আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শীত ও অন্যান্য দানব

'... আমাদের আশার কোনো পরকাল নাই'

লেখাটি বুধবার রাতে তৈরি করা। পরিস্থিতির বদল হলেও লেখাটির উপযোগিতা এখনো আছে বলে মনে হয়। শীতের প্রকোপ ভীষণ। আমাদের দেশে সচরাচর এই সময় হিম ঠাণ্ডা মানুষকে ঝিম ধরিয়ে দিলেও রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে রাজপথ থাকে উত্তপ্ত। রাজনৈতিক নেতারা এ সময় তার পুরো বছরের ক্যারিয়ার নির্ধারণে ব্যসত্দ হয়ে পড়েন।

সরকারি দলে যারা থাকেন তারা আন্দোলন ঠেকিয়ে আর বিরোধী দলের নেতারা আন্দোলন চাঙা করে সেই কাজটি করেন। এবারের অবস্থাও একই। তবে প্রোপটটা একটু ভিন্ন। যে অভিনব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আমাদের দেশের 'মহান' রাজনৈতিক নেতারা আবিষ্কার করেছিলেন এবং বাইরের সার্টিফিকেট নিয়ে মহা বিগলিত হয়ে এটাকেই পরিত্রাণের উপায় ভেবে বসেছিলেন, সেই প্রক্রিয়ার 'নির্দলীয় নিরপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার' এখন রাষ্ট্রমতায়। দেশের রাজনীতি সুস্পষ্ট দু'ভাগে বিভক্ত- চারদলীয় জোট ও মহাঐক্যজোট।

আমাদের দেশে উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে সুপার পারফরমড দুই নেত্রী 'দেশ উদ্ধার করনেওয়ালা' খালেদা জিয়া ও 'জন উদ্ধার করনেওয়ালা' শেখ হাসিনা বরাবরের মতো এবারো দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন; দু'জন দুই জোটের প্রধান হিসেবে আছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই হলো অবস্থানগত পরিস্থিতি। বাকি তথ্যগুলোও অবশ্য আমাদের, মানে এই মিডিওয়ালাদের কল্যাণে জনগণ ইতিমধ্যে জেনেই গেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতি হলো আস্থার বহিঃপ্রকাশ। মানে বিষয়টা হলো এরকম, এই শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে সমসত্দ কর্মকাণ্ডের মূল শক্তিই হলো আস্থা।

একটি দল বা একজন নেতা এই শাসনব্যবস্থায় দিনে দিনে জনগণের আস্থা অর্জন করে তবেই রাষ্ট্রমতায় আসেন, তাদের ভোটে। একটি বিষয় মনে রাখা খুবই জরুরি, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে প সরকার গঠন করে, তাদের কিন্তু রাষ্ট্রের সমসত্দ ভোটার ভোট দেন না। বিজয়ী দল বা জোটটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে মাত্র। কাজেই এখানে যে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে পুরো রাষ্ট্র্ইে তার বিরুদ্ধ মত ও পথের অনুসারী নাগরিকের অভাব থাকার কথা নয়; আমাদের দেশেও নেই। সরকারি দল ও বিরোধী দল- উভয় পই হাজারো মতদ্বৈততা স্বত্বেও রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশ নেবেন এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবেন_ এটাই গণতান্ত্রিক রীতি।

কিন্তু আমাদের দেশে এমনটা ল্য করা যায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তত্ত্ব আর যাই হোক না কেনো, অনত্দতঃ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অসারতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। এই তত্ত্ব বলে, 5 বছর রাষ্ট্র চালাবেন আপনি। এই 5 বছরে আপনি যেভাবেই চলুন না কেনো, নির্বাচনের আগে এসে আপনার সেই রাষ্ট্রমতা কিছু সময়ের জন্য 'দেবদূত'দের হাতে তুলে দিতে হবে। এরপর নির্বাচিত হলে ফের 5 বছর।

অর্থ্যাৎ আপনি যেভাবে খুশি দেশ চালান না কেনো, জনগণের কোনো আস্থা যে আপনার ওপর নেই, তা প্রতীয়মান হয় নির্বাচনের 90 দিনে। কাজেই এই সময় দেবদূতদের প্রয়োজন আর বাকি সময়টা রাষ্ট্র থাকবে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের হাতে জিম্মি। কিন্তু এই খেলা কি অননত্দকাল ধরে চলতে পারে? এইবার দেখুন, পরিস্থিতি। এতোদিন ধরে সৃষ্ট আস্থার সংকট কেমন অজগর সাপ হয়ে উঠেছে। আস্থার সংকট কাটাতে তত্ত্বাবধায়ক তত্ত্ব আমদানির কথা বলা হলেও 1991 সালের পর থেকে সবগুলো নির্বাচনের পরেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব (যে যখন পরাজিত) কখনো গর্জন করে আবার কখনোবা মিঁউ মিঁউ করে বলার চেষ্টা করেছেন, সূক্ষ্ম কারচূপি হয়েছে।

এইবার এসে সেই পরিস্থিতি আরো বদলে গেছে। যে আস্থা জনগণের খুঁজে পাবার কথা, সেই আস্থা জনগণ নয়, কেবল চারদলীয় জোট খুঁজে পেয়েছে ইয়াজউদ্দিনের ওপর_ এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগসহ বাকি দলগুলোর। আওয়ামী লীগ ও বাকি দলগুলোর এই অভিযোগের পেছনেও অবশ্যই রয়েছে মতার আকাঙ্া। কিন্তু তাদের অভিযোগ অমূলক নয়- অধ্যাপনা পেশা থেকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে আসা ইয়াজউদ্দিন তার সামপ্রতিকতম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এটা প্রমাণও করে দিয়েছেন। আমাকে সেদিন কে যেনো বলছিলেন, একজন অধ্যাপক মানুষ এমন কাজ করতে পারেন? আমি বলেছিলাম, পারেন।

অবশ্যই পারেন। গণতান্ত্রিক শাসনকালের অর্জন আর কিছুই না হোক, অনত্দতঃ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যার যার মেয়াদে এমনভাবেই রাজনীতিকীকরণ করেছে যে সেখান থেকে এমন দুই-চারজন বশংবদ অধ্যাপক দু'দলই খুঁজে পাবে। বি চৌধুরীকে আস্থার সংকটের কারণে যে বিএনপি সরিয়ে দেয়ার পরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন একজনকে তুলে আনবে_ এটাই ছিলো সবচেয়ে সহজ কাজ। এই সহজ কাজটি আওয়ামী লীগও করতে পারতো। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের বশংবদ অধ্যাপকদেরও আমরা দেখেছি।

হালে আমরা 544 কর্মচারির নিয়োগ দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আসীন এক অধ্যাপককে বলতে শুনেছি, 'ম্যাডাম যদি চান তাহলে তার বাসার সামনে সারাদিন টুল নিয়ে বসে থাকতেও আমার কোনো আপত্তি নেই!' কাজেই ইয়াজউদ্দিনদেরকেই কাজে লাগানো সহজ। আচ্ছা, বলুন তো, এই পরিস্থিতিতে দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে? কেউ কি বলতে পারবেন? পারবেন হয়তো। তবে দেশের রাজনীতির গতি দেখে ধারণার অভ্যাস যাদের ছিলো তাদের এখন হতাশই হতে হচ্ছে। সমসত্দরকম হাইপোথিসিস অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করছি, আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে- তা আমরা তো বটেই খালেদা-মান্নান-নিজামী কিংবা হাসিনা-জলিল-মেনন-ইনু-বি চৌধুরীরাও জানেন না।

এবং আমার ঘোরতর সন্দেহ, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দূরবর্তী ল্যও বারবার পরিবর্তন করছে। কিন্তু সমসত্দ বিষয়ের দিকে একটু নজর বুলান তো। আপনার কি মনে হয় না, পুরো বিষয়টিই চলেছে চমৎকার ছকের মধ্য দিয়ে? সেই তত্ত্বাবধায়কের তত্ত্ব থেকে শুরু করুন। আচ্ছা, কী কারণে জামায়াতে ইসলামী সেই সময় এই ব্যবস্থার প্রথম প্রসত্দাবকারী হিসেবে গোলাম আযমকে উল্লেখ করে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলো? সে কি কারো চোখে পড়ার জন্য? কিংবা চারদলীয় জোট মতা ছাড়ার পর থেকে জটিলতাগুলো কীভাবে নাটকীয় মোড় নিয়ে একের পর এক তার গনত্দব্যের দিকে চলেছে, দেখেছেন? অথচ সেই গনত্দব্য সবারই অজানা। তাহলে জানেন কে? অবশ্যই নাটকের পরিচালক যিনি তিনি।

মজার ব্যাপার হলো নাটকের এই পরিচালকদের পরিচয় কখনো ফাঁস হতে দেবে না আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোই। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনেই পরিচয়গুলো বেরিয়ে আসা দরকার। না হয় আমরা তাদের কাছে কিছু তেল, কয়লা পাঠিয়েই দেবো! আমাদের দেশে দুই রাজনৈতিক ধারারই কট্টর সমর্থকের অভাব নেই। ঈদের দিন আমাদের কোরবানির জন্য আসা এক কসাই চটুল রাজনৈতিক আলোচনার এক ফাঁকে বলে বসলেন, আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক থাকলেই নাকি তার কাছে কথার জোরে টেকা যায় না। ঈদের পর এসে অফিসে বসেছি।

আমাদের পরিচিত এক রিকশাচালক কাজে এসে কথায় কথায় জানালেন, বিএনপির সমর্থকরা নাকি একেকটা অন্ধ। আমার বেশ ভালোই লাগে। আমি বুঝে যাই, দুই দলের যেমন পরস্পরের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই, তেমনি তাদের সমর্থকদের মধ্যেও একই পরিস্থিতি। আমরা নিজেরা এই বিষয়টা কবে যে উপলব্ধি করতে পারবো, কে জানে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি জন্মের পর থেকে কেবল হারিয়েই আসছে।

নেতাদের হারিয়েছে, সম্মান হারিয়েছে, নীতি হারিয়েছে। মৌলবাদের কাছে নিজেকে বন্ধক রেখেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের আস্থাও হারিয়েছে। শেষ অর্জন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাও হারানোর মুখেই চলে গেছে। হয়তো আমরা এভাবেই সবকিছু চালালে বসে বসে তাও দেখতে হবে।

শীতে ফিরে আসি। তীব্র শীতে মানুষ মারা যাচ্ছে। ওদিকে রাজপথে গরম রাজনীতি চলছে। কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ হচ্ছে। এই রাজনীতি তো যে মানুষগুলো শীতে মারা যাচ্ছে তাদের জন্য নয়।

এই রাজনীতির মাঠে যারা রয়েছেন, তাদের জন্যই শুধু এটা। তারা মতায় যাবেন, শীতে মরা মানুষের ভোট পেয়ে। এরপর কম্বল কিছু দলের লোকজন পাবে, আর কিছু হরিলুট হবে। নির্বাচিতরা কিন্তু মালয়েশিয়া অথবা অন্য জায়গায় ঠিকই নিজেদের ব্যবসা ফাঁদবেন। এরপর দানব শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরো কিছু দানব বেড়ে উঠবে।

মানুষ কি তা চেয়ে চেয়ে দেখবে? আর কতোদিন দেখবে? #

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।