আমি যদি হতাম বনহংস;বনহংসী হতে যদি তুমি;কোনো এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারেধানক্ষেতের কাছেছিপছিপে শরের ভিতরএক নিরালা নীড়ে; রুম থেকে তৈরি হয়ে লবিতে নামতে নামতে ৫টা ১৫ বেজে গেল। ভাবছি এয়ারপোর্টে পৌছেতে দেরি না হয়ে যায়। ম্যারিয়ট নিউ অরলিন্সের সুবিশাল লবি। ফ্রন্ট ডেস্কে কি কার্ডটা জামা দিয়ে ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস প্রিন্ট করার জন্য কম্পিউটার টার্মিনালের দিকে এগোতেই পিছনে শুনতে পেলাম,
- শুভ সকাল স্যার। আমি কি তোমার ব্যাগ গাড়িতে তুলে ফেলব?
তাকিয়ে দেখি ষাটোর্ধ বয়েসের ছোটখাট একজন ভদ্রলোক।
পরনে লিমো কোম্পানির পোশাক। দেখে এশিয়ানই মনে হয়। তবে উচ্চারণ শুনে মনে হল ভারতীয় নয়। ভারতীয়দের ইংরেজীতে অদ্ভুত একটা টান থাকে।
-শুভ সকাল।
অবশ্যই। তুমি ব্যাগ উঠাও, আমি বোর্ডিং কার্ডটা প্রিন্ট করেই আসছি। আমাদের কি দেরি হয়ে গেল- আমি উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চাইলাম।
-না না আমদের হাতে এখনো বেশ খানিকটা সময় আছে। এত সকালে রাস্তায় তেমন ভীড় নেই, ২৫ মিনিটের মধ্যে আমরা এয়ারপোর্টে পৌছে যাব।
–সে আমাকে অভয় দিয়ে বলল।
এখন ফ্লাইট চেক-ইন ইন্টারনেটেই করা যায়। বোর্ডিং কার্ডটা প্রিন্ট করে নিতে হয়। চেক-ইন লাগেজ না থাকলে সরাসরি গেটে চলে যাওয়া যায়। এয়ারপোর্টের চেক-ইন কাউন্টারে যাওয়ার ঝামেলা নেই।
অনেক সময় বাঁচে । হোটেলে এজন্য বোর্ডিং কার্ড প্রিন্ট করার কিশক বা কম্পিউটার টারমিনাল থাকে। আমার সাথে অবশ্য চেক-ইন লাগেজ আছে। তবে বর্ডিং কার্ড প্রিন্ট করা থাকলে লাগেজ চেক ইন করতে বেশি সময় লাগে না। এয়ারপর্টেও সব কিছু স্বয়ংক্রিয়।
চেক ইন কিসক থাকে। সেখানে ক্রেডিট কার্ড বা পাসপোর্ট স্ক্যান করলেই সব ইনফরমেশন চলে আসে। লাগেজ কুপন প্রিন্ট করে কাউন্টারে লাগেজ জমা দিয়ে দিতে হয়।
গাড়িতে উঠে বসতেই তন্দ্রা এসে গেল। লিঙ্কন টাউন কারের আরমদায়ক সিট।
আরামে চোখ বুজে এল। মিনিট পাচেক ঘুমিয়েছি এর মধ্যে ড্রাইভারের গলা শুনতে পেলাম,
-স্যার, ডিসপ্যাচ থেকে এইমাত্র জানল যে তোমার ফ্লাইট দুই ঘন্টা দেরিতে ছাড়বে। আমরা কি হোটেলে ফিরে যাব। তুমি তাহলে বিশ্রাম নিতে পারবে।
আমার মেজাজ চরম খারাপ হয়ে গেল।
অবশ্য প্লেন দেরি হওয়াটা আমার জন্য নতুন কোন ব্যাপার নয়। আমার ধারনা ঠিক সময় ফ্লাইট ছাড়াটায় আমার জন্য অবাক করা ঘটনা। একবার ওকালাহোমা সিটি থেকে ফিরছি। ছয়টা তিরিশের ফ্লাইট বিভিন্ন ভাবে দেরি করে রাত ১১:৩০ ছাড়ল (এটা একটা মজার গল্প, অন্য একদিন বলব) । ডলাস থেকে এল পাসোর কানেক্টিং পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ভাবলাম ডলাস এয়ারপোর্টের হোটেলে থেকে যাব যাতে সকালে উঠে প্রথম ফ্লাইটে এল পাসো চলে যেতে পারি। ডলাসে এসে দেখলাম আমার ৮:৩০ এর কানেক্টিং তখনও ছাড়েনি। রাত ২টার সময় ছাড়ল। প্রায় সকাল করে বাসায় ফিরলাম।
-স্যার আমি কি হোটেলে ফিরে যাব?- আমার উত্তর না পেয়ে ড্রাইভার আবার জানতে চাইল।
-না আমাকে কাছাকাছি কোন স্টারবাক্সে নিয়ে চল। কফি খেতে ইচ্ছে করছে। – আমি চোখ না খুলে উত্তর দিলাম।
বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সকালের আলো ফুটছে। আবছা আলোয় ঝকঝকে একটা শহর।
অথচ কয়েক বছর আগে শহরটা হ্যারিকেন ক্যাটরিনার আঘাতে একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে আবার জেগে উঠছে ঝকঝকে আরেকটা নতুন শহর। তবু হ্যারিকেন ক্যাটরিনা এদেশের জন্য অনেকদিন একটা মর্মান্তিক স্মৃতি হয়ে থাকবে। ঝড়ের পরে ব্যাপক অব্যবস্থপনার কারনে মারা গিয়েছিল বেশকিছু মানুষ, নষ্ট হয়েছিল বিলিয়ন ডলারে্র সহায় সম্পত্তি। এর দায় ঘাড়ে নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থনার প্রধান।
দায় ঘাড়ে নিতে হয়েছিল স্বয়ং প্রেসিডেন্টকে। ক্যাটরিনার পরে টেলিভিশনে বাংলাদেশের নাম খুব শোনা যেত...দেশটা শিখেছে কিভাবে ঘুর্নিঝড় আর বন্যার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যায়...আমেরিকার উচিত বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো......ইত্যাদি, ইত্যাদি। এদেশে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছি। বাংলাদেশের কথা আসলেই এরা আমাদের ঝড় আর বন্যার সাথে সংগ্রাম করে বাচে থাকার অনেক প্রশংসা করে, এদের বেশিরভাগই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা জানেনা কিন্ত জানে ঘুর্নিঝড় আর বন্যার বিরুদ্ধে বিজয়ী সাহসী মানুষদের কথা।
কয়েকদিন আগে আমার ৮ বছরের মেয়েটা স্কুলে যাওয়ার পথে গাড়িতে হঠাৎ চাইল,
-ড্যাডি, বাংলাদেশের মানুষরা কি খুব ব্রেভ?
আমি আবাক হয়ে বললাম,
-অবশ্যই, কেন বাবা?
আমার মেয়ে খুব গর্ব ভরে বলল,
-ক্লাসে আমার টিচার বলেছে, বাংলাদেশ খুব সাহসীদের দেশ, যারা কোন ন্যাচারাল ডিসাস্টারকে কেয়ার করেনা।
-মেয়েটা ওর টিচারকে বলেছে যে ওর বাবা এসেছে ওই সাহসী মানুষদের দেশ থেকে।
আমি আমার ছোট্ট মেয়েটার হাত ছুয়ে বিদায় দিতে দিতে বললাম,
-তোমার টিচার ঠিকই বলেছেন। বাংলাদেশ হচ্ছে অপরাজিত মানুষদের দেশ।
গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে আমি হঠাৎ একটা প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম... সকালের সোনালী রোদে একটা পালিয়ে যাওয়া মানুষে ছায়া।
-স্যার আমরা স্টারবাক্সে এসে গেছি- ড্রাইভারের গলা শুনতে পেলাম।
গাড়ি পার্ক করতে করতে কিছুটা সংকোচভরে জনতে চাইল,
-স্যার, তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি।
-আবশ্যই
-তুমি কি ভারতীয়
আমি হেসে বললাম,
-না। আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে।
ছোটখাট ভদ্রলোকটার মুখটা হঠাৎ করে উজ্জ্বল হয়ে গেল। “ আমিও বাংলাদেশ থেকে, নাম শফিউল আহমেদ, বাড়ি বরগুনা”।
ভীষন উত্তেজনায় উনি প্রায় চীৎকার করে ঊঠলেন।
আমার অসম্ভব বিরক্তিকর সকালটা হঠাৎ করে আলোকিত হয়ে ঊঠল। আমি বললাম,
-চাচা আসুন, আমার সাথে এক কাপ কফি খান।
চলবে
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।