চারপাশে আত্মমুগ্ধ আদিমতাবোধ, আর গ্রন্থিবদ্ধ চিন্তা; সেখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজি...
এক
সূর্য এখন মাথার উপর। ইস, শহরকে যেন সিদ্ধ করে ছাড়বে! মতি ডান হাতের তর্জনি দিয়ে কপালের ঘাম ঝাড়ে। সেখানে ভাঁজ আরো একটা বেশী দেখা যায়।
'ওই মতি?'
মতি ফিরে চায় পেছনে। মনারুল হাসছে।
একটা বিড়ি এগিয়ে দেয় মতির দিকে 'নে বিড়ি ধর। '
মাথা নাড়ায় মতি। না সে বিড়ি নেবে না, 'বিড়ি টানলে ইসকা টানা যায় না, তার উপরে যা গরম!'
'ইসকাওয়ালার ঠান্ডাই কি, গরমই কি। এত্তো অল্প দম নিয়া তুই ইসকাওয়ালা?' তীর্যক মন্তব্য হানে মনারুল।
মতি হঠাৎ উদাস হয়।
গ্রীষ্মের এই দাপটে ফেটে চৌচির হয়ে ওঠে মাটি। অনুর্বর হয়ে পড়ে কৃষকের স্বাস্থ্য আর সুদখোর মহাজন কেড়ে নেয় সমস্ত ফসল। তাই শহরে চলে আসে মতি মিয়ারা। চরের নরীরা গনগনে উনুনের মধ্যে অপেক্ষায় থাকে পরিবারের উপার্জনকারী পুরুষের জন্য। কেউ কেউ পূর্ব পুরুষের ভূমিস্বত্ত্ব হারিয়ে বনে যায় রিকশাওয়ালা।
রংপুর শহর, রংপুর হতে ঢাকা, সিলেট অথবা চট্টগ্রাম। রিকসা চালায়, রিকসা চলে বিত্তহীনের বৃত্তের চাকায়।
মাথার উপরের সূর্যকে দেখে মতি। আবার ঘাম ঝাড়ে আর একা একাই কথা বলে, 'এই দুপুরত ইসকা নিয়া বেড়াইলে মাথা চনচন করে। শরীল টেকে না।
ওইদিক বউ, একনা ছাওয়া। অন্য বাড়ি বউ কাম করব্যার পারে, কিন্তুক দেই না। বউট্যা সোন্দর, গায় যৌবন। '
সে উদ্বিগ্ন হয়।
'উদিনক্যা, মিঠুর বউ দেওয়ানীর বাড়িত কাম করছিল।
তাক্ দেওয়ানীর ছোট ব্যাটা মিঠুর বউয়ের শরীলত হাত দিছে। গরিব মানুষের ইজ্জতটাই একখান জিনিস। এইটা গেলে থাকে কী?!'
দোকানগুলোর দিকে তাকায় সে। প্যাসেঞ্জার তাকে এখানে রেখে দোকানের ভেতরে গেছে, এখনো আসছে না। এই সময়টুকুর মুল্য সে পাবে না।
কিন্তু সে এতোক্ষণে তিন চার টাকার খ্যাপ নিতে পারতো। মতি মনারুলের দিকে তাকায়, একই গ্রামে তাদের বাড়ি। 'দেরে মনা, একটা বিড়িই দে। '
'মতি মিয়া বিড়ি ছারি দিছো বোলে, এলা ফির চাইস ক্যানে?'
মতি হাসে। মনার কাছ থেকে বিড়ি নিয়ে ধরায়।
তারপর কষে দুটো টান দেয়। মনার দিকে তাকায়, 'শুনিস নাই রেডিও-ত, বিড়ি খাইলে ক্যান্সার হয়। '
'হয় হয় মুইও শুনছুঁ। ' হাসে মনারুল। 'আইজ ভোর বেলাত একটা টিপ মাচ্ছুঁ রে, প্যাসেঞ্জার মোক ৫০ টাকা দিছে।
'
'হ্যা, উদিনক্যা মুইও একখান টিপ মাচ্ছুঁ মোকও ৫০ টাকা দিছিল; কায়োঁ কায়োঁ গরিবের দুঃখ বোঝে, বুচ্ছিস। '
'কী জানি বাহে!' মনারুল শূণ্য চোখে তপ্ত সূর্যের দিকে তাকায়। তারপর যেন দূরের কোন এক গল্পের রেশ ধরে বলে, 'কায়োঁ কায়োঁ তো রিসকাত উঠি দশ টাকা বেশি দেয়, ফির সমিতির লোন দিবার না পারলে ঘরের টিনও খুলি নিয়া যায়। ' বলতে বলতে সে ম্লান হাসি উপহার দেয় মতির দিকে ফিরে।
মনারুলের কথায় মতির বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে।
তারা দুজনেই নির্বাক হয়ে পড়ে হঠাৎ কোন এক উপলব্ধিতে, কিন্তু মনের মাঝে ঝড় তোলে নিঃশ্বাসের চেয়েও দীর্ঘ অনেক ঘটনা।
এই সময়ে মতির প্যাসেঞ্জার ফিরে আসে। ও মনারুলকে উদ্দেশ্যে বলে 'থাকিস মুই যাঁও। '
'আচ্ছা'
প্যাসেঞ্জারের ছেলেটি একটি বড়সড় চকলেট চুসচ্ছে। মতিরও একটা ছেলে আছে।
স্কুলে যায়। একদিন চকলেট চেয়েছিল ছেলেটা তার। মতি দেয়নি। নিজে ইসকা চালায়। 'হাউশ করি টাকা খরচ করা কি পোশায় তার?'
তবু আজ ছেলের জন্য চকলেট কিনতে ইচ্ছে করে মতির, এই সাহেবের ছেলের চকলেটটার মতো বড়।
মতি পেছন থেকে আওয়াজ পায় 'ডানে যাও। ' ডান পাশে একটি গলি, মতি ঢুকে পড়ে। সুন্দর আর বিশাল একটি বাড়ির সামনে তাকে থামতে হয়।
দুই
'ভাই! এই যে, দোকানদার ভাই, ওই চকলেটটা দেন তো। '
'কতো দাম?'
'পনের টাকা।
'
'এ্যা'
'একটা চকলেটের দাম পনেরো টাকা!' ভয়ানক আশ্চর্য হয় মতি। ফিরে চলে আসে। আবার দাঁড়ায়। মনের ভেতর কেমন এক ব্যথা। ফিরে গিয়ে কিনে ফেলে সে চকলেটটা।
অনেক রাত হয়েছে। পারুল নিশ্চই তার জন্য ভাত নিয়ে বসে আছে। পারুল ওর বউ। ওর জন্য মতির খুব মায়া লাগে। সুন্দরী বউয়ের জন্য সাজগোজের দরকার।
সোনো, পাউডার, কাজল, চুলের ফিতা, ঠোঁট পালিশ এই গুলান লাগে। মতি পারুলের জন্য সবসময় এসব আনতে পারে না। অবশ্য পারুল মুখ ফুটে কোন দিন এ গুলান চায়ও নাই। তবুও মতির খারাপ লাগে, নিজের কাছে নিজের খারাপ লাগে।
বাড়ির সামনে এসে রিকসা দাঁড় করায় মতি।
বাড়ি না বলে পাখির বাসা বলাই ভালো, এরও ভাড়া দিতে হয়। মতির আওয়াজ পেয়ে পারুল দরোজা খোলে।
'রাজুক ডাকা তো। ' পারুলকে মতি বলে।
'ক্যন. ছাওয়া ঘুমাইছে না?'
'তেও ডাকা।
'
পারুল রাজুর ঘুম ভাঙায়। রাজু চোখে হাত ডলতে ডলতে উঠে বসে।
'আব্বা দ্যাখ, তোর জন্য কি আনছুঁ। '
'কি?' রাজু ঘুম চোখে বাবার দিকে তাকায়।
'চকলেট'
রাজু দ্রুত হাত বাড়িয়ে নেয়।
খুশিতে কামড় বসায় তাতে।
'আব্বা'
'কি বাজান?'
'অধ্বেক রাখি দেঁও? কাইল সকালে খাইম এলা। '
'আচ্ছা, রাখি দে'
মতি হাত-পা ধুয়ে এসে দেখে পারুল ভাত বেড়ে বসে আছে। সারাদিনের কান্তি ভুলে যায় মতি। এক ধরনের তৃপ্তি ভর করে তাকে।
মতি বলে, 'পারুল দ্যাখ রাজু কী সোন্দর ঘুমাওছে!'
পারুল আর মতি রাজুর মুখের দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে থাকে।
======শেষ=======
[ গল্পটিতে রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ সালে লেখা গল্পটি হঠাৎ খুঁজে পেয়ে আনন্দ লাগছিল। আশা করি সামুর পাঠকবৃন্দও আনন্দ পাবেন। ]
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।