আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এ কী কথা শুনি : থলের বেড়াল বেরুলো সাড়ম্বরে

কি বলব লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ তার নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে পেরিয়ে এসেছে ৪০টি বছর। এই পথপরিক্রমায় চড়াই-উত্রাই, সাফল্য-ব্যর্থতা যাইই থাক, বাংলাদেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক সীমারেখার মধ্যেই নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছে তার স্বপ্ন ও সংগ্রাম নিয়ে। তাদের সেই আনন্দ ও গৌরবের জায়গাটিতে হিতাহিত বোধবর্জিত দায়িত্বজ্ঞানহীন উন্মাদের মতো চরম আঘাত করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মাখিয়ে দিয়েছেন ইতিহাস কর্তৃক পরিত্যক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত, ভুল, বিকৃত ও উদ্ভট তথ্য। তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিকভাবে এবং ঐতিহ্যগতভাবে আমরা একই দেশের নাগরিক।

আমাদের একই সংস্কৃতি, একই ভাষা, একই ধর্ম ও একই ঐতিহ্য। আমাদের দু’টি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের প্রণেতাও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যা আমাদের মাঝের আত্মিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত বহন করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফর এবং তার সরকারের বিশাল ব্যাপক সাফল্যের সাফাই গাইতে গিয়েই তিনি ধান ভানতে উপরে উল্লিখিত শিবের গীত গেয়েছেন। যে সফর সম্পর্কে বাংলাদেশ ও ভারতের সব বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকেই বলা হচ্ছে এই সফর ব্যর্থ। বরং বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের নামে যে কাজটি দুই সরকার প্রধান করেছেন তা বাংলাদেশের জন্য মহাবিপজ্জনক।

এই চুক্তি ১৯৭৪-এর দাসত্ব চুক্তির চেয়েও ভয়াবহ। কারণ, ৭৪-এর চুক্তির তবুও একটা সময়সীমা বেঁধে দেয়া ছিল। এখানে তাও নেই। চুক্তি বাতিলের একক ক্ষমতাও নেই বাংলাদেশের। ফলে এটা এ জাতির গলায় স্থায়ী ফাঁস হিসেবে প্রতিভাত হবে অচিরেই।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যদি উপদেষ্টা গওহর রিজভী, ড. মশিউর রহমানের মতো বিদেশি নাগরিক হতেন কিংবা দীপু মনি, ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলামের মতো বাঁচাল হতেন তাহলে আমাদের বলার কিছু থাকত না। কিন্তু তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের দাবিদার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। শুধু তাই নয়, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী মুজিব নগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র। সঙ্গত কারণেই তিনি বুঝে বলুন আর না বুঝেই বলুন, বাংলাদেশের মানুষকে ভারতীয় নাগরিক বানানোর যে ভয়ঙ্কর উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদে বসে, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, মন্ত্রিসভার নামে যে কচিকাঁচার আসরের তিনি সদস্য সেখান থেকে এর চেয়েও উদ্ভট ও অসত্য কথাবার্তা আমরা শুনেছি।

তাদের উদ্দেশে বলব, সেই অর্বাচীন উদাহরণের মর্মার্থ এবং সৈয়দ আশরাফের কথার নির্গলিতার্থ এক নয়। তার কথা একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষকে করেছে নিদারুণভাবে অপমানিত। একই সঙ্গে ইতিহাসের চূড়ান্ত বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। এসব কথা বলে জনগণের ওপর চালানো হচ্ছে মগজ ধোলাই। এমন সময় বলা হচ্ছে, যখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে এই সরকার ক্ষমতার মসনদের লোভে দেশটাকে পরজীবী লতাগুল্মে পরিণত করে ভারতকে ঘিরেই রচনা করছে তাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যত্।

সৈয়দ আশরাফ হয়তো সেই প্রক্রিয়ার একজন কুশীলব। হয়তো তাই ক্ষমতার লোভে মদমত্ত হয়ে কিংবা অন্য কোনো মদে মত্ত হয়ে এসব সাতিশয় উন্মত্ত প্রলাপ বকছেন। সৈয়দ আশরাফ হয়তো ক্ষমতার মোহে আক্কেল-হুশ হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু এ দেশের মানুষের তো আর মাথা খারাপ হয়ে যায়নি। তারা এই ইতিহাস বিকৃতির তাণ্ডবে রীতিমত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

সৈয়দ আশরাফ হয়তো ইতিহাস জানেন না, জানার সময়ও হয়তো জীবনে পাননি। তাই বলে মিথ্যা তো আর চাপার জোরে সত্য হয়ে যায় না। ঐতিহ্যগতভাবে আমরা একই দেশের নাগরিক ছিলাম বলে যে, মহামহা আবিষ্কার জাতির সামনে পেশ করেছেন, তা শুনে ও পাঠ করে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষই শুধু নয়, খোদ আওয়ামী লীগের দেশপ্রেমিক অংশও রীতিমত ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। কোথা থেকে তিনি পেলেন ভারতের সঙ্গে আমরা ঐতিহ্যগতভাবে একই দেশের নাগরিক ছিলাম? ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ ও অন্ধরা হয়তো তার কথায় সায় দেবে। কিন্তু সচেতন মানুষ জানে কোনোদিনই আমরা এক দেশের নাগরিক ছিলাম না।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে আমরা সামান্য পরাধীন প্রজা ছিলাম মাত্র। তখন আমাদের নাগরিক পরিচয় ব্রিটিশ সাবজেক্ট বাই বার্থ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কারণে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই পরিচিত হলো ডমিনিয়ন অব ইন্ডিয়া, ডমিনিয়ন অব পাকিস্তান নামে। থেকে গেল গভর্নর জেনারেলের শাসনও। সৈয়দ আশরাফ কি আমাদের সেই নাগরিকত্বের কথা বলছেন, যেটা ছিল আসলে দাসত্বের কলঙ্কচিহ্ন! ভাষা ও দারিদ্র্য যদি জাতি সত্তা নির্ণয়ের মাপকাঠি হয়, তাহলে হয়তো আমরা এক জাতি ছিলাম।

কিন্তু সেখানেও তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গেছেন, আমরা যে যাই বলি না কেন, বাংলা আসলে দুটি, সেটা দেহগত ও মনোগত দুভাবেই। তবুও বলব বঙ্গ নামে একটা দেশ ছিল, যদিও রাঢ় অঞ্চল তার পরিধির মধ্যে ছিল না। তবুও ‘বঙ্গ’ যদি একক হিসেবে ধরি তাহলেও তো এ কথা সত্য যে, ভারতের সঙ্গে সেই বঙ্গের আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কস্মিনকালেও ছিল না। মহাভারতের কালেও ছিল না। মধ্যযুগেও ছিল না।

এখন তো নয়ই। সম্পর্ক ছিল ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ বার বার বঙ্গের সম্পদ ও ভূমির লোভে হামলা চালিয়েছে। কখনও কখনও দখল করে নিয়েছে। শশাঙ্ক থেকে গোপাল, সুলতানী আমল থেকে মুঘল আমল, মুঘল আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন তো সেই সাক্ষ্যই বহন করে আনে। ভারত আমাদের ইলিয়াস শাহর চোখে যেমন, ঈশা খাঁর চোখেও তেমন সাম্রাজ্য লিপ্সু আধিপত্যবাদের প্রতীক।

ভারতের ভূমিকা স্রেফ দখলদারের ভূমিকা। আমরা সে সময় ছিলাম তাদের প্রজা। দেশ ভাগ হওয়া নিয়ে একদল যেমন আহা-উহু করেন তাও ডাহা মিথ্যা। দেশ কোনোদিনই ভাগ হয়নি। দেশ বলতে যে কথাটা এখনকার ইতিহাস-অজ্ঞ লোকেরা বলতে চান, সেটার মিস্ত্রি ছিল ব্রিটিশরা।

অশোক, আকবর, আওরঙ্গজেব কেউই পুরো উপমহাদেশ দখল করতে পারেননি। আকবর বাংলা জয় করে আমাদের দিল্লির পদতলে নিয়ে যান বটে কিন্তু এর অধিক কিছু নয়। আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের স্বাধীন দেশগুলোর সঙ্গে লড়াই করে জিন্দেগি নিপাত করেন। ব্রিটিশরা এসে একে একে স্বাধীন নাগাল্যান্ড, আসাম, মনিপুর, ত্রিপুরা, মিয়ানমার দখল করে ইউনিয়ন জ্যাকের নিচে নিয়ে আসে। এটা কোনোদিনই কোনো একক দেশ ছিল না।

অনেক স্বাধীন দেশের সমষ্টিমাত্র ছিল। যে কারণে এশিয়ার এই অঞ্চলকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ান উপমহাদেশ। দেশ বলা হয় না, যেভাবে মধ্য এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্য বলা হয়। তারা তো অনেক স্বাধীন দেশের সরলিকৃত নাম বোঝার সুবিধার জন্য। ভারত যে একটা মাত্র দেশ নয়, ছিল না কখনই—তার আরেকটা দিক হলো, বঙ্গ ভাষীদের যে এলাকাটা ভাষাগত খাদ্যগত আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের জন্য স্বতন্ত্র, সেটাও বিহার সীমান্ত পর্যন্ত।

তার ওপারে তো অন্য ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। বঙ্গের হিন্দুরা পলাশির পর ব্রিটিশ আমলে ব্যাপকভাবে চালু করে দুর্গাপূজা। প্রতিপক্ষ অসুর। উত্তরের অবতার রাম। প্রতিপক্ষ রাবণ।

দক্ষিণের দ্রাবিড়রা বলে আমাদের দেশ দখল করে, অচ্ছ্যুত করে রাখার ষড়যন্ত্র থেকেই রাবণকে তুচ্ছ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই যে বিভক্তি তার ধর্মীয় প্রতীকও ভিন্ন ভিন্ন। বৃহত্ বঙ্গের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক ভিন্নতাও স্পষ্ট। কলকাতার বাবু কালচারের জমিদার মহাজন ও বুদ্ধিজীবীদের শোষণ ভূমি আজকের বাংলাদেশ। পূর্ববঙ্গে ধান, পাট ও ট্যাক্সের টাকায় কোলকাতার দপদপানি আকাশ স্পর্শ করে।

বঙ্গভঙ্গ যে কারণেই হোক না কেন, সেটা ছিল ইতিহাসের অনিবার্য রায়। ওটা ভাঙন নয়। বাস্তবতা। রবীন্দ্রনাথের কথা তো আগেই বলেছি। কলকাতার বিরুদ্ধতার কারণে ১৯১১ সালে আমাদের উত্থান যেমন রহিত হয়, তেমনই ১৯২১ সালের আগে একটা সামান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও আমরা পাইনি।

আমাদের উন্নতির প্রতিটি পথের সামনে বার বার বাধার বিন্ধাচল হয়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতা। আমরা যে ওপারের চোখে কেমন ছিলাম, তার আরেক নজির মানিকের পদ্মা নদীর মাঝি, ঈশ্বর এখানে থাকেন না, থাকেন ওপারের ভদ্র পাড়ায়। মমতাও বুঝিয়েছেন, বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থ বড়। এই শোষণ-নির্যাতন থেকে এ দেশকে ও দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনে। তার নিজের জবানিতে এই কথা রেকর্ড করা আছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দলিলপত্রে।

তাছাড়া প্রবাসী সরকারের করা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূল নীতির সঙ্গে শেখ মুজিব যুক্ত করে দেন জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তার কথায় এই জাতীয়তাবাদের জন্যই আমরা ভারত থেকে আলাদা। ঐতিহ্যগতভাবেই আলাদা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমরা এক দেশের নাগরিক ছিলাম না কখনই।

দেশভাগ শব্দটিও ভুল। কিন্তু তার চেয়ে বড় ভুল করে বসে আছেন সৈয়দ আশরাফ অন্ধ উন্মাদ ভারত প্রেমের কারণে। তিনি তাদের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিষ্ঠিত নীতিকেই নাকচ করে দিয়ে বসে আছেন। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? আর কত রঙ্গ যে এরা জাতিকে দেখাবেন কে জানে! সৈয়দ আশরাফ ওপারের ইতিহাস জানেন না। জানার কথাও নয়।

তবে ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলার আগে তার উচিত ছিল বড়দের কাছ থেকে কিছু শিখে নেয়া। তাহলে এত বড় আত্মঘাতী কথা বলতে পারতেন না। আর কে না জানে সৈয়দ আশরাফ সাহেবরা তাদের হীন স্বার্থগত কারণেই কিছু মনে রাখেন না। রাখা উচিত জেনেও হয়তো রাখতে পারেন না। সেটা এদেশের মানুষ এখন বোঝেন।

বোঝে বলেই তারা সবকিছু নিজেরাই মনে রাখেন। তাদের মনে রাখতে হয়। কারণ, সৈয়দ আশরাফের মতো তাদের কোনো অনৈতিক দ্বৈত নাগরিকত্ব নেই। তারা জানে, এই দেশেই তাদের জন্ম, এখানেই তারা মরবেন। তাদের পালিয়ে যাওয়ার অন্য কোনো মোকাম নেই।

সে জন্যই তারা দেশকে, দেশের স্বাধীনতাকে প্রাণের চেয়েও মহামূল্যবান জ্ঞান করেন। ভালোবাসেন। এই ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও যদি সৈয়দ আশরাফ সাহেবদের থাকত তাহলে তো এত কথার প্রয়োজন হতো না। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।