আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আল্লাহ্‌ কে, তাঁর পরিচয় কি? তিনি দেখতে কেমন, তাঁর লিঙ্গ কি?

কল্যাণের কথা বলি, কল্যাণের পথে চলি।

মানুষের ক্ষমতার বাইরের কিছু নিয়ে বিতর্ক করা কিছু মানুষের স্বভাব। নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের দুর্বলতাকে স্বীকার করার পরিবর্তে এক অসীম সত্ত্বার অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়ে কখনো তাত্ত্বিক আবার কখনো কুটতর্ক বাধিয়ে নিজেকে জ্ঞানী বলে জাহির করার এক ধরণের প্রবণতায় ভোগেন কিছু মানুষ। নিজের অজ্ঞতাকে প্রকাশ করে যদি জানার জন্য প্রশ্নের প্রকাশ করা হয় তাহলে কোন সমস্যা থাকেনা। যারা জানে তারা তখন সে অজ্ঞতা দূর করে দিতে পারে।

কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় "আমি তোমাদের চ্যালেঞ্জ করছি, পারলে আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও" ধরণের তাহলে তিনি কোন উত্তরেই সন্তুষ্ট হবেননা। কারণ উত্তর জানা তার উদ্দেশ্য নয়। বরং বিশৃংখলা সৃষ্টি করে ময়দান ঘোলাটে করাই তার উদ্দেশ্য। এ ধরণেরই একটি কাজ করে যাচ্ছেন একজন ব্লগার। সম্প্রতি তিনি জানতে চেয়েছেন আল্লাহ্‌র লিঙ্গ প্রসঙ্গে।

তার প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য এই পোস্ট লিখা হয়নি। এই পোস্ট ঐ সমস্ত পাঠকদের জন্য যারা আসলেই ব্যাপারটা জানতে চান, কিন্তু সময়-সুযোগ করে জেনে নিতে পারেননি। লিখাটা হয়তো একটু দীর্ঘ হতে পারে। আমি আগ্রহী পাঠকদের একটু ধৈর্য ধরে পড়তে বলবো যাতে করে কনফিউশন দূর হয়ে যায়। আর এখানকার আলোচনাগুলো আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) ও তাঁর রসূল যেভাবে আল্লাহ্‌ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন সেভাবে বর্ণনা করা।

আল্লাহ্‌ কে, তার পরিচয় কি? আল্লাহ্‌ নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন কুর'আনের বিভিন্ন জায়গায়। এখানে আমি কয়েকটা উদ্ধৃত করছি। "[হে রসূল] আপনি বলুন, "আল্লাহ্‌ এক ও অদ্বীতিয়। আল্লাহ্‌ সব ধরণের অভাব মুক্ত। তিনি [সন্তান] জন্ম দেননা এবং [সন্তান হয়ে] জন্মও নেননি।

তাঁর সাথে তুলনা করার মতও কেউ নেই"। [কুরআন, ১১২/১-৪] "আল্লাহ্‌ হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ্‌ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও শাশ্বত-সুপ্রতিষ্ঠিত সত্ত্বা। তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করেনা। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর।

কে আছে এমন যে তাঁর দরবারে তাঁর অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করতে পারে? তাদের [তাঁর বান্দাহদের] সামনে এবং পেছনে যা আছে তা সবই তাঁর জানা। তাঁর জ্ঞাত বিষয়সমূহের মধ্য হতে কোন বিষয়ই তারা [তাঁর বান্দারা] আয়ত্ত্বাধীন করতে পারেনা, শধু তা ছাড়া যা তিনি নিজেই ইচ্ছে করে জানান। তার কুরসী [সাম্রাজ্য] সমগ্র আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীকে বেস্টন করে আছে। আর এসবের রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়েন না। বস্তুতঃ তিনি এক মহান-সুউচ্চ শ্রেষ্ঠতম সত্ত্বা।

" (বাকারা, ২/২৫৫) "বরকতময় হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যার হাতে রয়েছে সমস্ত রাজত্ব-কর্তৃত্ব। আর তিনি প্রতিটি বিষয়ের উপরই কর্তৃত্ববান। তিনিই মৃত্যু এবং জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তিনি তোমাদের মধ্যে কারা সৎকর্মশীল তা যাচাই করে দেখতে পারেন। তিনি সর্বজয়ী-শক্তিমান এবং অত্যন্ত ক্ষমাশীল। " [মুল্‌ক, ৬৭/১-২] "আল্লাহ্‌ আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর নূর"।

[আন-নূর, ২৪/৩৫] "তিনি-ই প্রথম, তিনি-ই শেষ। তিনি প্রকাশমান আবার তিনি গুপ্তও। আর তিনি প্রতিটি বিষয়ে অবহিত। " [আল-হাদীদ, ৫৭/৩] "পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহ্‌র। তুমি যেদিকেই মুখ ফিরাবে সেদিকেই রয়েছে আল্লাহ্‌র চেহরা।

নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ বিশালতার অধিকারী ও সর্বজ্ঞ। " [আল-বাকারা, ২/১১৫] "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ্‌র। আর আল্লাহ্‌ সব কিছুকে বেস্টন করে আছেন। " [আন-নিসা, ৪/১২৬] "তিনি-ই আল্লাহ্‌; তিনি ছাড়া আর কোন মা'বূদ নেই; গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছুই তিনি জানেন; তিনি রহমান ও রহীম। তিনি-ই আল্লাহ্‌ যিনি ছাড়া আর কোন মা'বূদ নেই; তিনি সব ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে থাকা সার্বভৌমত্বের অধিকারী [বাদশাহ্‌]; পুরোপুরি শান্তি-নিরাপত্তা; শান্তি-নিরাপত্তা দাতা; সংরক্ষক; সর্বজয়ী, নিজের নির্দেশ বিধান শক্তি প্রয়োগে কার্যকরকারী এবং স্বয়ং বড়ত্ব গ্রহনকারী।

লোকেরা তার সাথে আর যে সমস্ত সত্ত্বাকে অংশীদার করে তিনি তা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি আল্লাহ্‌ই যিনি সৃষ্টি পরিকল্পনাকারী ও এর বাস্তব রূপদানকারী এবং সে অনুযায়ী আকার-আকৃতি রচনাকারী। তাঁর জন্যই উত্তম নামসমূহ্‌। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সব কিছুই তাঁর প্রশংসা করে; আর তিনি মহা পরাক্রান্ত ও অতীব প্রজ্ঞাময়। " [আল-হাশর, ৫৯/২২-২৪] "তাঁর অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে এও রয়েছে যে, আকাশ এবং পৃথিবী তাঁরই হুকুমে সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

পরে যখনই তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে আহবান করবেন, তখন শুধুমাত্র একটি আহবানেই তোমরা বের হয়ে আসবে। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর বান্দাহ্‌। সবকিছুই তাঁর নির্দেশের অধীন। তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন আবার তিনিই এর পূনারাবৃত্তি করবেন। আর এটা করা তাঁর পক্ষে সহজতর।

আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে তাঁর জন্যই রয়েছে সর্বোত্তম গুনাবলী। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও সুবিজ্ঞ। " [আর-রূম, ৩০/২৫-২৭] মহান আল্লাহ্‌ তা'আলা তাঁর প্রজ্ঞাময় কিতাবে নিজের সম্পর্কে আরো বিবৃত করেছেন অনেকভাবে। আল্লাহ্‌ র বর্ণনা করা এ গুণগুলো তাঁর বিরাটত্ব ও মহানত্বেরই দিক নির্দেশনা দেয়। মানুষের ক্ষুদ্র জ্ঞান ও বুদ্ধিতে তাঁর বিরাট সত্ত্বা সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা তৈরী করা সম্ভব নয়।

তিনি মহাবিশ্ব এবং এর মাঝে যা আছে তাঁর স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রনকারী। আল্লাহ্‌ দেখতে কেমন, তাঁর লিঙ্গ কি? মহাবিশ্বের মহান স্রষ্টা তার সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সৃষ্টির সাথে তাঁর সাযুজ্য খুঁজতে যাওয়া এক ধরণের কুপমণ্ডুকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে পরিবেস্টন করে আছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোনটির মতন নন।

তাঁকে দুনিয়ার কোন চোখ দেখেনি এবং দেখার ক্ষমতাও রাখেনা। এজন্য মূসা (আলায়হি আস-সালাম) দেখতে চেয়েও পারেননি। মিরাজে গিয়ে মুহাম্মদ (সল্লা আল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁকে দেখতে পাননি। রসূলুল্লাহ্‌কে (সঃ) আবূ যর (রাদি'আল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি তাঁর রব্বকে দেখেছেন কিনা। রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) জবাবে বলেছেন, "আমি কিভাবে তাঁকে দেখতে পারি? আমিতো একটি নূর দেখেছি।

" (মুসলিম ও বুখারী)। মূলতঃ "কোন দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত্ব করতে পারেনা। তিনিই বরং সব দৃষ্টিগুলোকে আয়ত্ত্বাধীন রাখেন। বস্তুতঃ তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সব বিষয়ে ওয়াকিবহাল। " [আন'আম, ৬/১০৩] তিনি আমাদের সব ধারণা-কল্পনার উর্ধ্বে।

তাঁকে আমাদের পরিচিত কোন কিছু দিয়ে তুলনা করতে গিয়েই ভুল করে কিছু মানুষ। "অথচ তিনিই তাদের সৃষ্টিকর্তা। আর না জেনে না বুঝে তারা তাঁর জন্য পুত্র-কন্যা নির্দিষ্ট করে। তিনি তাঁর সম্পর্কে এরা যা বর্ণনা করে তা থেকে পবিত্র। " [আন'আম, ৬/১০০] "আল্লাহ্‌ কাউকে তাঁর সন্তান বানাননি আর দ্বীতিয় কোন খোদাও তাঁর সাথে শরীক নেই।

যদি তা-ই হতো তবে এরা প্রত্যেকেই নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং তারপর একে অন্যের উপর চড়াও হতো। মহান আল্লাহ পবিত্র এসব কথা থেকে যা এই লোকেরা তাঁর সম্পর্কে বলে। " (মু'মিনুন, ২৩/৯১)। "তোমার রব্ব, যিনি ইজ্জত-সম্মানের মালিক, পবিত্র সে সব বর্ণনা থেকে যা এরা তাঁর সম্পর্কে করে থাকে। " [আস-সাফফাত, ৩৭/১৮০] তিনি মানুষের পরিচিত কোন কিছুর মত নন।

তাঁর সত্ত্বা তাঁর সমস্ত সৃষ্টি থেকে আলাদা। আমরা তাঁর সত্ত্বা সম্পর্কে কোন ধারণা করতে পারিনা। লিঙ্গের ধারণা তাঁর সৃষ্টির জন্যই প্রযোজ্য, তাঁর জন্য নয়। আর তিনিই এই লিঙ্গভেদ সৃষ্টি করেছেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে নিজের অসীম প্রজ্ঞা বলে। এজন্য তিনি তাঁর রসূলকে (সঃ) বলতে নির্দেশ দিচ্ছেন একথা বলার জন্য যে, "তোমাদের মাঝে যে ব্যাপারে মতভেদের সৃষ্টি হয়, তার ফয়সালা করা আল্লাহ্‌রই কাজ।

সে আল্লাহ্‌ই আমার রব্ব, আমি তাঁর উপরই ভরসা করেছি এবং তাঁর দিকেই মনোনিবেশ করছি। [তিনি] আকাশমন্ডল ও জ়মীন সৃষ্টিকারী; তিনি তোমাদের নিজস্ব প্রজাতির মধ্য থেকে তোমাদের জন্য জুড়ি (স্ত্রী-পুরুষ) বানিয়েছেন এবং জন্তু-জানোয়ারের মাঝেও (তাদেরই নিজস্ব প্রজাতির) জুড়ি বানিয়ে দিয়েছেন; আর এভাবেই তিনি তোমাদের বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার ঘটান। বিশ্বলোকের কোন কিছুতেই তাঁর সাযুজ্য নেই; আর তিনি সব কিছু শুনেন এবং দেখেন। " [আস-শূরা, ৪২/১০-১১] এজন্য আল্লাহ্‌র জন্য আমাদের পরিচিত পরিমণ্ডলে সাযুজ্য খুঁজতে যাওয়া বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর লিঙ্গ তালাশ করাও এধরণের একটা বোকামী।

কিন্তু অনেকের প্রশ্ন "তাহলে আল্লাহ্‌ তাঁর জন্য পুরূষ-বাচক সর্বনাম ব্যবহার করলেন কেন?" পুরূষ-বাচক সর্বনাম ["He"ইংরেজীতে] ব্যবহার করলেই আল্লাহ্‌কে দুনিয়াবী পুরূষ লিঙ্গের সাথে তুলনা করে ভাবতে হবে এমন কোন কথা নেই। আরবী ভাষায় সব-কিছুর ক্ষেত্রেই স্ত্রী ও পুরূষ বাচক সর্বনাম ব্যবহার করা হয়, এমনকি নির্জীব বস্তুগুলোর ক্ষেত্রেও। আমাদের লিখার খাতাকে স্ত্রী-বাচক সর্বনামে লিখা হয় বলে খাতারতো কোন লিঙ্গ থাকেনা। ওটা আরবী ভাষার বিশেষ ধরণ। বাংলা ভাষায় সর্বনাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোন লিঙ্গই বুঝা যায়না, সেটা মানুষ হোক আর প্রানীই হোক অথবা ক্লীব বস্তু হোক।

তাই বলে কি কোন মানুষের সম্পর্কে ঐ সর্বনাম ব্যবহার করা হলে তাকে আমরা লিঙ্গহীন বুঝবো? ইংরেজী ভাষায় মানুষের ক্ষেত্রে লিঙ্গবাচক সর্বনাম ব্যবহার করা হয়, কিন্তু প্রানী বা বস্তুর ক্ষেত্রে তা করা হয়না। এজন্য এগুলো হলো ভাষার প্রয়োগরীতি। এসব দিয়ে অহেতুক প্রশ্ন সৃষ্টি করার কোন মানে হয়না। প্রকৃত ব্যপার হলো "বিশ্বলোকের কোন কিছুতেই তাঁর সাযুজ্য নেই" [আস-শুরাঃ ১১]। "তাঁর সাথে তুলনা করার মত বা তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই।

" [আল-ইখলাস, ১১২/৪]। রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেন, "সৃষ্টির শারীরিক সত্ত্বা ও গুনাবলী সম্পর্কে তোমাদের যে ধারণা, মহান আল্লাহ্‌ তার চাইতে অনেক-অনেক উর্ধ্বে। এগুলোর কোন কিছুই আল্লাহ্‌ সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা দেয়না। "

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.