আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

টু ট্রিট এ হাঙরি বার্ড

-সকাল থেকে তোমার রকম সকম দেখে তো ভাল ঠেকছে না, বল না কী হয়েছে? কনুই দিয়ে ছোটকু মানে ছোটকাকাকে গুঁতো মারল টুসকি। ছোটকু তবু মিটিমিটি হেসেই যাচ্ছে। গুনগুন করে কোন এক গানের কলি ভাজছে। বেশির ভাগ গানেরই গীতিকার সুরকার তিনি নিজে, কাজেই এক গান দুবার শোনা যায় নি কখনো তার মুখে!
-ও ছোটকু বল না গো কি হয়েছে? অমন করে হাসছ কেন? ঐ দেখ না পটলদাটা কেমন কাঁদছে নুকিয়ে নুকিয়ে!’ বুচি এসে ছোটকুর পিঠে হেলান দিয়ে বসল। সারা বছর নাক দিয়ে মধু ঝরছে তার, ফোঁৎ করে সেটাকে নাকের ভেতরে টেনে নিল বুচি।

ঠিকমত ল বলতে শিখেনি এখনো, লাঠি কে বলছে নাঠি, লালকে বলছে নান।
-এ আর নতুন কি রে? রোদ উঠলেও কাঁদছে, মেঘ করলেও কাঁদছে। পুরুষলোকের চোখে এত জল আসে কোত্থেকে! ছিঁচকাঁদুনে একটা। হাত দিয়ে মাছি তাড়াবার মত করে বলে উঠল ছোটকু।
-ওর বুঝি মন খারাপ হয় না! খেদি বলল।


-হ্যাঁ ছোটকু, জম্মদিনের কেক কেউ নুকিয়ে খেয়ে ফেললে বুঝি কাঁদতে নেই? হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকের সর্দিটুকু মুছে ফেলল বুচি।
-কত কষ্ট করে ওটাকে লুকিয়ে রেখেছিলাম আমি, সারপ্রাইজ দেব বলে। এখন আমারই তো কান্না পাচ্ছে। বলি ও বুচি, তুই পটলকে ওকথা বলে দিলি কেন? তোর পেটে কোনো কথা থাকে না কেন রে? এখন আরেকটা এনে দিলেও তো হাঁদারামটার কান্না থামবে না। ’
বাড়ির গিন্নির মত মুখ ঝামটে উঠল টুসকি! ওর গিন্নিমা নামটা একেবারে ঠিক দিয়েছে ফটকে।

ফটকেটা দিনরাত খাই খাই করলেও মাঝেমধ্যে দুএকটা উচিৎ কথা কইতে জানে, এজন্য আমি তাকে মনে মনে একটু পছন্দ করি বৈকি কিন্তু কাউকে বলতে পারি না! ওকে তো কেউ পছন্দ করে না, সকলে পেটুক বলে ক্ষ্যাপায়। তা একটু আধটু খেতে মন চাইতেই পারে, এ আর এমন দোষের কি! বেচারা খেতে পায় নি এতদিন ঠিকমত, ওর বাবা মানে আমাদের কি যেন এক তুতো কাকা খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, ফটকে আর তার মা তখন থেকে আমাদের সাথে থাকছে। তবে ফটকেটা একটু বেশিই পেটুক, পরের ভাগেরটাও মেরে দেয় সুযোগ পেলে! শুধু কি তাই? আরো অনেক দস্যিপনা করে সে। এইতো তরশুদিন করেছে আরেক কাণ্ড! ছোটকুর প্যান্টের পকেট হাতিয়ে কি যেন এক চিরকুট খুঁজে পেল আর পেয়েই চোঁ চোঁ করে দৌড়ে গিয়ে সেটা সোজা মার হাতে দিয়ে এলো! তারপর ছোটকু কি বকুনিটাই না খেল বড়দের কাছ থেকে! আমার ওই রহস্যময় চিরকুটটা খুব দেখতে মন চাইলেও সাহস করে বলতে পারিনি মাকে, মনে হচ্ছিল বোধ হয় তাহলে আমিও কানমলা খাব। সেদিন থেকে কেমন যেন শীতল চোখে ফটকের দিকে চেয়ে থাকে ছোটকু!
দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে টেঁপি বলল- আচ্ছা ছোটকু, বলতে পার কে এমন করল? কি পেটুক দেখেছ? আস্ত একটা কেক গায়েব করে দিল! আমি বললাম- তা নাহয় খেয়েই ফেলল কেকটা কিন্তু শঙ্কুসমগ্রটা নিয়ে গেল কেন? কি পাজি!
-ওটা নির্ঘাত গাবলুর কাজ! ছোটকু চোখ সরু করে গাবলুর দিকে তাকাল।


গাবলু খুব মনোযোগ দিয়ে লাটিমটাকে বাগে আনতে চাইছিল। শুনতে পেয়েই কই মাছের মত তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলো। -কী বলছ ছোটকু? আমার ও বই মুখস্ত জান তো? আমি কেন ওটা নেব?
-তুই তো বইয়ের সবকটা অংকও মুখস্ত করে ফেলেছিস’ বলে ফিকফিক করে হেসে উঠতেই খেদির পিঠে দুম করে একটা কিল পড়ল। -দ্যাখ খেদি, মুখে যা আসছে তাই বলবি নাকি! নিজে তো পাস গোল্লা। আমি মোটেও মুখস্ত করি না।

কত অংক পারি দেখতে চাস, বল না ছোটকুকে, দাদার বই থেকে যেকোনো একটা কষতে দিতে, আমি এক্ষুনি করে দেখাচ্ছি!
দেখতো, কিসের মধ্যে কি, পান্তা ভাতে ঘি! হচ্ছিল কিনা কেক আর বই চুরির কথা তার মধ্যে আবার অংক এল কোত্থেকে! গাবলুটা অংক নিয়ে খুব বেশি বড়াই করা শুরু করেছে। আমি বললাম- জানিস, ঘুলঘুলি দিয়ে আমি কিন্তু দেখেছি শঙ্কুর মলাটটা তেঁতুল গাছটার ডালের সাথে আটকে আছে। ওটা ওখানে গেল কেমন করে?
-এ মা ছি ছি, ওটাতো দাস্তিনের সাথে, ওটাকে কে আনবে এখন? বুচি নাক সিটকালো। ডাস্টবিনকে বলছে দাস্তিন!
পটলটা কাঁধ ঝুলিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিল এতক্ষণ। কিন্তু বুচির কথা শুনে এবার ক্ষেপে গেল একেবারে।

বলল -ওই মলাট দিয়ে আমি করবটা কি শুনি? তোর মাথায় না গোবর ছাড়া কিচ্ছুটি নেই, বুচি! বুচি গাল ফুলালো।
খেদি বলল- দেখলি তো কেমন চালাক, মলাটটা ফেলে দিয়েছে যাতে আমরা বুঝতে না পারি!
এদিকে ছোটকু এখনো হাসছে দেখে এবার টুসকি সইতে না পেরে বলে উঠল -ধুত্তুরি ছাই, এত হাসির হলটা কি, এবার বলে ফেলো তো!
ছোটকু হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ধরেছে এইতো কদিন আগে, বয়সে বছর পাঁচেক বড় তবু তিনি বরাবরই আমাদের মুশকিল আসান, বিদ্যে বোঝাই জ্ঞানের জাহাজ। টুসকির বকুনি খেয়ে এবারে আমাদের জ্ঞানের জাহাজ ছোটকু চোখ নাচিয়ে বলে উঠল -এত যে কেকের জন্য হাপিত্যেস করে মরছিস তোরা, ওটা খেয়ে চোরের এখন কি অবস্থা তা জানিস?
আমরা সকলে নড়েচড়ে বসলাম, যাক এতক্ষণে বোধ হয় থলের বেড়ালটা বের হচ্ছে। সমস্বরে বলে উঠলাম -কেন গো, কী হয়েছে চোরের? -আচ্ছা ফটকেটা কই গেল রে? ওটাকে দেখছি না কেন? ছোটকু জিজ্ঞেস করল। -ওকে কেন খুঁজছ? ওকে তো সকাল থেকেই দেখছি না, পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে হয়তো এখনো।

টেঁপি বলল। -ও ছোটকু বল না গো, চোরের কি হল? খেদি আর বুচি ছোটকুকে দুপাশ থেকে ঠেলছে! আমি বললাম-আচ্ছা তুমি কাল কেক লুকোনোর সময়ও ফটকেটাকে খুঁজছিলে, এখনো খুঁজছ। কেন বল তো? আমার কথার জবাব না দিয়ে ছোটকু গলা নামিয়ে বলল -তোরা জানিস না তো, কেকের মধ্যে কি ছিল! জোলাপ ছিল রে, জোলাপ! আমিই ঢেলে দিয়েছিলাম! সবার চক্ষু চড়ক গাছ। -কি!! কেন, আমার কেকে তুমি কেন জোলাপ ঢাললে? অমন রসিকতার মানেটা কি? পটল হা হা করে উঠল। -ঢেলেছি বেশ করেছি… -চোরে না খেয়ে যদি আমি খেতাম? ওটা খেলে আমার কি হত… পটলটার চোখ ছলছল করে উঠল।

-নে,আবার কাঁদতে বসবি নাকি রে?! তুই খাস নি তো! -ও ছোটকু জোলাপটা আবার কি জিনিস? বুচির এসব প্রশ্ন তেমন পাত্তা দেই না আমরা কখনো।
আমি বললাম- আহা বলই না কেন করলে অমন? জোলাপ ঢালতে গেলে কেন কেকের মধ্যে? -আমি তো জানতামই যে এবার চোরের নজর ওই কেকটার ওপর। পেটুক চোরের একটা শিক্ষা হওয়া খুব দরকার ছিল। কিন্তু বইটাও যে হাতিয়ে নেবে সেটা ভাবি নি রে। টেঁপি বলে উঠল -সত্যিই খুব বাড় বেড়েছে! সেদিন পুডিং বানিয়ে টেবিলের উপর রেখে মা আমাদের ডাকতে এল না? ওমা! ওর মধ্যেই অর্ধেকটা হাওয়া! গাবলু আফসোস করে বলল -আমার হারমোনিকা ঐ যে যেটা মামা দিয়েছিল গতবার, আমার টেবিলেই ছিল।

ওটাও খুঁজে পাচ্ছি না রে! -হুম, এবার দেখ গিয়ে কে লোটা হাতে নিয়ে টয়লেটে দৌড়চ্ছে! জোলাপের নির্যাসযুক্ত কেক খেয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা একেবারে, উচিত শিক্ষে হয়েছে তো! হা হা হা!
কেকটা কে খেয়ে ফেলল আর কেই বা বইটা হাতিয়ে নিল ভাবতে ভাবতে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলাম আমি। হঠাৎ মনে হল হুলোটাকে দেখছি না! ওটাই চুরি করে খেয়ে নেয় নি তো কেকটা? সে কথাটা বলতেই আমার কথা শুনে সকলে এমনকি বুচিটাও হেসে ফেলল। টুসকি বলল-কি গাধা রে বাবা! বেড়ালে কেক খেয়েছে শুনেছিস কখনো? তাও আস্ত একখানা কেক? কখনো দেখেছিস, বাবলু? আর হুলোটা মোটেও ওরকম নয়। মাঝেমধ্যে একটু দুধ টুধ চুরি করে খেয়ে ফেলে, তবু খুব লক্ষী একটা বেড়াল। এই বাবলু, তুই কিন্তু না জেনে কথা কইতে আসিস না এই আমি তোকে বলে রাখছি।


-দেখ গিয়ে শঙ্কুর বইটাও ওই হুলোই নিয়ে গেছে, গাবলুর চশমাটা চোখে দিয়ে হয়ত সিঁড়ির কোনে বসে বসে পড়ছে বইটা! ফোঁড়ন কেটে আবার হি হি করে হাসছে খেদি। গাবলু কটমট করে তাকিয়ে আছে খেদির দিকে। বাড়ির মেয়েগুলো একেকটা যা চিড়িয়া হচ্ছে রে বাবা, চুপ করে থাকাটাই আমি নিরাপদ মনে করলাম!
বুচি হঠাৎ বলল- ওটা ওই ফটিক দাদাই খেয়ে ফেলেছে নিচ্চই! ওর পেটে কত ক্ষিধে জান তো তোমরা। আমার হাত থেকে কালকে এত্ত বড় পেয়ারাটা কেড়ে নিয়ে…আমি বননাম যে পেটে পিলে হবে, মা নাঠি দিয়ে মারবে…
বুচিটা বকবক করেই চলেছে আর আমরা হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। ছোটকু বুচির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল- দেখলি তো, বুচিটার পেটে কত বুদ্ধি হয়েছে আজকাল!
এমন সময় মা এসে ঢুকলেন ঘরে।

কেমন রাগী রাগী হয়ে আছে মুখটা। আমরা তো সব স্পিকটি নট, সাথে সাথে ঘরের মধ্যে ঐ যে বলে না পিনড্রপ সাইলেন্স না কি যেন ওটাই আর কি, এমনকি ছোটকুও ভয়ে একেবারে কেঁচো হয়ে গেল।
-বাহ! সব নচ্ছারগুলো দেখি একসাথে! তা কি ফন্দি ফিকির করা হচ্ছে এখানে বসে বসে? -ইয়ে মানে, বৌদি কিছু না তো। ছোটকু মিনমিন করে উঠল। মা এবার বাজখাই গলায় আদেশ করলেন– এই যে ছোটন, যাও তো পাড়ার ডাক্তারবাবুকে একটু ডেকে নিয়ে এসো তো শিগগিরি।

ফটিকটার বাড়াবাড়ি রকমের পেট খারাপ হয়ে গেছে। জিব দিয়ে চুকচুক করে উঠল ছোটকু –কি বলছ তাই নাকি? আহারে, আমরা তো কিচ্ছু জানিই না! আচ্ছা, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি ’ বলে পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে দিয়ে সুড়সুড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ছোটকু। যাবার আগে চোখ টিপে একটা ফিচলে হাসি ছুঁড়ে দিয়ে গেল আমাদের দিকে।
ঘরের ভেতর থেকে শুনতে পেলাম মা ছোটকুকে বলছে –‘আচ্ছা ওই কেকটা কোত্থেকে এনেছিলে? ও দোকান থেকে আর কক্ষনো এনো না তো, যত্তসব পচা বাসি জিনিস গছিয়ে দেয়। ’ ‘আর কক্ষনো আনব না’ বলেই ছোটকু হেঁড়ে গলায় নতুন একখানা সুর ভাজতে ভাজতে চলে গেল।


এদিকে আমি ভাবছি বেচারা ফটিকের পেট খারাপের কথা শুনে ছোটকু কেমন খুশি খুশি মুখ করে চলে গেল মনে হয়! ব্যাপারটা কি?! কিছুই বুঝলাম না আমি! ওমা এখন দেখি টুসকি-খেদি-টেঁপি-বুচি-গাবলু-পটল সকলে মিটিমিটি হাসছে। উফ এত হাসির হলটা কি!
-------------------------------
গান্ধর্বী

সোর্স: http://www.sachalayatan.com/

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।