আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জন বানভিল : এ প্রিন্স অব ফিকশন

আত্মমাঝে বিশ্বকায়া, জাগাও তাকে ভালোবেসে

আইরিশ লেখক জন বানভিল । তিনি ১৯৪৫ সালে আয়ারল্যান্ডের ওয়েক্সফোর্ড-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় ওয়েক্সফোর্ডের খ্রিস্টান ব্রাদার্স স্কুলে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ভর্তি হন সেন্ট পিটার্স কলেজে। কাজের উদ্দেশ্যে ডাবলিন আসার পর বৃহৎ পরিসরে ভ্রমণের সুযোগ ঘটে তার।

১৯৮৮-৯৯ পর্যন্ত ‘আইরিশ টাইমস’র সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বানভিল। ১৯৭০ সালে তার প্রথম গল্প সংকলন ‘লঙ ল্যানকিন’ প্রকাশিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে ‘নাইটসপাওয়েন’ এবং ১৯৭৩ নালে ‘ব্রিচউড’ উপন্যাস দু’টি প্রকাশিত হয়। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত পঞ্চদশ শতাব্দীর পোলিশ অ্যাস্ট্রোনমার কোপার্নিকাসকে নিয়ে লেখা ফিকশনাল পোর্টেট ‘ড. কোপার্নিকাস’ ‘দ্য জেমস তায়িত ব্লাক মোমোরিয়াল’ পুরস্কার জয় করে। ‘ড. কোপার্নিকাস’ ছিল জন বানভিল’র প্রথম উপন্যাস যেখানে তিনি একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর জীবন এবং তার বৈজ্ঞানিক ধারণাসমূহের ওপর গুরুত্বারোপ করে তার চিত্ররূপ নির্মাণ করেছেন।

ফিকশনধর্মী ধারাবাহিক রচনায় ষোড়শ শতাব্দীর প্রখ্যাত জার্মান অ্যাস্ট্রোনোমার কেপলারকে নিয়ে ১৯৮১ সালে লেখেন দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কেপলার’। উপন্যাস ‘কেপলার’ ‘গার্ডিয়ান ফিকশন’ পুরস্কার জয় করে। ১৯৮২ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ স্যার আইজাক নিউটনকে নিয়ে নির্মাণ করেন উপন্যাস ‘দ্য নিউটন লেটার: এন ইন্টারল্যুড’। পরবর্তী সময়ে নিউটনকে নিয়ে লেখা ‘দ্য নিউটন লেটার: এন ইন্টারল্যুড’ নিয়ে চ্যানেল ফোর টেলিভিশন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। জার্মানির প্রখ্যাত জনশ্রুত চরিত্র, মহাজ্ঞানী ড. ফস্টাস’র কাহিনী নিয়ে ১৯৮৬ সালে তিনি পুনর্নিমাণ করেন উপন্যাস ‘মেফিস্টো’।

জন বানভিল ১৯৮৯ সালে রচনা করেন, ‘দ্য বুক অব এভিডেন্স’। উপন্যাসটি ‘গুইনেস প্যাট এভিয়েশন বুক অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার লাভ করে। ২০০৫ সালে বুকার পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার আগেও জন বানভিল ১৯৯৩ সালে তার ফিকশনধর্মী উপন্যাস ‘ঘোস্ট’ এবং ১৯৯৫ সালে ‘অ্যাথেনা’র জন্যে বুকার পুরস্কারের জন্যে মনোনীত সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন। একজন অভিনেতার শৈশব কাটনো গৃহ ত্যাগের কাহিনী অবলম্বনে লিখেছেন উপন্যাস ‘ইকিপস’ ইকিপস’র কাহিনীর ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় তার ‘শারোদ’ উপন্যাসে। ইউরোপীয় নগরের চিত্র ব্যক্তি অনুভূতির নির্যাসে রাঙিয়েছেন তার ‘প্রাগ পিকচার্স: পোর্টেট অব এ সিটি’ উপন্যাসে।

২০০৫ এ প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘দ্য সি’। ২০০৫ সালে ‘দ্য সি’ ‘বুকার’ পুরস্কার অর্জন করেছে। সমসাময়িকদের মধ্যে আইরিশ লেখক জন বানভিল তার নিজস্বতার জন্যেই অন্যদের থেকে আলাদা। তার উপন্যাসে দর্শনের ব্যাপক প্রভাব থাকায় তাকে দার্শনিক ঔপন্যাসিকও বলা হয়ে থাকে। প্রত্যক্ষের বহুমাত্রিকতা, কল্পনা আর বাস্তবতার সংঘাত এবং ব্যক্তির অস্থিত্বের বিচ্ছিন্নতা বানভিলের লেখার মূল নিয়ন্ত্রক।

উত্তরাধুনিকতা, জাদুবাস্তবতা এবং স্যামুয়েল বেকেট বানভিলের লেখায় প্রভাব বিস্তার করেছে। বেকেটের মতোই বানভিল আইরিশ ভূ-খণ্ড থেকে ইউরোপের চারিত্র বৈশিষ্ট ঐতিহাসিকের মতোই পর্যবেক্ষণ করেন। প্রচলিত বর্ণনার মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতা এবং বিচ্যুতির চিত্র নির্মাণ তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে এ বিষয়ে বিতর্কও রয়েছে। তার রচনায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কয়েকজন লেখকের প্রণোদনা রয়েছে।

বিশেষ করে প্রাউস্ট. দস্তয়ভস্কি এবং নাবোকোভ এর নাম এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বানভিলের প্রথম দিকের ফিকশনধর্মী রচনা ‘লঙ ল্যানকিন’ (১৯৭০) এবং ‘নাইটসপাওয়েন’ (১৯৭১) দু’টি ছোটগল্প সংকলনের মাধ্যমেই তার বাস্তবধর্মী ধারার বিপরীতে নিজের অবস্থান চিহ্নিত করে অধিবিদ্যার বিমূর্ত জগতে তার চলন নিশ্চিত করেন। কিন্তু তার সে সময়কার লেখাগুলোকে বাগাড়ম্বরপূর্ণ এবং অনুবর্তনের দোষে দুষ্ট বলে সমালোচিত হয়েছে। বানভিল সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত হয়ে ওঠেন তার পরবর্তী চারটি উপন্যাসের মাধ্যমে। ঐ চারটি উপন্যাসকে ‘সায়েন্টিফিক টেট্রালজি’ আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে।

উপন্যাস চারটি ‘বৈজ্ঞানিক’ বিষয়সূত্রতার কারণেই একটি অভেদ পরিমণ্ডলে আবর্তিত হয়েছে। গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত বিষয়াদির সমন্বয়ে বানভিল একটি বিকল্প ভাষার অনুসন্ধান করেন যার মাধ্যমে পাঠকের সামনে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির খোলা ময়দান উন্মোচিত হয়ে যায়। ‘ড. কোপের্নিকাস’ (১৯৭৬), ‘কেপলার’ (১৯৮১), এবং ‘দ্য নিউটন লেটার: এন ইন্টারল্যুড’ (১৯৮২), এ লেখক এবং উপন্যাসের চরিত্রগুলো পারস্পরিক কথোপকথন এবং দ্বন্দ্বে উপনীত হয়। শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় এক নতুন চেতনা কিংবা বক্তব্যে গিয়ে তার উপন্যাসের সামাপ্তি রেখাগুলো টানা হয়। নেপথ্যে থেকে যায় ব্যক্তি বানভিলের প্রচ্ছন্ন চিত্র।

আর তাই কেউ কেউ এগুলোকে বানভিলের আত্মজৈবনিক রচনা হিসেবেও বিবেচনা করে থাকেন। বানভিলে আরো একটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস ‘মেফিস্টো’ (১৯৮৬), যেখানে তিনি ‘ইন্টার টেক্সচ্যুয়াল রিপিটেশন’ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ এক উপন্যাসের মোটিভ এবং মূল সুর অন্য উপন্যাসে পরোক্ষভাবে উপস্থাপন করেছেন। ‘মেফিস্টো’ বানভিলের টেট্রালজির চতুর্থ উপন্যাস। ফাউস্ট’র ধারায় গাণিতিক বিস্ময়ের আবহে তিনি এ উপন্যাসটি নির্মাণ করেছেন।

‘দ্য বুক অব এভিডেন্স’ (১৯৮৯) এ ফ্রিডি মন্টগোম্যারি নামে একজন কয়েদির স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। একজন গৃহপরিচারিকাকে খুনের অভিযোগে তার বিচার চলছিল। গৃহপরিচারিকা মন্টগোম্যারিকে একটি চিত্রকর্ম চুরির পরিকল্পনায় বাধা দেয়। তা নিয়ে মন্টগোম্যারির অন্তর্গত ব্যাখ্যা এবং প্রশ্ন নিয়ে রচিত হয় ‘দ্য বুক অব এভিডেন্স’। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘ঘোস্ট’ উপন্যাসটি জেল থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েদিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

উপন্যাসটিতে ‘রবিনসন ক্রুসো’র পরোক্ষ প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করা যায়। বানভিলের ‘দ্য আনটাচেবল’ (১৯৯৭), ‘ইকিপস’ (২০০০), এবং ‘শারোদ’(২০০২) উপন্যাস তিনটিতে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র, স্বাধীনতা, দেশপ্রেম এবং বানভিলের ‘শিকড়’ অর্থাৎ আইরিশ প্রেম ধরা পড়ে। এক নজরে, জন বানভিল’র সাহিত্যকর্ম: লঙ ল্যানকিন (ছোটগল্প সংকলন) ১৯৭০, নাইটসপাওয়েন (উপন্যাস) ১৯৭১, ব্রিচউড (উপন্যাস) ১৯৭৩, ড. কোপার্নিকাস (উপন্যাস) ১৯৭৬, কেপলার (উপন্যাস) ১৯৮১, দ্য নিউটন লেটার: এন ইন্টারল্যুড (উপন্যাস) ১৯৮২, মেফিস্টো (উপন্যাস) ১৯৮৬, দ্য বুক অব এভিডেন্স (উপন্যাস) ১৯৮৯, ঘোস্ট (উপন্যাস) ১৯৯৩, অ্যাথেনা (উপন্যাস) ১৯৯৫, দ্য আর্ক (উপন্যাস) ১৯৯৬, দ্য আনটাচেবল (উপন্যাস) ১৯৯৭, ইকিপস (উপন্যাস) ২০০০, শারোদ (উপন্যাস) ২০০২, প্রাগ পিকচার্স: পোর্টেট অব এ সিটি (উপন্যাস) ২০০৩, দ্য সি (উপন্যাস) ২০০৫। পুরস্কার ও সম্মাননা: অ্যালিড ব্যাংক প্রাইজ (১৯৭৩) ‘ব্রিচউড’ (ছোটগল্প সংকলন), আর্ট কাউন্সিল ম্যাকিউলে ফেলোশিপ (১৯৭৩) ‘ব্রিচউড’ (ছোটগল্প সংকলন), আমেরিকান আয়ারল্যান্ড ফান্ড লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড (১৯৭৫) ‘ড. কোপার্নিকাস’ (উপন্যাস), জেমস তায়িত ব্লাক মোমোরিয়াল (১৯৭৬) ‘ড. কোপার্নিকাস’ (উপন্যাস), গার্ডিয়ান ফিকশন প্রাইজ (১৯৮১) ‘কেপলার’ (উপন্যাস), গুইনেস প্যাট এভিয়েশন বুক অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৯) ‘দ্য বুক অব এভিডেন্স’ (উপন্যাস), বুকার (২০০৫) ‘দ্য সি’ উপন্যাস।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।