আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আজ হিমুর মন খারাপ

ব্লগার না পাঠক হওয়ার চেষ্টায় আছি রাতের বেলায় একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখলাম। ঘুমের ঘোরেই রাত দুইটার দিকে মনে হল খাটের নিচে কে একজন বসে আছে। এই রাত্রিরে বন্ধ রুমে খাটের নিচে কে লুকিয়ে থাকবে চিন্তা করে পেলাম না। বাইরে রীতিমত তুফান হচ্ছে। বাতাস আছড়ে পড়ছে জানালার উপরে।

ভাগ্যিস জানালা বন্ধ ছিল, তা না হলে রুমে যা আছে সব উড়ে যেত! আমার মনে হল আজরাইল (আঃ) খাটের নিচে বসে আছেন! ওখান থেকে তিনি বলছেন, “মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু!” ভয়ানক অবস্থা। খাটের পাশে হাতড়ে লাইটের সুইচ জ্বাললাম। লাইট জ্বলল না। বুঝলাম ইলেক্ট্রিসিটি নেই। ঢাকা শহরের এই এক আজীব সমস্যা।

একটু দমকা হাওয়া বইলেই কারেন্টের লোকজন কারেন্ট নিয়ে যায়। ভাবখানা এমন যেন ঝড়ে সব উড়ে যাবে! আমার মনে হয় কারেন্ট নেওয়ার জন্য সামান্য বাতাস একটা উছিলা মাত্র। পাঁচমিনিটের মত ঝিম মেরে বসে রইলাম। তারপর বালিশের পাশে রাখা একটা ম্যাচ ধরালাম। ম্যাচের আলোয় রুম সামান্য আলোকিত।

আলোকিত রুমে একটা মোম খোঁজে পেলাম। মোম জ্বাললাম। মোম জ্বালানোর পর আজরাঈলের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। তবে ক্ষীণ একটা সন্দেহ, খাটের নিচে কি উনি এখনও বসে আছেন? হিমুরা অহেতুক সন্দেহ করে না। কাজেই এক গ্লাস পানি খেয়ে মোম নিভিয়ে দিলাম।

হঠাত করেই মনে হল জানালা খুলে দেখি। জানালা খুললাম। বাতাস এসে হালকা ঝাপ্টা দিল মুখে। খুবই সামান্য বাতাস। বৃষ্টি পড়ছে।

বাতাসের ঝাপ্টায় সামান্য বৃষ্টি এসে আমাকে ভিজিয়ে দিল। অদ্ভুত অনুভূতি। আমার হঠাতই মনে হল প্রকৃতি ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গ। তার নিঃসঙ্গতা যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখনই সে তার প্রবল দুঃখগুলোকে বৃষ্টি হয়ে ঝড়িয়ে দেয়। অনেক মানুষই প্রকৃতির এই নিঃসঙ্গতাকে ধরতে পারে না।

কিংবা প্রকৃতিই হয়ত তার নিঃসংঙ্গতাকে বুঝতে দেয় না। এইসব সাত পাঁচ ভেবে হঠাতই মনে হল বাইরে থেকে হেঁটে আসলে কেমন হয়। কিন্তু সাথে সাথে এই ভাবনাকে বাদ দিলাম। সব ভাবনাকে পাত্তা দিলে চলে না। আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে মনে হয় বেশ বেলা হয়ে গেল। পুবের এক কবাট খোলা জানালা দিয়ে চোখে বেশ ভাল মত আলো এসে পড়ছে। সেই আলোতে আরমোড়া দিয়ে ঘুম ভাঙ্গল। মেসে মনিরের নাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা। ছোকড়া নতুন এসেছে।

রুমে ঢুকেই কেন জানি ভয় ভয় চোখে তাকায়। দেখলেই মনে হয় কি নেয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। একদিন তাকে এ ব্যাপারে কিছু বলব বলে ঠিক করেছি। আজই বলব। কিন্তু ছোকড়াটা গেল কই? রুম থেকে বের হয়েই আজমল সাহেবের সাথে দেখা।

উনার হাতে বাংলাদেশের বহুল প্রচলিত দৈনিক প্রথম আলো! উনি আমার পাশের রুমে থাকেন উনার শালার সাথে। মেসের একমাত্র অস্থায়ী বাসিন্দা। বাসা থেকে ঝগড়া করে প্রায় প্রতি মাসে দুই-তিনদিনই উনার মেসে থাকা হয়। বয়স ৫০ এর বেশি। এত্ত বৃদ্ধ বয়সেও উনার ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণ আমি ঠিক ধরতে পারি না।

তাছাড়া উনার একটি ভয়ঙ্কর অদ্ভুত স্বভাব আছে। যাকে সামনে পান তার সাথেই খাতিরের আলাপ শুরু করেন। এমনকি যার সাথে উনার প্রথম দেখা হয় তার সাথেও তিনি এমন ভাবে কথা বলেন যিনি তার দীর্ঘদিনের পরিচিত। -হিমু সাহেব, ভাল আছেন? আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। সাথে সাথেই উনি প্রবল আগ্রহে বললনে, ভাই পদ্মা সেতু হবে কিনা বলেন? হকচকিয়ে যাওয়া আমার স্বভাবের বাইরে।

কিন্তু উনার এই প্রশ্ন শুনে আমি যে শুধু হকচকিয়ে গেলাম তাই না বিদ্যুতের খুটির মত খাম্বা হয়ে দাঁড়ায়ে গেলাম। উনি আবারো বললেন, সেতু কি হবে? আমি মনে মনে বললাম, আমি এবার বুড়ার কথার জালে আটকে পড়েছি। লেকচার আমাকে শুনতেই হবে। কিন্তু সেতু হলেই বা বুড়ার কি আর না হলেই কি! বুড়া নিশ্চয়ই সেতু থেকে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবেন না! আমি কিছু না বলে একটা রহস্য হাসি দিলাম। এ হাসির দুই ধরণের অর্থ আছে।

একটি হল হবে। দুই নাম্বার হল হবে না! আমার এই হাসির অর্থ আজমল সাহেব ধরতে পেরেছেন কি না কে জানে। তিনি চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে পদ্মা সেতুর ব্যাখ্যা দিলেন। প্রথমে তিনি সরকারী দিক থেকে ব্যাখ্যা দিলেন। তারপর দিলেন বিরোধীদলীয় দৃষ্টিকোন থেকে।

অতঃপর দিলেন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। সব ব্যাখ্যা করার পর তিনি দূর্নীতিবাজদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা দিলেন। সব ব্যাখ্যা শুনার পর আমি উনাকে বললাম, “”ভাইসাব, বাজে কয়টা?” উনি বললেন সাড়ে দশটার কিছু বেশি। আমি উনাকে বিদায় বলে বাইরে চলে এলাম। খানিকক্ষণ রোদে হাটাহাটি করলাম।

বিজ্ঞানীরা বলেন রোদে নাকি ভিটামিন ডি আছে। গায়ে একটু ভিটামিন লাগিয়ে দেখি কিছু হয় কি না! সকাল থেকেই মনে ক্ষীণ সন্দেহ বাদলদের বাসায় কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে একটা চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মজনু হাঁক দিল, “হিমু বাই, ও হিমু বাই। ” আমি দোকানের কাছে গেলাম। হাসিমুখে মজনুকে বললাম, খবর সব ভাল তো? মজনু বলল জি, আপনার দোয়ায় ভাল।

মজনু চা বানিয়ে দিল। চায়ের কাঁপে প্রথম চুমুক দেওয়ার সাথে সাথে দেখলাম তিনটা হুন্ডায় ছয়জন লোক এসে মজনুর দোকানে ঢুকল। মজনু সাথে সাথে কথা না বলেই টাকা দিয়ে দিল। আমি তখন হুন্ডা ভাইদের উদ্দেশ্যে বললাম, “পদ্মা সেতুর জন্য নাকি?” তাদের দলপতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। আমি সেই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলাম।

তাদের প্রস্থানের সাথে সাথেই মজনু বলল, “দুকান চালানোর লাইগা উনাগো টেকা দেওন লাগে। ” আমি নিঃশব্দে মাথা নাড়লাম। দোকানের বাইরে রাখা আরেকটি বেঞ্চে দুইজন মাঝারি বয়সের লোক এসে বসল। চা খেতে খেতে একজন হঠাত করেই বলল, “মেয়েছেলের কারবার দেখেন। কি কাপড় পড়ছে।

এর চেয়ে না পড়লেই ভালা হইত। ” আরেকজন খিলখিল করে হসে উঠল। আমি মাথা ঘুড়িয়ে দেখলাম একটা ফতুয়া আর জিন্স পড়ে একটা মেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে বিশালাকৃতির সানগ্লাস। আমি চা শেষ করে মজনুর দোকান থেকে বিদায় নিলাম।

এখানে বসে বসে “মেয়েছেলের কারবার” দেখার চেয়েও আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। প্রখর রোদের ভেতর হাঁটতে লাগলাম। এক সময় চার রাস্তার মাথায় এসে দেখলাম এক ট্রাফিক সার্জেন্ট ব্যস্ত ভঙ্গিতে জ্যাম ছুটানোর চেষ্টা করছেন। একদিকের রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছেন তো অন্য তিন দিকের রাস্তায় বিশাল জ্যাম লেগে যাচ্ছে। আমি আস্তে করে সার্জেন্টের কাছে গেলাম।

রোদে উনার অবস্থা কাহিল। একটা পেপার উনার মাথার উপরে ধরলাম। হতভম্ব সার্জেন্ট ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। ভুলে তিনি চার দিকের গাড়িই বন্ধ করে রেখেছেন। সবদিকেই বিশাল জ্যাম লেগে গেল।

গাড়ির ড্রাইভারেরা সমানে হর্ণ দিয়ে যাচ্ছে। রিকশাওয়ালারা চিল্লাচ্ছে। আমি নির্বিকার। সার্জেন্ট হতভম্ব! সার্জেন্টকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে বাদলদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাদলের বাসায় ঢুকেই দেখলাম এক তন্ত্র সাধক কার্পেটে বসে আছে।

বাদল তার সেবা শুশ্রুষা করছে। মাজেদা খালা সাধক বাবাজীর জন্য নানা পদের খাবার রান্না করছেন। খালুর রুমে ঢুকা কঠিন ভাবে নিষিদ্ধ হলেও আমার ডাক চলে এল। ঘটনা ঠিকমত না বুঝলেও আমি একান্ত অনুগত ছেলের মত খালুর রুমে চলে গেলাম। রুমে ঢুকেই আমি মোটামোটি টাস্কি খেলাম।

খালুর বয়স যেন হঠাত করেই ভয়ানক বেড়ে গেছে। খালু প্রবল চিন্তিত ভঙ্গিতে আমার দিকে ঝুঁকে এসে বলল, “ঘটনা দেখছ? তোর খালার মাথা তো পুরা গেছে! কোথা থেকে সাধক নিয়ে আসছে? শালীর বাচ্চা! থাব্রায়ে তন্ত্র সাধণা শিখাব। শালী আমার জীবনটাকে ধ্বংস করে দিছে। ” খালু অধিক উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। আমি শান্ত ভঙ্গিতে খালুর রুম থেকে বের হলাম।

দুপুরে বেশ আয়েশ করে তন্ত্র বাবার জন্য রান্না খাদ্যে ভাগ বসালাম। বিশাল ব্যবস্থা। অনেক পদ টাচই করতে পারলাম না। খাওয়ার পর বাদলের রুমে গিয়ে বসলাম। বাদল মহা উৎসাহের সাথে তন্ত্র বাবার গুণাগুণ করতে লাগল।

বাবা নাকি সব কিছু তার তন্ত্র সাধনা দিয়ে বের করে ফেলতে পারে। তবে এই তন্ত্র বাবার জন্য নাকি বাদলের বাবা তার স্ত্রীর সাথে ভয়ঙ্কর খারাপ ব্যবহার করছেন। আমি তন্ত্র বাবার নানা গুণের কথা শুনতে শুনতে বাবার একজন ভক্ত হয়ে গেলাম! বিকেলে তন্ত্র বাবার কাছে গিয়ে বললাম “বাবা, আমার বউয়ের আজ বিয়ে। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন অন্যত্র বিবাহ করছে।

ওকে কি আর ফিরিয়ে আনা যাবে?” বাবা বেশ কিছুক্ষণ সাধণা করে কোয়েকাহাফ শহর থেকে আগত জ্বীন কফিলের মাধ্যমে জানালেন আমার বউয়ের বিবাহ শেষ পর্যন্ত আর হবে না। সে বাসায় তার জামাইয়ের নিকট ফেরত আসবে। আমি তখন বাবাকে ধীরে ধীরে বললাম, “বাবা, কফিল কোন জায়গায় হয়ত ভুল করেছে। ” বাবা রুক্ষ স্বরে চিল্লায়ে বললেন, কফিল কখনই ভুল করে না। তখন আমি আস্তে আস্তে বললাম, বাবা এখনও আমার নিকাহ হয় নাই।

বাবা কিছুটা সময় তব্দা মেরে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসা থেকে তন্ত্র বাবার বিদায় হল। যেই খালা চিল্লায়ে বাবাকে বাসায় এনেছেন সেই খালাই বাবাকে বিদায় জানালেন। খালুর সাথে মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে লাগলেন। বাদল আমাকে বারবার বলছে রাতে তার সাথে থেকে যেতে।

খালুও বলছেন থেকে যেতে। আশ্চর্য! কে বলবে কিছুক্ষণ আগেও খালার সাথে খালুর প্রবল ঝগড়া হচ্ছিল। আমি আস্তে আস্তে খালার বাসা থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে জ্যোৎস্না না। তারপরও বেশ ভাল চাঁদের আলো।

রূপাদের বাসার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। মনে হল রূপা জানালার শিকে হাত দিয়ে আমাকে দেখছে। প্রবল মায়ায় আমাকে বাঁধতে চাইছে। কিন্তু হিমুরা বন্ধন থেকে মুক্ত হয়। কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতেই মন ভয়ানক খারাপ হয়ে গেল এটা ভেবে যে মৃত্যুর পরও কি এই ঘোর লাগা জগত পাওয়া যাবে? প্রকৃতি কি তখন বিশেষ কোন ব্যবস্থায় ভয়ঙ্কর মায়া সৃষ্টি করবে যে মায়া কেবল হিমুরাই ভাঙ্গতে পারে? কে জানে! আমি হাঁটতে থাকি।

আবছা চাঁদের আলোয় হাঁটতে খারাপ লাগছে না...... পুনশ্চঃ আমার অতি ক্ষুদ্র জীবনে অনেক লেখকের বই পড়লেও কেন জানি হুমায়ুন স্যারের বই আমাকে তীব্র ঘোরের ভেতর ফেলে দেয়। কারণটা আজও ধরতে পারি নি। কিসের জন্য হিমুকে নিয়ে একটা গল্প লিখে ফেললাম তাও জানি না! আমি জানি আমি মোটামোটি অখাদ্য গল্প লিখে ফেলেছি। ভয়ঙ্কর অখাদ্য এই গল্প লেখতে আমার বাঁধে নি কারণ গল্প লিখতে লিখতেই মন ভাল হয়ে গেছে। আর মাঝে মাঝেই পাঠকদের অখাদ্য লেখা পড়া লাগে যাতে করে তাঁরা ভাল এবং খারাপ লেখার মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারেন।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।