আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নূহ (আঃ) এর মহাপ্লাবন সম্পর্কে পবিত্র কোরআন কী বলে?

সহীহ বোখারী ও মুসলিম শরীফের সকল হাদিস শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হকের অনুবাদকৃত হাদিস থেকে নেয়া হয়েছে।

হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে প্রায়ই বাইবেল এবং কোরআনের বর্ণনা গুলিয়ে যায়। এই বন্যার কথা পবিত্র কোরআনে আছে- “নূহ আরো বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক!’ পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্যে থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিয় না। ‘তুমি তাঁদেরকে অব্যাহতি দিলে তাঁরা তোমার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুষ্কৃতিকারী ও কাফির” [দ্রঃ সূরা নূহ- ২৬ ও ২৭]।
“অতঃপর আমি তাঁর নিকট ওহী পাঠালাম, ‘তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর।

অতঃপর যখন আমার আদেশ আসবে ও উননু উথলে উঠবে তখন উঠিয়ে নিও প্রত্যেক জীবের এক জোড়া এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে” [দ্রঃ সূরা মু’মিনূন- ২৭]।
“অবশেষে যখন আমার আদেশ এল এবং ভূপৃষ্ঠ উথলে উঠল; আমি বললাম, এতে উঠিয়ে নাও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুইটি, যাঁদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত হয়েছে তাঁরা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে। এবং যাঁরা ঈমান এনেছে তাঁদেরকে” [দ্রঃ সূরা হুদ- ৪০]।
“হে পৃথিবী তুমি তোমার পানি গ্রাস করে নাও। এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও।

এর পর বন্যা প্রশমিত হল এবং কাজ শেষ হল। নৌকা জুদী পর্বতের ওপর স্থির হল এবং বলা হল, যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হোক” [দ্রঃ সূরা হুদ- ৪৪]।
এই আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, যে হযরত নূহ (আঃ) এর পরিবার এবং বিশ্বাসীরা ছাড়া পৃথিবীর সকল মানুষ মহাবন্যায় মারা গিয়েছিল। এখানে পবিত্র কোরআন একটা মহাবন্যার কথা বলেছে। এবং বাইবেল সম্ভবত একটা সার্বজনীন বন্যার কথা বর্ণনা করেছে।

কিন্তু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী সেটা ছিল একটা আঞ্চলিক বন্যা। তবে, এটা ঠিক; দুই বর্ণনাই এখানে একমত, যে বিশ্বাসীরা ছাড়া সকল মানুষ তখন মারা গিয়েছিল। আর তখনকার পৃথিবীতে একটা আঞ্চলিক মহাবন্যাতে সেটা হওয়া অসম্ভবও ছিল না। কারণ তখন মানুষের সংখ্যাই খুব সামান্য ছিল এবং তাঁরা এখনকার মত পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে যায়নি। আপনি যদি বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটা দেখেন, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন।

প্রায় ৫০০ বছর আগেও ক্রিস্টোফার কলম্বাস উত্তর আমেরিকা আবিষ্কারের আগে সেখানকার পুরোটা জুড়ে মানুষের বসবাস ছিল না। এখন সেটা লোকে পরিপূর্ণ। যীশু খ্রিস্টের সময়ে পৃথিবীতে মানুষ ছিল মাত্র ৩০০ মিলিয়ন। তার প্রায় দেড় হাজার বছর পর, সেটা গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৫০১ মিলিয়নে। ১৮০০ সালের দিকে মানুষের সংখ্যা ছিল ৯৮০ মিলিয়ন।

১৯০০ সালে হয় প্রায় ১.৬ বিলিয়ন। ১৯৫০ সালে ২.৫ বিলিয়ন। ১৯৬০ সালে ৩ বিলিয়ন। ১৯৭০ সালে ৩.৭ বিলিয়ন। ১৯৮০ সালে ৪.৪ বিলিয়ন।

১৯৯০ সালে ৫.২ বিলিয়ন। ২০০০ সালে ৬ বিলিয়ন। তারপর এখন প্রায় (+,-)৭ বিলিয়ন। এই পরিসংখ্যান থেকে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়, যে সভ্যতার প্রথম দিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শেষ দিকের তুলনায় খুবই মন্থর ছিল। তার সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, যে প্রায় ৪৮০০ বছর আগে নূহ (আঃ) এর সময়ে খুব কম সংখ্যক মানুষই পৃথিবীতে ছিল এবং তাঁরা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে বসবাস করত না।


এবার মহাপ্লাবনের ভৌগলিক বিবরণে আসি। সুমেরাইনদের প্রাচীন রেকর্ড থেকে জানা যায়, যে টাইগ্রীস নদীর তীরে মাঝ বরাবর খৃস্টপূর্ব ২০০০ শতাব্দীতে Kuti বা Gutu নামে এক সম্প্রদায় বাস করত। সে স্থানটি বর্তমান তুরষ্কের ইড়যঃধহ প্রদেশ (তুরষ্ক, ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্তে)। বর্তমান তুর্কি-সিরিয়ান সীমান্ত এবং ইরাক ও পারস্য পর্যন্ত Ararat পর্বতমালা পর্যন্ত সম্প্রসারিত এই সব শহরগুলি Ararat পর্বতমালার উপত্যকায় অবস্থিত। Judi পর্বতও এই পর্বতমালার অংশ।

এই পর্বতমালার একটা অনুপম বৈশিষ্ট্য যা আর পৃথিবীর কোথাও নেই; সেটা হল, বিরাট লবনাক্ত পানির হৃদ। এসব হৃদের সাথে কোনো নদীর সংযোগ নেই। মনে হয় বিরাট লবণাক্ত পানির অংশ পর্বতের নীচু অংশে আটকে পড়েছে। এগুলোর মধ্যে Lake Van এবং Lake Urumiya প্রধান। যা প্রাচীনকালের কোনো মহাপ্লাবন বা প্রচন্ড বৃষ্টিপাত বা প্রাচীন তুষার যুগের হিমবাহ দ্বারা সংগঠিত হওয়া সম্ভব।

বর্তমানে এসব স্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব কম, এবং হিমবাহ অনুপস্থিত। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, যে ঘটনার সূত্রপাত সম্ভবত প্রাচীনকালেই হয়েছিল। এই স্থানের স্থানীয় পুরুষানুক্রমিক ভাবে হস্তান্তরিত লোক কাহিনী নূহ (আঃ) এর মহাপ্লাবনকেই স্বীকার করে। Josephus, Nestorian, Christians- পূর্বদেশীয় সমস্ত খৃস্টান এবং ইহুদীরাও এই প্রাচীন কাহিনীর ধারণাকে সমর্থন করে। হতে পারে তাঁরা স্থানীয়দের এবং তাঁদের ঐতিহ্যের সাথে সুপরিচিত।


তবে, সার্বজনীন বন্যার দাবী করাটা ভূল। বাইবেলে সেই দাবী থাকলেও; পবিত্র কোরআন এখানে কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে। আর যদি একটা আঞ্চলিক বন্যা হয়, তাহলে সারা পৃথিবীর জীববৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। আর পবিত্র কোরআনে এমন কোনো দাবী নেই, যে আল্লাহ’তায়ালা হযরত নূহ (আঃ) কে সমস্ত পৃথিবীর সকল প্রাণীদের জোড়ায় জোড়ায় নৌকাতে তুলতে আদেশ করেছিলেন। বরং এটা এমন এক কৌশলী বর্ণনা, যে সেই জোড়া জোড়া প্রাণীগুলোকে শুধু হযরত নূহ (আঃ) পোষা প্রাণী বলেও ব্যাখ্যা করা যায়।



অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।