শতবার এমনকি হাজার বার ব্যর্থ হলেও আপনি সফল হতে পারেন। ঘটনাগুলো বলছি, আপনার কাজে লাগবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র হঠাৎ যেন পাগল হয়ে গেল বিদেশ যাবে বলে। আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে সে ভর্তি হয়ে গেল। গেল সে ভিসার জন্যে আমেরিকান দুতাবাসে।
দুতাবাসে বসা ভদ্র মহিলা তার ফাইল দেখেটেখে বল্ল, আসসালামুআলাইকুম। ছাত্রটি ফিরে আসলো। কিন্তু হতাশ হল না। সে খোঁজ নিয়ে দেখলো, সপ্তাহের পাঁচ দিন ঐ মহিলা বসেন না। তাই সে পরের সপ্তাহে আবার গেল।
অন্য সুদর্শনা ছিলেন। কিন্তু তিনিও তাকে সালাম জানিয়ে বিদায় দিলেন। ফাইলের ধরন পাল্টে ফেল্ল সে। সে ফাইলের প্রথমেই রাখলো পাঁচ হাজার ডলারের ড্রাফট। তারপর অন্য কাগজ গুলো।
গেল সে পরের সপ্তাহ। আজ অন্য ভদ্র লোক বসা। তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সহিত ফাইল দেখলেন, দু’চারটা প্রশ্ন করলেন এবং ভিসা দিয়ে দিলেন। পরের সপ্তাহেই সে চলে গেল আমেরিকা। এখানে সে যদি প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে হাল ছেড়ে দিত, তাহলে তার কি আমেরিকা যাওয়া হত? এটা আ্মাদের সিলেটের মিরাবাজারের ফয়জুর রহমান সাহেবের ঘটনা।
তিন সন্তানের জনক, বিশ্বের প্রথম পাঁচ ধনীর একজন, ইউলিয়াম হেনরী ত্রি লোকটা কে? চিনে ফেলেছেন? এক কথায় তার পরিচয় তার নামে, নাম বিল গেইটস, মাইক্রোসফটের চেয়ারম্যান। বিখ্যাৎ হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডিগ্রি নিতে ব্যর্থ হয়ে ছিলেন। এই ব্যর্থতার মাঝেই তার সাফল্যের বীজ রোপিত হয়েছিল। বলা যায়, কৈশোর থেকেই কম্পিউটার-প্রোগ্রাম লেখার পাগলামোতে তাকে পেয়ে বসে। এবং মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি প্রোগ্রাম লিখে প্রথম বছরে বিশ হাজার ডলার রোজগার করেন।
গেইটস মানুষের কল্যাণে কাজ করছিলেন। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের আগে ‘‘কবল’’ বা ‘ডস’ দিয়ে কম্পিউটার চালানো অনেক কঠিন ও সময় সাপেক্ষ ছিল। অপারেটিং সিস্টেম না বুঝার কারণে অনেকে কম্পিউটার ব্যবহার পর্যন্ত করতেন না। মিস্টার গেইটস তার বন্ধু এলেনের সহযোগীতায় মানুষের জন্যে সহজ করে অপারেটিং সিস্টেম তৈরী করেন ‘উইন্ডোজ’ এবং জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করেন পঁচাশি সালের বিশ নভেম্বর। আর উইন্ডোজ- এরও কত ভার্সন? শেষমেষ ভিস্তা উপহার দিয়েও তিনি কান্ত হন নি, চলছে আরো সহজ করার প্রক্রিয়া।
আর এই মানব কল্যাণের ব্রত থাকার কারণে টাকা এসেছে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে, বেহিসেব। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি থাকলেন বিশ্বের এক নম্বরের ধনী ব্যক্তি। এখন তিন নম্বরে। কারণ হিসেবে জানা যায়, তিনি নিজেই এক নম্বরে থাকতে চান না বলে বিগত বছরে বহু বিলিয়ন ডলার হক্কুল ইবাদ বা মানব কল্যাণে খরচ করে ফেলেছেন। মানব কল্যাণে অবদানের কারণে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।
তার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল, যে জন্যে ডিগ্রি নিতে ব্যর্থ হয়েও তিনি সাফল্য অর্জন করে ছিলেন। The tragedy in life doesn't lie in not reaching your goal. The tragedy lies in having no goal to reach. - Benjamin Mays বৈজ্ঞানিক টমাস আলভা এডিসন বিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁর বিশ্বাস হল, বিশেষ বিশেষ বৈদ্যুতিক চাপে বিশেষ পদার্থে আলো জ্বলে উঠবে। শুরু হল নতুন গবেষণা। কিন্তু গবেষণায় ব্যর্থ হলেন তিনি।
এক’শ বার গবেষণা, এক’শ বার ব্যর্থ, দুই’শ বার গবেষণা, ব্যর্থ। এভাবে তিনি হাজার বার ব্যর্থ হলেন, পাঁচ হাজার বার গবেষণায় ব্যর্থ। বন্ধুরা টিপ্পনি কাটলো, কি মিষ্টার এডিসন! তোমার আলাদিনের চেরাগ তো জ্বল্ল না, ব্যর্থ হলে? তিনি আলফা লেভেলের, মানে ঠান্ডা মাথার লোক ছিলেন। স্মিত হেসে বল্লেন, ব্যর্থ কোথায়? পাঁচ হাজার বার গবেষণা করে দেখলাম, এই পদার্থ গুলো দ্বারা আলো জ্বলবে না। যখন সঠিক পদার্থ বের করবো, আলো জ্বলে উঠবে।
তারপর আরো পাঁচ হাজার বার ব্যর্থ! এবং তার পরের বারে চার দিক উজ্জল করে ঝলমলে আলো জ্বলে উঠলো, যা তার আগে না কেউ বিশ্বাস করতো, না কেউ দেখে ছিল। এরপর এডিসন বল্লেন, Many of life's failures are people who did not realize how close they were to success when they gave up. ব্যর্থ লোকেরা জানে না, কাজ ছেড়ে দেওয়ার মুহুর্তে তারা সাফল্যের কত কাছে ছিল। আমরা কি করি? অন্যের দেখাদেখি ব্যবসা শুরু করে প্রথম বার লালবাতি জ্বলে উঠলো। বিলাতে বড় ভাই থাকেন, মার্কিন মুল্লুকে চাচা-মামা থাকেন, তাদেরকে আবার হাত-পা ধরে কিছু মূলধন সংগ্রহ করে দুরু দুরু বক্ষে আবার ব্যবসা শুরু। আবার ডবল লালবাতি! এখন আর পুঁজি জোগাড় করার কোন উপায় নাই।
তারপর মনে হল, ব্যবসা আমার দ্বারা হবে না। আমার ভাগ্যে ব্যবসা নাই। আসলে ব্যবসা শুরু করার সময় বিশ্বাসই ছিল না যে, আমি ব্যবসা করতে পারবো। আমেরিকার বিলিওনারী এনড্রু কার্নেগীকে বার বছর বয়সে পাবলিক পার্ক থেকে দারওয়ান বের করে দিয়ে ছিল, দারিদ্রের কষাঘাতে কাপড়চোপড় ময়লা ছিল বলে। এই অপমান তাঁর মনে দাগ কেটে ছিল।
তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, আমার টাকা হবে, এবং প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তখন এই পার্কটি কিনে জনগণের জন্যে উন্মুক্ত করে দেব। ১২ বছর পর তিনি পার্কটি কিনতে পেরে ছিলেন, এবং জনগণের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়ে ছিলেন। ব্যর্থ হলেই হাহুতাশ করে কেউ চোখের জলে নাকের জলে এক করে দেয়। আর সফল বলে আমরা যাদের জানি তারা এই ব্যর্থতাকে পিলার হিসাবে ব্যবহার করেন। তারা সবসময় মনে করেন, Failure is the pillar of success. সফল ব্যক্তিরা ব্যর্থতায় হার মানেন নি।
ব্যর্থতা থেকেই তারা সাফল্য লাভ করেছেন, ব্যর্থতার মাঝেই তারা সাফল্যের বীজ রোপন করেছেন। আমরা মুঘল সম্রাট বাবরের ইতিহাস মুখস্ত করে পরীক্ষা পাশ করি। বাবর কিন্তু প্রথম জীবনে ব্যর্থ হয়ে ছিলেন তিন তিন বার। তার নিজ দেশ ফারগানায় তিনি পরাজিত হন। কিন্তু বিজয়ের বিশ্বাস তার কেউ ভাঙতে পারে নি।
তিনি ফারগানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ভাগ্যান্মেষনে এবং দিল্লি দখলে সক্ষম হন। যাত্রা শুরু হয় মোঘল সাম্রাজ্যের। বরং আমরা বলতে পারি, ফারগানায় পরাজিত না হলে আমরা সফল বাবরকে পেতাম না, তার বংশধরের হাতে গড়া বিশ্বের সপ্তাহচার্যের এক আশ্চর্য তাজমহল পেতাম না। জর্জ ইলিয়ট বলেন, Any coward can fight a battle when he's sure of winning; but give me the man who has the pluck to fight when he's sure of losing. মানুষ পরাজিত হয় কখন? মানুষ পরাজিত হয় প্রথম তার নিজের কাছে। যখন কোন যোদ্ধা মনে করে, এ যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়, তখন শত গুন সৈন্য নিয়েও সে বিজয় অর্জন করতে পারে না।
আর যখন মনে করে, জয়ী আমি হবই। তখন আপাত: পরাজয়ে সে হার মানে না। পরাজিত হয়েও সে পরবর্তীতে বিজয় ছিনিয়ে আনে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রথম আঘাতে চুরমার করে দিয়ে ছিল আমাদেরকে, নিরস্ত্র করেছিল আমাদের সসস্ত্র জোয়ানদের, বন্দি করে ছিল, হত্যা করে ছিল। কিন্তু বাঙালীর বিজয়ের মনোবল ভাঙতে পারে নি।
তাই আপাত: পরাজিত হয়েও শুধুমাত্র বিশ্বাসের কারণে আমরা আবার সংগঠিত হতে পেরে ছিলাম এবং পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের অনুকুলে এনে যুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে পেরে ছিলাম, ছিয়ান্নববই হাজার স্বসস্ত্র পাকিস্তানীকে ঢাকার বুকে সারেন্ডার করতে বাধ্য করে ছিলাম। দেশ কিন্তু এভাবেই স্বাধীন হয়ে ছিল। ঘটনাটি নববই সালের। আসলে সাফল্য কোন গন্তব্য নয়। সাফল্য হচ্ছে এক অবিরাম জয়যাত্রা।
কারো কারো কাছে সাফল্য হচ্ছে গন্তব্য। গন্তব্যে পৌছে গেলে যাত্রার সমাপ্তি ঘটে। আর তখন চড়তে বাধ্য হয় উল্টোরথে, Back to origin. আর যারা একে Endless journey মনে করে, তারা প্রাপ্ত সাফল্যকে শোকর আলহামদুলিল্লাহ্ বলে Ground zero বানায় এবং পরবর্তী সাফল্যের জন্যে অবিরাম কাজ করতে থাকে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করতে পারে না। কারণ, জিপিএ ফাইভ পাওয়াকে আস্ত সাফল্য মনে করে সে রেষ্ট নেয়, ভর্তি পরীক্ষাকে আর গুরুত্ব দেয় না।
ফল হয়, ভর্তি পরীক্ষায় গোল্লা। যারা প্রাপ্ত সাফল্যকে পরবর্তী সাফল্যের সিঁড়ি বানায়, তাদেরকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। থিওডর রোজভেল্ট বলেন, Do what you can, with what you have, where you are. সত্যিই তো। জীবন যেকোন সময় যে কোন অবস্থান থেকে শুরু করা যায়। চাকুরী থেকে অবসর লাভ করে অনেকেই হতাশায় ভোগেন, দেহে রোগ বাধিঁয়ে ফেলেন।
তারা ভাবেন, জীবনে যা করার তা শেষ হয়ে গেছে, আর কিছু করার নেই, এখন শুধুই বসে বসে সময় পার করা। অথচ বিখ্যাতদের অনেকে ঐ সময়টাকেই গঠনমূলক বা সেবামূলক কাজে ব্যয় করে অনন্য মানুষ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। যারা সফল তারা ভাবেন, পরিপক্ষ বয়স ও জ্ঞানকে এখনই কাজে লাগাবার উপযুক্ত সময়, তারা কাজে লেগে থাকেন। সাফল্যে ও আনন্দে ভরপুর থাকেন মৃত্যু পর্যন্ত তারা। লিংক ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।