আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ভারত ফ্যাক্টর!: ড. আসিফ নজরুল



বাংলাদেশের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত ভারতের কাছে। কুলদীপ নায়ার যখন একথা বললেন তখন ক্ষমতায় বিএনপি সরকার। ২০০৫ সালের নভেম্বরের ঘটনা এটি। ভারতের গোয়ায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক একটি সম্মেলনে তার সঙ্গে দেখা। তিনি বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবদান প্রসঙ্গে বলছিলেন।

কুলদীপের বক্তব্য ঠিক। কিন্তু এর অন্য একটি দিকও তো আছে। আমি তাই বললাম, বাংলাদেশ যে স্বাধীন হয়েছে সেজন্য ভারতেরও কৃতজ্ঞ থাকা উচিত বাংলাদেশের কাছে। দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন তিনি। আমার কথা শুনে খাওয়া বন্ধ করে স্থির দৃষ্টিতে তাকান আমার দিকে।

আমি ব্যাখ্যা করি, বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে তো মহাবিপদে পড়ত ভারত। পাকিস্তান তখন বাংলাদেশে (অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) পারমাণবিক ঘাঁটি বসাত। দু'দিকের সীমান্ত নিয়ে মহাব্যস্ত থাকতে হতো ভারতকে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও ঘাঁটি হতো বাংলাদেশে। এ প্রসঙ্গ নিয়ে আর আলোচনায় উৎসাহী মনে হলো না তাকে।

তাতে তেমন মন খারাপ করার মতো কিছু ঘটেনি। কারণ এর পরদিনই সবচেয়ে প্রার্থিত মানুষটির সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সুযোগ ঘটে আমার। তিনি ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদ আইকে গুজরাল। গুজরাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন বেশ কয়েক বছর। ভারতের শক্তিশালী নাগরিক সমাজের আন্দোলনের প্রভাবশালী একজন নেতাও তিনি তখন।

তার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একপাক্ষিকভাবে ভালো সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগ নেন তিনি। বাংলাদেশের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ তার অন্যতম অবদান। তবে তার পররাষ্ট্রনীতি ভারতের পরবর্তী সরকারগুলো একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেনি। সম্মেলনের শেষদিনে পানাজিতে নৌ-ভ্রমণের সময় গুজরালের সঙ্গে একা বসে কথা বলার সুযোগ হয়। তোমরা বড় দেশ, তোমরা কেন উদারতা দেখাও না বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের সঙ্গে? আমার কথা শুনে একপর্যায়ে তিনি হেসে জানতে চান, তুমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে কী করতে বাংলাদেশের জন্য? একনিঃশ্বাসে বলি নদীর পানির ন্যায্য ভাগাভাগির কথা, বাণিজ্য সম্পর্ক সাম্যভিত্তিক করার কথা, নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার কথা।

আমার অভিযোগও থাকে অনেক : কেন ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নির্বিচারে বাংলাদেশের লোকদের গুলি করে মেরে ফেলে, কেন বাংলাদেশকে ইসলামী মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচারণা চালায় ভারত, কেন বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো দেওয়া হচ্ছে না? একসময় থেমে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করি গুজরালকে, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলে কী করতেন? গুজরাল বলেন : কিছু না, আমি শুধু ভারতের বিরুদ্ধে অহেতুক প্রচারণা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতাম। আর কিছুই না? গুজরাল বলেন : দেখ, ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ অন্য একজন সম্পর্কে নিন্দা বা প্রচারণা চালাতে থাকলে তাদের সম্পর্কের যেমন অবনতি ঘটে, তেমনি দুটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটে। ২ বিএনপি সরকারের সময় নেতিবাচক প্রচারণা ছিল। ভারতের পক্ষ থেকে ছিল, বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ছিল। গত তিন বছরে পরিস্থিতি বদলেছে।

বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারিভাবে এই প্রচারণা নেই বললে চলে। বরং উলফা বিদ্রোহীদের দমনে সহায়তা, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার তদন্ত, টিপাইমুখ বাঁধের বিষয়ে একতরফা ছাড়, ট্রানজিটের বিষয়ে ভারতের ইচ্ছার প্রাধান্য দেওয়া ইত্যাদিসহ আরও বহু উদাহরণ রয়েছে বর্তমান সরকারের ভারতপ্রীতির। এই প্রীতি (বিরোধীদের ভাষায় আনুগত্য) বাংলাদেশের ইতিহাসে তুলনাবিহীন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এমনি একসময়ে ভারত সফর করছেন। গুজরালের ব্যাখ্যা অনুসারে আমরা কি আশা করতে পারি এই সফরে বন্ধুত্বের বস্তুনিষ্ঠ নিদর্শন পাওয়া যাবে ভারত থেকেও? কেউ কেউ এখনই বলা শুরু করেছেন, একটি সফরে সব সমস্যার সমাধান হওয়ার কথা নয়।

এটি ঠিক। কিন্তু এ সফরে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা অন্তত কিছু সমস্যার সমাধান হতে পারে, হওয়া উচিত। বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো বাংলাদেশকে প্রত্যর্পণ, কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, অন্যসব নদীবিরোধের নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চুক্তি সম্পাদন, বাণিজ্য ঘাটতি নিরসন_ এসব বিষয় ইতিমধ্যে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি অনুসারে দায়িত্ব পালনের অবলিগেশন বা বাধ্যবাধকতা ভারতের রয়েছে। অন্তত এসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বাংলাদেশ সরকারের বন্ধুত্ব হবে একেবারেই একতরফা। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব একতরফা হলে তার নানা খেসারত দিতে হতে পারে বাংলাদেশকে।

গঙ্গা নদী স্টাইলে অন্যান্য অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রেও ভারত প্রথমে প্রকল্প নির্মাণ করে পরে আলোচনা শুরু করলে, ট্রানজিটের নামে ভারত একতরফা সুবিধা নিলে, প্রধানত ভারতের স্বার্থে সন্ত্রাসবিরোধী চুক্তি সই হলে বা ভারতের কারণে সামুদ্রিক সীমানা রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে গুরুতর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে বাংলাদেশ। এত বিশাল ঝুঁকি একতরফাভাবে গ্রহণ করলে এবং বিশেষ করে এর বিনিময়ে বস্তুনিষ্ঠ কোনো সুবিধা বাংলাদেশ না পেলে সরকারকেও তীব্র সমালোচনা এবং বিরোধের মুখে পড়তে হবে। এতে ভারতবিদ্বেষ বাড়বে, ভারতের প্রতি চরম বন্ধুভাবাপন্ন একটি সরকারের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন কি? ৩ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অকাতরে সাহায্য করেছে ভারত। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের বহু মানুষ ভারতবিরোধী।

এটি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও অযৌক্তিক নয়। কারণ ভারতের সঙ্গেই রয়েছে আমাদের সবচেয়ে তীব্র স্বার্থ-সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। মিয়ানমারের সঙ্গে সামান্য কিছু বাদে একমাত্র ভারতের সঙ্গেই রয়েছে আমাদের স্থল সীমানা, সামুদ্রিক সীমানা, ছিটমহল ও অভিন্ন নদী ভাগাভাগির প্রশ্ন। ভারতেরই সবচেয়ে বেশি সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসীদের সহায়তা দেওয়ার, বাংলাদেশেরও সুযোগ রয়েছে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার। পারস্পরিকভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশের সুযোগও রয়েছে দুই দেশের নাগরিকদের।

ভারতের ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদীরা রাজনৈতিক ধারা উস্কে দিতে পারে বাংলাদেশে একই ধরনের রাজনীতি। একই কথা সমভাবে প্রযোজ্য বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক উগ্র রাজনীতির ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের বন্ধুত্ব বা বৈরিতা তাই সবচেয়ে বেশি সম্ভব ভারতের সঙ্গে। ভারতই পারে বাংলাদেশকে সবচেয়ে লাভবান বা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করতে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন দু'ভাবে।

একপক্ষ ভারত তোষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আরেকপক্ষ ভারতবিদ্বেষে অন্ধ হয়ে পড়ে। অথচ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত সম্মানজনক এবং সাম্যভিত্তিক বন্ধুত্বের। দু'পক্ষেরই উচিত অধিকাংশ সমস্যার উইন-উইন সমাধান খোঁজা যা দু'পক্ষের জন্য কম-বেশি লাভজনক। একক্ষেত্রে ভারতের জন্য বেশি লাভজনক হলে, অন্যক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশি লাভ নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

ভারতের প্রতি আবেগসর্বস্ব শত্রুতা করে আমাদের যেমন কোনো সুবিধা হবে না, তেমনি নতজানু মনোভাব রাখলেও আমাদের প্রকৃত কোনো লাভ হবে না। সম্মানজনক একটি বন্ধুত্বের সম্পর্কের স্বরূপ সঠিকভাবে নির্ধারণ করাই হবে তাই দু'দেশের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হ ড. আসিফ নজরুল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশেল্গষক (সুত্র, সমকাল, ০৮/১২/২০০৯)

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.