আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

খেতভরা সবজি নিয়ে দিশেহারা চাষি

শীত হচ্ছে সবজির মৌসুম। কপি, শিম, লাউ, শালগমসহ বিভিন্ন সবজিতে ভরে থাকে বাজার। বিক্রিও হয় দেদার। এ জন্য সবজিচাষিরা এ মৌসুমের জন্য উদগ্রীব থাকেন। আশায় থাকেন, কষ্টের ফলন থেকে কিছু অর্থ আসবে, ঘুচবে আর্থিক দৈন্য।

কিন্তু চলমান হরতাল-অবরোধে সবজিচাষিদের সে আশায় গুড়ে বালি পড়েছে। বাজারের বদলে তাঁদের খেতের সবজি খেতেই নষ্ট হতে চলেছে। অর্থের আশার বদলে তাঁদের মনে এখন দুর্দিনের আশঙ্কা। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অঞ্চলের চাষিদের এখন এ দুরবস্থা। অবরোধে পরিবহনসংকট থাকায় আড়ত থেকে সবজি সরবরাহ করতে পারছেন না পাইকাররা।

এ জন্য আড়তেও পচছে কপিসহ অন্যান্য সবজি।

যশোর সদর উপজেলার কোদালিয়া এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজির চাষ করেন আবদুস সাত্তার। এ বছর ঋণ নিয়ে ৪০ বিঘা জমিতে বাঁধাকপির চাষ করেছেন তিনি। হরতাল-অবরোধের কারণে পরিবহনসংকট চলছে। এতে পাইকাররা আড়ত থেকে সবজি রাজধানীসহ অন্যান্য শহরে পাঠাতে পারছেন না।

এ কারণে খেতের সবজির চাহিদা কমে গেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে সাত্তারের সবজি খেতেও। জমি থেকে বাঁধাকপি তুলতে পারছেন না। তাই জমিতেই নষ্ট হচ্ছে বাঁধাকপি। এতে বিপাকে পড়েছেন তিনি।

কেবল আবদুস সাত্তার নন, সবজির চাষ করে বিরোধী দলের টানা হরতাল ও অবরোধের কারণে এবার বিপাকে অনেক চাষি। এর মধ্যে অনেকে ঋণ নিয়েছেন ব্যাংক থেকে। অনেকে আবার চাষ করেছেন জমি ইজারা নিয়ে। হরতাল-অবরোধের কারণে হাঁসফাঁস অবস্থা তাঁদের।

 

সবজি নিয়ে দুরবস্থা

যশোর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে সবজির খেত আবদুস সাত্তারের।

গতকাল বুধবার খেতেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলো ডটকমকে জানান, নিজের জমি নেই, তাই এ বছর অন্যের ৪০ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে বাঁধাকপির চাষ করেছেন। এর জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা ঋণ নেন।

আবদুস সাত্তার জানান, এক বিঘা জমিতে বাঁধাকপি চাষ করতে চাষ, বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক ও জমির ইজারাসহ সব মিলিয়ে তাঁর ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সাধারণত প্রতিদিন দুই থেকে তিন ট্রাক করে সবজি তোলেন তিনি।

অবরোধের কারণে পরিবহনসংকট থাকায় সবজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গত পাঁচ দিন সবজি তুলতে না পারায় বর্তমানে তাঁর খেতে অন্তত দুই লাখ বাঁধাকপি পড়ে আছে। এসব বাঁধাকপি ফেটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। হরতাল-অবরোধের কারণে বাঁধাকপি তুলতে সাহস পাচ্ছেন না তিনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে চিন্তিত এই চাষি।

সাত্তার জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতিটি বাঁধাকপির দাম আট থেকে ১০ টাকা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে প্রতিটি বাঁধাকপি অন্তত ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নিঃস্ব হওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকবে না তাঁর।

যশোর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, যশোর থেকে প্রতিবছর আড়াই লাখ মেট্রিক টন সবজি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।

 

পাওয়া যাচ্ছে না ট্রাক

এ দিকে অবরোধের কারণে ট্রাকমালিকেরা ট্রাক চালাতে সাহস পাচ্ছেন না।

ঝুঁকি নিয়ে দু-একটি যাও চলছে, তাতে আবার দ্বিগুণ বা তিন গুণ টাকা গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। যশোর এলাকার সবচেয়ে বড় সবজির মোকাম বারীনগর বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০টি ট্রাক ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি নিয়ে যায়। অবরোধের কারণে এই মোকাম থেকে মাত্র দুই-তিনটি ট্রাক ছেড়ে যাচ্ছে।

বিপাকে পাইকারি ব্যবসায়ীরাও

স্থানীয় বাজার থেকে সবজি কিনে বিপাকে পড়ছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরাও। যশোরের ঝিকরগাছার সবজির পাইকারি ব্যবসায়ী মো. আবুল হোসেন জানান, স্থানীয় হাট থেকে গত সোমবার তিন ট্রাক সবজি কেনেন তিনি।

এর মধ্যে নিজের দুটি ট্রাক ঢাকার কারওয়ান বাজারে পাঠান। পথে দুটি ট্রাকেই ইট ছুড়ে সামনের কাচ ভেঙে ফেলে অবরোধকারীরা। বাকি এক ট্রাক সবজি বাজারেই পচে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। কারওয়ান বাজার ও চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে নিয়মিত সবজি পাঠান তিনি।

ঝুঁকি নিতে চান না চালকেরা

যশোরের ঝিকরগাছা থেকে ট্রাকভর্তি পেঁপে নিয়ে কারওয়ান বাজারে এসেছেন মো. লিটন হোসেন।

তিনি জানান, সোমবার রাতে যশোর থেকে রওনা হন। মাগুরা শহর পার হওয়ার পর তাঁর ট্রাকসহ মোট ১০টি ট্রাকে ভাঙচুর চালায় অবরোধকারীরা। এতে সবগুলো ট্রাকের সামনের ও দুই পাশের কাচ ভেঙে যায়। তিনি বলেন, ‘খুব রিস্ক নিয়ে ঢাকা আইছি। এবার বাড়ি যাতি পারলি হয়।

আর বাইর হব না। চাকরি থাক না-থাক। আগে জান বাঁচানো, তারপর টাকা। জানই যদি না থাকে তাইলে টাকা দিয়ে কী করব। ’

 

বিপাকে শ্রমিকেরাও

টানা অবরোধ-হরতালের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজির পাইকারি বাজার ও মোকামের ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়েছে।

কাজ না থাকায় বসে আছেন এসব হাট ও মোকামের শ্রমিকেরা।

বুধবার বগুড়ায় সবজির বৃহত্তম পাইকারি বাজার মহাস্থান বাজারে গিয়ে দেখা যায় আড়তের ব্যাপারি ও শ্রমিকেরা অলস বসে আছেন। কয়েকটি আড়তে কিনে রাখা সবজি পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। টানা অবরোধের কারণে হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাও তেমন নেই।

মহাস্থান বাজারের আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পাইকারি ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলামের ভাষ্য, হরতাল-অবরোধের কারণে ব্যবসা প্রায় বন্ধ।

তিনি বলেন, সবজি কিনে বাইরে পাঠাতে পারছি না। ট্রাকও পাওয়া যাচ্ছে না। দুয়েকটি মিললেও ভাড়া দ্বিগুণ বা তিন গুণ।

মহাস্থান বাজারের শ্রমিক লবির উদ্দিন বলেন, ‘হাটত আচ্চি, কোনো কাম নাই, এভাবে চললে কেমনে বাঁচমো। ’

এ দিকে টানা অবরোধের কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় শীতের সবজি চড়া দামে কিনতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে।

গতকাল বুধবার কারওয়ান বাজারের এক ক্রেতা জানান, কপি, লাউ, শিম ইত্যাদি সবজির দাম প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে।

দামে ঝাঁজ তোলা পেঁয়াজের দামও আবার বেড়েছে। তিন-চার দিন আগেও যে পেঁয়াজের দাম ৬০ টাকা কেজি ছিল, গতকাল তা ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

 

(প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আব্দুল্লাহিল ওয়ারিশ, ঢাকা; মনিরুল ইসলাম, যশোর ও আনোয়ার পারভেজ, বগুড়া)

সোর্স: http://www.prothom-alo.com     বুকমার্ক হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.