আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কবি থাকেনা; স্বামী থাকে, পিতা থাকে



আমার পাঠক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে পড়া উপন্যাস "খোয়াবনামা" শেষ করলাম। ভেবেছিলাম উপন্যাস শেষ করে একটা রিলিফ পাব। কিন্তু শেষ হবার পর মনে হলো সাহিত্যকেও কি আমার জীবন পাঠ্যবই বানিয়ে ফেলল যে শেষ করার সুখে পড়া হয়? একটা সময় দিনে এমনকি তিনটা পর্যন্ত বইও নি:শেষ করেছি। সূনীলের সেই সময়-প্রথম আলো-পুর্ব পশ্চিমের দুই খন্ত করে বই কয়েক মাসের ব্যবধানে শেষ করেছি। পাঠ্যবই ছাড়া ছাপার অক্ষরে অন্য যে কোন কিছু হলেই হতো।

বাবা-মা’র ভয়ে তাড়াতাড়ি লাইট নিভিয়ে ঘুমের ভান করে তাদের ঘুমাতে পাঠিয়ে ভিডিও গেমসের আলোয় বই পড়ে পড়ে অকালে চশমা নিয়েছি, আমার কোন খেদ নেই। অনেক কিছুই আমরা জীবনের চেয়েও বেশী কিছু ভেবে অর্জন করি, আবার একসময় হেলায় হারাই। অনেক প্রাপ্তিইি আমাদের পূর্ণ করে, অথচ তা হারিয়ে ফেলা আমাদের ব্যথিত করেনা। আবার এর উল্টোটাও ঘটে অহরহ। পাঠক চিরকাল বাচে না।

আমার পাঠকও লাইফ সাপোর্টে আছে দীর্ঘদিন। সবই এক সময় হারিয়ে যায়। খোয়াবনামায় কিংবদন্তীর কথা বলতে বলতে লেখক গজার মাছ আর বাঘাড় মাছদেরও কিংবদন্তী বানিয়ে ফেলেছেন। নাম শুনে শুনে বাঘাড় মাছটার উপর খুব আগ্রহ জন্মাল। বলা বাহুল্য কোনওদিন খাইনি।

এমনকি দেখিওনি। বাবা-মার কাছে বললাম। বাঘাড় মাছের কথা বলতে বলতে তাদের কন্ঠেও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো কিংবদন্তীর টান--বাঘাড় মাছ কি যে সে মাছ? গরুর গাড়িতে করে হাট থেকে নিয়ে আসতে হতো। রতনকান্দির হাট ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না। রতনকান্দির হাট ছাড়া সেই আধ মণ এক মণের একেকটা মাছ কেনার লোক কোথায়? লেখক তৌফিক তুহিন সামহোয়্যার ইন ব্লগে বাঘাড় মাছের একটা ভালোই পরিচিতি দিয়েছেন।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতিটা উল্লেখ করা যায়: বাঘাড় মাছ বাংলাদেশের বিল, হাওর, বাওড়গুলোতে মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। এটিকে এক প্রকার মিঠা পানির হাঙ্গর মাছ বলা যায়, কারন এটি সর্বভুক মাছ। বগুড়ার বাঙ্গালি নদী, যমুনা নদী ততসংলগ্ন বিল বাওড়ে এটি এখনো পাওয়া যায়। এছাড়া সিলেট সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার এসব জেলার নদীতে মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। আবার কুমিল্লার তিতাস ও গোমতী নদীতেও একসময় এদের বেশ দেখা মিলতো।

আর মেঘনার বাঘাড় ছিল কিংবদন্তীতুল্য। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসে বাঘাড় মাছের উল্লেখ পাওয়ায় আগ্রহী হই। বাঘাড় মাছ অতি সুস্বাদু। চাইলে ঢু মারতে পারেন--http://www.somewhereinblog.net/blog/tawfiqtuhin/29378350 আমরা বর্তমান যুগে অনেক আরাম আয়েশ, সুযোগ সুবিধা ভোগ করছি যা আগে কখনও ছিল না। আবার আগে অনেক কিছুই ছিল, যা এখন ইতিহাস।

আমার এসব ক্ষেত্রে প্রথমেই মনে পড়ে রবীন্দ্র নাথের কথা। নিউটনের কথা। রকফেলার-জেপি মরগ্যানের কথা। তাদের যতই টাকা থাক কোন দিন ভিডিও কলের কথা চিন্তাই করতে পারেননি। অথচ আমাদের দেশের অনেক প্রান্তিক লোকই এখন পকেটে থ্রি জি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

গুরুর জন্য খানিকটা আফসোসও হতো। এখন নিজের জন্যই আফসোস হয়। রবীন্দ্র নাথ মুঠোফোনে কথা বলতে না পারুক এক জীবনে যথেচ্ছ বাঘার মাছ খেয়ে গেছেন নিশ্চই। আর এখন দেশের শীর্ষ ধণীও চাইলেই যে একমণী একটা বাঘার কিনতে পারবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বাঘার বাদই দিলাম।

বিলের পুরনো কৈ আর নদীর পাঙ্গাসেরই কত কিংবদন্তী শোনা যায়। এই মাছ দুটো বাঘারের মতো অভিমানে দূরে সরে যায়নি। বরং স্ত্রীর মতো কাছে এসে হারিয়ে ফেলেছে প্রেয়সীর ভালোবাসা। এখন বাজারে যে পাঙ্গাস বা কৈ পাওয়া যায় খেতে একদম খারাপ না হলেও এদের স্বাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে জিভে জল আসবে এমন ’হা-মাছ’ বোধ হয় এখনও এ বঙ্গভূমিতে জন্মায়নি। দুই প্রজন্ম পরে ইলিশের অবস্থা কী হয় কে জানে।

হয়তো আমাদের নাতি-নাতনিরা শুনবে ইলিশ নামে আমাদের একটা মাছ ছিল। যা আমাদের জাতীয় মাছ এবং যাকে ২১ শতকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছে। বোয়াল নামে একটা মাছ ছিল, আইর, কালবাউশ বা পাবদা বলে কিছু ছিল। তারা চিনবে রুই কাতল মৃগেল আর অন্যান্য কার্প জাতীয় মাছেদের, যারা পিতৃপুরুষের ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলে মানুষের পুকুরেই দিব্যি জন্মে ও বেড়ে ওঠে। সংবাদ পত্রে দেখলাম বানিজ্যিক ভাবে ইলিশ উৎপাদন করা যায় কিনা তা নিয়ে গবেষণার কথা।

গবেষণা কবে থেকে চলছিল তা জানি না। তবে গবেষণা শেষ হবার পর তার ফলাফলটা জানলাম। দুই কোটি টাকা ব্যায়ে প্রায় দুই বছর গবেষণার পর রায় দেয়া হলো বানিজ্যিক ভাবে ইলিশ চাষ সম্ভব নয়। মাছ বেঁচে থাকে, বড়ও হয় তবে খরচের তুলনায় তার বৃদ্ধি খুব কম এবং সবচেয়ে বড় কথা স্বাদ মোটেই প্রাকৃতিক মাছের মতন হয় না। খবরটা পড়ে দু:খ পাওয়া উচিত ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু আমার বরং খানিকটা ভালোই লাগলো।

ইলিশ যদি পাঙ্গাস বা কৈ এর মতন হয়ে যায় তাহলে অপ্রাপ্তির এই বাঙ্গালী জীবনে আর থাকল কী? তবে চাষের ইলিশ ছাড়া যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কপালে আর ইলিশ জুটবে না সে ব্যপারে ভবিষ্যৎবাণী দিতে নস্ট্রাডামুস হতে হয় না। এভাবেই সব এক সময় হারিযে যায়, হারিয়ে যাবে। সবকিছু একদিন নষ্টদের দখলে যায়। চোখের আড়াল হয়, দিন কয়েক মাঝে মাঝে মনে পড়ে একসময় আর মনেও পড়ে না। কয়টা মাছকে পাতে না পেয়ে আমাদের মাছে-ভাতে বাঙ্গালীর আজ বুকটা হাহাকার করে ওঠে? মাছে ভাতে বাঙ্গালী বলতে যে হাজারো মাছের কথা বোঝানো হতে সেই দিন গত।

এখন আমরা দেখি হাতে গোণা গুটি কয়েক মাছ যারা খামারে যেতে আপত্তি করেনি। কবে যেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম। সেখানে একটা তথ্য জানলাম, আমরা ইতিমধ্যে সমুদ্রের ৫০ শতাংশ মাছ খেয়ে ফেলেছি। ওরা ভুল বলতে পারে অথবা আমিও ভুল শুনতে পারি। কিন্তু যদি দুজনই সঠিক হয়ে থাকি তবে তা গভীর সমুদ্রের চেয়েও অনেক গভীর উদ্বেগের বিষয় সেটা।

রবীন্দ্রনাথ-রকফেলারদের জন্য আফসোস করছিলাম। আসলেই সেই আফসোস বৃথা। রবীন্দ্র নাথ মোবাইল ফোন দেখেননি, এয়ার কন্ডিশন পাননি, কম্পিউটার-ইন্টারনেট কিছুই পাননি। কিন্তু তার জন্য তো তার কোন খেদ ছিল না। যে জিনিস কখনও ছিল না, তার অভাব সাধারণ মানুষ বোধই করে না তার এক জীবনে।

কম্পিউটারের অভাব কয়জন মানুষ বোধ করেছে পঞ্চাশ বছর আগে? মোবাইলের অভাব ত্রিশ বছর আগে? ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনের অভাব? যে প্রেম কখনও আসেইনি তার কথা ভেবে আর ক’জন কাঁদে? যারা কাঁদতে চায় তারা কাঁদে যে প্রেম এসেছিলে, কিন্তু থাকেনি। রবীন্দ্রনাথরা যা পেয়ে গেছেন অথচ এখন আর নেই তার জন্য আমরা বরং আফসোস করতে পারি। বাতাসে হেমন্তের ঘ্রাণ থাকে না, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী কারখানার দূষিত বাতাস থাকে। মানুষের জীবনে স্বস্তি থাকেনা, কিছুটা আর্থিক সক্ষমতা থাকে। শীতের সকালে বাড়িতে ভাপা পিঠা থাকে না, দোকানে পিৎজা থাকে।

বাঘাড় মাছ থাকে না, মোবাইল ফোন থাকে। কবিতা থাকেনা, অভ্যস্ততা থাকে। কবি থাকেনা; স্বামী থাকে, পিতা থাকে।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।