আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ঝরা পাতার গল্প

কবে যাবো পাহাড়ে... কবে শাল মহুয়া কণকচাঁপার মালা দেব তাহারে.... বিরক্তিকর কর্কশ এলার্মটা বেজেই যাচ্ছে একটানা ঘ্যানঘ্যান করে। বিছানা থেকে নেমে কয়েক’পা হেঁটে টেবিলের কাছে গিয়ে ওটা বন্ধ করা যায়; তবে মুশকিল হলো, ওটা করতেই ইচ্ছে করছেনা। বিছানার ওপর অদ্ভুত হাস্যকর ভঙ্গিতে উবু হয়ে দু’হাতে দু’কান চেপে পড়ে রইলো কিছুক্ষণ শুভ। তারপর কম্বলের নীচে থেকে একটা পা বের করে মাটিতে রাখলো। সেভাবে পড়ে রইলো আরো কিছুক্ষণ।

এভাবে মোটামুটি পনেরো মিনিটের কসরতের পর অবশেষে পুরো শরীরটা বেরিয়ে এলো বিছানা থেকে। আজকের দিনটার আপেক্ষিক গুরুত্ব অনেক। আজকে একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে। ওই ব্যাংকের ম্যানেজার ওর আজিজ চাচা’র পুরনো বন্ধু। সেই সুবাদেই একদিন সন্ধ্যায় ম্যানেজার সাহেবের বাসায় গিয়ে চা খেয়ে এসেছে।

এই চাকরিটা হয়ে যাওয়া সমূহ সম্ভাবনা আছে। তবে সবার আগে তাকে সময়মত তৈরী হয়ে ট্রাফিক জ্যামের কুরুক্ষেত্র পেরিয়ে বাড্ডা পৌঁছাতে হবে। দিনের পরের অংশ হলো তানিয়া। আজ তানিয়ার জন্মদিন। ওকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে না গেলেই নয়।

সন্ধ্যের পর ওর নিজের পার্টি আছে, কাজেই বিকেলটাতেই ওকে নিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে কফি খাওয়া যাবে। লাঞ্চেই যাবার ইচ্ছে ছিলো- কিন্তু ইন্টারভিউ শেষ করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাবে। একবার মনে হয়েছিলো, ধুৎ শালার ইন্টারভিউ! তানিয়ার ২৪ তম জন্মবার্ষিকী তো আর বারবার আসবে না। গোল্লায় যাক চাকরি। পরে আরো অনেক ইন্টারভিউ দেয়া যাবে।

কিন্তু মুশকিল হলো, চাকরিটা ওর যতটা না নিজের জন্য দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি দরকার তানিয়ার জন্য। তানিয়ার বাবা-মা কখনোই তানিয়ার হাত একটা ভবঘুরে ভ্যাগাবন্ডের হাতে তুলে দেবেন না। আর নিজের কপাল থেকে ওই ‘ভবঘুরে ভ্যাগাবন্ড’ সীলটা তুলতে লাগবে একটা চাকরি, সেটা যেরকমই হোক না কেন। গত বেশ কয়েকদিন ধরে তানিয়ার মনটা খুব খারাপ। শুভ’র সাথে ঠিক করে কথাও বলেনা আজকাল।

আসলে ও বোধ হয় বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে অনেক আশঙ্কিত। আশঙ্কারই তো বিষয়! প্রায় প্রতিদিন নিত্যনতুন সম্বন্ধ আসছে। বাবা-মা বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। মেয়েটার নিজের কোনো পছন্দ আছে কি না- সে প্রশ্নটাও কি করতে নেই? গত দু’দিন তানিয়া ওর ফোন ধরেনি, মেসেজের রিপ্লাই দেয় নি। শুভ বোঝে।

তানিয়ার মনটা আসলে অনেক খারাপ। খামোখা শুভর সাথে কথা বলে, শুভর সাথে দেখা করে ওর মনটাও খারাপ করে দিতে চায় না। অনেক ভালো মেয়ে তানিয়া। নিজেরটা বাদ দিয়ে বাকি সবারটা চিন্তা করে সে সবসময়। বিশেষ করে শুভরটা।

ওকে নিয়ে কখনো বাইরে বেরোবার আগে তানিয়া অনেকক্ষণ সময় নিয়ে শুভর জন্য শার্ট পছন্দ করে; ও চায়না- শুভকে দেখতে খারাপ লাগুক। শুভ বোঝে তানিয়াকে, তাইতো আজ ওর মন ভালো করার জন্য ওর সাথে দেখা করবে; ওকে জড়িয়ে ধরে চুমো খাবে, বলবে- ‘শুভ জন্মদিন!’। ওর সব কষ্ট-বেদনা, উদ্বেগ- সবকিছু ওর ভালোবাসা দিয়ে ধুয়ে মুছে মিলিয়ে দেবে শুভ। ইন্টারভিউটা বেশ ভালোই হলো বোধ হয়। ম্যানেজার ভদ্রলোক ইন্টারভিউ বোর্ডে ওকে চিনেও না-চেনার ভান করেছেন।

তবে বেশিরভাগ প্রশ্নেরই ঠিকঠাক উত্তর দিয়েছে ও। অবশ্য, এর আগের ইন্টারভিউগুলোতেও শুভ সব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তরই দিয়েছিলো। ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বেরিয়ে আসার পর সবসময়ই মনে হয়েছে- ‘চাকরিটা এবার না হয়ে যায় না’। বলা বাহুল্য, কোনোটাই হয়নি শেষ পর্যন্ত। তা না হলে কি আর ও আজও এমন চালচুলোহীন কচুরিপানার মত ভেসে চলে জনস্রোতে? যাক! এবার তানিয়ার বাড়ি।

সকালবেলায়ই তানিয়াকে এসএমএস দিয়েছিলো ও। এতক্ষণে তানিয়া নিশ্চয়ই পড়েছে সেটা। সেজেগুজে তৈরি হচ্ছে নিশ্চয়ই। ‘তানিয়া না! রেডি হতে এত্ত সময় লাগায়!’- মনে মনে ভাবে আর হাসে শুভ। দুপুরে পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি।

তবে ব্যাপার না। তানিয়ার সাথে বিকেল পাঁচটায় ওর বাসার সামনে দেখা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। বাস থেকে নেমে একটা রিক্সা নেয় শুভ। সাধারণত এই পনেরো মিনিটের হাঁটা পথে রিক্সা চড়ে না ও। তবে আজকের ব্যাপারটা অন্য রকম।

‘তানিয়া, রেডি?’- তানিয়ার বাসার উল্টোদিকে যে চা’য়ের দোকান আছে- সেখান থেকে ফোন দেয় শুভ। ‘রেডি? কিসের জন্য?’ ‘আমার এসএমএস পাও নাই?’- শুভ একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ফোনে অনেক লম্বা একটা নীরবতা। তারপর তানিয়ার কন্ঠ- ‘শুভ, আমি কি তোমাকে বলেছি, যে আমি যাবো? আমি এখন অনেক ব্যস্ত। আজকে বাড়িতে মেহমান আসবে অনেক।

অনেক কাজ। আজকে যেতে পারবো না। আর হ্যাঁ, তোমার ইন্টারভিউ কেমন হলো?’ ব্যাপারটা কিছুই বোঝা গেলো না। তানিয়ার বাসায় মেহমানের আনাগোনা থাকে সমসময়ই। কখনো তো সেজন্য তানিয়ার ওর সাথে বাইরে যাওয়া আটকায় নি! তানিয়া তো ঘরের কাজ করেনা কখনো।

মেহমান আসলে তাতে ওর ব্যস্ত হতে হবে কেন? আসলে বোধ হয়, তানিয়া শুভ’র সাথে দেখা করতে চাইছে না- কারণ ওর উৎকন্ঠা, ওর কষ্টগুলো শুভকে দেখতে দিতে চায় না সে। শুভ মনে মনে বলে, ‘তানিয়া, আর কয়েকটা দিন! আর কয়েকটা দিন ধৈর্য্য ধরো। এবারে চাকরিটা হয়েই যাবে, আমি জানি! সময়ের ব্যাপার মাত্র!’ নিজের অজান্তেই চোখটা একটু ঝাপসা হয়ে আসে শুভ’র। পরের দিন শুভ একটু দেরিতেই ওঠে ঘুম থেকে। তারপর একটু বেরোয়, ক্যাম্পাসের দিকে।

কোনো কাজ না থাকলে ও এখনও ক্যাম্পাসে গিয়ে বসে থাকে। মাঝেমধ্যেই পুরনো দু-একজন বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যায়। আড্ডায় আড্ডায় বেলা বয়ে যায়। আজও সে আশায় আছে ও। অবশ্য তানিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারলে হয়তো এক ছুটে ওর বাসায় চলে যেতে হতে পারে।

সে সম্ভাবনা কতটুকু- এ মুহুর্তে বোঝা যাচ্ছে না। তানিয়ার মোবাইল বন্ধ কাল রাত থেকে। কম করে হলেও ত্রিশ বার ফোন করেছে শুভ এ পর্যন্ত। মোবাইল সেট নষ্ট হয়ে গেলো না কি আবার? ক্যাম্পাসের কোণে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবে শুভ। এর মধ্যেই দূর থেকে একটা মেয়েকে দেখা যায়।

দেখতে ঠিক ওদের বান্ধবী রেহানার মত। ‘ওই রেহানা!’- হাত নাড়ে শুভ। রেহানা দেখতে পায়, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। ‘মামা, একটা চা’- শুভ তড়িৎ আদেশ করে। ‘কি খবর রেহানা? কেমন আছো?’ ‘আমি তো ভালোই, তোমার কি খবর বলো।

’ ‘আমি, এইতো! এখনও ভ্যাগাবন্ড! আচ্ছা, তোমার কি তানিয়ার সাথে দেখা হয়েছে এর মধ্যে? ওর ফোন বন্ধ পাচ্ছি। গত কয়েকদিন ধরে ঠিকমত কথাও হয়নি। কি যেন কি হয়েছে ওর!’ রেহানা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে। যেন ভাষা খুঁজছে। ‘শুভ, তানিয়ার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেল কাল রাতে!’ ভ্রু কুঁচকে তাকায় শুভ।

তারপর মুচকি হাসে। ‘না, না! ওর জন্য ছেলে খুঁজছেন আঙ্কেল অনেক দিন হলো। তবে তানিয়ার অমতে তো আর বিয়ে হতে পারে না। আর আমারও চাকরিটা হয়ে যাচ্ছে এবার। আমার মনে হয় এই ব্যাপারগুলো নিয়েই তানিয়া একটু আপসেট।

আর কিছু না। ’ ‘শুভ!! তানিয়া বিয়েতে মত দিয়েছে। ছেলে আমেরিকায় চাকরি করে। দু’জন দু’জনকে পছন্দ করেছে। কথা পাকাপাকি হয়ে গেছে।

আমি ছিলাম ওখানে কালকে। তানিয়া নিজের মুখে আমাকে বলেছে! তোমার স্বপ্নের জগৎ থেকে বের হওয়ার সময় এসে গেছে। ’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে বেরিয়ে যায় রেহানা। শুভ’র মুখের দিকে ফিরে তাকাবার সাহস হয় না ওর। তানিয়া।

বিয়ে হয়ে গেছে। বাসর, বৌভাত- সব। নিজেকে অনেক প্র্যাকটিকাল মেয়ে মনে করতো তানিয়া। সবসময় বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়ার পক্ষপাতী ও। শুভ’র সাথে রিলেশনটা work out করেনি।

শুভ সময়মতো চাকরি পায়নি। ও তো আর সারা জীবন ওর জন্য অপেক্ষা করতে পারেনা! ওকেও তো বিয়ে করতে হবে, ঘর-সংসার পাততে হবে। কাজেই, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে ওর কাছে। আমেরিকা যাবার আগে একবার ফোন করে শুভ’র সাথে কথা বলে নেবে ও। ‘No hard feelings. We can still be friends!’ তবে ওর প্রথম খটকা লাগে বাসর রাতে।

ওর বাসর রাতটা কেমন হবে- সেটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছে ও। প্রথম কোনো মানুষের সাথে ভালোবাসার রাত কাটবে, একে অন্যের শরীরে মিশে এক হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, ওই স্বপ্নগুলোতে সবসময়ই ওই অন্য মানুষটা ছিলো শুভ। যখন ওর স্বামী ওর কাঁধ থেকে আঁচল সরিয়ে দিলো, ওর কেন যেন হঠাৎ এক ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করলো। এরপর পুরো রাত ধরে যা চললো, পুরোটাই ওর কাছে ধর্ষণ মনে হলো।

মন থেকে ও কোনোভাবেই স্বপ্নের শুভ’কে সরিয়ে সেখানে ওই লোকটাকে স্থান দিতে পারলো না। তারপর এক সময় সবকিছু চুকেবুকে যাবার পর তানিয়া পাশ ফিরে শোয়। ওর চোখে জল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, চাঁদটাকেও ঝাপসা লাগছে। তবে ওই চাঁদের মাঝেও যেন ও শুভ’র মুখটা দেখতে পাচ্ছে।

শুভ’র চেহারা আজ পর্যন্ত কখনো এত স্পষ্ট, পরিষ্কার কখনো দেখতে পায়নি ও। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।