই বিভিন্ন দিক থেকে ধরার চেষ্টা করে এসেছে। এখনো এই দেশগুলো তাদের জাতীয় পরিচিতিই তুলে ধরতে পারেনি কিংবা জাতীয়তাবোধই গড়ে ওঠেনি। এখানকার অধিবাসীরা নিজেদের সঙ্গে এখনো সোভিয়েত যোগসূত্র ধরে রাখতে আগ্রহী, সে হতে পারে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য কিংবা পুরনো সাম্যবাদী অর্থনীতির সচ্ছলতার জন্য।

এ কারণেই দেশগুলোতে ঘটে চলেছে একের পর এক রঙিন বিপ্লব। যেমন_জর্জিয়ার রোজ রেভেলিউশন, ইউক্রেনের অরেঞ্জ রেভেলিউশন, কিরঘিজস্তানের পিংক রেভেলিউশন। সাবেক কেজিবি সদস্য পুতিনের কথাতেই তা স্পষ্ট, 'সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া বিশ শতকের বৃহত্তম ভূ-রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। ' আসলে পুতিন এই গত মাসেই একটি প্রস্তাব রেখেছিলেন, সোভিয়েত পরবর্তী সব দেশে একই ইউরেশিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার। এবারই প্রথম নয়, পুতিন অবশ্য প্রথম থেকেই সোভিয়েত পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোকে এক ছাতার তলায় আনতে চেয়েছেন।

যদিও বেশির ভাগ দেশই পুতিনের এই মনোভাবের সঙ্গে সহমত পোষণ করে না। এই মতপার্থক্যের জায়গাটা এমন জায়গায় পেঁৗছায় যে ইউক্রেনে সভা করতে গেলে পুতিনকে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখোমুখিও হতে হয়। তবে পুরোটাই যে নেতিবাচক তাও নয়, ব্যাপক বিক্ষোভের ঠিক পাশে পুতিনের প্রতি জনগণের সমর্থনও আছে বিস্তর। এই সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই স্বপ্ন দেখা থামাননি পুতিন। লেভেদা সেন্টার কর্তৃক আয়োজিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা থেকেই প্রমাণ হয়ে যায় যে অন্ততপক্ষে ২০ শতাংশ রাশিয়ান আজও সোভিয়েত ইউনিয়নেই ফিরে যেতে চায়।

আপাতদৃষ্টিতে এই বিশেষ মনোভাবাপন্নদের সংখ্যাটা কম মনে হতেই পারে। তবে লক্ষ করার মতো বিষয় এই যে হিসাবটা গত আট বছরে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এ জন্যই ইউক্রেন কিংবা জর্জিয়ার মতো দেশ তাদের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে পাশ্চাত্য ইউরোপ তথা ন্যাটোর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হচ্ছে, এটা কিছুতেই হজম হচ্ছে না বৃহত্তর রাশিয়ানদের। বর্তমান পরিস্থিতি যা, তাতে মনে হচ্ছে রাশিয়া বুঝি সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই সোনালি দিনগুলো ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা বিচারে রাশিয়া আজ অত্যন্ত দুর্বল এক দেশ।

রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত পুতিন রাশিয়াকে দেখতে চাইছেন জগৎসভার শ্রেষ্ঠ আসনে। অথচ দেশের বৃহত্তর অংশ কিন্তু আজও সেই বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার। এ দুই আকাশ-পাতাল বাস্তবের মধ্যে পড়েই রাশিয়া কিছুটা হলেও দ্বিধাগ্রস্ত। ইতিহাসের সরণি বেয়ে রাশিয়া আজ প্রায় সর্বহারার দলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিচারে রাশিয়া তার নিজের ভৌগোলিক সীমানা হারিয়েছে।

অর্থনীতি হারিয়েছে। সেনা শক্তিতে নিঃস্ব। এমনকি শিক্ষার দিকটিও। প্রোগ্রাম অব ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতে শিক্ষায় রাশিয়ার বর্তমান র‌্যাংকিং সারা বিশ্বে ৪৩। অথচ একসময় এ দেশই স্পেস টেকনোলজি, সাধারণ বাস্তুবিজ্ঞান, নানাবিধ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সারা বিশ্বের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় দিন দিন কমছে। শিক্ষকদের বেতনের হার কমতে কমতে গড়ে মাসিক ৪৮০ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে খুব স্বাভাবিক কারণেই দেশের তরুণরা শিক্ষকতা থেকে দূরে থাকতে চাইছে এবং সবচেয়ে যেটা খারাপ, তা হলো ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গাইজেশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, রাশিয়ার যুবসমাজই আজ নেশার কবলে সবচেয়ে বেশি। এমনকি সারা বিশ্বের মধ্যে এইচআইভি/এইডসে আক্রান্তের সংখ্যা এ দেশেই সবচেয়ে বেশি হারে বেড়ে চলেছে। এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী আছে? যে দেশ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, আজ সেই দেশের পরিচয় চীন, ভারত, ব্রাজিলের মতো নেহাতই মামুলি একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দোষত্রুটি অনেক ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল এর একনায়কতান্ত্রিক চরিত্র। আর ইতিহাস সাক্ষী, যেখানেই একনায়কতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়েছে, গণবিক্ষোভ সেখানে আবশ্যিক। ভ্লাদিমির লেনিন (১৮৭০-১৯২৪), জোসেফ স্তালিন (১৮৭৮-১৯৫৩) থেকে শুরু করে লিওনিদ ব্রেজ্নেভ (১৯০৬-১৯৮২)_প্রায় প্রথম থেকেই একনায়কের ছড়াছড়ি এখানে। তবে এটাও খুব সত্যি কথা যে তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেরই অত্যন্ত প্রখর আন্তর্জাতিক দৃষ্টি ছিল।

সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা ছিল। আর ছিল একটা আদর্শ। যার ওপর ভিত্তি করে তাঁরা দেশকে অকাতরে অর্থনৈতিক উন্নতি এনে দিয়েছিলেন। সামাজিক উন্নয়নে তাঁরা বরাবর মার্কসীয় আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়েছেন। সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা ভেবেছেন।

গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে অর্থনৈতিক উন্নতিকে ঠিক কোন জায়গায় নিয়ে গেলে ধনী-দরিদ্রের আর কোনো বৈষম্য চোখে পড়ে না। সবার জন্য কিভাবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে হয়, সেটা প্রায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন তাঁরা। তারপর অলিম্পিকের মেডেল তালিকায় শীর্ষস্থান তো ছিলই! সবাই আশা করেছিল, এরা একদিন নিশ্চিত গণতান্ত্রিক পথে হাঁটা শুরু করবে। হলোই বা আকারে ছোট, তবু সেই সংযুক্ত সোভিয়েত রাশিয়াকে নিয়ে আশা ছিল, সাম্যবাদের পথ ধরেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। এই বিশ্বকে উপহার দেবে সুযোগ্য নেতৃত্ব, যাদের মধ্য থেকে ধনতান্ত্রিক চরম আগ্রাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘৃণ্য কায়েমি স্বার্থ পূরণের দিকে প্রতিবাদের আঙুল উঠে আসবে! সম্পদের লোভে একের পর এক দেশ দখল করার দিকে যেভাবে এগিয়ে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এই দুর্বার গতি আটকে দিতে আজ নেই সোভিয়েত ইউনিয়ন! ২০ বছর আগের সেই সোভিয়েতের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়।

খুব স্বাভাবিক, ২০ বছর আগের সেই সোভিয়েত ভাঙনের সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা ঘটা সহজ কথা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পোস্টমর্টমে শুধু পাওয়া যায় ২০ বছর আগেকার সেই ট্র্যাজেডিতে পুঁজিবাদী-ভোগতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কারো কোনো লাভ হয়নি। না রাশিয়ার, না পৃথিবীর।  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।