আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

০: একটি স্বর্গীয় পরিভ্রমণের গল্প (সম্পূর্ণ)

শ্রদ্ধা আর মমতাই তোমাকে জয়ী করতে পারে; তুমি তোমার জ্ঞান প্রয়োগ কর।
রোমানদের দুঃখ: বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যা, চারদিকে বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ, আমি খবরের কাগজ পড়ছিলাম। পাশেই তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া আমার মেয়ে ফারিন মনোযোগ দিয়ে অংক করছিল। তার কাঠপেন্সিলটা খাতার উপর গণিতের ধ্রুপদী সৌন্দর্যের সন্ধানে চষে বেড়াচ্ছে, আর মাঝে মাঝে দুলে উঠছে মায়ের হাতে বেঁধে দেয়া ছোট দুটি বেনী। হঠাৎ খাতা থেকে মুখ তুলে ফারিন বলল, "আব্বু, রোমানদের খুব কষ্ট ছিলো, না?" গণিতের সাথে রোমানদের কষ্টের সম্পর্ক ঠিক বুঝতে না পেরে মেয়ের দিকে অবাক চোখে তাকাই।

"এই যে, রোমানরা একটা ছোট্ট সংখ্যা লেখার জন্য কতগুলো বর্ণ ব্যবহার করত! এই দেখো, ৩৮৭৮ কে রোমান পদ্ধতি লিখে কত পেয়েছি। " আমার সামনে খাতা তুলে ধরল ফারিন: MMMDCCCLXVIII। রোমানদের দুঃখটা এবার বুঝতে পেরে মুচকি হাসলাম আমি। ফারিন তখন বলতে থাকল, "আর তাছাড়া একে দেখে চট করে বুঝার উপায় নেই এটি ৩৮৭৮। আবার লেখার সময় এটি অন্য বর্ণের সাথে গুলিয়েও যেতে পারে।

" মৃদু মাথা নেড়ে মেয়ের সাথে একমত হই। "সেই তুলনায় আমাদের সংখ্যা কত ভালো! আর শূন্যটা কী সুন্দর! সহজে যোগ-বিয়োগ গুণ-ভাগ করা যায়। আচ্ছা বাবা, রোমানরা কিভাবে গুণ-ভাগ করত?" প্রগাঢ় আনন্দে কোমল হয় আমার চোখ। আমার দুই মেয়ের জন্মের পর--বড়টি এবার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে--চেয়েছিলাম গণিতের প্রতি তাদের মমতা গড়ে উঠুক। এই পৃথিবীতে শুধু আসা আর চলে যাওয়া নয়, জগতের সুশৃংখল নিয়ম আবিষ্কারে যে সর্বোত্তম পরিশুদ্ধ আনন্দ--আমার কন্যারা তা পাক।

মেয়েরা আমাকে নিরাশ করেনি। "রোমান যোগ-বিয়োগ এবং বিশেষকরে গুণ ও ভাগ এত জটিল ছিল যে তারা Abacus নামে একটা যন্ত্র ব্যবহার করত। আমাদের ১৭৩ ×১০০ = ১৭৩০০ এর মত সহজ ছিলনা ব্যাপারটি। অসম্ভব জটিলতার কারণে কেউ কাগজ পেন্সিলে হিসেব না করে Abacus এর সাহায্য নিত, এমনকি খুব ছোটখাট হিসেব হলেও। " বড় মেয়ে জেরীন ততক্ষণে পাশে এসে বসেছে।

"বলতো জ্ঞান-বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কোনটি?" মেয়েদের কাছে আমি প্রশ্ন ছুড়ি। দুইবোন এক নাগাড়ে বলতে থাকে--কম্পিউটার, রকেট, মোবাইলফোন, মুদ্রাযন্ত্র, নিউটনের গতিসূত্র...। "নিঃসন্দেহে এগুলো বড় আবিষ্কার। কিন্তু এ সবই সম্ভব হয়েছে একটি ক্ষুদ্র সংখ্যা ০'র ফলে। আর একে সাহায্য করেছে আমাদের দশ-ভিত্তিক বাকি অংকগুলি।

আজকে সমগ্র জ্ঞান-বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে ০'র ক্ষমতার উপর। তাই বলা যায় ০'র আবিষ্কার-ই সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। " "কিন্তু শূন্য আবিষ্কার করার কী আছে বাবা? এটি তো ছিলই। " ফারিনের জোরালো প্রতিবাদ। "না মামনি, এটি সবসময় ছিলনা।

খুব প্রাচীনকালে মানুষের গণিতের শূন্যের কোনো ধারণা ছিল না। তখন এটি ছিল কিছুই না। ধরো, তোমার বড় আপুকে আমি পনের টাকা দিলাম, বড় আপু আবার সেই পনের টাকা তোমাকে দিয়ে দিল। আপুর কাছে আর কত টাকা আছে?" "কিছুই নাই। " "ঠিক।

আবার তুমি এভাবেও বলতে পার: আপুর কাছে 'শূন্য' টাকা আছে। তাই না?" "হ্যাঁ। " "তারমানে যা কিছুই না তাকে তুমি শূন্যও বলতে পারো। কিন্তু প্রাচীনকালে মানুষ একে 'শূন্য' হিসেবে চিন্তা করেনি। তারা ভাবত যা 'কিছুই না' তা নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করা বোকামি।

কে চায় তার ভেড়া 'কিছুই না' হোক, টাকা-পয়্সা 'কিছুই না' হোক? আর এর ফলে শূন্যের ক্ষমতা তারা উপলব্ধি করতে পারেনি। তুমিই বলো, এই যে ৫০-এর ০, এটা কি 'কিছুই না'? এর কি কোন গুরুত্ব নেই?" "আছে বাবা। " "আচ্ছা, তাহলে বলোনা ০ কিভাবে আসলো?" দুইবোন দুইপাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে আমাকে। ০ নিয়ে বলা সহজ কথা নয়। কত হাজার বছরের মানব সাধনার ফল, কত সভ্যতায় পরিভ্রমণ, কতই না অরণ্য-জনপদে তার পথপরিক্রমণ! ০ কখনো পেয়েছে মানুষের ভালোবাসা, কখনো বা ঘৃণা।

বাইরে বৃষ্টির প্রকোপ বাড়তে থাকে, আর দেয়াল থেকে বিশ্বমানচিত্রটি নামিয়ে নিয়ে আমি আমার মেয়েদের নিয়ে যাই প্রাচীন জ্ঞানীমানবদের কাছে... শূন্যের শৈশব পবিত্র নবী ঈসা মসীহের (Jesus Christ) জন্মের প্রায় ৩০০০ বছর আগের কথা--মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের সুমেরীয়্গণ (Sumerian) স্থানীয়্মান ভিত্তিক সূক্ষ্ম এক সংখ্যাপদ্ধতি গড়ে তোলে। সুমেরীয়দের কাছে সংখ্যা ছিল স্বর্গীয়, সংখ্যার মধ্য দিয়ে তারা প্রকাশ করত তাদের দেব-দেবীদের। তাদের কাছে ৬০ ছিল একটি পরিপূর্ণ সংখ্যা, তাই সকল দেব-দেবীর পিতা আনু'র সংখ্যা ছিল ৬০। অন্যান্য দেব-দেবীরা ছিল আনুর ভগ্নাংশ, যেমন চন্দ্রদেবতা নানা'র সংখ্যা ৩০, আর নানার মেয়ে দেবী ইশতার, যাকে গ্রিকরা আফ্রোদিতি এবং রোমানরা ভেনাস নামে অভিহিত করে, এর সংখ্যা ১৫। তো সুমেরীয়দের সংখ্যাপদ্ধতি ছিল ৬০-ভিত্তিক, আমাদের মত ১০-ভিত্তিক না।

তাই আমরা যদি ১৭ লিখি এর মানে হচ্ছে ১-দশ ৭-এক। কিন্তু সুমেরীয়রা যদি ১৭ লিখত তার মানে হত ১-ষাট ৭-এক বা আমাদের বর্তমান ৬৭-এর সমান। তবে তাদের তো আর আমাদের ১, ২, ৩ এর মত চিহ্ন ছিলনা; তারা মাত্র দুটি চিহ্ন ব্যবহার করত: Y-আকৃতির ১ ও কোণ আকৃতির ১০: খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সালের দিকে সুমেরীয় সভ্যতার পতন ঘটে উত্তর থেকে আসা এক জাতির কাছে। এদের রাজার নাম হাম্মুরাবি (Hammurabi) আর এরা মহাপ্লাবনের নবী পবিত্র নূহের (Noah) বড় পুত্র সেম'র বংশধর, তাই এদেরকে বলা হ্য় সেমেটিক (Semitic) জাতি। আবার মূল এলাকার নামানুসারে এদেরকে ব্যাবিলনীয়ও বলা হ্য়।

এই ব্যাবিলনীয়রা (Babylonian) সুমেরীয়দের কাছ থেকে সংখ্যাপদ্ধতিসহ নানা জ্ঞান লাভ করে। সংখ্যা নিয়ে কাজ করতে করতে এরা একসময় দেখল কিছু স্থানে কোন অংক রাখা যায় না। যেমন আমরা ১০৫ লেখি ১, ০, ৫ দিয়ে যার মানে ১-শত, কোন দশ নেই, ৫-এক। তেমনি ব্যাবিলনীয়রা তাদের ১০৫ লিখত এভাবেঃ মাঝখানে ফাঁকা জায়্গা মানে হচ্ছে 'কোন অংক এখানে বসবে না'। কিন্তু এতে সমস্যা, পরে যারা পড়ত কেউ ভাবত ১০৫, কেউ ১৫।

ফলে তারা ফাঁকা জায়গার পরিবর্তে দুটি তীর্যক গদার মত চিহ্ণ ব্যবহার করা শুরু করল। মেসোপটেমিয়ার কীশ নগরে পাওয়া মৃত্তিকালিপি (৭০০ খ্রিস্টপূর্ব) থেকে দেখা যায় বেল-বান-আপলু (Bel-ban-Aplu) নামে একজন লেখক তিনটি হুকের মাধ্যমে লিখতেন। এভাবেই প্রথম শূন্যের প্রচলন ঘটে। অবশ্য ব্যাবিলনীয় এই শূন্য পরিপূর্ণ শূন্য ছিলনা কারণ এটি কখনো স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে ব্যবহৃ্ত হতো না, কিংবা কখনো সংখ্যার ডানে বসত না, মাঝে বসত। "তাহলে তারা আট এবং আটশ'র মধ্যে কিভাবে পার্থক্য করত?" জেরীনের চিন্তায় চমৎকৃত হই।

কোন প্রসংগে সংখ্যা আলোচনা করছে তা দেখে। ধরো, ফারিনের কাঠপেন্সিলটার দাম যদি বলি আট, আবার এবার ঈদে আম্মু ফারিনকে যে ড্রেসটা দিয়েছেন তার দামও আট, তুমি কি বুঝবে? "বুঝেছি বাবা, আট টাকা আর আটশ টাকা। " মিশরীয়দের হায়ারোগ্লিফ (Hieroglyph) বা পবিত্রলিপিতেও সংখ্যাচিহ্নের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে মিশরীয়দের সংখ্যা ১০-ভিত্তিক হলেও আমাদের মত স্থানীয়মান ভিত্তিক ছিলনা; বড় বড় সংখ্যার জন্য তাদের আলাদা প্রতীক ছিল। মিশরীয়্গণও সংখ্যাকে মনে করত স্বর্গীয়।

তারা মনে করত নীলনদের দেবতা ওসিরিস (Osiris) ও উর্বরতার দেবী আইসিসের (Isis) পুত্র আকাশদেবতা হোরাসের (Horus) চোখ স্বর্গীয় ভগ্নাংশে গঠিত, তাই ভগ্নাংশের প্রতীক হিসেবে তারা বেছে নেয় হোরাসের চোখের বিভিন্ন অংশ। মিশরীয়দের হিসাবরক্ষণে দুই-ঘরা নগদান বইতে ন-ফ-র (nfr)নামে একটি চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়-অনেকের মতে এটিই তাদের শূন্য। গ্রিকরা ছিল মিশরীয়দের ছাত্র; বিভিন্নমাত্রার সংখ্যার জন্য তাদেরও ছিল নানা প্রতীক। অবশ্য ততদিনে ফিনিশীয়দের (Phoenician) বর্ণমালা পেয়ে যায় গ্রিকরা, গড়ে উঠে গ্রিক বর্ণমালা। সংখ্যাপ্রতীক হিসেবে হায়ারোগ্লিফ চিহ্নের পরিবর্তে গ্রিকরা তাই তাদের বর্ণ ব্যবহার শুরু করে।

গ্রিকরা সংখ্যা নিয়ে গবেষণা করেছে বহু, কিন্তু দৈনন্দিন বাস্তবজীবনে এর প্রয়োগ নিয়ে ভাবেনি তেমন। ঋণাত্মক সংখ্যারও যে অস্তিত্ম থাকতে পারে তা তারা বিশ্বাস করত না। তাদের যুক্তি ছিল যা কিছুই না তা আবার কি ধরনের সংখ্যা, আর এর চেয়ে ছোট কী-ই বা হতে পারে! তারা বলত, ex nihilo nihil fit--যা কিছুই না, তা থেকে যা আসে তাও কিছুই না। আর এর ফলে গ্রিকদের শূন্য বলে কোন সংখ্যা ছিলনা। "আহারে বেচারা গ্রিক!" সহমর্মিতা ঝরে জেরীনের কন্ঠে।

তোমরা যখন বড় হবে, তখন দক্ষিণ ইটালির এলিয়া শহরের এক প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকের কথা শুনবে, তার নাম জেনো (Zeno)। কিছু অদ্ভুত, অবাস্তব কথা বলে গিয়েছেন তিনি। যেমন তিনি একবার বলেছিলেন, গ্রিক বীর একিলিস পেছন থেকে দৌঁড়ে কখনো একটি কচ্ছপকে ধরতে পারবে না, তা একিলিস যত জোরেই দৌঁড়াক না কেন। তার এই অদ্ভুত কথাগুলিকে বলা হয় জেনো'র প্যারাডক্স। "কিন্তু বাবা, বাস্তবে তো এটি সত্যি নয়!" হ্যাঁ, কিন্তু জেনো যেহেতু শূন্য চিনতে পারেন নি, তাই এই বিভ্রান্তিগুলি সৃষ্টি হয়েছিল।

ওদিকে মধ্যআমেরিকায়, প্রথমে ওলমেক (Olmec), পরে মায়া'রা (Maya) ২০-ভিত্তিক (Vigesimal) একটি চমৎকার সংখ্যাব্যবস্হা গড়ে তোলে। ‌ঝিনুকের খোল আকৃতির শূন্য, বিন্দু আকৃতির এক, এবং ক্ষুদ্র রেখাংশ আকৃ্তির পাঁচ--এই তিনটি মাত্র অঙ্ক নিয়ে তারা অনেক বিশাল বিশাল সংখ্যা লিখে ফেলত। কিন্তু নবম শতকে মায়ারা রহস্যময়্ভাবে হারিয়ে যাওয়ার ফলে তাদের সংখ্যাও আর অগ্রসর হতে পারেনি। অবশ্য শূন্য মায়া বা ওলমেকদের নিজস্ব উদ্ভাবন--এ ব্যপারে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং কারো কারো মতে এটি আফ্রিকানদের কাছ থেকে পাওয়া।

"কিন্তু বাবা, কোথায় আফ্রিকা আর কোথায় মধ্যআমেরিকা, মাঝে অতবড় অতলান্তিক মহাসাগর?" জেরীনের কন্ঠে সুস্পষ্ট বিস্ময়। অতীতে মহাদেশগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত ছিল। আহ্নিকগতি এবং নানাবিধ ভূতাত্ত্বিক কারণে এরা আস্তে আস্তে সরতে থাকে, মাঝখানে সৃষ্টি হ্য় সাগর। তোমরা যদি আফ্রিকার ঢেবে যাওয়া পশ্চিমপাশ এবং দক্ষিন আমেরিকার স্ফীত পূর্বপাশের দিকে তাকাও ব্যাপারটি বুঝতে পারবে। তো অনেকের মতে, সাহারা মরুভূমি থেকে কিছু লোক গিয়ে মধ্যআমেরিকায় ওলমেক সভ্যতার সূচনা করে।

তারা অবশ্য সাগরই পাড়ি দিয়ে থাকতে পারে, কারণ মহাদেশগুলির বিভাজন হয়েছিল বহু মিলিয়ন বছর আগে। ওলমেকদের গায়ের রং, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যরীতির মধ্যে আফ্রিকার যথেষ্ট ধাঁচ পাওয়া যায়। এছাড়া মিশরীয় জন্মভূমি-বিতাড়িত পাখিমুখো দেবতা থোথ (Thoth) এবং ওলমেকদের প্রধান দেবতা পালকময় সরীসৃপ কীটজালকোয়াটলের (Quetzalcoatl) কাহিনীতে যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। এদিকে আমাদের উপমহাদেশে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ব্রাহ্মী (Brahmi) নামে একটি সংখ্যাব্যবস্থা গড়ে উঠে। তবে এটি এখনকার মত স্থানীয়্মান বিশিষ্ট ছিলনা।

ফলে শুধুমাত্র ১০টি নয়, বরং অনেক চিহ্ন লাগত বিভিন্ন সংখ্যা প্রকাশ করতে। এই ব্রাহ্মী লিপিগুলি পরে বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে যায়। এদের একটি প্রধান ভাগ গুপ্ত (Gupta) সাম্রাজ্যের ভিতর দিয়ে প্রথমে গুপ্তলিপি (Gupta Numeral) এবং পরে দেবনগরী (Debanagari Numeral) লিপিতে পরিণত হ্য়। ষষ্ঠশতকে ভারতে প্রথম ১০-ভিত্তিক সংখ্যাব্যবস্থা গড়ে উঠে। কিন্তু ব্যাবিলনীয়দের মত ভারতীয়রাও শূন্যকে আলাদা সংখ্যা হিসেবে দেখেনি।

ছোট ছোট কিছু সংখ্যা যোগ করার সময় তারা দেখল এককের ঘর কখনো ফাঁকা পড়ে যায়। সেই খালি ঘরে তখন তারা একটি পুঁচকে ফোঁটার মত শূন্য বসাতেন। কারো কারো মতে ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতি ব্যাবিলনীয়দের কাছ থেকে পাওয়া। তাদের যুক্তি, সিন্ধু সভ্যতা মহেঞ্জোদারো (Mohenjo-daro) ও হরপ্পা'র (Harappa) নৌযানগুলি আরবসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে পারস্য উপসাগরে ঢুকে মেসোপটেমিয়ার সাথে পণ্য ও জ্ঞান আদান-প্রদান করত। ।

অবশ্য ভারতীয় দার্শনিকতায় বহুকাল আগে থেকেই 'দার্শনিক' শূন্যতার এক বিশেষ স্থান ছিল, যা পরে গাণিতিক শূন্যের সাথে এক হয়। তুমি যদি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের পবিত্রলিপি ওম (Om, Aum) এর দিকে তাকাও দেখবে ত্রয়ীদেবতা ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু ও শিবের পাশে একটি শূন্য। যাহোক এখনও শূন্যকে কেউ সংখ্যা হিসেবে ভাবেনি--না গ্রিক, না মিশরীয়, না রোমান, না এরিষ্টোটল, ইউক্লিড, আর্কিমিডিস বা পিথাগোরাস "খাবার রেডি, সবাই খেতে আস। " দৈববাণীর মত ঘোষিত হয় আমার স্ত্রীর কন্ঠ, অসম্ভব নিয়ামানুবর্তী এক মহিলা। উঠে দাঁড়তে যাই আমি।

"না, তুমি উঠবে না। " দুইপাশ থেকে আমি মেয়েদের কঠিন বন্ধন অনুভব করি। নিয়্মানুবর্তী মহিলাটি মুচকি হেসে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে একটি চিরূনি তুলে নিয়ে জেরীনের পেছনে বসে তার মাথার চুলগুলি আঁচড়ে দিতে থাকে। আমরা তিনজন আবারো পরিভ্রমণ শুরু করি। Dixit-algorismi, ভয়ংকর সারাসীন যাদু নবম শতকের শুরুর এক দিনের কথা।

বাগদাদ নগরীতে, খলিফা আল-মামুনের প্রসাদের সামনে একটি ক্যারাভান এসে থামে। সেখান থেকে নামেন পাগড়ীপরা সৌম্য চেহারার ভীনদেশী এক যুবক; তাঁর নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্ম্দ ইবনে মুসা, জন্মভূমি আরল (Aral) সাগরের তীরে উত্তর রেশমপথের (Silk Road) পাশে পারস্যের খোয়ারিজম (Khwarizm) প্রদেশ। আল-মামুন এই যুবকটির সংখ্যার প্রতি অপার ভালোবাসার অনেক গল্প শুনেছিলেন। তিনি শুনেছিলেন শৈশব থেকেই এই যুবক জগতের সবকিছুই নাকি সংখ্যার মধ্যে প্রকাশ করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে! তাই তাঁকে ডেকেছেন বাগদাদের বাইতুল-হিকমা তথা জ্ঞানের নিবাসে (House of Wisdom) সংখ্যার মধ্যে স্রষ্টাকে তালাশ করতে। বাইতুল হিকমায় নানা বর্ণ ও ধর্মের জ্ঞানতাপসদের সাথে একাত্ম হয়ে যান ইবনে মুসা।

অসামান্য জ্ঞান ও কোমল ব্যবহারের কারণে কেউ তাঁকে নাম ধরে ডাকেন না--গভীর শ্রদ্ধাভরে সবাই তাঁকে ডাকেন আল-খোয়ারিজমি খোয়ারিজম থেকে আগত জ্ঞানী। পেরিয়ে যায় দিন আর আল-খোয়ারিজমির সামনে উদ্ভাসিত হ্য় প্রাচীন জ্ঞানভান্ডার। কিন্তু তিনি খোঁজেন গণিতজ্ঞানের। তিনি শুনেছিলেন প্রাচীন হিন্দুদের গাণিতিক উৎকর্ষের কথা। বৃত্তীয়নগরী বাগদাদের প্রতিষ্ঠাকারী খলিফা আল-মনসুরের রাজসভায় একদা কঙ্কা নামে এক ভারতীয় জোতির্বিদের আগমন ঘটেছিল; জনশ্রুতি আছে এই কঙ্কা খলিফার জন্য উপঢৌকন হিসেবে এনেছিলেন ব্রক্ষ্মগুপ্ত (Brahmagupta) নামে এক গণিতবিদের লেখা একটি গ্রন্থ।

গ্রন্থটি খুঁজতে গিয়ে একদিন তিনি পেয়ে যান একটি সভ্যতার জমানো জ্ঞান--আর পান সেই 'ব্রাক্ষ্মী' লিপিগুলি। ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতিতে মুগ্ধ হন তিনি, কিন্তু ব্রাক্ষ্মী প্রতীকগুলি সরাসরি ব্যবহার করেন না। বরং যোজন কোণের (Additive Angle) উপর ভিত্তি করে ১, ২, ৩ ও ৪ কে প্রথম চিত্রায়িত করেন। তারপর বৃ্ত্তের পেট কেটে যোজনকোণের সমন্বয়ে বের করেন ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯ কে। সবশেষে জুড়ে দেন খালিস্থানের প্রতীক ০ কে, যাকে ভারতীয়রা বলত শূন্য আর আরবরা সিফর (Sifr)।

পরিপূর্ণ হয় ১০-ভিত্তিক সংখ্যালিপি। ভূমধ্যসাগর থেকে ভারতমহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদে দ্রুত ছড়িয়ে এই লিপিগুলি। এই Sifr থেকেই বর্তমান ইংরেজি zero শব্দটির উৎপত্তি। আল-খোয়ারিজমি আনন্দিত হন, কিন্তু তাঁর হৃদয় শান্ত হয়্না। খালি মনে হয় কী একটা বাদ রয়ে গেছে।

সারাক্ষণ তিনি তাকিয়ে থাকেন রহস্যময় সিফরের দিকে, নির্ঘুম সময় কাটান নানা গবেষণায়। সিফর কি 'কিছুই না', শুধু 'খালিস্থানের প্রতীক' মাত্র? গ্রিকরা যে বলত ex nihilo nihil fit--যা কিছুই না, তা থেকে যা আসে তাও কিছুই না--এই দর্শন কি আদৌ সত্যি? নাকি এই পূঁচকে শূন্য বৃ্ত্তের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডের অসীম রহস্য? মামনিরা, সেই সময় আল-খোয়ারিজমি ও অন্যান্য মুসলিম গাণিতবিদগণ পবিত্র কুরআনের (Al-Qur'an) বিভিন্ন আয়াতে ব্যাপকভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। তার একটি হচ্ছে এরকম "কি, মানুষ কি ভুলিয়া গিয়েছে যে আমি ইতোমধ্যেই তাকে সৃ্ষ্টি করে রেখেছি, এবং সে ছিল কিছুই না?" আল-খোয়ারিজমি নিশ্চিত হন এই শূন্যতা মানুষের প্রতি স্রষ্টার অসীম মমতাই নির্দেশ করে। কেটে যায় আরো পনের বছর। তারপর একদিন গভীর রাতে, চারদিক শুনশান নীরবতা--আল-খোয়ারিজমির সামনে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে স্বর্গীয় জ্ঞানের দরজা।

তিনি উপলব্ধি করেন 'সিফর' শুধু অঙ্কহীন স্থানের প্রতীক নয়, বরং আলাদা একটি পরিপূর্ণ সংখ্যা যা অনন্তের দিকে ধাবমান ঋণাত্মক ও ধণাত্মক সংখ্যার মধ্যে বজায় রেখেছে ভারসাম্য। তিনি উপলব্ধি করেন সিফর সংখ্যা না হলে গণিত কখনো আল্লাহ-র গৌরবের দিকে অগ্রসর হতে পারবে না। ভয় নয়, সিফরকে গ্রহণ করতে হবে পরিশুদ্ধ বিশ্বাসে। তিনি অনুভব করেন যুক্তিয় গণিতশাস্ত্রের চুড়ান্ত উপলব্ধি আসলে স্বর্গীয় প্রকাশ--ঠিক যেরকম স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিতে প্রকাশিত হন, কিন্তু আবদ্ধ হননা। কিন্তু সিফরের নতুন এই যুগান্তকারী ধারণার প্রচলন সহজে ঘটে না।

আল-মামুনের প্রাসাদে তুমুল বাহাস হয়: এক দিকে খলিফা আর প্রাসাদ গ্রন্থাগারিক আহমাদ, অন্যদিকে খোয়ারিজমি। আরবীয় খেঁজুর বিচির সাহায্যে নানা হিসেব নিকেশ করে খোয়ারিজমি প্রমাণ করেন সিফর একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা। তিন দিন বাহাসের পর খলিফা হৃদয়ঙ্গম করেন সিফরের নতুন পরিচয়, তাঁর খেলাফতে এর নতুন গুণের কথা তিনি সত্যায়ন করেন। আর খোয়ারিজমি একে একে রচনা করেন অমর কিছু গ্রন্থ, যার একটি Kitab al-Jabr wal-Muqabala গড়ে দেয় বীজগণিতের ভিত, তাই তাঁকে বলি 'বীজগণিতের জনক'। গ্রন্থটির নামের al-Jabr অংশ থেকেই উৎপত্তি হয় ইংরেজী algebra শব্দটির।

আর যেরকম নিয়্মতান্ত্রিক পদ্বতিতে তিনি বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যা সমাধান করেন তার নাম হয় algorismi, যা Al-Khwarizmi নামটির পরিবর্তিত বানান। এই algorismi-ই বর্তমান কম্পিউটার বিজ্ঞানের এর ভিত algorithm. [কিতাব আল-জাবর ওয়াল মুকাবিলা'র একটি পৃষ্ঠা] মাগো, আরবের মাটিতে মধ্য-এশিয়ার এই বিনয়ী মানুষটির এই গাণিতিক অন্তরদৃষ্টির কারণে বীজগণিত, ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি এবং গণিত, প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের অধিকাংশ ধারার সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। সিফর সংখ্যা না হলে, এই সুদুরপ্রসারী আবিষ্কার না হলে আমরা আজকেও গণনার চেয়ে সামান্য একটু বেশী কাজ হয়তো করতে পারতাম মাত্র। কিন্তু চমৎকার এই সংখ্যালিপি বাথের আদেলার্দ (Adelard of Bath) ও হেলানো মন্দিরের লিউনার্দো ফিবোনাচ্চি (Leonardo Fibonacci) যখন ইউরোপে নিয়ে যান, ভয় ও ঘৃ্ণায় ৫০০ বছর মুখ ফিরিয়ে রাখে অনেকে--তারা একে বলত 'আরব সারাসীনদের যাদু' (Dangerous Saracen Magic) আর '০ একটা শয়তান', না হলে যে 'কিছুই না' সে কিভাবে 'কোন কিছু' হয়? কিন্তু সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে, তাই সে সময় ইউরোপী্য় গণিতবিদরা কোন কিছু আবিষ্কার করলে প্রেরণার উৎস হিসেবে লিখতেন dixit-algorismi এই রকমই বলেছেন আল-খোয়ারিজমি। কাহিনী শেষ করে কন্যাদের দিকে তাকাই আমি--তাদের চোখে এক অপার্থিব আলো।

আমি একজন 'অসংশোধণীয় রকমের আশাবাদী' মানুষ, তাই অনেকের মতে য্খন চারপাশের বাতিগুলি নিভে আসছে, তখন মেয়েদের চোখের আলো আমাকে আশ্বস্ত করে। [সংক্ষেপিত] তথ্যসূত্রঃ ১। Marvels of Math: Fascinating Reads and Awesome Activities, Kendall Haven ২। Click This Link ৩। Click This Link ৪।

Click This Link ৫। http://en.wikipedia.org/wiki/User:Robertolyra; ৬। http://www.geocities.com/rmlyra/arabic.html; ৭। Click This Link
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।