আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

পাহাড়ি বাংলায়-২, বাদুড়গুহার আঁধার দুপুর

চুপচুপে ঘর্মাক্ত অবস্থায় পাহাড়ি হ্রদের ঝিরঝিরে বাতাসে খোলা বারান্দার ছায়ায় বসে গাছপাকা পেঁপে খেতে কী দারুণই না লাগার কথা! তেমনই লাগছিল বটে। সারাটা দিন, সেই ভোর বেলা বান্দরবানে রুমা থানা থেকে ভারী ব্যাকপ্যাক কাঁধে রওনা হয়েছি, পথে চড়াই-উৎরাই, ঝিরি, খাদ, বন ইত্যাদি ইত্যাদি পায়ে দলে (কবিতার মত চলমান সে পথের কথা আরেকদিন হবে) যখন ঘামে ভিজে ছায়ায় জিরোচ্ছি, সাথে মিলেছে ঠাণ্ডা পাকা তুলতুলে পেঁপে,

আর গরম ভাত-ডাল-মুরগীর আশ্বাস, ভাবছি বাংলাদেশের উচ্চতম প্রাকৃতিক এই হ্রদ বগা লেকের সুশীতল জলের আহ্বানে সাড়া দিয়েই উদরপূর্তি করতে বসে যাবো, তখনই পর্বতারোহী এম এ মুহিত জানান দিল বাদুড় গুহা দেখতে হলে এখনই যেতে হবে! গুহা দেখে, ভালো মত ধুলো-ময়লা গায়ে মেখে তারপর হ্রদের জলে রগড়ে রগড়ে গোসল করে ধোঁয়া ওঠা ভাত খাওয়া যাবে !

যাত্রার শুরু থেকে শুনে আসছি এই গুহার কথা, সেটি নাকি এখনো সো কলড পর্যটকদের নাগালের বাহিরে আছে, যাদের কারণে টেলিভিশনে প্রচারিত একাধিক একদা গা ছমছমে বাদুড়ময় গুহাতে এখন বাদুড়ের বদলে মানুষের বিষ্ঠা মেলে, গুহার কোণে থাকে কোল্ড ড্রিংকসের বোতল, সিগারেটের মোথা। গুহাটাও নাকি আজব কিসিমের, পুরোপুরি পাথুরে নয়, বা পাহাড়ের অংশও নয়।

বরং এক ঢালে মাটির মাঝে বিশাল গর্ত দেখে অনেক বছর আগে আমাদের গাইড রুয়াত বম সেখানে ঢুকে এটি আবিষ্কার করেন, মুহিত ভাই এর আগে বার দুই গেছেন গুহার কন্দরে। তাঁর এক কথা, যেতেই হবে বাদুড়গুহাতে, কোনদিন সবাই এর খোঁজ পেয়ে যাবে, দিবে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নীরবতার বারোটা বাজিয়ে।

কী আর করা, যতই ক্লান্ত থাকি, অ্যাডভেঞ্চারের লোভ আছে ষোল আনা। আর উপর বাংলাদেশের গুহা বলে কথা! চললাম সদল বলে সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে। বেশী কিছুক্ষণ উপর দিকে ওঠার পর এক বনের মাঝে দেখি বড়সড় এক গর্ত, সেটিই নাকি গুহামুখ! উঁকি দিয়ে দেখি তা বেশ গভীর, লাফিয়ে নামার বা হাচরে পাঁচরে নামার উপায় নেই। মহা করিৎকর্মা রুয়েত চোখের নিমিষে পড়ে থাকা দুটো বাঁশ বিশেষ ভাবে কেটে এক প্রান্ত দড়ির মত করে বড় এক গাছের সাথে বেঁধে গর্তের কাছে ফেলে, আরও দুটো বাঁশ গুহামুখ থেকে মেঝে পর্যন্ত নামিয়ে বানরের মত তরতর করে নেমে গেল! তারপর পরই আসল আমাদের নামার আহ্বান! মুহিত ভাইও পর্বতের ফাটল দিয়ে নামার ভঙ্গীতে বেশ দ্রুতই নেমে গেলেন,

আমিই একটু ধীরে সুস্থে পৌঁছালাম সেই তলদেশে, এবং সাথে সাথে নাচ কুঁচকে ফেললাম অ্যামোনিয়ার বোটকা গন্ধে, যার উৎস বাদুড়ের বিষ্ঠা!

গুহার এক দিকে কয়েক মিটার এগোতেই তা সরু হওয়া শুরু করল, সেই সাথে ইতস্তত বেরিয়ে আসা শুরু করল বিরক্ত হওয়া কিছু বাদুড়। খানিক পরেই হাঁটু ভাঁজ করে এগোলে থাকলাম তিন জনে, অবশ্য তার আগেই হেড ল্যাম্প জ্বালিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

কয়েক মুহূর্ত পরেই সূর্যের ঝকঝকে রোদ আড়ালে চলে গেল, আর আমাদের গেরিলা ট্রেনিঙের মত হাতে –বুকে ভর দিয়ে এগোতে হল বেশ কিছুক্ষণ,

যখন মনে হল আর মা ধরিত্রী আরেকটু চেপে বসলেই তার ফাঁক দিয়ে গলতে পারব না, তখনই দুই পাথরের মাঝে ব্যবধান বাড়তে শুরু করল। অবিশ্বাস্য মনে হলেও দাঁড়ানো সম্ভব হল নিজের পায়ে, আসলে সরু পথে শেষে আমরা একটু বেশ বড়সড় চেম্বারে প্রবেশ করেছি। এর মধ্যেই ভ্যাঁপসা গরমে দরদর করে ঘেমে একাকার অবস্থা।

বাদুড়ের রাজ্যে তখন বিশাল তোলপাড়, যেদিকেই আলো ফেলা হয় সেদিকেই উড়ন্ত বাদুড়। সেই আলো-ছায়ায় False Vampire Bat ও আরেকটা অল্প বৃহদাকৃতির বাদুড়ই চোখে পড়ল।

যদিও বাদুড় খেতে আসা সাপ চাক্ষুষ করেছেন মুহিত ভাই দুই বার। সেই সাথে বড়সড় শতপদী, নানা পোকামাকড়।

এই ভূগর্ভস্থ গুপ্ত স্থান কতটা আঁধারময়? সেটা জানার কৌতূহলে যেই না সকল টর্চ একসাথে বন্ধ করেছি, ব্যস- কালো রঙে ছেয়ে গেল আমাদের মহাবিশ্ব। চোখের সামনে আনলেও নিজের হাত দেখা যায় না সেই সূচীভেদ্য আঁধারের রাজ্যে। ফের সাতজলদি জীবনদায়িনী আলোক ফিরিয়ে আনা হল।

এই বিশাল উঁচু প্রাকৃতিক প্রকোষ্ঠটি ঠিক পাথুরে নয়, বরং শিলীভূত মাটি নরম স্তরে স্তরে অবস্থান করে সৃষ্টি করেছে। তাই বেশী টানা হ্যাচড়া করলে মাটি ধ্বসে জীবন্ত সমাধি হবার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এর অন্য পাশে আরেকটি সরু পথ, যেখানে রুয়েত আগে প্রবেশ করে দেখেছে অন্য চেম্বার। কিন্তু আজ আমাদের ফেরার পালা, সেই একই পথ ধরে, বুকে ক্রল করে, সত্যিকার ভাবে ধুলিস্নান করে, ফের গুহামুখে। ইশ, সূর্যের পুড়িয়ে দেওয়া আলোকেও এখন কত আপন মনে হচ্ছে, ভালো লাগছে গাছের পাতা, পাখির কলতান- যা যা দেখা যায় এই গর্তের তলদেশ থেকে।

আবার একে একে উঠতে হল গুপ্ত গুহা থেকে, আমি জানি বেশী দিন এই সমস্ত স্থানগুলো লুকিয়ে থাকবে না বাংলার তরুণ-তরুণীদের থেকে, শুধু মনে রেখেন সেখানের প্রাকৃতিক পরিবেশের কোন ক্ষতি করবেন না দয়া করে, আর বাহিরের ময়লা নিয়ে এই জায়গাগুলোতে ফেলবেন না।

সোর্স: http://www.sachalayatan.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।