আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাঁক বদলের বছর

যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করা এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল বছরজুড়ে।
নিয়মিত প্রাকৃতিক অঘটনের দেশে রানা প্লাজা ধসে অগণিত প্রাণহানির ঘটনা ছিল ভয়ানক এক ‘মনুষ্যসৃষ্ট’ দুর্যোগ।
যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আন্দোলনে মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক জাগরণের অভাবিত এক আন্দোলন জমে রাজধানীর শাহবাগে।
সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড়ের শিকার হয়।
ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠা রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন আগে বাংলাদেশ প্রবেশ করছে ইতিহাসের এক নতুন বাঁকে।

  
বিদায়ী ২০১৩ সালের আলোচিত সেই সব ঘটনার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে এনেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
 

 




কাদের মোল্লার ফাঁসি
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজ দেশের মানুষের বিপক্ষে গিয়ে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটতরাজের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের মধ্য দিয়ে ‘কলঙ্কমুক্তি’র পথে এগিয়েছে জাতি। এ বছরই মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় প্রথম রায় হয়েছে, প্রথম কোনো যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ও কার্যকর হয়েছে এ সময়েই।
যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে চার দশক প্রতীক্ষার পর ন্যায়বিচার পায় স্বজনহারা পরিবার।
একাত্তরে নৃশংসতার জন্য কসাই কাদের নামে পরিচিত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে গত ১২ ডিসেম্বর রাতে ফাঁসি দেয়া হয়।


১৯৭১ সালে ঢাকার উপকণ্ঠ মিরপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সে সময় আইনে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করাও সম্ভব ছিল না।
রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে কাদের মোল্লার বিজয় চিহ্ন ভি দেখানোর প্রতিক্রিয়ায় ফুঁসে ওঠে ছাত্র-জনতা। শাহবাগে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তোলে তারা। অচিরেই তাদের সমাবেশ পরিচিতি পায় গণজাগরণ হিসেবে।

লাখো মানুষের এই সমাবেশের উত্তাপ গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে বিদেশের মাটিতেও অবস্থানরত বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে সংশোধিত হয় আইন, যাতে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনেরও আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়। সেই আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শেষেই সর্বোচ্চ আদালত দেয় কাদের মোল্লার ফাঁসি।
চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দেড় মাসেরও বেশি সময় পরে কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ মুহুর্তে নাটকীয়ভাবে চেম্বার বিচারপতির আদেশে তা পিছিয়ে যায়। পরে পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হওয়ার পর কার্যকর হয় এই ফাঁসি।


স্বাধীনতার পরপরই এই বিচার শুরু হয়। মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন দণ্ড হয় অনেকের। তবে ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি এএসএম সায়েম এক সামরিক ফরমান বলে ‘দালাল আইন, ১৯৭২’ বাতিল করেন। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত সারাদেশের ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত করা হয়।

দালাল আইন বাতিলের ফলে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন সহস্রাধিক মামলা বাতিল হয়ে যায় এবং এ সকল মামলায় অভিযুক্ত প্রায় ১১ হাজার দালাল, রাজাকার, আলবদর, আল শামস মুক্তি পেয়ে যায়।
এর মধ্যে ২০ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৬২ যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ৭৫২ যুদ্ধাপরাধীও মুক্তি পেয়ে যায়।
এরপর  ৯০ দশকে যুদ্ধাপরাধের বিচারে গড়ে ওঠা গণ-আন্দোলনে জনতার আদালতে প্রতীকী বিচার হয় গোলাম আযমের, স্বাধীনতাবিরোধীদের গুরু বলে পরিচিতি যার।
ওই আন্দোলনের দেড় যুগ পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চে গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যার মাধ্যমে বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরু হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন পলাতক বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে গত ২১ জানুয়ারি শুরু হয় যুদ্ধাপরাধ মামলায় রায়।


এরপর একে একে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হয় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, পলাতক দুই ছাত্রসংঘ নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের। মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধ করেও বয়সের কারণে ৯০ বছর কারাদণ্ড পান গোলাম আযম।
এ ছাড়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড এবং আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।
কারাগারে থাকা সব দণ্ডিতের মামলাই বর্তমানে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগে রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা।
নেতাদের পাশাপাশি দলগতভাবে বিরোধিতার জন্য জামায়াতকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আদালতের রায়ে।

হাই কোর্টের একটি রায়ে দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারিয়েছে। এই দলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে তদন্তও করছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
 

 




রানা প্লাজা ধস
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনা ঘটে গত ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার মধ্য দিয়ে, যার করুন পরিণতি বিশ্ববাসীকেও বিহ্বল করে। বহুতল এই ভবন ধসে প্রাণ হারান অন্তত এক হাজার ১৩১ জন পোশাক শ্রমিক। নিখোঁজ হন অনেকে, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনো উঠে আসছে যাদের দেহাবশেষ।


ওই দিন সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন নয় তলা ভবনটি ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে এক হাজার ১১৫টি মৃতদেহ উদ্ধারের পর ১৩ মে উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়। জীবিত উদ্ধার দুই হাজার ৪৩৮ জনের মধ্যে পরে মারা যান আরো ১৬ জন।
উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেয়া সেনাবাহিনীর মতে, এই ঘটনায় আরো ২৬১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ১৭৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
ঘটনায় নিহত ২৩৪ জনের পরিচয় পাওয়া মেলেনি।

বেওয়ারিশ হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। পরে আবার ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ঘটনার সাত মাস পর ডিসেম্বরে ধ্বংস্তূপ থেকে উদ্ধার হয় দুটি খুলি।
আগেরদিন ফাটল দেখার পরেও ভবন ও কারখানা মালিকদের তৎপরতায় ওই দিন রানা প্লাজার বিভিন্ন তলায় গার্মেন্টে কাজ শুরু হয়। তাতেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় হাজারের বেশি মানুষ।


ভবন ধসের ১৭ দিন পর রেশমা বেগম নামের এক পোশাককর্মীকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে।
রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশে পোশাক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। শ্রমিকের রক্তমাখা পোশাক না পরারও ঘোষণা দেন কোনো কোনো দেশের ক্রেতারা। এরই জের ধরে গত জুনে বাংলাদেশের পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে একই সুবিধা বাতিলের হুমকি দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যে বাজারে বাংলাদেশের ১ হাজার ১৩৭ কোটি ডলারের পোশাক এই সুবিধা পেয়ে আসছে।


 

 




বিএনপির নেতাদের ধরপাকড়
এ বছর প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দুই বার অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শেষবার মই ও রশি বেয়ে দোতলায় উঠে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে পুলিশ।
গত ১১ মার্চ প্রথম অভিযানের দিন বিকালে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে ১৮ দলের সমাবেশের শেষদিকে হঠাৎ কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এর পরপরই বিএনপি কর্মীরা পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়তে থাকে এবং সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়।
এর প্রতিবাদে একদিন হরতালের ঘোষণা দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


এর ঘণ্টাখানেক পর বিএনপি কার্যালয় থেকে ফখরুল, সাদেক হোসেন খোকা, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী, জয়নুল আবদিন ফারুকসহ শতাধিক নেতা-কর্মীকে আটক করে পুলিশ। ওই সময় বিএনপি কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে দশটি হাতবোমা উদ্ধারের কথাও জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পরদিন মির্জা ফখরুল, সাদেক হোসেন খোকা ও আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে ছেড়ে দিলেও অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে হাতবোমা বিস্ফোরণ এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দুটি মামলা হয়। মামলায় রুহুল কবির রিজভী, জয়নুল আবদিন ফারুকসহ ১৫৮ জনকে আসামি করা হয়।
পরে জামিন নিয়ে গ্রেপ্তার নেতারা বেরিয়ে এলেও ঘটনাটি আলোচনায় থাকে।

এর মধ্যেই গত ৩০ নভেম্বর ভোরে বিএনপি কার্যালয়ে দ্বিতীয় দফা অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানেও গ্রেপ্তার হন যুগ্ম মহাসচিব (দপ্তর) রুহুল কবির রিজভী, যিনি বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘদিন কার্যালয়েই অবস্থান করে আসছিলেন।
দ্বিতীয় অভিযানের পর বিএনপি অফিসের কর্মীরা জানান, মই ও রশি বেয়ে বেয়ে দোতলার দরজা ভেঙে ঢুকে রিজভীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। লুঙ্গি পরা অবস্থায় তাকে মাইক্রোবাসে তোলা হয়।
ওইদিন বিএনপি কার্যালয়ের আসবাবপত্র ভাংচুরের পাশাপাশি দপ্তরের দুটি কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নগদ অর্থ, রিজভীর ল্যাপটপ ও কয়েকটি মোবাইলে সেট পুলিশ নিয়ে গেছে বলে অফিসকর্মীরা জানান।


রিজভীকে গ্রেপ্তারের পর দপ্তরের দায়িত্ব পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদের অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও পাঠানোও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
 

 




শাহবাগ আন্দোলন
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রত্যাখ্যান করে শাহবাগে তরুণদের একটি সমাবেশ থেকে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় গণজাগরণ। আরব বিশ্বের একনায়কদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক গণআন্দোলন আরব বসন্তের সঙ্গে মিলিয়ে কেউ কেউ একে ডাকতে থাকেন বাংলা বসন্ত নামে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও ‘কসাই কাদের’র সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ফেইসবুকে। ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নামে একটি সংগঠনের ডাকে শাহবাগে জড়ো হয় কয়েকজন শিক্ষার্থী।


বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে একটি মানববন্ধন হয়। মানববন্ধন শেষে সেখানে হয় একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ।
সমাবেশ শেষ হওয়ার পরে তরুণরা সিদ্ধান্ত নেয় কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা শাহবাগেই অবস্থান করবেন।
নানা ঘটনাপ্রবাহে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা অবস্থান চালিয়ে এই আন্দোলন গড়ে এক নতুন ইতিহাস। ওইদিন সরকারের প্রতি ৬ দফা ঘোষণা করে সমাপ্তি হয় টানা অবস্থানের।


গণআন্দোলনের মুখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন পরিবর্তন করা হয়। পরে ওই আইনে আপিল বিভাগে ফাঁসি হয় কাদের মোল্লার। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ওই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিদেশেও।
যুদ্ধপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সারা দেশ থেকে এক কোটি সাত হাজার ৭৬১টি স্বাক্ষর সংগহ করে দেয়া হয় সংসদকে।
শাহবাগের আন্দোলন গড়ে ওঠার দশম দিন হত্যা করা হয় আহমেদ রাজীব হায়দার নামে আন্দোলনের এক কর্মীকে।

পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে সারা দেশে নিহত হয় আরো কয়েকজন আন্দোলনকারী। আন্দোলনের মূলকেন্দ্র শাহবাগেই একাধিকবার হাতবোমা ছোড়া হয়।
এছাড়া শাহবাগ গণজাগরণের বিরোধিতাকারী হেফাজতে ইসলাম ৬ এপ্রিল এই আন্দোলনের কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করলেও তা প্রতিহত করে দেয় ছাত্র-জনতা। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে সংসদে প্রস্তাব পাশের পর বছরের শেষদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের দাবিতে মাঠে নেমে নতুন আলোচনার জন্ম দেয় গণজাগরণ মঞ্চ।

 




হেফাজতের সমাবেশ
ঢাকাকেন্দ্রিক নানা কর্মসূচিতে এ বছরজুড়ে আলোচনায় থাকে কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম, যার নেতৃত্বে রয়েছেন কওমী মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ শফি।


‘নাস্তিক’ ব্লগারদের শাস্তি ও নারীনীতি বাতিলসহ ‘বিতর্কিত’ ১৩ দফা নিয়ে মাঠে নামে তারা।
সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক হিসাবে নিজেদের দাবি করলেও পরে জামায়াত থেকে অর্থ ও লোকবলের মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা নেয়ার অভিযোগ ওঠে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে।
এছাড়া সংগঠনের কমিটিতে স্থান দেয়া হয় ১৮ দলীয় জোটে থাকা ইসলামী মৌলবাদী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের।
১৩ দাবিতে লংমার্চ করে গত ৬ এপ্রিল মতিঝিলে সমাবেশ করে সংগঠনটি, তাতে যোগ দিয়ে সংহতি জানান বিএনপি নেতারা। সংহতি জানায় মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিও।


নারীশূন্য বিশাল ওই সমাবেশে পেশাগত কাজে গিয়ে আহত হন একুশে টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার নাদিয়া শারমীন। বিব্রতকর অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন আরো অনেক নারী সাংবাদিক। এরপরই আলোচনায় আসে হেফাজতের নারীবিরোধী অবস্থান।
হেফাজতে ইসলামের নেতারা বরাবরই তাদের কর্মসূচিকে ‘ধর্মীয়’ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার বিরোধী নয় বললেও ওই সংগঠনের লংমার্চ ফেরত কর্মীরা শাহবাগ মঞ্চ দখলের চেষ্টা চালায়।
গত ৫ মে তারা মতিঝিলে সমাবেশ ডেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায়, যাতে সংঘাতে নিহত হন বেশ কয়েকজন।


হেফাজতকর্মীরা শাপলা চত্বরে টানা অবস্থানের ঘোষণা দিলে রাতে সাঁড়াশি অভিযানে তাদের তুলে দেয়া হয়। ওই অভিযানে হাজার হাজার হেফাজত কর্মী নিহত হয়েছেন বলে তাদের নেতারা দাবি করলেও তার স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে পারেননি। বছরের শেষ পর্যন্ত সংগঠনটির পক্ষ থেকে নিহতদের কোনো তালিকা দেয়া হয়নি।
এরপর সভা-বিবৃতির মধ্যে সক্রিয় হেফাজত ২৪ ডিসেম্বর আবারো মতিঝিলে সমাবেশের ঘোষণা দিলেও অনুমতি না পাওয়ায় তা ব্যর্থ হয়।
 

 




হাসিনা-খালেদা টেলিসংলাপ
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হলেও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যখন প্রধান দুই দল মুখোমুখি অবস্থানে এমন সময়ে গত ২৬ অক্টোবর বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরল টেলি সংলাপ হয়।


ওই কথোপকথনে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে গণভবনে খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানান। জবাবে হরতালের আগে সংলাপে অনাগ্রহ দেখান বিএনপি চেয়ারপারসন।
৩৭ মিনিট স্থায়ী এই টেলিফোন আলাপে বেশকিছু বিষয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয় দুই নেত্রীর মধ্যে।
পুরো কথোপকথনের অডিও টেপ প্রচার হওয়ার পর তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আলোচনার ঝড় ওঠে। বিরোধীদল এর জন্য দায়ী করে সরকারকে।

এটাকে সংলাপে সরকারের আন্তরিকতার অভাব বলে মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া।
এ ঘটনার পর সংলাপের উদ্যোগ কে নেবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
এ সময়ে দুই প্রধান দলের সাধারণ সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মধ্যে ২৩ নভেম্বর বৈঠক হয় বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। উভয় দলের কয়েক জন শীর্ষ নেতা এটা স্বীকার করলেও অস্বীকার করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
এরমধ্যেই গত ৬ ডিসেম্বর চার দিনের সফরে ঢাকায় আসেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ-তারানকো।


 




তার কয়েক দিনের দৌঁড়ঝাপে উত্তেজনাকর সময় পার করে জাতি। ১১ ডিসেম্বর ফিরে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তার মধ্যস্থতায় দুই দফা বৈঠকে বসেন দুই দলের প্রতিনিধিরা।
তার এই সফরে মূল সংকটের কার্যকর কোনো সমাধান বেরিয়ে না এলেও বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুই দল আলোচনায় এসেছে। এখন তা চালিয়ে যেতে হবে।


এরপরও দুই দলের নেতারা একবার বসেছিলেন। ধারাবাহিক এই সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার কথা কেউ স্বীকার না করলেও তাদের আর আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি।
এর মধ্যেই দশম সংসদ নিয়ে আর আলোচনা নয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তবে সমঝোতা হলে ‘হত্যা’ বন্ধ শর্তে দশম সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়া হবে।
আলোচনার এই পুরো সময়ে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংসতা কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর ঘোষণা দেয়ার কয়েকদিন পর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচি দেন খালেদা জিয়া।


 

 




আলোচিত বিচার
বিডিআর বিদ্রোহে হত্যাকাণ্ডের বিচারে এ বছর রেকর্ড সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, ঘটনার এক বছরের মধ্যে আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষিত হয়। অর্থপাচার মামলায় তারেকের খালাসও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়া উপসহকারী পরিচালক তৌহিদুল আলমসহ (৫৫) সীমান্তরক্ষা বাহিনীর ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। গত ৫ নভেম্বর ঘোষিত এই রায়ে আসামিদের ১৬১ জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড নেতা তোরাব আলীও রয়েছেন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে।


চার বছর আগে নতুন একটি সরকার দায়িত্ব নেয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় আধাসামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহের সেই ঘটনা পুরো বিশ্বে আলোড়ন তোলে। এক মামলায় এতো আসামির সর্বোচ্চ সাজার আদেশও নজিরবিহীন।
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের অবরোধের মধ্যে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে একটি মিছিল থেকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎকে।
ওই ঘটনার খবর ও ছবি সারা বিশ্বেই আলোড়ন তোলে। আসামিরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের কর্মী হওয়ায় সরকারও বিরোধীদলের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে।


সরকারদলীয় লোকজন জড়িত থাকায় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করলেও ঘটনার এক বছরের মাথায় গত ১৮ ডিসেম্বর আলোচিত বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার রায় হয়। এতে আট জনকে ফাঁসি এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।
দণ্ডাদেশ পাওয়া ২১ আসামির সবাই আদালতপাড়া সংলগ্ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মী ছিলেন।
ঘুষ হিসাবে আদায়ের পর ২০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের মামলায় গত ১৭ নভেম্বর খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দেয় আদালত।
তবে তারেকের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে সাত বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৪০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়।


মামলা দায়ের থেকে শুরু করে পুরো বিচার প্রক্রিয়াতেই অনুপস্থিত ছিলেন তারেক। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। তারেকের খালাসের এই রায়ের বিরুদ্ধে সম্প্রতি উচ্চ আদালতে আপিল করেছে দুদক।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও মুদ্রা পাচারের আরেকটি মামলায় কারাদণ্ডাদেশ নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন।
 

 




গলফার সিদ্দিকুর ও ক্রিকেটার আশরাফুল
গলফ বিশ্বকাপে এ বছরই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে গত নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে গলফ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পান মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান।
বাংলাদেশের সেরা গলফারের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপে সেরা বিশে থাকা। কিন্তু অনভ্যস্ত পরিবেশ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ৬০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ৫৫তম স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে।
তবে মেলবোর্নে যাওয়ার আগে নয়া দিল্লিতে হিরো ইন্ডিয়ান ওপেনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন সিদ্দিকুর। এটি এশিয়ান ট্যুরে তার দ্বিতীয় শিরোপা।


ইন্ডিয়ান ওপেন জিতে পাওয়া দুই লাখ ২৫ হাজার ডলারের প্রাইজমানি সিদ্দিকুরকে এশিয়ান ট্যুরের এ বছরের অর্ডার অব মেরিটের তিন নম্বর অবস্থানে তুলে এনেছে। গলফ থেকে এ বছর মোট আয় ৪ লাখ ৮৬ হাজার ডলার।
এ নিয়ে চার বছরের মধ্যে তিনবার এশিয়ান ট্যুরের এ বছরের অর্ডার অব মেরিটের শীর্ষ দশের মধ্যে থেকে বছর শেষ করছেন সিদ্দিকুর।
বিশ্বকাপে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও বাংলাদেশের গলফের এই রাজপুত্র ২০১৬ সালের অলিম্পিককে পরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। ১৯০০ ও ১৯০৪ সালে অলিম্পিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসরের পর ২০১৬ সালের রিও ডি জেনেইরো অলিম্পিকে আবার থাকছে গলফ।


অলিম্পিকে বিশ্বকাপের বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় বলে বর্তমানে বিশ্ব র্যারঙ্কিংয়ে ১৬৬তম অবস্থানে থাকা সিদ্দিকুর ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেই অলিম্পিকে সুযোগ পাবেন।
এছাড়া মালয়শিয়ায় আগামী বছরের মার্চে ইউরোপ ও এশিয়ার সেরা গলফারদের নিয়ে অনুষ্ঠেয় প্রতিযোগিতা ইউরেশিয়া কাপেও খেলার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে সিদ্দিকুরের। এশিয়ান ট্যুর অর্ডার অব মেরিটে এশিয়ার প্রথম চার গলফার এই প্রতিযোগিতায় সরাসরি সুযোগ পাবেন।
সিদ্দিকুরের সাফল্যের কল্যাণে বাংলাদেশে গলফ দিনে দিনে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। উঠে এসেছে সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ খেলোয়াড়।


২০১৩ সালে সাফল্য এসেছে ক্রিকেটেও। দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ধরাশয়ী করার পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা সফরে সাফল্য পায় বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ম্যাচ গড়াপেটার তথ্য প্রকাশে ধাক্কা খায় দেশের ক্রিকেটাঙ্গন। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলায় নিষিদ্ধ হন তারকা ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল।
 

 




রঙ্গমঞ্চে ‘রঙিন’ এরশাদ
বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ।

বছরের শুরুর দিকে গণজাগরণ মঞ্চের সমালোচনা ও হেফাজতে ইসলামকে সমর্থন, আর সংলাপের জন্য দুই নেত্রীকে চিঠি দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।
এছাড়া মহাজোটে জাতীয় পার্টির থাকা না থাকা নিয়ে ঘন ঘন নিজের অবস্থান পরিবর্তনের জন্যও সব সময় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সাবেক এই সামরিক শাসক। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর নয়, সব দল ছাড়া নির্বাচন নয়- বলে আসা এরশাদ বছরের শেষ দিকে হঠাৎ সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেন। হঠাৎ এক সকালে সাংবাদিকদের ডেকে নাটকীয়ভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো, আর সর্বশেষ তার সিএমএইচ-বাস নিয়েও দেশজুড়ে চলছে নানা আলোচনা।
গত ১৭ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেন এরশাদ।

পরে ২৯৯ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেয় জাতীয় পার্টি।
১৮ নভেম্বর এরশাদ বিএনপিকেও নির্বাচনে ডাকেন। পরদিন দলটির ৫ নেতা-নেত্রী যোগ দেন মন্ত্রিসভায়।
এরা হলেন- এরশাদের স্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলির সদস্য রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, সভাপতিমণ্ডলির সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু ও সালমা ইসলাম।
ওই দিনই সভাপতিমণ্ডলির আরেক সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়।

সরকারের বর্তমান মেয়াদের পুরো সময়ে মন্ত্রিপরিষদে থাকা জিএম কাদেরকেও সর্বদলীয় সরকারে রাখা হয়।
নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন এরশাদ নিজেও ঢাকা-১৭, লালমনিরহাট-১ ও রংপুর-৩ আসনের মনোনয়নপত্র জমা দেন।
সব দল না আসায় এবং ‘পরিবেশ না থাকায়’ গত ৩ ডিসেম্বর এক নাটকীয় ঘোষণায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান এরশাদ। দলের হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দানকারীদের তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।
নির্বাচন ও সরকার ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ‘অজ্ঞাত স্থানে’ থাকার পর ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এরশাদ।

এরপর ৫ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদেরও পদত্যাগের নির্দেশ দেন তিনি।
জাতীয় পার্টিতে টানাপোড়েনের খবরের মধ্যে ৬ ডিসেম্বর রাত থেকে গুঞ্জন রটে, এরশাদ পদত্যাগ করেছেন এবং জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হয়েছেন তার স্ত্রী রওশন এরশাদ।
ওই দিনই এরশাদ বলেন, তফসিলের মেয়াদ ১০ দিন বাড়ালে এবং সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে নির্দেশ মেনে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের জন্য জাতীয় পার্টির সব সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাকযোগে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে এরশাদের পক্ষ থেকে বলা হলেও এ বিষয়ে সরকারি কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি।
এরপর গত ১২ ডিসেম্বর রাতে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে র্যাবের পাহারায় জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদকে সিএমএইচে নিয়ে যা্ওয়া হয়।

এরপর সরাসরি গণমাধ্যমে এরশাদের আর কোনো বক্তব্য আসেনি।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা মন্ত্রণালয়ের কাজে অংশ না নিলেও গত ১৫ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠকে অংশ নেন দলটির নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও তার দল থেকে ২০ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, যার মধ্যে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদও রয়েছেন। সঠিকভাবে প্রত্যাহারের আবেদন না করায় প্রার্থী হিসাবে রয়ে গেছেন এরশাদও।
দশম সংসদের প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি।

নির্বাচনপন্থী ‘অংশটির’ সঙ্গে এরশাদের স্ত্রী রওশন রয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বের হলেও তিনি নিজে এ বিষয়টি স্পষ্ট করেননি।
তবে তার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক চুন্নু গণমাধ্যমে জানান, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাচ্ছে।
এর মধ্যে ফিরোজ রশীদ নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করেছেন।
নির্বাচনে যাওয়া এবং নির্বাচন বর্জন নিয়ে জাতীয় পার্টিতে সংকটকালীন এই সময়ে ‘বহিষ্কৃত’ সভাপতিমণ্ডলির সদস্য কাজী জাফর গঠন করেন আলাদা জাতীয় পার্টি।
২০০৭ সালে রওশন এরশাদ নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারপারসন দাবি করেন, গোলাম মসিহ।

সোর্স: http://bangla.bdnews24.com     দেখা হয়েছে বার     বুকমার্ক হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।