দাদাঠাকুর (১৯৫০-এর ছবি)
আজ ২৭শে এপ্রিল সম্ভবত দাদাঠাকুরের জন্মদিন, টিভিতে দেখলাম।
এই মানুষটি সম্পর্কে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।
অনেকদিন আগে একটি সিনেমাও দেখি ও একটি লেখাও পড়ি যা ডায়রীতে নোট করি-
দাদাঠাকুর-শরৎচন্দ্র পন্ডিত-(জন্মঃ ১২৮৮বঙ্গাব্দ, মৃত্যুঃ ১৩৭৫ বঙ্গাব্দ/1880 -–1968)
এক অর্থে তিনিই বাংলার শেষ কবিয়াল। দাদাঠাকুর ইংরেজ ভক্ত ছিলেন না। যেখানেই শাসকের অত্যাচার ও নীতিহীনতা দেখেছেন, সেখানেই তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক লেখনীর মাধ্যমে আঘাত হেনেছেন।
কলকাতা থেকে ২৫০কি.মি. দুরের রঘুনাথগঞ্জ শহর থেকে প্রকাশ করেছেন ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ পত্রিকা। প্রকাশ করেছেন ‘বোতল পুরাণ’, ‘বিদূষক’ নামের পুস্তিকা আকারে পত্রিকাও। দাদাঠাকুর ছিলেন স্বভাব কবি এবং তীক্ষ্ণধী, সমাজ সচেতন লেখক। নিজেকে জাহির করেননি কোনও দিন।
স্বদেশি আন্দোলন ও স্বদেশিয়ানার ব্যাপারে দাদাঠাকুরের আবেগ কোনও অংশেই কারও থেকে কম ছিল না।
বিপ্লবীদলের লোক নলিনীকান্ত সরকারকে তাঁর বাড়িতে যথা সময়ে আশ্রয় দেন এবং সর্বোতভাবে সাহায্য করেন।
কাজি নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাতে পাঠান শুভেচ্ছা-“ "ধূমকেতুর প্রতি বিষহীন ঢোড়ার অযাচিত আশীর্বাদ"। ”
দাদাঠাকুর ছিলেন '‘একাই একশো'’- তিনি ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’-এর কম্পো্জিটার, প্রুফ-রিডার, মুদ্রক, প্রকাশক, সম্পাদক এমনকি বিক্রেতাও ছিলেন।
নলিনীকান্ত সরকার লিখেছেন, "“দাদাঠাকুর একটি চরিত্র এবং আমাদের মনেহয় বাংলাদেশের একমাত্র চরিত্র"।
দাদাঠাকুর ছিলেন সাংবাদিক, সম্পাদক, সর্বোপরি কবি।
দাদাঠাকুরই মনেহয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সুযোগ্য উত্তরসূরি এবং শেষ কবিয়াল।
(- তথ্য দেন তুষার ভট্ট্যাচার্য, কে এন রোড, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। )
এঁনাকে অনেক ধন্যবাদ।
দাদাঠাকুরকে নিয়ে যে সিনেমাটা দেখি তার শেষটা দেখে মন ভরে না। এখন বুঝি সিনেমা যে সময় হয়েছে তখনও তিনি জঙ্গিপুরে হয়ত বেঁচে ছিলেন।
‘দাদাঠাকুর'’(১৯৬২) সিনেমায় নাম ভূমিকায় ছিলেন ছবি বিশ্বাস।
দাদাঠাকুর তার বাড়িতেই কাগজ ছাপছেন, সহকারী স্বদেশী, মনেহয় নলিনীকান্ত-চরিত্রটি অভিনয় করেন তরুনকুমার। এক সাহেবের কাছ থেকে পুরনো প্রিন্টার মেশিন কিনে নিজেই পত্রিকা ছাপছেন-‘ 'বিদূশক'’। সেটা শহরে নিজেই গান গেয়ে ফিরি করে বেরাচ্ছেন।
সিনেমাতে দেখি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস তৎকালিন কলকাতা পৌরসভার মেয়র পথে তাঁকে অপদস্ত হতে দেখে গাড়ি থেকে নেমে প্রণাম করেন।
তার একমাত্র পুত্র খুব অসুস্থ, শেষে মৃত্যুও হয়- সেদিনও দাদাঠাকুর কর্মব্যস্ত। তা দেখে নলিনীকান্ত বিরক্ত ও মর্মাহত। কিন্তু দাদাঠাকুর বলেন, ‘"তিনি যে বিদূশক!’"
তার অবস্থা দেখে কোন এক রাজা তাকে সাহায্য করতে চান। সুরসিক দাদাঠাকুর তাকে বলেন, “"ছোটবেলা থেকে আপনার দান-ধ্যানের গল্প শুনেছি, মু্গ্ধ হয়েছি, মনে মনে ঠিক করেছি এমন রাজাই হব। কিন্তু তারই অনুগ্রহে হতে পারব না"।
” তার কথা শুনে রাজামশাইও তার মনের কথা বুঝে জান।
দাদাঠাকুরের চেষ্টাতেই এক তেলেভাজা বিক্রেতা পৌরসভার সভাপতি হন। চরিত্রটি করেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
দাদাঠাকুর কথা দিলে যে করে হোক তা পালন করতেন। একবার প্রবল বৃষ্টিতে রেললাইন বন্ধ, তিনি একগলা জলে ডুবে মাথার উপর প্রশ্নপত্র নিয়ে কোন এক স্কুলের পরিক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হন।
যা দেখে শিক্ষকরা বিস্মিত হন।
সিনেমায় আরো কিছু চরিত্র ছিল-বিশ্বজিৎ ও সুলতা অভিনয় করেন।
মদ্যপ জমিদারপুত্র প্রেমের জন্য স্বদেশী হয়ে প্রাণত্যাগ করলে দাদাঠাকুরের চোখে জল আসে। যা দেখে নলিনীকান্ত ব্যঙ্গ করে বলেন, "“বিদূশকও তাহলে কাঁদে!"”
তাতে দাদাঠাকুর যা বলেন তা অনেকটা এমন-“ 'সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে ঈশ্বর নির্বিকার, তাই বিদূশকও নির্বিকার হয়ে হাসি-ঠাট্টা করে। কিন্তু প্রকৃত বীরের মৃত্যুতে ঈশ্বরও কষ্ট পান, কাতর হন, তাই সেই বীরকে বিদূশক কি করে উপেক্ষা করেন! যে বীরের জন্য ঈশ্বর কাঁদেন, তার মৃত্যুতে তাই বিদূশকের চোখেও জল আসে।
'
এখানেই সিনেমা শেষ হয়।
কাগজে দাদাঠাকুরের যে ছবিটি দেখি তাতে কম বয়সে তিনি যে বেশ শক্তসমর্থ ও সুপুরুষ ছিলেন বোঝা যায়। তাঁর চোখ দুটো দেখলে মনেহয় শান্ত অথচ কৌতুকপ্রিয়।
নেট থেকে তার কিছু নমুনা তুলে দিচ্ছি-
দাদাঠাকুরকে তাঁর পরিচিত একজন জিঞ্জাসা করলেন, " আপনি রবিঠাকুরকে দেখেছেন ?"
দাদাঠাকুর উত্তরে বল্লেন, "না দেখিনি, তবে দেখা হলে বলতুম আপনি যেমন ঠাকুর, আমিও তেমন পন্ডিত । "
*******
শরত্চন্দ্র পন্ডিত ওরফে দাদাঠাকুরকে এক কৌতুহলী ব্যক্তি মজা করে জিঞ্জাসা করলেন, " দাদাঠাকুর আপনার উপাধিটা পন্ডিত হল কি করে?"
উত্তরে দাদাঠাকুর বল্লেন,"হবে নাই বা কেন? বস্তু যখন খন্ড খন্ড হয় তখন তাকে বলি খন্ডিত।
আমি যেখানেই যাই সব কাজ করি পন্ড, তাই আমি পন্ডিত। "
*******
একবার নলিনী সরকারের বাড়িতে এসে দাদাঠাকুর বল্লেন," বুঝলে হে নলিনী তোমাদের এই শহর কলকাতা বড় অদ্ভুত। "
নলিনীকান্ত বল্লেন,"কেন এই শহরের হলটা কি?"
দাদাঠাকুর বল্লেন,"হবে আবার কি? রোজ যা হচ্ছে! পাঁজিতে লেখা বছরে একদিন রাস, একদিন ঝুলন। কিন্তু এই শহর কলকাতায় নিত্য রাস, নিত্য ঝুলন। "
নলিনীকান্ত - " কোথায় দেখলেন নিত্য রাস আর নিত্য ঝুলন?"
দাদাঠাকুর - " কেন তোমাদের ট্রামে বাসে যেমন রাস তেমন ঝুলন।
"
*******
হাতিবাগানের মোড়ে দাদাঠাকুর বিদূষক কাগজ বিক্রি করতেন।
একদিন তাঁর পরিচিত একজন তাঁকে নিয়ে এল আর্ট থিয়েটারের ম্যানেজার অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের ঘরে। সে ঘরে আড্ডা দিতেন অপরেশ বাবু, জীবন বাবু, তিনকড়ি চক্রবর্তী, প্রবোধ গুহ, দানী বাবু প্রভৃতি ।
দাদাঠাকুরকে দেখে দানী বাবু হাত তুলে নমস্কার করে বল্লেন, "আজকাল আর চোখে ভাল দেখি না। আমার প্রনাম নেবেন।
"
দাদাঠাকুর দানী বাবুর পাশে বসে গল্প জুড়ে দিলেন।
তাই দেখে তিনকড়ি বাবু বল্লেন," পন্ডিত মশাই, আমাদের দিকেও একটু কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করুন। "
দাদাঠাকুর হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন,"গরীব ব্রাহ্মণে দানী দেখলেই তাঁর কাছে যাই। আপনার ও তিনটি মাত্র কড়ি একমাত্র বামুনের হুঁকায় লাগানো ছাড়া আর কোনো কাজে লাগে না। "
*******
একবার নলিনীকান্ত সরকারের বাড়ি দাদাঠাকুর এসেছেন, তাঁর মেয়ের জন্মদিনে।
ছানার ডালনা পরিবেশন করা হচ্ছে।
নলিনীকান্ত একটু রসিকতা করলেন - " দাদা একটু গরুর ছানার ডালনা দিই?"
সঙ্গে সঙ্গে দাদাঠাকুর বল্লেন," দে ভাই , গরুর ছানার `অকেশনেই`তো এসেছি। "
*******
দাদাঠাকুর আর নলিনীকান্ত সরকার একদিন পাশাপাশি ঘুমোচ্ছেন।
হঠাত্ গভীর রাতে নলিনীকান্তকে জাগিয়ে দাদাঠাকুর বল্লেন," ওরে নলিনী,একটা বড় জিনিষ আবিষ্কার করেছি। নলিনী পন্ডিতের (সাহিত্যিক ও সাহিত্য পরিষদের চির সদস্য) সব সম্পত্তি তোর আর আমার।
"
ঘুম ভাঙ্গা চোখে নলিনীকান্ত- "কি করে হবে?"
দাদাঠাকুর -" কেন তুই নলিনী আর আমি পন্ডিত| দুজনে মিলে নলিনী পন্ডিত। "
*******
বহরমপুর পৌরসভায় ভোট হবে । লড়াই দুজন সদস্যের মাঝে ।
একজন রমনীমোহন, অন্যজন নীলমণি ভট্টাচার্য্য । দুজনেই দাদাঠাকুরের সুপরিচিত ।
ভোটের আগে দাদাঠাকুর বল্লেন," রমনীর জয় হবে আর নীলমণি হেরে যাবে । "
ভোটের ফল বের হলে দেখা গেল দাদাঠাকুরের কথাই মিলে গেছে ।
সবাই তখন তাকে বল্লে, "এমনটা যে হবে সেকথা আপনি আগে থেকে জানলেন কিভাবে ?"
দাদাঠাকুর বল্লেন, "এ তো খুব সহজ, রমনীর (Raw Money-র) সাথে নীলমণি (Nil Money) পারবে কেমন করে ?"
*******
একদিন এক ধনীর বাড়ি নিমন্ত্রণ খেয়ে পরদিন ছাপাখানায় এসে একটা ঢেঁকুর তুলে নলিনীকান্ত সরকারকে বল্লেন,"একটু তামাক সাজ, শরীরটা আজ ভালো নেই"।
নলিনীকান্ত জিঞ্জাসা করলেন, " কেন আবার কি হল?"
দাদাঠাকুর বল্লেন," কালকের ঐ ব্রাহ্মণ ভোজনের জের, সারা রাত্রি পেট্রিয়ট হয়ে বিছানায় ছটফট করেছি । "
নলিনীকান্ত - "পেট্রিয়ট হয়ে , সে আবার কি ?"
দাদাঠাকুর -"পেটের মধ্যে রায়ট বাধলে লোকে পেট্রিয়ট হয় ।
আর বলিস কেন, পোলাও, লুচি ,মাছ, মাংস , মন্ডা-মিঠাই সব পেটের মধ্যে ঢুকে পড়ায়, সেই সব অপরিচিতদের দেখে , যারা স্থায়ী বাসিন্দা, ডাল-ভাত, শাক-চচ্চড়ি একত্রে উচৈঃস্বরে who are you,who are you? করে রায়ট বাধিয়ে দিল । সারা রাত্রি পেটের মধ্যে ভারি অশান্তি । তোর কাছে যখন এলুম তখনও who are you?(ঢেঁকুর) বলে একবার হাঁক ছাড়লে । "
[http://nakshikantha.comze.com/Koutuki/Smaranio/smaranio.html]
[http://www.milansagar.com/kobi/kobi-dadathakur.html ] ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।