আমাদের কথা খুঁজে নিন

   



১। বাঙালির সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাস ১৯৭১। আর এই '৭১ এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি ৩০ লাখ শহীদ, অসংখ্য বর্বরোচিত, পৈশাচিক গণহত্যা। ... এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর দেশে-বিদেশে প্রতিবছর কোনো না কোনো গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ হয়, যা সমৃদ্ধ করে আমাদের জাতিগত ইতিহাসকেই। কিন্তু একজন সাংবাদিক যখন সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে লিখে ফেলেন একটি গবেষণাগ্রন্থ, তখন তা ভিন্ন মাত্রা পায় বৈকি।

আর গবেষণাকর্মটি যদি হয় স্থানীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ, বলা ভালো মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত অধ্যায় গণহত্যা নিয়ে, তাহলে নিঃসন্দেহে তা উন্মোচিত করে অনেক অজানা অধ্যায়। বলা ভালো, এ সব স্থানীয় পর্যায়ের নিবিড় অনুসন্ধান মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রীক ইতিহাসটিকেই সমৃদ্ধ করে। এই দুঃসাহসিক অনুসন্ধানী গবেষণাকর্মটি করেছেন তরুন সাংবাদিক সহকর্মী, ব্লগার আজিজুল পারভেজ । আর এ জন্য তিনি পরিশ্রম করেছেন প্রায় এক দশক। একাত্তরের গণহত্যা : রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার ২।

সিলেটের ঐহিত্যবাহী বিয়ানীবাজার থানাটির রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস। সাংবাদিক পারভেজের জন্মস্থান এই বিয়ানীবাজারেই। 'একাত্তরের গণহত্যা : রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার' নামক তার গবেষণাগ্রণ্থে স্থান পেয়েছে বিয়ানীবাজার কেন্দ্রীক গণহত্যার তদন্ত প্রতিবেদন, অনুসন্ধান ও গবেষণা তো বটেই, এমনকি '৭১ এ কর্মসূত্রে যেসব বিয়ানীবাজারবাসী তৎকালীন পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে গণহত্যার নির্মম শিকার হন, তাদের তথ্যও। এই দূরহ কাজটি করতে গিয়ে পারভেজকে অসংখ্য গ্রাম ও শহরের প্রত্যক্ষদর্শী, শহীদ পরিবারের সদস্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছে। অধ্যায়ন করতে হয়েছে এ সংক্রান্ত সহায়ক গ্রন্থ, '৭১ সালের পত্র-পত্রিকা, যাচাই-বাছাই করতে হয়েছে প্রাপ্ত তথ্য, নিজস্ব অনুসন্ধানও।

স্থানীয় পর্যায়ের ইতিহাস, সামগ্রিক ইতিহাসটিকে কীভাবে সমৃদ্ধ করে, তার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বিয়ানীবাজারে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মারা গিয়েছিলেন, সেই সব শহীদদের একটি তালিকা তৈরি করা হয় ১৯৮৪-৮৫ সালে। এই তালিকায় ১১২ জন শহীদের বিবরণ দেওয়া হয়। এক যুগ পর গবেষক তাজুল মোহাম্মদ আরো একটি তালিকা তৈরি করেন, যাতে স্থান পায় প্রায় ২০০ জনের নাম। পারভেজের মতে, দুটি তালিকাই ত্রুটিপূর্ণ।

কারণ বাড়ি বাড়ি ঘুরে সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে তিনি যে শহীদদের তালিকাটি তৈরি করেন, শুদ্ধরূপে তার সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৮ জনে। এর মধ্যে ৩০ জন শহীদের নাম এই প্রথম তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। এ ভাবে তথ্যানুসন্ধান ও শুদ্ধকরণের মাধ্যমে স্থানীয় তথা জাতীয় ইতিহাসটি নির্ভুল হয়ে উঠবে। ৩। আগেই বলা হয়েছে, পারভেজের বইটিতে জরিপ আছে বিয়ানীবাজারের শহীদদের নিয়ে।

এই জরিপে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ, ছাত্র-কৃষক-দিনমজুর সব শ্রেণী-পেশার, ধর্ম-বর্ণের শহীদরা স্থান পেয়েছে। এতে যুদ্ধের ভয়াবহতা বোঝা যায়। ইতিহাস স্বাক্ষী, দেশের অধিকাংশ শহীদ স্মৃতি বিলুপ্তের পথে। তাঁদের সন্ধান দেওয়ার মতো অনেকে এখন আর বেঁচেও নেই। ১৯৭১ এ বাংলাদেশের অনেক নদী তীরে (বিশেষ করে যেখানে ব্রিজ-কালভার্ট ছিলো) পাকিস্তানী সেনা বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসরা অনেক মানুষকে হত্যা করে ভাসিয়ে দেয়, যার কোনো হিসেব নেই।

প্রায় এক হাজার বধ্যভূমি ও গণকবর আবিস্কৃত হয়েছে। এ সব বধ্যভূমি ও গণকবরে কতো শহীদ ঘুমিয়ে আছেন, তারও সঠিক কোনো হিসেব নেই। তাই ৩০ লাখ শহীদের বিষয়টি একেবারে অবাস্তব নয়। কিন্তু এই সংখ্যাটি নিয়ে যখন বির্তক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়, তখন অজানা শহীদ স্মৃতির প্রতি অশ্রদ্ধাই প্রকাশ করা হয়, যে অধিকার আমাদের কেউ দেয়নি। ... ৪।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক আজিজুল পারভেজের বইটির সূচিপত্র। ক্রমানুসারে: একাত্তরের গণহত্যা: একটি মাঠ জরিপ। বিয়ানী বাজারের অবস্থান, পরিচিতি ও প্রারম্ভিক তথ্য। অপারেশন সার্চ লাইটে হত্যার শিকার যারা। সৈনিক জওয়ান কর্মকর্তারা প্রাণ দিলেন সারা দেশে।

বিয়ানীবাজারে গণহত্যা: ইউনিয়নভিত্তিক বিবরণ। রণাঙ্গণে শহীদ যারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যার শিকার যারা। প্রকাশিত শহীদ তালিকাগুলোর অসঙ্গতি ও আরো কয়েকটি নাম। এবং...মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা।

একেবারে ইন্ভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং স্টাইলে লেখা বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে পারভেজ নির্মোহভাবে তুলে ধরেন গণহত্যার সব ভয়ংকর তথ্য, তদন্ত-সাক্ষ্য ও বর্ণণা। সেখানে নেই লেখকের নিজস্ব কোনো অভিমত, ব্যক্তিগত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। তবু এ সব তথ্যচিত্র এতোটাই বাস্তব যে সিনেমার স্লাইডের মতো এক একটি দৃশ্যপট আমাদের নিয়ে যায় '৭১ এর সেই উত্তাল দিনগুলোতে। আমরা শুনি অসহ্য মেশিনগানের গুলির শব্দ... বেয়নেটে খুঁচিয়ে বুক ফেড়ে বের করে দেওয়া কলজে কাঁপানো আর্ত-চিৎকার! আমাদের চোখ ভিজে যায় অজান্তেই। বার বার আমাদের পাঠক মন সংগঠিত হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গণদাবিতে।

... মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের কারণে শিশুসহ দুইজনকে হত্যা মাথিউরা দুধবক্সী-দিঘিরপাড়ের সমজিদ আলীর জ্যোষ্ঠপুত্র আব্দুল আজিজ মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর অনুজ দুই ভাইকে। রমজান মাসের রাতে ধরে নিয়ে এসে ৫ নভেম্বর তাদের হত্যা করা হয় কাঁঠালতলা বধ্যভূমিতে। স্থানীয় মুসলিম লীগার বোরকা হাজি তাদের ধরিয়ে দেন বলে জানা যায়। তাঁদের পরিবারের রেডিওটি ওই রাজাকার ওইদিন নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়। এই দুই ভাই হচ্ছেন-- আবদুল হাসিব : বয়স ছিলো ২৩ বছর।

তিনি ছিলেন কৃষক। একমাত্র কন্যা সন্তান আয়েশার জনক ছিলেন। বিধবা স্ত্রী ফাতেমা বেগমের পরে বিয়ে হয়েছে দেবরের সঙ্গে। আবদুল লতিফ: বয়স মাত্র ১৩-১৪ বছর। মাথিউরা ঈদগাহ সিনিয়র মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন।

(একাত্তরের গণহত্যা : রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার, পৃ. ৬৯। ) ৫। পারভেজের বইটি পাঠের সবচেয়ে বড় সুবিধা এর প্রতিটি অধ্যায়ে যে সব উপঅধ্যায়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সে সব তথ্যের নীচেই ফুটনোটে তুলে দেওয়া হয়েছে এর তথ্যসূত্র। আর এ সব তথ্যসূত্র কখনো সহায়ক একাধিক গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকার ক্লিপিং, কখনো বা তদন্ত সাক্ষ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। তাই পাঠক সহজেই তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকেন, আরো নিজস্ব অনুসন্ধানের জন্য তথ্যসূত্রের জের ধরে সহায়ক গ্রন্থ বা পত্রিকাসমূহ পাঠ করে নিতে পারেন, এমন কী প্রতক্ষদর্শীর সঙ্গে কথাও বলে নিতে পারেন।

আর এসব তথ্যসূত্রের জন্য পাঠককে পুরো বইটি হাতড়ে বেড়াতে হয় না। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনী প্রথম সর্বশক্তি নিয়ে বড় ধরণের আঘাত হানে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর। 'অপারেশন সার্চ লাইট' নামক সেই বিভৎস গণহত্যায় তারা স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিলো এ দেশের মুক্তিকামী জনতার স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে। এই গণহত্যায় যারা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারি। এছাড়া পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনেও চলে সেনা অভিযান।

ট্যাঙ্ক, মর্টার, মেশিনগানসহ ভাড়ি অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে সেখানে চালানো হয় সর্বাত্নক হামলা। বাঙালি ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) জওয়ান ও পুলিশ সদস্যরা হালকা বন্দুক নিয়ে পাক-সেনাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও তা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। অধিকাংশই মারা পড়েন এই প্রস্তুতিবিহীন প্রতিরোধ যুদ্ধে। ওই রাতে পাক-সেনারা নির্বিচার গণহত্যা চালিয়েছিলো নীলক্ষেত, বাবুপুরাসহ ঢাকার আরো কয়েকটি এলাকায়। অগ্নিসংযোগ ও গণধর্ষণও চলেছিলো ব্যাপক।

এই পর্বটি তুলে ধরা হয়েছে পারভেজের 'অপারেশন সার্চ লাইটে হত্যার শিকার যারা' নামক অধ্যায়ে। এর দুটি উপ-অধ্যায়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক ড. জিসি দেবকে হত্যা এবং প্রতিরোধ যুদ্ধ : পিলখানা আক্রমণে শহীদ যারা। প্রথম উপ-অধ্যায়ে শহীদ শিক্ষক ড. গোবিন্দ্র চন্দ্র দেবের সংক্ষিপ্ত জীবনীর বয়ান তুলে ধরা হয়েছে কয়েকটি বই ও সংবাদপত্রের তথ্যসূত্র থেকে। আর দ্বিতীয় উপ-অধ্যায়ে শহীদ তিনজন ইপিআর সদস্যর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হয়েছে শহীদ পরিবারের সাক্ষ্যে। বলা ভালো, জিসি দেবসহ মোট চারজন শহীদেরই জন্মস্থান বিয়ানীবাজার।

এ কারণেই তারা কথা বলা হয়েছে বইটিতে। কিন্তু এই অধ্যায়টি পড়লে ২৫ মার্চের গণহত্যার কোনো ভয়াবহ চিত্রই পাওয়া যায় না। এ সংক্রান্ত তেমন কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি বইটিতে। এমন কী ড. জিসি দেবকে কিভাবে ট্যাঙ্ক চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো, কিভাবে জগন্নাথ ও ইকবাল হলসহ অন্যান্য ছাত্রবাসে ছাত্র-শিক্ষকদের মেশিনগান ও বেয়নেট দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছিলো, তারও কোনো বর্ণনা নেই এই বইয়ে। অথচ সাংবাদিক পারভেজ এই কাজটি সহজেই করতে পারতেন ওই গণহত্যার অন্তত দুজন প্রত্যক্ষদর্শী ডাকসুর গোপাল এবং কার্টুনিস্ট নজরুলের সাক্ষ্য গ্রহণে।

মুক্তিযোদ্ধা-আলোকচিত্রী রশিদ তালুকদারও জীবন্ত বর্ণনা দিতে পারতেন পুরো ঢাকার গণহত্যার। এছাড়া সায়মন ড্রিং-এর দি ওয়াশিনটন পোস্ট -এ পাঠানো সাড়া জাগানো প্রতিবেদনটিও উদ্ধৃত করা যেতো। কারণ এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মহলে সে সময় সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলো, এর মাধ্যমে বিশ্ব জেনেছিলো, পূর্ব বাংলায় গণহত্যা শুরু হয়েছে। ... বইয়ের প্রচ্ছদ ও ভেতরের ফ্ল্যাপে ব্যবহৃত গণহত্যার আলোকচিত্রের সূত্র উল্লেখ না করা আরেকটি মারাত্নক ঘাটতি। ৬।

এর পরেও বিয়ানীবাজার উপজেলাকে কেন্দ্র করে দেশের গণহত্যার ওপর এমন তথ্যসমৃদ্ধ বইয়ের বিকল্প নেই। আর এর স্বীকৃতি স্বরূপ কিছুদিন আগে এ বইটিতে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রবর্তিত 'বজলুর রহমান স্মৃতি পদক' পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এ পদক প্রদান করেন। বইটির পরবর্তী সংস্করণ সমস্ত ভুল-ত্রুটি কাটিয়ে আরো বর্ধিত কলেবরে প্রকাশ হবে, এটি গবেষণা সহায়ক গ্রন্থ বহুল পঠিত -- এমনটাই কাম্য। একাত্তরের গণহত্যা : রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার প্রকাশক: ঐতিহ্য প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০০৯ প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ দাম: ১৪০ টাকা।

--- ছবি: প্রচ্ছদ, একাত্তরের গণহত্যা : রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার, রিকশা পেন্টিং, ন্যাট জিও ম্যাগাজিন, ১৯৭২, গণ কবর ও মুক্তিযোদ্ধা, ন্যাট জিও ম্যাগাজিন, ১৯৭২।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১৩ বার     বুকমার্ক হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।