আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

পকেট-মানিব্যাগ সাবধানঃ 'পদ্মা সেতু'র 'ফান্ড' সংগ্রহ করবে ছাত্রলীগ!

মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোন সুযোগ নয়, অধিকার। গত পরশু সন্ধ্যা ৭টায় একটি বেসরকারি টেলিভিশ চ্যানেলের খবরে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সদস্য সংগ্রহ অভিযান কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে জাতীয় সংসদের উপনেতা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলছেন,‘বিশ্বব্যাংক টাকা দেয় নাই, তাতে কী হয়েছে? প্রয়োজনে নিজেরা ফান্ড গঠন করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করব। আমরা বিশ্বব্যাংকের তোয়াক্কা করি না। বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই যে বাংলাদেশ পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারে তা আমরা দেখিয়ে দিতে চাই। আমরা আমাদের নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করব।

ছাত্রলীগের কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলছেন, তোমরা আমাদের নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাহস জোগাবে। খুবই আশাবাদী ও আত্মমর্যাদাশীল বক্তব্য এবং উদ্যোগ। কিন্তু ‘দরকার হলে এক বেলা বাজার করব না উক্তিটি আমাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন ও বিস্মিত করেছে এবং মনে কিছু প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে। একবেলা বাজার না করে জমানো টাকা দিয়ে যদি পদ্মা সেতু করা যায়, তাহলে তিনি বা তার মন্ত্রীসভার সদস্যরা কত টাকার বাজার করেন? আর তার এই আহ্বান যদি দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি হয়ে থাকেঃ তাহলে প্রশ্ন জাগে - - দ্রব্যমূল্যের চাপে যে দেশের অধিকাংশ মানুষ বাজারে যেতেও এখন ভয় পান, প্রয়োজনের চেয়ে কম বাজার করতে পারেন, সেই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একবেলা বাজারে না যাওয়ার আহ্বান করা কি তাদের সাথে ঠাট্টা-মস্করার পর্যায়ে পড়েনা? তাছাড়া, - দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা আপামর এই জনসাধারণকে এই আহ্বান না জানিয়ে যে দুইচারজন ব্যক্তির জন্য বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর চুক্তি বাতিল করেছে, পুরোজাতিকে লজ্জিত করেছে, এত বড় সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিয়ে এর সমাধান করলেই কি ভালো হতোনা? মিসেস চৌধুরীর আরও একটি উক্তি যা আমাকে শুধু উদ্বিগ্নই করেনি, ভীত সন্ত্রস্তও করেছে তা হলো- তিনি ছাত্রলীগের কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তোমরা পদ্মা সেতুর জন্য তহবিল সংগ্রহ করবে। মিসেস চৌধুরীর মুখে এ কথা শোনার পর আঁতকে ওঠলাম।

যে ছাত্রলীগ চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজি,ছিনতাই,অবৈধ ছাত্রভর্তি প্রভৃতি নিয়ে প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হয়; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হয়ে সংগঠনটির মূল নেত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই ছাত্রলীগকেই পদ্মা সেতুর তহবিল সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে! জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জোবায়েরসহ দুই ছাত্রকে হত্যা, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এক ছাত্রের মৃত্যু; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিরীহ ছাত্র আবুবকর সিদ্দিকের মৃত্যুর সংবাদ এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই এই সরকারের আমলেই কমপক্ষে আটজন ছাত্র নিহত হওয়ার খবর আমি পত্রিকায় পড়েছি। একটি পলিটেকনিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলে ছাত্রলীগের এক কর্মী কর্তৃক অন্য গ্রুপের কর্মীকে চাপাতি দিয়ে সিনেমা স্টাইলে কোপানোর দৃশ্য এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মিছিলে না যাওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে সাধারণ ছাত্রদেরকে প্রচণ্ড শীতে রাত দুইটায় হল থেকে বের করে দেওয়া; পরীক্ষায় পাশ না করানোয় অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্তৃক শিক্ষককে লাঞ্চিত করে ক্যাম্পাসে ব্যাপক ভাংচুর করে সেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া; মোবাইল ফোনে ওয়াজ শোনার অপরাধে গত(২০১১) বিজয় দিবস রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ কনস্টেবলকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা; ডিসিসিকে দুইভাগ করার প্রতিবাদে ডাকা হরতালের দিন ডিসিসির সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার উপর ছাত্রলীগের আক্রমণ; দলীয় অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য শিল্পী এনে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টাসহ ছাত্রলীগ কর্তৃক ঘটানো হাজারো ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে পত্রিকার পাতা গুলো। তাছাড়া, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা সেঞ্চুরিয়ান মানিক তো বাংলাদেশের ইতিহাসেই স্থান করে নিয়েছে।

পত্রিকায় খুঁজে আজকেও ছাত্রলীগ নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদন পেলামঃ চাঁদাবাজির অভিযোগে চকবাজার থানার ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর চকবাজার থানার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদ লিটনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মারধর, হামলা ভাঙচুরের পর ছাত্রলীগের আবদার! সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের এক ছাত্রকে প্রথমে মারধর করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। কলেজের অধ্যক্ষ ওই ছাত্র ও মারধরে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগের এক নেতাকে আটকে রেখে ডাকেন তাঁদের অভিভাবকদের। বিষয়টি জানার পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছিনিয়ে নেন ওই নেতাকে। ভাঙচুর করেন অধ্যক্ষের কার্যালয়সহ বিভিন্ন কক্ষ।

বুধবারের এই ঘটনার পর উল্টো অধ্যক্ষের অপসারণের দাবিতে কলেজে ধর্মঘট ডাকেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ধর্মঘট অমান্য করে শিক্ষকেরা পরদিন বৃহস্পতিবার ক্লাস নেওয়া শুরু করলে এবার সাভার ‘হকার্স লীগের’ নেতা-কর্মীদের নিয়ে কলেজে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। বাধা দিলে লাঞ্ছিত করে শিক্ষকদের। রংপুরে সাংবাদিক শিশিরকে পেটাল ছাত্রলীগ কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ ড. দীপ কেন্দ্রনাথ দাসের বদলির আদেশ বাতিলের জন্য কলেজ শাখা ছাত্রলীগ কর্তৃক ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চালাকালে বেলা ১টার দিকে ছাত্রলীগ টেন্টের পাশ দিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য যাওয়ার কলেজের ছাত্রলীগ সভাপতি রাফিউল ইসলাম রাফির নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগ হামলা চালিয়ে সাংবাদিক শিশিরকে পিটিয়ে তার মোটরসাইকেলটিও ভাংচুর করে। বিএনপির ডাকা গত ১২ মার্চের মহাসম্মেলনে যোগদান করতে আসা মানুষেকে বাঁধা দিতে পুলিশের পাশাপাশি তল্লাশি করতে নেমে চেকপোস্ট বসিয়ে ছত্রলীগ কর্তৃক যাত্রীদের ব্যাগ,মানিব্যাগ, পকেট চেক করে মানিব্যাগের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর পত্রিকায় পড়েছি।

কিছু দৃশ্য বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের খবরেও দেখেছি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্তৃক ছাগল চুরি নিয়ে দুই দিন আগে 'দৈনিক আমাদের সময়' পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে দেখেছি। এই ছাত্র লীগকেই যদি পদ্মা সেতুর তহবিল সংগ্রহ করার দায়িত্ম দেওয়া হয় অর্থাৎ পদ্মা সেতুর তহবিল সংগ্রহের লাইসেন্স দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের পরিণতি কি হবে তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এই প্রসঙ্গে, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে এক প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক পিয়াস করিম বলেছেন- যে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজিতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ট, তাদেরকেই যদি পদ্মা সেতুর জন্য চাঁদা আদায়ের লাইসেন্স দেওয়া হয় তখন কি পরিস্থিতি হবে তা কল্পনাই করতে পারছিনা। তিনি পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেছেন- আপনার বাসার গেটে এসে যদি ছাত্রলীগের কর্মীরা বলে পদ্মা সেতুর তহবিলের জন্য চাঁদা নিতে এসেছি, চাঁদা দেন; তখন আপনি কি বলবেন? লাইসেন্স পাওয়ার পর ফার্মগেট, শাহবাগ, মহাখালী, নিউমার্কেট, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, পল্টন, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা সেতুর তহবিল সংগ্রহের চেকপোস্ট বসাতে পারে; চাঁদার জন্য আপনাদের বাসার গেটে এসে কড়া নাড়তে পারে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সুতরাং, প্রিয় ব্লগার ও ভিজিটর ভাই বোনেরা আপনাদের পকেট-মানিব্যাগ-পার্স-ডেবিট কার্ড-ক্রেডিট কার্ড সাবধান! ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।