আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

১০ ই মুহাররাম বা কারবালা :

সুন্নি মুসলিম, ছালেহ্‌ ভূমিকা স্বরূপ কিছু প্রশ্ন মনে রাখতে হবে । ১। কারবালা'র পটভূমি : ২। কেন হুসাইন রা. মদিনা থেকে কূফার দিকে যাত্রা করলেন ? ৩। হুসাইন রা. কী জিহাদের জন্য বের হয়েছিলেন ? ৪।

হুসাইন হত্যার জন্য দায়ি কে ? ৫। হুসাইন হত্যায় ইযাযিদের ভূমিকা কী ? ৬। বিষাদ সিন্ধু সম্পর্কে পর্যালোচনা। পটভূমি : আমিরুল মু‘মেনীন হযরত ওসমান রাযি. এর শাহাদাতের মাধ্যমে ইসলাম খিলাফতের মধ্যে ফ্যাসাদের বীজ বপন করতে মুনাফিকরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্ভন শুরু করে। যা হযরত আলী রাযি. কে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করেনি।

ক্ষমতার লোভ আর মুনাফিকদের চক্রান্ত এ দু‘য়ে মিলে কারবালার প্রান্তরে সৃষ্টি করে ইসলামের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কেন হুসাইন রা. মদিনা থেকে কূফার দিকে যাত্রা করলেন ? হুসাইন রাযি. কেন মদিনা থেকে কূফার দিকে রওয়ানা হলেন ? এই প্রশ্নের উত্তর খুব সোজা । ইসলামের ইতিহাসের প্রত্যেকটা বইয়ে এর বিবরণ রয়েছে। খলীফা হিসেবে ইয়াযিদ কে কূফাবাসী মেনে নেয়নি। ফলে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় ।

এবং কূফা বাসীরা সরাসরি হুসাইন কে খলীফা হওয়ার আমন্ত্রন জানায় । ফলে তিনি বিশৃংখলা দূর করার মানসে নিজে খলীফার দায়িত্ব নেয়ার উদ্দেশে কূফার দিকে বের হয়েছিলেন। হযরত মুয়াবিয়ারাযি. এর খিলাফতের শেষ দিকে কিছু মুসলমান খলিফাকে পরামর্শ দিলেন বর্তমানে ফিৎনার আবির্ভাব দেখা দিয়েছে। আপনি থাকতেই একজন খলিফা নির্ধারণ করুণ। অন্যদিকে কুফা নগরী থেকে চল্লিশ জন এসে খলিফাকে পরামর্শ দেন ইয়াযিদকে খলিফা ঘোষণা দেয়ার জন্য।

তিনি এ বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। তিনি একান্ত ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শে বসেন। এ পরামর্শ বৈঠকে মতভেদ দেখা দিল। খিলাফতের বিষয়টি জটিলাকার ধারণ করল। কিছু লোক ইয়াজিদকে সমর্থন করে আর কিছু লোক ইমাম হুসাইন রাযি. কে খলিফা প্রস্তাব করেন।

তবে কী কারণে ইয়াযিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা হলো; তার মূল তথ্য আমাদের সামনে প্রকাশিত নয়। মদীনার গভর্নর ছিলেন মারওয়ান। তিনি লোকদের বললেন, “আমীরুল মু’মেনীন মুয়াবিয়া রাযি., হযরত আবু বকর রাযি. ও হযরত ওমর রাযি. পদ্ধতি অনুসারী এই ইচ্ছা প্রকাশ করলেন যে, তাঁর পরিবর্তে খলিফা হিসেবে তার পুত্র ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করাবেন। এ সময় তথায় উপস্থিত ছিলেন হযরত আবু বকর রাযি. এর পুত্র হযরত আব্দুর রাহমান রাযি.। তিনি দাঁড়িয়ে এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, “হে মারওয়ান! আপনার এই বক্তব্য সত্য নয়।

হযরত মুয়াবিয়া রাযি. এর পক্ষে যে বক্তব্য দিচ্ছেন এটা সত্য নয়। এটা আবু বকর রাযি. ও হযরত ওমর রাযি. এর পদ্ধতি নয়। বরং এটি রোম ও পারস্য সম্রাটদের পদ্ধতি। ইসলামের প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা কাউকে নির্ধারণ কিংবা তাদের পুত্রকে খলিফা নির্ধারণ করেননি। এমনকি বংশের (গোত্রের) কাউকে নির্ধারণও করেননি।

মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও তায়েফের মানুষের ইচ্ছা ছিল খিলাফতের দায়িত্ব যেন হয় আহলে বাইতের হাতে। মুয়াবিয়া রাযি. এর জীবদ্দশায় সিরিয়া ও ইরাকের একটি দল ইয়াজিদের হাতে বায়াত ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছে। মুসলমানদের বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিান্নতা থেকে হিফাযত করার জন্য বাধ্য হয়ে ইয়াজিদের হাতে বায়াত মেনে নেন। কিন্তু মদীনাবাসী তথা হযরত হুসাইন রাযি., হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাযি. ইয়াজিদের বায়াত কোন অবস্থাতেই মেনে নিলেন না। তাঁরা দ্বীনের স্বার্থে প্রচার করতে লাগলেন, “ইয়াজিদ মুসলমানদের খলিফা হওয়ার কোন যোগ্যতা নেই।

যাতে সে মুসলমানদের খলিফা হতে পারে। ” এরই মধ্যে হযরত মুয়াবিয়া রাযি. ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর ইয়াজিদ খলিফার আসনে বসে। ইন্তেকালের পূর্বমূহুর্তে হযরত মুয়াবিয়া রাযি. ইয়াজিদকে একটি অসিয়ত করেণ, “আমার মনে হচ্ছে, ইরাকবাসী হযরত হুসাইন রাযি. কে তোমার মোকাবেলায় উদ্ধুদ্ধ করবে। যদি এরূপ হয়, আর মোকাবেলায় তুমি বিজয়ী হও তবে, হযরত হুসাইন রাযি. কে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।

রাসূল রাযি. এর আত্মীয়-স্বজনকে সর্বদাই সম্মান প্রদর্শন করবে। সকল মুসলমানদের ওপর তাঁদের অধিকার রয়েছে এবং তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। ” (তারিখে কামেল, ইবনে কাসীর : ৪র্থ খন্ড, ১ পৃষ্ঠা)। ইয়াজিদ খিলাফতে আরোহণ করে মদীনার গর্ভনর ওয়ালীদ ইবনে ওকবার কাছে পত্র মারফতে জানিয়ে দিল হযরত হুসাইন রাযি. ও তাঁর সমর্থনকারীদের চাপ সৃষ্টি করুণ আমার হাতে বায়াত হওয়ার জন্য। ওয়ালিদ পত্র পেয়ে চিন্তিত হলেন, কীভাবে এ কাজ করা যায়।

মদীনার সাবেক গর্ভনর মারওয়ানকে পরামর্শের জন্য ডাকলেন। মারওয়ান বললেন, হযরত মুয়াবিয়া রাযি. ইন্তেকাল করেছেন এ সংবাদ হযরত হুসাইন রাযি. ও মদীনাবাসীর কাছে পৌঁছেনি। তাই তাদেরকে বাইয়াত নেওয়ার জন্য আহ্বান করুন এবং বৈঠক করুণ। যদি আনুগত করেণ তাহলে কাজটি সহজে হয়ে গেল। নতুবা তাঁদেরকে হত্যা করা হবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমরকে পাঠালেন হযরত হুসাইন রাযি. সহ বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে। হুসাইন রাযি. ছিলেন সুক্ষ্ম মেধার অধিকারী। তিনি বললেন, “আমার মনে হয় মুয়াবিয়া রাযি.এর ইন্তেকাল করেছেন। এ খবর মদীনায় আসার আগে আমাদেরকে ইয়াজিদের খিলাফতের ব্যাপারে জোড়-চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ” কুফা নগরীতে যখন মুয়াবিয়া রাযি. এর ইন্তেকালের এবং মদীনায় ইমাম হুসাইন রাযি. ইয়াজিদের হাতে বায়াত প্রত্যাখ্যানের সংবাদ পৌঁছলো তখন তারা সকলে সুলায়মান ইবনে সারদ খাযায়ীর গৃহে সমবেত হলেন।

এ বৈঠকে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আমরা হুসাইন রাযি. এর হাতে বায়াত নিব। কুফা নগরীতে একা প্রতিনিধি দলসহ চলে আসার আহ্বান জানিয়ে হুসাইন রাযি. ’র কাছে পত্র প্রেরণ করলেন। হুসাইন রাযি. প্রতিনিধি দল ও পত্র পেয়ে কুফা আসতে উদ্ধুদ্ধ হলেন। তিনি পরিবেশ-পরিস্থিতি আঁচ করতে তাঁর চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিল রাযি. কুফায় প্রেরণ করেন। মুসলিম বিন আকিল সেখানে গেলে ১৮ হাজার মুসলমান হযরত হুসাইন রাযি. এর ওপর বাইয়াত গ্রহণ করেন।

কুফার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁর সাথে দেখা করতে আসলে তিনি হুসাইন রাযি. এর পত্র দেখাতেন। তারা এই পত্র পড়ে চোঁখের পানি ফেলতেন। সাধারণ মুসলমানগণ ইয়াজীদের হাতে বায়াত গ্রহণ করতে কোনক্রমেই সম্মত নন। দিন দিন হুসাইন রাযি. এর প্রতি বায়াত গ্রহণ করতে লাগলো। হযরত হুসাইন রাযি. কুফাবাসীর প্রায় দেড়শত পত্র ও মুসলিম বিন আকিলের চিঠি পেয়ে কুফা যেতে দৃঢ়মত প্রকাশ করেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের রাযি. ও সম্মানীত সাহাবীগণ কুফা যেতে জোড় আপত্তি জানালেন যে, কুফাবাসির বায়াত ও প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করা সঠিক হবে না। সেখানের অবস্থা আপনার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং সুবিধাবাদী মানোভাবের কথা ওমর বিন আব্দুর রহমান রাযি. ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. সহ প্রধান সহাবীগণ ভাল করে জানতেন। তাই তারা হুসাইন রাযি. কে সেখানে যেতে বার বার নিষেধ করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. দ্বিতীয় দিন এসে হুসাইন রাযি. কে কুফায় না যাওয়ার বিনীত অনুরোধ করেন।

এবং এর পরও যদি যেতে চান তাহলে স্ত্রী-পুত্রের রেখে যান। আর যদি যেতে চান কুফা না গিয়ে আপনি ইয়ামেন চলে যান। সেখানে আপনার সম্মানীত পিতার অনেক ভক্তবৃন্দ আছেন। সেখানে মানুষ শান্তিপ্রিয়। ইসলামের দাওয়াত সেখান থেকে সহজে প্রচার করতে পারবেন।

কিন্তু তাঁর দৃঢ় সংকল্প, তাঁর মহান উদ্দেশ্য তাঁকে এই মহান বিপদের মোকাবেলা করতে বাধ্য করেছে। তিনি হিজরীর ষাট সনের তিন অথবা আটই জিলহজ্ব তারিখে মক্কা হতে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যাত্রা পথে কবি ফরযদকের সাক্ষাৎ হয়। তিনি হুসাইন রাযি. কে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হুসাইন রাযি. প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, বলুনতো ইরাক ও কুফার লোকেরা বর্তমানে কী অবস্থায় আছে? কবি ফরযদকে বললেন, “ইরাকবাসীদের অন্তর আপনার সাথে, কিন্তু তাদের তলোয়ার বনু উমাইয়া তথা ইয়াজীদের সাথে। ভাগ্য নির্ধারণ হয় আসমান থেকে।

আল্লাহর ইশারাই সব কিছু হয়ে থাকে। ” আব্দুল্লাহ ইবনে জাকির রাযি. হুসাইন রাযি. কুফা আগমণের খবর পেলেন। তিনি পত্র লিখে তাঁর পুত্রকে দিয়ে বললেন তুমি দ্রুত এই পত্র হুসাইন রাযি. এর কাছে দিবে। “আমি আপনার দিকে আবেদন করছি যে, আপনি আমার পত্র পাওয়ার সাথে সাথেই মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তন করবেন। আমি আপনার কল্যাণের জন্যই এই আবেদন করছি।

আমি আপনার বিপদের আশংকা করছি। আমি আশংকা করছি, আপনাকে ও আপনার পরিবার- পরিজনকে এবং আপনার সাথীদেরকে শেষ করে দেয়া হবে। আল্লাহ না করুক, আপনি যদি শেষ হয়েই যান, তবে পৃথিবীর জ্যোতি নির্বাপিত হয়ে যাবে। কারণ আপনি মুসলমানদের নেতা এবং একমাত্র আশার আলো। আপনি আর সামনে অগ্রসর হবেন না।

পত্র প্রেরণ ছাড়া আমি নিজেও আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসছি। আমার অপো করুন। ওয়াস সালাম। ” (ইবনে আসীর) হযরত হুসাইন রাযি. তাঁর দৃঢ় সংকল্পের কারণ হচ্ছে একটি স্বপ্ন। তিনি বলেন, “আমি রাসূল রাযি. কে স্বপ্নে দেখেছি।

তাঁর তরফ থেকে আমাকে যা নির্দেশ দিয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্যই আমি যাচ্ছি। “সে স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আজ পর্যন্ত আমি এটি গোপন রেখেই আমার পরওয়ারদেগারের সান্নিধ্যে চলে যাব। (কামিল ইবনে কাসীর- ১: ৪) হুসাইন রা. কী জিহাদের জন্য বের হয়েছিলেন ? সমাজের সবাই জানে হুসাইন জিহাদের জন্য বেরিয়েছিলেন । কথাটা বলা হয় হুসাইন রা. কে বড় করার জন্য । আসুন আমরা একটু ভেবে চিন্তে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাই।

আমি মনে করি হুসাইন মদিনা থেকে জিহাদের উদ্দেশে বের হননি। তার প্রমান আমি নিম্নে পেশ করবো । ১. হুসাইন যখন কূফার দিকে যাত্রা করেন তখন আব্দুল্লাহ বিন ওমর, আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের মতো মহান সাহাবীরা তাকে বাধা প্রদান করেন। আর সাহাবার কখনোই জিহাদে বাধা প্রদান করেন না । এটাই স্বতসিদ্ধ।

২. হুসাইন তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন আমি খলীফা হতে যাচ্ছি আপনারা বাধা দিচ্ছেন কেনো ? জিহাদে বাধা দেয়ার কথা বলেন নি। ৩. কারবালা প্রান্তরে ইবনে যিয়াদের বাহিনীর সামনে তিনি বলেছিলেন আমি জিহাদের জন্য আসিনি। ৪. হুসাইন মদিনা থেকে বের হয়েছিলেন মাত্র ৭০ জন পুরুষ নিয়ে । বাকী সব ছিলেন মহিলা আর শিশু । এখন প্রশ্ন কেউ কি মহিলা শিশু নিয়ে জিহাদে যায় ? এখন পঠক মাত্রই প্রশ্ন করবেন তাহলে হুসাইন খলীফা হওয়ার জন্য কেন বের হলেন ? অথচ, খলীফা ছিলেন ইয়াযিদ ।

তাহলে খলীফা বিরোধীতা করে অন্যায় করেছেন হুসাইন ? এর সবচে' উত্তম জবাব হুসাইন শরীয়তের পরিভাষায় "আযিমত" অর্থাৎ উত্তম প্রতিষ্ঠার জন্য বের হয়েছিলেন । কারণ, ইয়াযিদ অপেক্ষা হুসাইন বেশী যোগ্য ছিলেন । হুসাইন হত্যার জন্য দায়ি কে ? আমরা সত্য ইতিহাস তালাশ করলে দেখতে পাই সীমার হচ্ছে দায়ী । হুসাইন হত্যায় ইয়াযিদের কোন হাত ছিলো না। তারপ্রমান আমরা দেখি মাও. আবুল কালাম তার লেখা "ইনসানিয়াত মউত কে দরওয়াজে পর" নামক বইয়ে দেখি যে, " যুদ্ধের আগেরদিন শত্রু মিত্র নির্বিশেষে উভয় পক্ষ হুসাইনের পিছনে নামায পড়েছিলেন ।

ইয়াযিদ বাহিনীর সেনাপতি এবং মুসলমান মুসলমানে যুদ্ধ এড়ানোর অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু সীমারের জন্য পেরে উঠেন নি। " মুফতি শফী রহ. "শহীদে কারবালা" নামক বইটি পাঠ করলে আমরা দেখতে পাই সীমার হুসাইনের দূর সম্পর্কের ফুফাতো ভাই ছিলেন । মহররমের ৯ তারিখ হুসাইন রাযি. হঠাৎ আওয়াজ দিয়ে জেগে উঠলেন। হযরত জয়নব এই আওয়াজ শুনে তাঁর কাছে আসেন এবং কারণ জিজ্ঞাসা করেন। হুসাইন রাযি. বলেন, “আমি রাসূল সা. কে স্বপ্নে দেখেছি।

তিনি আমাকে বলছেন, “তুমি শীঘ্রই আমার কাছে আসছ। ” জয়নব রাযি. এ কথাগুলো শুনে কেঁদে ফেললেন। হযরত হোসাইন রাযি. তার শাহাদাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখে আত্মীয় স্বজনকে অসিয়ত করেন তাঁর ইন্তেকাল হলে কেউ যেন বুক থাপরিয়ে বা চিৎকার করে না কাঁদে। দশই মহররম। আশুরার রাত।

সমস্ত রাত মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুলে কাঠিয়ে দিলেন । দিনে হুসাইন অনেক বড় একটি বক্তৃতা দিলেন, অতপর যোহায়ের বিন আলকাইন রাযি. দাড়িয়ে উপদেশ দিলেন হুসাইনকে হত্য না করবার জন্য। এ ধরনের বক্তব্য চলা কালীন অবস্তায় শমর হঠাৎ হযরত হোসাইন রাযি. এর উপর তীর নিক্ষেপ করলো। এ অবস্তা দেখে হুর বিন ইয়াযিদ অনুতপ্ত হয়ে হোসাইন রাযি. এর দলে যোগ দিলেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে লোকদের বলেন, “তোমরা তাঁকে পত্রের মাধ্যমে আহবান করেছিলে যে, আমরা জান-মাল উৎসর্গ করবো।

আর এখন তোমরাই তাকে হত্যা করতে এসেছো? তোমরা তাকে নিরাপদ স্থানে যেতে দিচ্ছো না। ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দিয়েছো। অতচ, সেই নদীর পানি ইহুদি, খৃষ্টান ও অগ্নিপূজকরা সকলেই পান করছে। যদি তোমরা এ আচরণ থেকে বিরত না হও তা হলে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তৃষ্ণার্ত রাখবেন। ” কেউ সাহস করতে পারছেনা হোসাইনকে শহীদ করতে।

যে সামনে যায় সেও ফিরে আসে। এ জগন্য হত্যা করে পাপের দায় কেউ নিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত কানদাহ গোত্রের মালিক বিন নাসলি নামক এক পাপিষ্ঠ ব্যক্তি সামনে এগিয়ে এসে হোসাইন রাযি. এর মাথার উপর আঘাত করলো। মারাত্মক আহত হলেন তিনি। এরপর সীমর দশ ব্যক্তিকে নিয়ে হযরত হোসাইন রাযি. এর উপর আক্রমন করে।

পাপিষ্ঠ সিনান বিন আনাস হযরত হোসাইন রাযি. এর মস্তক কেটে ফেলে। হযরত হোসাইন রাযি. এর শরীরে ৩৩ টি তীরের এবং ৩৪ টি তলোয়ারের আঘাত দেখা গিয়েছে। হুসাইন হত্যায় ইযাযিদের ভূমিকা কী ? কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা শুনে ইয়াযিদের দু’চোঁখ থেকে পানি ঝরতে লাগলো। সে হুর বিন কায়িসকে বললো, আমিতো তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, তাঁদেরকে হত্যা না করে গ্রেফতার করে আনতে। আল্লাহ তাআলার অভিশাপ সুমাইয়ার পুত্রের উপর।

যে এ হত্যা কান্ড ঘটিয়েছে। খোদার কসম আমি সেখানে উপস্তিত থাকতাম, তবে আমি তাঁদেরকে ক্ষমা ও সুন্দরের দৃষ্ঠিতে দেখতাম। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পাই বেঁচে থাকা মহিলা ও শিশুদেরকে ইয়াযিদ সম্মান সহকারে মদিনাতে প্রেরণ করেন। এবং তিনি অনুতপ্ত হন। অথচ, আমরা ইয়াযিদকে উল্টোটাই কল্পনা করি ।

কারবালা ও বিষাদ সিন্ধু : সবশেষে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বহুল পঠিত একটি উপন্যাস "বিষাদ সিন্ধু" নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আমি মীর মশাররফ হোসেনকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি। তারপরও বলবো তিনি কারবালার ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন। খালেদ মতিন নামক বাংলাদেশের শ্রেষ্ট সমালোচলক বিষাদ সিন্ধু সম্পর্কে বলেন " কারবালার ইতিহাসে ভূমি তথা রাজ্যলাভের দ্বন্ধই ঐতিহাসিক। কিন্তু রস সন্ধিৎসু কথা শিল্পি মীর মশাররফ হোসেন সু-কৌশলে মুখ্যকে গৌন আর গৌনকে মুখ্য করে তুলেছেন।

" মীর মশাররফ যে কারণে হসাইন শাহাদাতের নজরানা পেশ করেছেন তার প্রকৃত ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি না রেখে কাল্পনিকের দিকে ঘটনাকে প্রবাহিত করবার চেষ্টা করেছেন। যারা বিভিন্ন কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন তাদেরকে পৃথিবী বেশি অনুসন্ধান করে ইতিহাসের চেয়ে উপন্যাসের ভিতরে, তাদেরকে খুজে বেড়ায় কল্পনার রাজ্যে। এ কারণে ইতিহাস দর্শনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠাতা ইবন খালদুন একটি সাধারণ মূলনীতি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, “পৃথিবীতে যে ঘটনা যত বিখ্যাত হবে, কল্পনা ও রূপকথা তাকে ততই আপন আশ্রয়ে টেনে আনবে। ” পাশ্চাত্যের কবি গ্যাটে এ কথা অন্যভাবে বলেছেন, “মানুষের বিরাট ব্যক্তিত্বের চরম পরিণতি এই যে, তা রূপকথায় পরিণত হয়”। কিন্তু আবার আমি কীভাবে মশাররফ হোসেন কে দায়ি করবো তিনি তো ইতিহাস লিখেন নি ! ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।