আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কেন প্রয়োজন সাম্যবাদী সমাজ?

সাম্যবাদীতাই জীবন নৈরাজ্যবাদী (এনার্কিস্ট) নামে একটি মতাবলম্বী লোক আছেন যাঁহারা মনে করেন যে ধনিকতন্ত্র ধ্বংস করিবার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের উচ্ছেদ করিয়া সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। তাহাদের মতে, রাষ্ট্রই সমস্ত অনর্থ ও অত্যাচারের কারণ। কাজেই রাষ্ট্র এক মুহূর্তও বরদাস্ত করা ঠিক নয়। তাঁহাদের ধারণা, রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করিলেই সমস্ত রকমের অন্যায় অবিচার লোপ পাইবে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীগণ কল্পনাবিলাসী মাত্র।

ধনিকতন্ত্র ধ্বংস হইবার সঙ্গে সঙ্গে ধনিক সমাজের প্রভাব, ঐ সমাজের ভাবধারা একেবারে লুপ্ত হইবে না। ধনিক-সমাজের ধ্বংসাবশেষ বেশ কিছুকাল থাকিয়া যাইবে। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্ছেদ করা হইলে ধনিক-সমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইবার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকিয়া যাইবে এবং সাম্যবাদী-সমাজ প্রতিষ্ঠিত করা কোনও দিনও হইয়া উঠিবে না। সমাজতন্ত্র (সোস্যালিজম) হইতেছে ধনতন্ত্র (ক্যাপিটালিজম) এবং সাম্যবাদের (কমিউনিজম) মধ্যে সমাজ বিকাশের একটি স্তর। ধনিক ব্যবস্থা হইতে সাম্যবাদে পৌঁছাইতে হইলে এই সোপান পার হইয়া যাইতে হইবে।

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ ধনতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ লুপ্ত করিয়া জনসাধারণকে সাম্যবাদী শিক্ষা ও ভাবধারায় দীক্ষিত করা এবং পর্যাপ্ত উৎপাদন করিয়া সাম্যবাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সৃষ্টি করা। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে কিছু কিছু জোর-জুলুম চালাইতে হইবে সেই সকল লোকের উপর যাহারা ধনিক সমাজের সমর্থক, যাহারা সাম্যবাদী-সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে বাঁধা সৃষ্টি করিবে। সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রকে যন্ত্ররূপে ব্যবহার করিতে হইবে সাম্যবাদী-সমাজ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য, এমন আদর্শ সমাজ সৃষ্টি করিবার জন্য যেখানে আর রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন থাকিবে না। যাঁহারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা উচ্ছেদ করিয়া একবারেই ধনতন্ত্র হইতে সাম্যবাদে লাফ দিবার চেষ্টা করিবেন তাঁহাদের মনোভাব যতই মহৎ হউক না কেন, তাঁহারা কার্যতঃ ধনিক ব্যবস্থাকে বাঁচাইয়া রাখিতেই সাহায্য করিবেন। সমাজতন্ত্র কথাটার আজকাল বড়ই কদর্থ হইতেছে।

পথে ঘাটে ইহা এখন প্রায় যে-কোনও অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সমাজের দশজনের প্রয়োজনে যে কোন কাজকেই এখন অনেকে সমাজতন্ত্র বলিয়া চালাইয়া দেন। এইজন্য সমাজতন্ত্র কথাটা ব্যবহার করা বিপজ্জনক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রকৃত সমাজতন্ত্রীদের এই সম্বন্ধে সতর্ক থাকা উচিত। তাঁহারা যেন শুধু নামের ফাঁকিতে না পড়েন।

পূর্বে সাম্যবাদীগণ নিজেদের অনেক সময়ই সমাজতন্ত্রী বলিয়া আখ্যা দিতেন। কেননা সমাজতন্ত্র সাম্যবাদের পৌঁছাইবার একটি স্তর বা সোপান। সমাজতন্ত্রের ভিতর দিয়া না গেলে সাম্যবাদে পৌঁছান অসম্ভব। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করিবে। কাজেই, সমাজতন্ত্রীদিগকে সাম্যবাদী ভিন্ন অন্য কোন মতাবলম্বী বলিয়া ভুল করিবার কোনও সঙ্গত কারণ ছিল না।

কিন্তু পরের যুগে নানা-জাতীয় সুবিধাবাদীদের অপপ্রয়োগে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করা বিপজ্জনক হইয়া দাঁড়াইল বলিয়া সাম্যবাদীগণ নিজেদের কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদী বলিয়া অভিহিত করেন এবং লেনিন সাম্যবাদীদের আন্তর্জাতিক সঙ্ঘের নামকরণ করিলেন ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ বা ‘সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ’। লেনিন শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিকে সমাজতন্ত্রী পার্টি না বলিয়া সাম্যবাদী পার্টি বলিলেন কেন সেই সম্বন্ধে যুক্তি দেখাইয়া বলিয়াছেন, ‘যদিও মানবসমাজ ধনতন্ত্রের পর সমাজতন্ত্রেই পৌঁছাইবে, তব্ওু আমাদের পার্টির উদ্দেশ্য আরও অগ্রসর হওয়া এবং প্রকৃতপক্ষে সাম্যবাদই সমাজতন্ত্রের বাস্তব পরিণতি। ’ রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র (স্টেট সোস্যলিজম) নামে একটি কথা এখন বহুল প্রচারিত। যে রাষ্ট্রে বিশিষ্ট উৎপাদনের উপায়গুলির, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির মালিকানা স্বত্ব রাষ্ট্রের হাতে সেখানে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র প্রচলিত বলা হয়। কোনও একটি রাষ্ট্র হয়তো ডাকবিভাগ, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, রেলওয়ে, স্টীমার প্রভৃতি যোগাযোগ ও যানবাহন বিভাগ, খনি, লোহালক্কড়, অস্ত্রশস্ত্রের কারখানা প্রভৃতি পরিচালিত করে।

এক্ষেত্রে বলা হয় যে, উক্ত রাষ্ট্রে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। কিন্তু আমরা যেন রাষ্ট্রিক-সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে এক অর্থ জ্ঞাপক মনে করিয়া না বসি। সমস্ত কিছু উৎপাদনের উপায়গুলির মালিক যদি রাষ্ট্র হয়, শুধু তাহা হইলেই রাষ্ট্রকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা চলে না। দেখিতে হইবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোন্ শ্রেণীর হাতে, রাষ্ট্র পরিচালনা করে কাহারা? এবং কোন্ শ্রেণীর স্বার্থে এই রাষ্ট্রায়ত্তকরণ হইয়াছে? অনেক ক্ষেত্রে একচেটিয়া মালিকরা কম পুঁজি খাটাইয়া বেশী মুনাফা করিতে পারে, রাষ্ট্রের পুঁজি (তথা জনসাধারনের অর্থ) খাটাইয়া যাহাতে তাহাদের সুবিধার্থে কতগুলি শিল্প পরিচালিত হয় সে জন্য ধনিক রাষ্ট্রও অনেক শিল্প রাষ্ট্রয়াত্ত করে। রাষ্ট্র যদি ধনিক-শ্রেণীর হাতে থাকে, তাহা হইলে সেখানে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলেও অর্থাৎ সমস্ত উৎপাদনের উপায়গুলি রাষ্ট্রের আয়ত্তাধীন থাকিলেও প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনের উপায়গুলির ধনিকশ্রেণীরই থাকিয়া গেল, উহা ধনিকের স্বার্থে ব্যবহৃত হইবে।

রাষ্ট্রযন্ত্র যতক্ষণ না শ্রমজীবীদের হাতে আসিতেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উহার যতকিছু ব্যবস্থা, তাহা মূলতঃ ধনিকেরই সুবিধার জন্য এবং সকল ব্যবস্থাই ধনিক প্রথার অন্তর্গত হইবে। প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলির অবস্থা অনেকটা এইরূপ। রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র একটি ভুয়া কথা, ইহা জনসাধারণকে ধাপ্পা দিবার জন্য ব্যবহৃত হয়; ইহাকে রাষ্ট্রিক-ধনতন্ত্র (স্টেট ক্যাপিটালিজম্) বলিলেই ঠিক হইত। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্রকেই বলা হয়, যে রাষ্ট্র শুধু সমাজের উৎপাদনের উপায়গুলির মালিক নয়, যে-রাষ্ট্র পরিচালনা করে সমাজের সমস্ত শ্রমজীবীগণ তাহাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।