আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গল্প: অন্তরালের সাধক

বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক, হে ভগবান। বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ, পুর্ন হউক, পূর্ন হউক, পূর্ন হ্‌উক, হে ভগবান। রবীন্দ্রনাথ

ভোগল দিঘীর হাটে প্রচুর শালের জঙ্গল। জায়গাটা দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলায়। শালবন মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে আছে; সে শাল অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া যায়।

এর আগে বন্ধুদের সঙ্গে বহুবার আমি ভোগল দিঘীর হাটে এসেছি। একটা সময় ছিল যখন বন্ধুদের সঙ্গে বাংলাদেশ চষে বেড়াতাম। এখন কে কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে। সে সব কথা ভাবলে মন বিষন্ন হয়ে ওঠে। সময়টা চৈত্রের মাঝামাঝি।

শালবন দুপুরবেলার উজ্জ্বল রোদে ডুবে আছে । একা একা শালবনে হাঁটছি। সকাল থেকে নানা কারণে মনটা অস্থির ছিল। শালবনে হেঁটে হেঁটে মনটা শান্ত হল। দুপুর থেকে শালবনে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

খুব ভোরে ভোগল দিঘীর হাটের বাস স্টেশনে নেমেছি। একাই। তারপর একটি স্থানীয় সস্তা হোটেলে উঠে খেয়ে দেয়ে ঘুম। দুপুরের আগেই আবার বেরিয়ে পড়েছি। ভোগল দিঘির হাটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসীর বাস ।

আদিবাসী বলতে সাঁওতালই বেশি। তবে কোচরাও আছে। আমি তাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। তারাও আমাকে দেখে। এরাই বাঙালির নৃগোষ্ঠীর মূল ভিত,- অথচ হাজার বছর ধরে বাঙালিসমাজে কোনঠাসা।

চৈত্রের দুপুরটি উদাস। শালবনময় ঝকমক অমলিন রোদ । কী রকম এক কড়া গন্ধ বাতাসে। সম্ভবত সাঁওতালরা পাতা পুড়িয়েছে । শালবনের ভিতর দিয়ে কালচে সরু পিচরাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে।

গন্তব্যহীন হাঁটতে হাঁটতে আমার ঘোর লাগে। বুক ভরে পোড়া শালপাতার গন্ধ নিই। চকিতে শুকনো পাতার ওপর দিয়ে দৌড়ে একটা খরগোশ চলে যায়। একটা মাঝারি কালচে রঙের সাইজের শূকর দৌড়াচ্ছে। বর্শা হাতে ছুটন্ত জন্তুটার পিছন পিছন দৌড়ে যাচ্ছে কয়েকজন কোল- ভীল-কোচ-সাঁওতাল ...এ রকম অনেক প্রাচীন দৃশ্য উঠে আসে ভোগল দিঘীর হাটের নির্জন দুপুরের শালবনে।

স্বল্প দৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নির্মান আমার দীর্ঘদিনের সাধ । বৃষ্টির শব্দ, ঘোড়ার ডাক, এনিগমার মিউজিক ... শালগাছে ঠেস দিয়ে বিপদজনক ভঙ্গিতে কামার্ত সাঁওতাল তরুণী, মুখোমুখি চাবুক হাতে স্যাডিস্ট বাঙালি যুবক। তবে আদিবাসীদের ওপর মূলধারার শোষনের বিষয়টি অন্যভাবেও আনা যেতে পারে। আদিবাসী গ্রামের উঠানে কালচে রঙের মাঝারি সাইজের একটা শূকরের পায়ূপথে রড ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পোড়ানো হচ্ছে - এখানে নিরীহ আদিবাসীদের ভূমিকা অনেকটা ধর্ষকের ... প্রাণীহত্যার বিষয়টা এভাবেও দেখানো যেতে পারে। এরকম ভাবনায় আচ্ছন্ন ছিলাম- হঠাৎই লোকটাকে দেখলাম।

বয়স্ক থলথলে শরীর। ছাপা লুঙ্গি আর সাদা রঙের ময়লা ফতুয়া পরে একটা শালগাছের নীচে কাটা-গুঁড়ির ওপর বসে আছে। গায়ের রং ফরসা। চুল পেকে গেছে, মাথার সামনে দিকে অনেকটা টাক। পাকা দাড়ি।

চোখে কালো ফ্রেমের কালো রঙের চশমা, দৃষ্টিহীনদের চশমা যেমন হয়। বৃদ্ধর বসার ভঙ্গিটা কেমন অদ্ভূত। সহসা গভীর টান বোধ করলাম। আমি এগিয়ে যাই। বৃদ্ধ আমায় দেখে স্মিত হাসলেন।

বললেন, আজ ভোরে কিন্তু আপনাকে আমি বাস স্টেশনে দেখেছি। কন্ঠস্বর জলদ গম্ভীর। ওহ্, তাই নাকি। হ্যাঁ। আপনি খুব সম্ভব নাশতা সেরে ধনঞ্জয় মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে বেরুচ্ছিলেন।

আমি মাথা নাড়লাম। বসুন না, আলাপ করি। আমি কাটা-গুঁড়ির এক প্রান্তে বসলাম। চতুর্দিকে শুকনো শালপাতার স্তুপ। সামনে সরু পিচ রাস্তা।

টুংটাং ঘন্টি বাজিয়ে সাইকেল চালিয়ে দেহাতি যুবক যাচ্ছে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ক্যান ঝুলে আছে, সম্ভবত দুধের । পিচ রাস্তার দু’পাশে শালগাছের সারি। ওপাশে কাকেদের চিৎকার। একটা সিগারেট ধরাবো কিনা ভাবছি।

বৃদ্ধের সামনে সঙ্কোচ হল। বৃদ্ধ বললেন, সিগারেট খেলে খান। সমস্যা কি? আমিও তো মাঝেসাজে চুরুট খাই। বৃদ্ধ আমার মনের কথা জানলেন কি করে। আমি অবাক হলাম।

বৃদ্ধর কথার বলার ভঙ্গিটি মুগ্ধ হওয়ার মতো। একে কি বলে? ব্যক্তিমায়া? বৃদ্ধের অবয়বে কী আছে, ভারি øিগ্ধ। শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় মনের সব কথা বৃদ্ধকে খুলে বলি। ... শুনুন, আমি এক সময় কবিতা লিখতাম।

ব্যাঙ্কের চাকরির পর ফুরিয়ে গেছি। দৈববাণী আর আসে না। বিয়ের পর নতুন বৌয়ের ইচ্ছেয় বইয়ের আলমারী শোওয়ার ঘর থেকে সরাতে হল। তারপর থেকে সারাক্ষণ নিজেকে নিঃস্ব মনে হয়, অফিসে আর বাসায় দম বন্ধ হয়ে আসে। সন্ধ্যার পর দুঃখী বালকের মতো শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই, একটার পর একটা সিগারেট টানি।

স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ছবি নির্মাণের কথা ভাবি। ছুটিছাঁটা পেলে শহরের বাইরে এক দিনের জন্য হলেও চলে যাই ... আমি সিগারেট ধরালাম। বৃদ্ধ বললেন, আমার নাম আহমেদ রশীদ। আপনার? আমি আমার নাম বললাম, কোন ব্যঙ্কে চাকরি করি, কবে বিয়ে করেছি- সেসবও বললাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এখানেই থাকেন? নাকি আমার মতো বেড়াতে এসেছেন? শালপাতার ফাঁক গলে বৃদ্ধের চোখেমুখে শেষ দুপুরের রোদ এসে পড়েছে।

আহমেদ রশীদ হেসে বললেন, না, না। আমি বেড়াতে আসিনি। আমি প্রায় তিরিশ বছর হল এখানেই লুকিয়ে আছি। লুকিয়ে আছেন মানে? আমি অবাক হলাম। কিছু বলতে যাব- এমন সময় দেহাতি একটি মেয়ে কে আসতে দেখলাম।

মেয়েটিকে সাঁওতাল বলেই মনে হল; তবে আমি ঠিক সিওর না । মেয়েটির গায়ের রং মিসমিসে কালো, কিন্তু অসম্ভব সুশ্রী। বড় বড় চোখ, নাকে পিতলের নথ। হাতে কলাপাতায় ঢাকা লাল রঙের একটি মাটির বাসন। মেয়েটির বয়স বছর তিরিশ বয়স বলে মনে হল আমার।

মেয়েটি উবু হয়ে কলাপাতা ঢাকা বাসনটি আহমেদ রশীদের পায়ের কাছে রাখল। তারপর সিধে হয়ে দাঁড়াল। আহমেদ রশীদ বললেন, আচ্ছা, তুই এখন যা রে শিপ্রা। সন্ধ্যার পর হামি তুর বাড়িত একবার যাইমো। মেয়েটি উবু হয়ে আহমেদ রশীদকে প্রণাম করে চলে গেল।

দৃশ্যটায় কী ছিল। আমার কল্পনার চলচ্চিত্রে দৃশ্যটা সংযোজন করে নিলাম। খুঁটিনাটি পরে লিখে রাখব। সে যাই হোক। শালবনের এই বৃদ্ধকে আমার বুদ্ধের মতো মনে হল।

শিপ্রাকে সুজাতা। কলাপাতা ঢাকা বাসনে কি রয়েছে দেখার কৌতূহল হল। আমি বললাম, আপনি তখন বললেন ... আপনি এখানে লুকিয়ে আছেন? হ্যাঁ। মাথা নেড়ে আহমেদ রশীদ বললেন। তার কারণ? সে অনেক কথা।

শুনবেন? আহমেদ রশীদ কন্ঠস্বরে সামান্য আবেগ ফুটে উঠল মনে হল। বলুন। বলে সিগারেটে টান দিলাম। শুকনো শালপাতার টকটক গন্ধ পাচ্ছি। সিগারেট খাওয়া ঠিক হচ্ছে না মনে হয়।

অবশিষ্টাংশ ছুঁড়ে ফেলে দিলাম দূরে। আহমেদ রশীদ বললেন, আমি আসলে মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে আছি, আর সে কারণেই বনেজঙ্গলে লুকিয়ে থাকি। তিরিশ বছর ধরে এখানকার আদিবাসী এক গাঁয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছি। কেন? আহমেদ রশীদ বললেন, শৈশব থেকেই দেখেছি- লোকে আমার প্রতি অদ্ভূত এক আকর্ষন বোধ করে। আমাকে খুশি করতে নানাভাবে চেষ্টা করে।

আমি যা বলি তাই তারা বিশ্বাস করে। একটু আগে যে সাঁওতাল মেয়েটিকে দেখলেন- হ্যাঁ। মেয়েটির নাম শিপ্রা, সাঁওতাল, বন্ধ্যা। ওর ধারণা- সে নিয়মিত আমার সেবাযতœ করলে একদিন না একদিন সন্তানসম্ভাবা হয়ে উঠবে। প্রায়ই আমাকে এটা-ওটা রান্না করে খাওয়ায়।

দেখি আজকে কি দিয়েছে- বলে ঝুঁকে মাটির বাসন তুলে কলাপাতা সরালেন। আমি উঁিক দিয়ে দেখলাম। ভিতরে ভাত আর খানিকটা দই। আহমেদ রশীদ হেসে বললেন, খাবেন নাকি? কন্ঠস্বরে গভীর আন্তরিকতা। থাক।

বৃদ্ধ আমাকে ভীষন টানছে। কিন্তু তিনি তিরিশ বছর ধরে আদিবাসী গাঁয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছেন কেন? আহমেদ রশীদ বললেন, লোকে আমার প্রতি কেন যেন ভীষন টান বোধ করে। আমি যা বলি তাই বিশ্বাস করি। লন্ডনে যখন ছিলাম - তখনও এমনও দেখেছি। আপনি ইংল্যান্ড ছিলেন নাকি? হ্যাঁ।

আহমেদ রশীদ মাথা নেড়ে বললেন। ওখানেই তো ডাক্তারি কমপ্লিট পড়লাম। আমরা রংপুরের বনেদি পরিবার, যদিও পাকিস্তান আমল থেকে ঢাকায় সেটল। আমাদের পরিবারে নামকরা ডাক্তার আর ব্যারিষ্টারের অভাব নেই। আমার বাবাও সিক্সটি ফোরে চিফ জাষ্টিস ছিলেন।

আমি সেভেনটি ফোর এ বিলেত চলে যাই। ওখানেই ডাক্তারি পাস করে দেশে ফিরে আসি। তারপর থেকে এখানেই আছি। বিয়েটিয়ে করিনি। এখানকার স্থানীয় লোকদের যতটা পারি চিকিৎসা সেবা দিই।

আমি বললাম, সে তো বুঝলাম। কিন্তু আপনি লোকজন এড়িয়ে চলছেন কেন? ঐ যে বললাম- আমার প্রতি লোকজন গভীর টান বোধ করে। এই কারণে আমি যা বলি সে সব লোকে বিশ্বাস করে। তাতে ক্ষতি কি? ক্ষতি? হ্যাঁ। ক্ষতি আছে।

কী রকম? ধরুন। আহমেদ রশীদ বললেন। আমি জীবন ও জগতের সরূপ ব্যাখ্যা করতে শুরু করলাম। ধরুন সেসব নিয়ে বইও লিখলাম। হুঁ।

লোকে মন দিয়ে আমার কথা শুনবে, মানে যারা আমার ভক্ত- হ্যাঁ। তারা আমার বই পড়বে। তারপর তারা বলতে শুরু করবে জীবন ও জগতের সরূপ সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যাই সত্য ও চূড়ান্ত। তারপর তারা স¤প্রদায় গড়ে তুলবে। স¤প্রদায়ের নাম দেবে-এই ধরুন ‘রশীদি।

’ দিক। তাতে ক্ষতি কি। আমি বললাম। শালবনে বাতাস বয়ে যায়। আমার ঘোর লাগে।

ক্ষতি আছে। আহমেদ রশীদ বললেন। রশিদী স¤প্রদায় তাদের মতাদর্শ সত্য প্রতিপন্ন করার জন্য অন্যদের নানা যুক্তি দেখিয়ে হেয় করবে, বিরোধী পক্ষকে ঘৃনা করবে। তারপর অপর পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। বিশ্বের ইতিহাসে এই তো হয়ে আসছে-তাই না? তাই তো।

আহমেদ রশীদ গম্ভীর কন্ঠে বললেন, আসলে জীবন ও জগতের প্রকৃত সত্য কেউই জানে না। সবাই বিশ্বজগতের মনগড়া ব্যাখ্যা দেয়। আহমেদ রশীদের এই কথাটা শালবনের এই শেষবেলার আলোয় কেমন যেন শোনাল। বেলা পড়ে আসছে। শুকনো শালপাতার গন্ধ ঘন হয়ে উঠছে।

আকাশের রং কেমন বদলে যাচ্ছে- অনেকটা ফিকে ফিরোজা রং ধারন করেছে। পিচরাস্তার মাঝখানে একটি শুভ্র খরগোশ। পর্যটন কর্পোরেশনের একটি সাদা মাইক্রোবাস ধূলো উড়িয়ে চলে যায়। সাদা খরগোশটি কোথায় পালালো কে জানে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, একটা মতবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কেন? কেবলমাত্র সেই মতবাদের প্রবক্তার ব্যক্তিমায়ার জন্যই? হুঁ।

তাই তো। কেবলই কি ব্যক্তিমায়া? তাহলে সত্য বলে কি কিছু নেই? আহমেদ রশীদ স্বীকার করলেন, হ্যাঁ। প্রত্যেক মতবাদে সত্যও কিছু আছে বৈ কী, অন্তত মরাল, মানে, নৈতিক দিক থেকে, প্রাচীন ভারতের জৈনরা ছিল প্রাণীহত্যার বিরোধী। তবে ঐ ব্যক্তিমায়াই হল আসল। মহাবীরের, জৈনধর্মের প্রবক্তা-তাঁর গভীর ব্যক্তিমায়া ছিল।

আমার কাছে এখন আহমেদ রশীদের জীবনদর্শন অনেকটাই স্পষ্ট। বৃদ্ধ স¤প্রদায় তৈরি করবেন না, অনিবার্য সংঘাত এড়াতে অরণ্যে নিভৃত জীবনযাপন করছেন। আশ্চর্য! বললাম, আপনি তাহলে সংঘাত এড়াতেই অন্তরালে আছেন? হ্যাঁ। আশ্চর্য! সবাই তো গডফাদার হতে চায়। ক্ষমতার সুখ উপভোগ করতে চায়।

আহমেদ রশীদ ম্লান হেসে বললেন, এসব করে কী লাভ? এসব তো অনিবার্য সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। শিখদের গুরু নানকের মতবাদ যতই নিরীহ হোক-তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিখ ধর্মটির অগ্রযাত্রার ইতিহাসে আমরা রক্তপাত দেখেছি। গুরু নানকের ভারতবর্ষের কোথাও নিভৃত জীবন কাটিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। বললাম, বুঝেছি। আপনি আমার শ্রদ্ধা গ্রহন করুন।

আহমেদ রশীদ ম্লান হাসলেন। আমি আরও কী বলতে যাব-সম্ভবত আহমেদ রশীদের জীবনদর্শন সম্বন্ধে কোনও প্রশ্ন করব- হঠাৎ একটি দেহাতি যুবককে দৌড়ে আসতে দেখলাম। কালো হাড্ডিসার। খালি গা ধূতি পরা। আহমেদ রশীদ বললেন, কী রে সরেন, কী হয়েছে, তুই দৌড়াচ্চু ক্যা? লোকটা স্থানীয় ভাষায় গরগর করে কি সব বলল ।

আহমেদ রশীদ বললেন, আই হ্যাভ টু গো, ইয়াংম্যান। আমার এক পেশেন্টের ক্রিটিক্যাল অবস্থা-এই মধু সরেনের ওয়াইফ। আমাকে এক্ষুনি যেতে হচ্ছে। বলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আমার বিস্ময়ভরা চোখের সামনে অন্তরালের সাধক শালবনের ঋষি শেষ বেলার ম্লান আলোর বনপথে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

আমিও উঠে দাঁড়াই। গাছগুলির ওপাশে একটি শূকরের মৃত্যুযন্ত্রণা শুনতে পেলাম যেন। তার বিকট আর্তনাদ। কারা যেন গাছপালার আড়ালে শূকর বধ করছে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে দৌড়ে একটা খরগোশ চলে যায়।

পিচ রাস্তায় একটি সাপের খোলশ কাগজের ঠোঙার মতো গড়িয়ে যাচ্ছে। চর্তুদিকের গাছপালায়, পিচরাস্তায় কনে দেখা রোদ ছড়িয়ে আছে। একটা মাঝারি কালচে রঙের সাইজের শূকর দৌড়াচ্ছে। জন্তুটা পিছন পিছন দৌড়ে যাচ্ছে কয়েকজন কোল ভীল সাঁওতাল ... এরকম অনেক প্রাচীন দৃশ্য ভোগল দিঘীর হাটের নির্জন দুপুরের শালবনে উঠে আসতে পারে । একটু আগে আহমেদ রশীদ বলছিলেন: আসলে জীবন ও জগতের প্রকৃত সত্য কেউই জানে না।

সবাই মনগড়া ব্যাখ্যা দেয়। আমার শরীর ছমছম করে ওঠে। আমি পায়ে পায়ে শালবন থেকে বেরিয়ে যেতে থাকি। আজ রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হব। শালবনজুড়ে বেলা শেষে হাজার হাজার কাক ডেকে উঠল।

কি তাদের চিৎকারের কারণ? ভাবলাম আমার যদি আহমেদ রশীদ এর মতো ব্যক্তিমায়া থাকত। তাহলে? আমি আমার অগনিত ভক্তদের বলতাম-এই জীবন ও জগৎ আসলে সত্য নয়, কাকেদের স্বপ্ন মাত্র। তারপর মজা দেখতাম ...

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.