somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তসলিমা নাসরিনের কয়েকটি কবিতা

০১ লা আগস্ট, ২০১২ দুপুর ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অভিমান

কেউ জানে না
জীবন ঝরে যায় বার্চের পাতার মতো,
আর পায়ে মাড়িয়ে যে যার গন্তব্যে চলে যায়, পেছন ফেরে না, শরীরে জমতে থাকে বরফের চাঁই, পাথর।

চিৎপুরে কিংবা আরমানিটোলার গলি হলে কেউ নিশ্চয় আহা
বলত
পলাশির রাস্তায় ভিড় হত, গাড়িঘোড়া শ্লথ হত শ্যামবাজারে,
নীলক্ষেতে।
জীবন উড়ে যায় দুরন্ত সি-গালের মতো, কেউ জানে না কোথায়,
পেছনে কেউ হাত নাড়ে না, কেউ জল মোছে না আঁচলে বা শার্টের
হাতায়,
কেউ মাথার দিব্যি দিয়ে বলে না ফিরে এসো।

জীবন পড়ে থাকে ফুটপাতে শুকনো ফুলের মতো, সিগারেটের
ফিলটারের মতো,
কাগজের ঠোঙার মতো,
পেছন ফেরে না কেউ, শরীরে জমতে থাকে শ্যাওলা, ব্যাঙের ছাতা।
ঝরে যেতে থাকি বার্চের পাতার মতো, পড়ে থাকি ঘোর অন্ধকারে
কে আর আলো জ্বেলে বলবে- বাঁচো!
এ তো আর বোলপুর নয়, বনানী বা বঙ্গবাজারের মোড় নয়।


অস্বীকার

ভারতবর্ষ কোনও বাতিল কাগজ ছিল না যে তাকে ছিঁড়ে টুকরো
করতে হবে।
সাতচল্লিশ শব্দটিকে আমি রবার দিয়ে মুছে ফেলতে চাই।
সাতচল্লিশের কালিকে আমি জল সাবান দিয়ে ধুয়ে দিতে চাই।
সাতচল্লিশ নামের কাঁটা গলায় বিঁধছে, এই কাঁটা আমি গিলতে চাই না,

উগরে দিতে চাই
উদ্ধার করতে চাই আমার পূর্বপুরুষের অখণ্ড মাটি।

আমি ব্রহ্মপুত্র যেমন চাই, সুবর্ণরেখাও চাই
সীতাকুণ্ড পাহাড় চাই, আবার কাঞ্চনজঙ্ঘাও চাই।
শ্রীমঙ্গল চাই, জলপাইগুড়িও।
শালবন বিহার চাই, আবার ইলোরা অজন্তাও।
কার্জন হল যদি আমার, ফোর্ট উইলিয়ামও আমার।
একাত্তরে যে মানুষ যুদ্ধ করে
জয়ী হয়,
দ্বিজাতি তত্ত্বকে ঠেঙিয়ে বিদেয় করে-
সাতচল্লিশের কাছে সে মানুষ পরাজিত হয় না কখনও।


মৃত্যুদণ্ড

এই আমি দাঁড়ালাম
শরীরে কোনও অসুখ আছে কি না পরীক্ষা করুন। শেষ স্নান করিয়ে দিন।
আখেরি ইচ্ছে-টিচ্ছের কথা জিজ্ঞেস করুন-
আপনারা তো এমন কথাই জিজ্ঞেস করবেন, কী আমার খেতে ইচ্ছে করে
বিরুই চালের ভাত? গলদা চিংড়ি? কই ভাজা? তেঁতুলের আচার? সর্ষেবাটা ইলিশ
কাকে দেখতে ইচ্ছে করে, বাবা মা? ভাই বা বন্ধু? খুব কাছের কোনও মানুষ?

না, এরকম কোনও ইচ্ছে আমার করবে না,
এসবের কিছুই না চেয়ে
আমি এমন একটি ইচ্ছের কথা বলব যে আমি জানি আপনারা চমকে উঠবেন।
আমি যদি বলি একটি সেকুলার পৃথিবী চাই, দেবেন?
অথবা যদি চাই শস্যখেতের সব আল ভেঙে যাক, কাঁটাতার সীমানা আর
দেশে দেশে দেয়াল ধসে যাক।
যদি চাই কোনও শ্রেণী নেই, নারী ও পুরুষে বৈষম্য নেই, ধর্ম নেই, দেবেন?
দেবেন তেমন একটি সুন্দর জগৎ আমার চোখের সামনে?

দিলে আমি হেসে ঝুলব ফাঁসিকাঠে
দিলে আমি মাথা পেতে নেব মৃত্যুদণ্ডাদেশ,
তা না হলে ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে আমি বেরিয়ে যাব, আবার বাঁচব।
বেঁচে আমি স্বপ্ন বপন করব একভাগ মাটি আর তিনভাগ জলে।


চরিত্র

তুমি মেয়ে,
তুমি খুব ভাল করে মনে রেখো
তুমি যখন ঘরের চৌকাঠ ডিঙোবে
লোকে তোমাকে আড়চোখে দেখবে।
তুমি যখন গলি ধরে হাঁটতে থাকবে
লোকে তোমার পিছু নেবে, শিস দেবে।
তুমি যখন গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠবে
লোকে তোমাকে চরিত্রহীন বলে গাল দেবে।

যদি তুমি অপদার্থ হও
তুমি পিছু ফিরবে
আর তা না হলে
যেভাবে যাচ্ছ, যাবে।


প্রত্যাশা

কারুকে দিয়েছ অকাতরে সব ঢেলে
সেও অন্তত কিছু দেবে ভেবেছিলে।
অথচ ফক্কা, শূন্যতা নিয়ে একা
পড়ে থাকো আর দ্রুত সে পালায় দূরে
ভালবেসে কিছু প্রত্যাশা করা ভুল।

আলোকিত ঘর হারিয়ে ধরেছ অন্ধকারের খুঁটি
যারা যায় তারা হেসে চলে যায়, পেছনে দেখে না ফিরে।
তলা ঝেড়ে দিলে, যদিও জোটেনি কানাকড়ি কিছু হাতে
তুমি অভুক্ত, অথচ তোমার সম্পদ খায় তারা
যাদের বেসেছ নিংড়ে নিজেকে ভাল।

ঠকতেই হবে ভালবেসে যদি গোপনে কিছুর করো
প্রত্যাশা কোনও, এমনকি ভালবাসাও পাবার আশা।
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=কবিতাগুলো যেনো এক একটি মধুমঞ্জুরী ফুল=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৩ ই মে, ২০২৪ বিকাল ৪:২০



©কাজী ফাতেমা ছবি
মনের মাধুরী মিশিয়ে যে কবিতা লিখি
কবিতাগুলো যেনো আমার এক একটি মঞ্জুরী লতা ফুল,
মনের ডালে ডালে রঙবাহারী রূপ নিয়ে
ঝুলে থাকে কবিতা দিবানিশি
যে কবিতার সাথে নিত্য বাস,
তাদের আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে দেখা - ১৩ মে

লিখেছেন জোবাইর, ১৩ ই মে, ২০২৪ রাত ৮:০৩

১৩ মে ২০০৬


দমননীতির অদ্ভুত কৌশল
সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের ওপর দমন নীতির আশ্রয় নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্রুত বিচার আইন ও পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে দমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাঁচা আম পাড়ার অভিযান

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৩ ই মে, ২০২৪ রাত ১০:৩২



গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরের বাড়ীয়া ইউনিয়নের দেউলিয়া গ্রামে আমার প্রায় ৫২ শতাংশ জমি কেনা আছে। সেখানে ছোট একটি ডোবা পুকুর, অল্প কিছু ধানের জমি আর বাকিটা উঁচু ভিটা জমি। বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কেন এমন হলাম না!

লিখেছেন সায়েমুজজ্জামান, ১৪ ই মে, ২০২৪ সকাল ৯:৪১


জাপানের আইচি প্রদেশের নাগোইয়া শহর থেকে ফিরছি৷ গন্তব্য হোক্কাইদো প্রদেশের সাপ্পোরো৷ সাপ্পোরো থেকেই নাগোইয়া এসেছিলাম৷ দুইটা কারণে নাগোইয়া ভালো লেগেছিল৷ সাপ্পোরোতে তখন বিশ ফুটের বেশি পুরু বরফের ম্তুপ৷ পৃথিবীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি

লিখেছেন প্রামানিক, ১৪ ই মে, ২০২৪ দুপুর ১:৩১



২৬শে মার্চের পরে গাইবান্ধা কলেজ মাঠে মুক্তিযুদ্ধের উপর ট্রেনিং শুরু হয়। আমার বড় ভাই তখন ওই কলেজের বিএসসি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র ছিলেন। কলেজে থাকা অবস্থায় তিনি রোভার স্কাউটে নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×