আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অগ্নি-জলের কন্যাদ্বয়


এমিলি ডিকিনসন যখন মারা যান তখনও সিলভিয়া প্লাথের জন্ম হয়নি। এমিলির জন্ম ১৮৩০ সালে আর মৃত্যু ১৮৮৬-তে; অন্যদিকে সিলভিয়ার জন্ম ১৯৩২ সালে আর মৃত্যু ১৯৬৩ সালে। জন্ম-মৃত্যুর এই হিসাব থেকে দেখা যায় এমিলি বেঁচেছিলেন ৫৬ বছর আর সিলভিয়া বেঁচেছিলেন ৩১ বছর। সময়ের হিসেবে এমিলি যেমন সিলভিয়ার আগে জন্মে ছিলেন বেঁচেছিলেনও তার চেয়ে বেশি। শুধু সময়ের হিসেবে নয় তারা জন্মেছিলেনও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে।

তবু এই ফারাকটাই বড় নয়, বরং যেটুকু বড় করে দেখতে চাইছি তাতে ফারাকের চেয়ে মিলটাই বেশি। হ্যাঁ, যে নারীরা বিশ্ব সাহিত্যে কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদের মধ্যে এই দুই মার্কিন নারীর নাম আসে সর্বাগ্রেই। আর মর্মান্তিক হলেও সত্য তারা দুজনেই আÍহত্যা করেছিলেন নৃশংসভাবে। সিলভিয়া প্লাথ নিজের মাথাটি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন জলন্ত গ্যাসের চুল্লিতে। এমিলি ডিকসন নিজের চেয়ে বেশি ওজনের পাথর বেঁধে নদীতে ডুবে মরেছিলেন।

জীবনকে এক কবি সপে দিয়েছিলেন আগুনের শিখায় আরেক কবি সপে দিয়েছিলেন জলের অতলে। কেন এই আÍহনন, কোন কষ্ট কবিতার সংসার থেকে তাদেরকে মৃত্যুর অমিমাংসিত জগতে নিয়ে যায়, পাঠক হিসেবে সে প্রশ্ন অনুসন্ধানে ব্রতী হই। কবিতা ও জীবনযাপন দুক্ষেত্রেই এই দুই কবি আগ্রহ সৃষ্টি করে। পুরো মার্কিন সাম্রাজ্যে ওয়াল্ট হুইটম্যান আর এমিলি ডিকেনসনকে সবচেয়ে সেরা কবি মনে করা হয়। হুইটম্যানের মতো এমিলিও মার্কিন লেখক রাল্ফ এমার্সন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ছিলেন।

এছাড়া তার কবিতায় সতের শতকের ব্রিটিশ অধিবাস্তব [Metaphysical] কবিদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মৃত্যু, ভালবাসা, প্রকৃতি - এইসবই ছিলো তার কবিতার বিষয়াবলি। অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে গৃহস্থালি ভাষায় কাব্য রচনা করতেন তিনি। তার কবিতার সঙ্গে নিজের জীবনাচারের ঘনিষ্ট সহযোগ লক্ষ্য করা যায়। তার কবিতায় বর্ণিত ‘her own society`-এর মতোই এমিলি আপন গহন জগতেই নিহিত থাকতেন।

পরিবারের ঘনিষ্ট দুয়েকজন ছাড়া আর কারো সঙ্গে তাকে দেখাও যেতো না কখনো। ২৩ বছর বয়স থেকেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন জীবন যাপন করতেন তিনি। এমনকি কবিতা ছাপানোর ব্যাপারেও তারমধ্যে কখনো কোন আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়নি। তার সময়ের সাহিত্য সমাজের অধিকাংশ লেখক-কবিদের মতো তিনি খ্যাতির কাঙাল ছিলেন না, ক্ষেত্রবিশেষে আÍপ্রচারণাকে তিনি ঘৃণাও করতেন। ‘কিছু একটা’ হয়ে ওঠার চেয়ে ‘কিছু না-হওয়াই’ তার পছন্দের ছিলো।

তার কবিতায়ই তিনি বলেছেন - I’m nobody! Who are you? Are you nobody, too? Then there’s a pair of us – don’t tell! They’d banish us, you know. How dreary to be somebody!
How public, like a frog To tell your name the livelong day To an admiring bog!
I’m nobody! Who are you? Are you nobody, too?
লেখা বাহুল্য, কিছু হয়ে ওঠার প্রবণতা তার মধ্যে না-থাকলেও তার কবিতাই হয়ে উঠেছিলো সত্যিকার একটা কিছু। তার কবিতায় বর্ণিত ‘amazing sense/ from ordinary meaning.’- এর ঋদ্ধ প্রকাশ যে-কোন কবি থেকে তাকে সতন্ত্র করে তুলেছিলো। উল্লেখ্য, সাধারণ পরিবেশ থেকে তুলে আনা এইসব অসাধারণ কবিতা বোঝার মতো মানসিক প্রস্তুতি তখনকার ম্পাদকদের ছিলো না। তার সময়ে নারীদের কাছ থেকে সম্পাদক-পাঠকরা সাধারণত ‘মেয়েলি এবং পেলব’ কবিতা আশা করতেন। যেহেতু এমিলি ডিকেনসনের কবিতা সে চাহিদার ধার ধারেনি সেহেতু তখনকার সাহিত্য সমাজের সঙ্গে তার একটা অলিখিত দূরত্ব তৈরিই হয়ে যায়।

যার কারণেই সারা জীবনে প্রায় ১৭০০ কবিতা লিখলেও জীবিতকালে মাত্র ৭টি কবিতা ছাপা হয়েছে তার। মজার ব্যাপার, এই ৭টি কবিতাও ছাপা হয়েছে তার অনুমতি ছাড়াই। অনেকটা নিরবে এবং গোপনেই লেখালেখি চালিয়েছেন তিনি। ছাপতে না দিলেও নিজের হাতে সেলাই করা খাতায় বাধাই করে রাখতেন সব কবিতাগুলো। সেইসব খাতার সযতœ সেলাই-বাঁধাই ও সংরক্ষণের ধরণ থেকে ধারণা করা যায় কবিতা ছাপার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব না-দিলেও কবিতা লেখার গুরুত্ব তার কাছে কম ছিলো না।

এমিলির কবিতা বুঝতে হলে তার পারিবারিক পরিমণ্ডলটি খেয়াল করা প্রয়োজন। তার বাবা এডওয়ার্ড ডিকেনসন নীতিবান, সাধারণ মানুষ। ছেলেমেয়ের সঙ্গে তার একটা দূরত্ব ছিলো সদাই, এমিলির মা’ও সন্তানদের খুব কাছে ছিলেন না। তার দাদা স্যামুয়েল ফাউলার ডিকিসনস আমহার্সট কলেজের প্রতিষ্ঠা ছিলেন। এডওয়ার্ড এই কলেজেই কোষাধ্যক্ষের কাজ করেছেন।

বাবা-মা’র সঙ্গে একটা সূক্ষè দূরত্ব থাকলেও তাদের তিন ভাই-বোনের মধ্যে ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব ছিলো। এমিলির বড় বোন লাভানিয়াও বিয়ে করেননি। বড় ভাই অস্টিন অবশ্য বিয়ে করেছিলেন এমিলির এক বান্ধবীকে। অস্টিন তার স্ত্রীকে নিয়ে পাশের বাড়িতেই থাকতেন। ফলে তিন ভাই-বোন আমৃত্যু কাছাকাছি ছিলেন।

ছোটবেলায় Mount Holyoke Female Seminary -তে ভর্তি হওয়ার একবছর পর আবার হোম সিকনেসের কারণে ঘরে ফিরে আসেন। এ প্রতিষ্ঠান তাকে খ্রীস্টিয় আদর্শ নারী বানানোর চেষ্টা করে, লেখা বাহুল্য এমিলি আর ও পথে যাননি। পরবর্তীকালে তার কোন কোন কবিতায় ঈশ্বরভক্তি দেখা দিলেও তিনি আদতে সন্দেহবাদী ছিলেন। ১৮৭৪ সাল এমিলির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরই তার বাবা মারা যান।

এর আগের বছর তার আট বছরের ছোট্ট ভাগ্নে গিলবার্ট মারা গিয়েছিলো। উল্লেখ্য, ছোট্ট গিলবার্টকে লেখা তার বেশ কিছু চিঠি আমরা পাই। এ দুটি মৃত্যুর পর পরই যেন সার দিয়ে তার চোখের সামনে আরও মৃত্যু দেখা দেয়। ১৮৭৮-তে স্যামুয়েল বাউল, ১৮৮১-তে হলান্ড ও চার্লস ওয়ডসওর্থ, ১৮৮২-তে অটিস পি লর্ড ও তা মা এবং ১৮৮৫-তে হেলেন হান্ট জেকসন মারা যান। এর মধ্যে লর্ড ছিলেন তার বাবার বন্ধু যাকে প্রেম নিবেদন করে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন।

প্রখ্যাত কবি ও উপন্যাসিক জেকসন তার জীবিতকালে এমিলির কবিতা ছাপার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পাদ্রি চার্লস ওয়ডসওর্থে প্রতিও এমিলি প্রেমাসক্ত ছিলেন। দুজনের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে সে প্রেমও ব্যর্থ হয়। স্প্রিংফিল্ড রিপাবলিক পত্রিকার সম্পাদক স্যামুয়েল বাউলের প্রতিও এমিলির আসক্তি কথা জানা যায়, এমিলি একাধিক কবিতা বাউলের প্রতি উৎসর্গকৃত। বাউলের সঙ্গে হলান্ডও একই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

পর পর এতোসব মৃত্যু এমিলিকে আরো নিসঃঙ্গ করে তোলে। এমিলি নিজেকে আরও গুটিয়ে নেন। ঘর থেকে একেবারে বের হন না, পড়েন আর লেখেন। তার জীবনাচরণে দূবোর্ধ্য রহস্যময়তা বিরাজ করে। এ সময় ঘরে সব সময় বিয়ের সাদা পোশাক পরতেন এমিলি।

অবশ্য বিয়ে করা আর হয়ে ওঠেনি এমিলির। গৃহবাসের দিনগুলিতে তিনি রবার্ট ব্রাউনিং, এলিজাবেথ ব্রাউনিং, জন রাসকিন ও জন কিটসের কবিতা পড়তেন। ১৮৬২ সালে লেখক টমাস ওয়েন্টঅর্থ হিগিনসন-এর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। এ বছর ১৫ এপ্রিল সাহিত্যিক হিগিনসনকে নিজের চারটি কবিতাসহ চিঠি লিখলে তাদের মধ্যে হৃদ্ধতা হয়। এই বন্ধুত্ব এমিলি আমৃত্যু রক্ষা করেন।

১৮৭০ সালে এমিলির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হিগিনসন এমিলিকে ‘ছোট্ট বিষন্ন নারী’ বলে উল্লেখ করেন। সাদা পোশাক, লাল চুল আর হাতে ফুল নিয়ে এমিলি তার সঙ্গে দেখা করেন। তার কথা শুনে হিগিনসনের মনে হয় ‘নরম, ভীরু, শ্বাসরুদ্ধ শিশুর কন্ঠ। ’ হিগিনসন তার কবিতার মুগ্ধ পাঠক হলেও তিনিই এমিলিকে কবিতা না-ছাপার পরামর্শ দেন। বন্ধুর এই পরামর্শের পাশাপাশি তৎকালের সাহিত্যসেবীদের প্রচার-প্রচারণার তীব্র লোভ ও বাজারী মানসিকতার কারণও এমিলি ডিকিনসনকে কবিতা ছাপা থেকে বিরত রাখে।

ডিকিনসনের মৃত্যুর পর বোন লাভিনিয়াই প্রথম তার কবিতাগুলো ছাপতে শুরু করেন। লাভিনিয়া জানতেন তার বোন কবিতা লেখে কিন্তু সেই বোনের মৃত্যুর পর সেই কবিতার পরিমাণ-পরিধি দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে ছিলেন। ১৮৯১ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে তিনি সহসম্পাদক হিসেবে এমিলির তিনটি কবিতার ভলিঅম বের করেন। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে এমিলি ডিকিসনসের ভাগ্নি মার্থা ডিকিনসন বিয়ানচি আরো কিছু কবিতা পাঠকের সামনে আনেন। কিন্তু এমিলির কবিতা মূল সমস্যা ছিলো তার বিভিন্ন কবিতা একাধিক রূপ।

একই কবিতা তিনি নানা সময়ে নানাভাবে লিখতেন, কাটতেন, সংশোধন করতেন। তাই পূর্ববর্তী সংস্করণ দুটোতে অসম্পূর্ণতা রয়েই গেলো। পাঠকের কাছে পূর্ণাঙ্গ ও যথার্থভাবে এমিলি ডিকিনসনের কবিতাগুলো এলো টমাস এইচ জনসনের সম্পাদনার কল্যাণে। বর্তমানে এমিলি ডিকিনসনের কবিতার বিশ্বস্ত রূপ হিসেবে এই সংকলনটি অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। ক্রমাগত ডেসের ব্যবহার, ভাঙা ছন্দ, বিশেষ বিশেষ বিশেষ্য পদের আগে বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার [capitalization of nouns], অপ্রচলিত উপমা, তীব্র বিষাদ, মানবিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদি বৈশিষ্টের কারণে এমিলি ডিকিনসনকে আলাদাভাবেই চেনা যায়।

প্রচুর কবিতা পড়তেন তিনি; কবিদের সময়ের সবচেয়ে মধুর সন্তান মনে করতেন তিনি। তার ভাষায়,"the dearest ones of time, the strongest friends of soul." জুডিথ ফার নামের এক গবেষক দেখিয়েছেন যে এমিলির ১৪১টি কবিতায় আÍার কথা আছে। আÍিক কোন এক টানেই হয়তো তিনি স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন নিসঃঙ্গ প্রহর। "The Soul unto itself / Is an imperial friend - / Or the most agonizing Spy / An Enemy - could send - "
অনেকক্ষেত্রেই হয়তো এমিলির সঙ্গে সিলভিয়ার অমিল আছে। এমিলি আÍহত্যা করেছিলেন পরিণত বয়সে, বিয়ে করেননি সারা জীবনে, কবিতাও ছাপেননি কখনো।

অন্যদিকে সিলভিয়া অত্যন্ত তরুণ বয়সে আÍহত্যা করেছিলেন, ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন ব্রিটিশ কবি টেড হিউজকে , জীবিতকালেই কবি হিসেবে খ্যাতিও পেয়েছিলেন। মৃত্যুকালে এমিলি ছিলেন পাঠকের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, অন্যদিকে সিলভিয়া যথেষ্ট ছিলেন সমাদ্রিত। পাঠক প্রিয়তার সঙ্গে ওইটুক বয়সেই তিনি পুলিৎজারসহ একাধিক পুরস্কার [১৯৮১] পেয়েছিলেন; স্মিথ কলেজের একটি বৃত্তিও পেয়েছিলেন সিলভিয়া। এমিলি যেখানে কবিতা ছাপার ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন সেখানে সিলভিয়া খুব ছোট্টবেলা থেকেই কবিতা ছাপানোর ব্যাপারে প্রবল আগ্রহী। নিজের নারী এবং কবি সত্তার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন তিনি।

মাকে লেখা এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি হবো পৃথিবীর কতিপয় মহিলা কবিদের অন্তর্গত এমন একজন সম্পূর্ণত আনন্দিত নারী, কোন তিক্ত, হতাশ, বিকৃত পুরুষ-অনুকারক নয়, যে অনুকরণ অবশেষে মহিলা কবিদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি নারী এবং নারীজন্মে আনন্দিত। আমি গান গাইবো পৃথিবীর উর্বরতার, ক্ষয়-শোক-মৃত্যুর মধ্যে মানুষের উর্বরতার গান। আমি গায়িকা হবো। টেড আর আমার সুন্দর মিলিত জীবন হবে’ [উদ্ধৃতি : ভাবনার ভাস্কর্য, কেতকী কুশারী ডাইসন।

এই লেখায় ব্যবহৃত সিলভিয়ার সব চিঠি পত্র উল্লেখিত সূত্র থেকে গৃহীত]। এইসব অমিল সত্ত্বেও সবচেয়ে বড় মিল বলা যায় তাদের দুজনেরই জীবন বৈচিত্রে। দুজনের জন্ম-মৃত্যু এবং জীবনযাপন নিয়ে আজও গবেষণা চলে। এমিলির তুলনায় সিলভিয়া স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তার নিজের কাছেই নিজের জীবনটা খুব অদ্ভূত মনে হতো। ১৯৫২ সালে যখন স্মিথ কলেজে সদ্য ভর্তি হলেন তখন নিজের প্রতিই সিলভিয়ার প্রশ্ন ছিলো - "You walked in, laughing, tears welling confused, mingling in your throat. How can you be so many women to so many people, oh you strange girl?" মাত্র ৮ বছর বয়সে সিলভিয়ার কবিতা ছাপা হয়।

বিচ্ছন্নতা, আতœবিধ্বংসী মনোভাব আর আÍহনই সিলভিয়া প্লাথের কবিতার মূল বিষয়বস্তু। তীক্ষ অন্তঃদৃষ্টি, বিষাদ আর বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায় তার কবিতায়। তার ‘daddy’ কবিতায় মৃত বাবার প্রতি ভালবাসা ও ঘৃণাকে তুলে ধরা হয়েছে। তেমনি ‘Medusa` কবিতা কন্যার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কের টানা-পোড়েন নিয়ে রচিত, ‘The Jailer` কবিতায় দায়িত্বহীন-স্বার্থপর স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ক্রোধ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে বলে রাখা দরকার, ছোট্টবেলায় প্লাথের বাবা মারা যান, বেঁচে থাকার জন্যে তার মা-কে প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়।

তার ‘Mushrooms’ কবিতার সংবেদনশীলতা আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয় কী তীব্র অনুভূতিপ্রবণ ছিলেন তিনি। অযতেœ অবহেলায় ফুটে মাশরুমের কষ্ট আমাদের আপ্লুত করে - Nobody sees us, Stops us, betrays us; The small grains make room. ... Little or nothing. So many of us! So many of us!
আমাদের পায়ের নিচের ভূমি সমতল, দিগন্ত বিস্তৃত; আকাশও তাই। আকাশ ও মাটি আনুভূমিক[Horizontal] হলেও আমরা নিজেরা কিন্তু গাছেদের মতোই উলম্বিক [vertical]| । কিন্তু গাছ তার শেকড় প্রোথিক রাখে মাটিতে, সে অর্থে মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাটি থেকে দূরেই রয়ে যায়। তার ও অস ঠবৎঃরপধষ কবিতায় তাই দেখি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের শেষ পর্যন্ত মাটিতে শুয়ে পড়াতেই যথার্থতার আভাষ; অর্থাৎ আকাশ মাটির বিপরীতের উলম্বিক মানুষ যথার্থভাবেই একদিন [মৃত্যুর পর] আনুভূমিক হওয়ার সুযোগ পায় - But I would rather be horizontal. I am not a tree with my root in the soil .... It is more natural to me, lying down. Then the sky and I are in open conversation, And I shall be useful when I lie down finally: The the trees may touch me for once, and the flowers have time for me.
বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন শুরু থেকে সিলভিয়ার লেখায় বিষাদ আর তিক্ততার ছড়াছড়ি দেখা যায়।

যতোই তিনি আনন্দের গান গাইতে চান না কেন এক অজানা দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে ফিরেছে। পরবর্তী জীবনে স্বামীর সঙ্গে অমিলই কিংবা আÍহত্যার আগ মুহূর্তেই শুধু নয়, সারা জীবনই তার লেখা নঞর্থক বক্তব্যে ভরা ছিলো। সিলভিয়া বিয়ে করেছিলেন বিখ্যাত কবি টেড হিউজকে। ১৯৫৬ সালে তিনি ইংরেজ কবি টেড হিউজকে বিয়ে করেন। অসমবয়সী খ্যাতিমান কবিকে ভালবেসেই বিয়ে করেছিলেন সিলভিয়া।

তাদের উদ্দাম দূরন্ত প্রেম অনেকেরই ঈর্ষার বিষয় ছিলো। সিলভিয়ার মতোই দুটো ফুটফুটে মেয়ে হয়েছিলো তাদের। মাকে লেখা একাধিক চিঠিতে সিলভিয়ার সুখী দাম্পত্যের চিত্র ফুটে উঠেছিলো - ‘...অধিকাংশ দম্পতিদের থেকে আমরা সত্যিই ভিন্ন জাতের; কারণ আমরা প্রতি মুহূর্তেই পরস্পরের জীবনে আরও তীব্রভাবে অংশগ্রহণ করি। টেডের সঙ্গে এবং তার জন্য আমি যা কিছু করি, হোক না তা কেবল রান্না করা, সবই একটা দিব্য দীপ্তি পায়, এবং অভ্যাসে এটা বেড়েই যায়, কমে না। ’ [৮ অক্টোবর, ১৯৫৬], ‘আমরা এত সুখী!’ [১৯৬১ সালে লেখা চিঠি], ‘বাচ্চার জন্ম দেয়া সত্যিই আমার জীবনের সব থেকে সুখের অভিজ্ঞতা।

একের পর এক বাচ্চা হয়ে চলুক এমন সাধ হয়। ’ [১২ মার্চ, ১৯৬২]। অথচ এ চিঠি লেখার কয়েক মাস পরেই প্রেম-ভালবাসা-দাম্পত্য সুখ সম্পর্কে তার ধারণা পাল্টে যায় অনিবার্যভাবেই। ১৯৬২ সালেই অক্টোবরের ২১ তারিখের চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘সুখী বিয়ে-টিয়ের কথা শুনলে আমার এখন যে সাহায্য হবে তার চেয়ে ঢের বেশি সাহায্য হবে এ কথা শুনলে যে লোকেদের ডিভোর্স হয় এবং তারা নরকের মধ্য দিয়ে যায়। ’ ডিকিনসনের চেয়ে প্লাথের ব্যক্তিগত জীবনের বিষাদের খবর আমরা বেশি জানি।

সকল নারী সত্তাতেই প্লাথ ব্যর্থ হয়েছেন; তাকে আমরা ব্যথিত কন্যা, হতাশ স্ত্রী, হনন প্রবণ মাতা হিসেবেই চিনি। ১৯৬২ সালে তার মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে"Daddy" কবিতায় তিনি আÍহত্যার কথা লেখেন। তিনি লেখেন, বিশ বছর বয়সে আমি মরার চেষ্টা করেছি - "...But they pulled me out of the sack,/ And they stuck me together with glue." উল্লেখ্য প্লাথের জীবনে এ বছরটিই ছিলো সবচেয়ে সৃষ্টিমুখর। প্লাথের মৃত্যুর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয় তার স্বামী বিখ্যাত বিট্রিশ কবি টেড হিউজকে। ১৯৬২ সালে প্লাথ আবিষ্কার করেন হিউজ অন্য এক নারীর প্রেমে পড়েছেন।

অতএব অনিবার্যভাবেই এ বছরের সেপ্টেম্বরে তাদের প্রেমের বিয়ে ভেঙে যায়। ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে তাদের দুটো সন্তান হয়েছিলো। প্লাথের মৃত্যুর সময় তাদের কন্যা ফ্রেইডার বয়স ছিলো ২ বছর আর পুত্র নিকোলাসের বয়স ছিলো ৮ মাস। বিচ্ছেদের পর প্লাথ তার পুত্র-কন্যা নিয়ে তাদের শহরতলির বাড়িতেই রয়ে যান আর হিউজ চলে যান লণ্ডনে। এ সময়টকু প্লাথ প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন যথার্থ মা হওয়ার।

কিন্তু তখন প্রায়ই তিনি অসুস্থ থাকেন, প্রতিদিনই জ্বর আসতো তার। প্রায়শই স্বাভাবিকভাবেই প্লাথের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য টেড হিউজকেই সবাই দায়ী করে থাকতেন। তবুও এরই মাঝে প্রতিদিন ভোরে ছেলে-মেয়েদের জেগে উঠার আগই তিনি লিখতে বসতেন। অসুস্থতা আর তীব্র ব্যস্ততা সত্ত্বেও মাত্র সাত সপ্তাহে "Ariel"--এর বৃহৎ কবিতাগুলো শেষ করেন তিনি। প্লাথ যখন মারা যায় তখনও আইনগতভাবে তিনি হিউজের স্ত্রীই ছিলেন।

প্লাথের সব লেখার স্বত্ব তারই হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৬৯ সালে হিউজের দ্বিতীয় প্রেমিকা এবং স্ত্রী এসিয়া উইভিল-ও প্লাথের আÍহত্যার অনুকরণ করেছিলেন। এমনকি এসিয়ার কন্যা সুরাও একই পথ দেখিয়েছিলেন। এ সব প্রসঙ্গে হিউজ সচারচর কোন সাক্ষাৎকারে কখনো কিছু বলতেন না। তবে প্লাথের জীবন লেখক এনি স্টিভেনসনকে ১৯৮৯ সালে হিউজ লেখেন - "... I saw quite clearly from the first day that I am the only person in this business who cannot be believed by all who need to find me guilty." হিউজের অবিমিশ্র নিরবতা এ সন্দেহকে জোরদার করে।

কেউ কেউ অবশ্য প্লাথের আÍহত্যার জন্য তার মানসিক অস্থিরতার কথাও উল্লেখ করেন। ১৯৮২ সালে প্লাথের জার্নালের ভূমিকায় টেড হিউজ বলেন, "I never saw her show her real self to anybody -- except, perhaps, in the last three months of her life." " আসলে জীবনেরপ্রতিটি মুহূর্তেই তীব্র উচ্চাকাঙ্খা তাকে তাড়া করে ফেরেছে। স্কুলে পড়ালেখায় সবার আগে যেতে চেয়েছেন তিনি, বান্ধবীদের মধ্যে নিজেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয়-মোহনীয় করে তুলতে চেয়েছেন, স্ত্রী হিসেবে আকর্ষণীয় স্বামী পেতে চেয়েছেন এবং সর্বাগ্রে লেখক হিসাবে আকাঙ্খা করেছিলেন তীব্র জনপ্রিয়তার। পাওয়ার চেয়ে চাওয়ার মাত্রাটা তার পাল্লা দিয়ে বেড়েছিলো। এমিলি ডিকিনসন কবিতা ছাড়া কিছু লেখেননি; অন্যদিকে সিলভিয়া প্লাথ পদ্যের সীমানা ছেড়ে গদ্যের ভূমিতেও পা রেখেছিলেন।

১৯৬৩ সালে প্লাথের মৃত্যুর বছরই প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস দ্য বেল জার। এ উপন্যাস প্লাথের ব্যক্তি জীবনের উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। মানসিক বিধ্বস্ততা, আÍহননের প্রয়াস, এমনকি এক কলেজগামী তরুণীর সব কিছু কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাই এ উপন্যাসের পটভূমি। উপন্যাস ছাড়াও গল্প ও প্রবন্ধও লিখেছেন প্লাথ। তার মৃত্যুর ১৪ বছর পর প্রকাশিত হয় জনি প্যানিক এণ্ড দ্য বাইবেল ড্রিম তার গদ্য ও গল্পের সংকলন।

ধারণা করা যায় কিছুদিন বাঁচলে তিনি হয়তো সমান তালে গদ্য-পদ্যের ভূবনে বিচরণ করতেন।
এমিলি ডিকিসনস জন্ম : ১০ ডিসেম্বর, ১৮৩০, ম্যাসাচুটস মৃত্যু : ১৫ মে, ১৮৮৬ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী :
সিলভিয়া প্লাথ জন্ম : অক্টোবর ২৭, ১৯৩২, বোস্টন মৃত্যু : ফেব্র“য়ারি ১১, ১৯৬৩, লণ্ডন উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী : দ্য কলোসাস [১৯৬০], এরিয়াল [১৯৬৫], ক্রসিং দ্য ওয়াটার [১৯৭১], নির্বাচিত কবিতা [১৯৮১]

সোর্স: http://www.sachalayatan.com/

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।