আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মুসলিম-বিদ্বেষের পেছনে অর্থ জোগায় কে?

এম জে রোজেনবার্গ ঠিক এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম-আতঙ্কের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেটা ছিল বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র আর পেন্টাগনে আলকায়েদা সন্ত্রাসীদের আঘাতের মুহূর্ত। ইসলামের ব্যাপারে ভীতি এর আগেও ছিল। তবে সে দিনের ক্ষয়ক্ষতি এবং এ কারণে সৃষ্ট সর্বব্যাপী আতঙ্ক বহু আমেরিকানকে আরবদের ব্যাপারে সতর্ক এবং সন্ত্রাসীদের প্রচারিত ধর্মটি সম্পর্কে অবিলম্বে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ৯/১১-এর ওই ঘটনা যে নানান অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হবে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সবার আগে এর ইঙ্গিত দিলেন।

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘৯/১১-এর হামলা ইসরাইলের জন্য ভালোই হয়েছে’। ওই ঘটনার পর পরই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী অর্থ বহন করে? নেতানিয়াহুর জবাব ছিল, ‘খুব ভালো হয়েছে’। পরক্ষণেই তিনি নিজের উক্তি সম্পাদনা করে বললেন, ‘খুব ভালো না হলেও এটা শিগগিরই সহানুভূতি সৃষ্টি করবে। ’ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘ওই হামলা দুই দেশের বìধনকে আরো শক্তিশালী করবে। কারণ আমরা বেশ কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, আর যুক্তরাষ্ট্র মাত্র এখন সন্ত্রাসজনিত ব্যাপক রক্তক্ষরণের যাতনা ভোগ করছে।

’ নেতানিয়াহু ৯/১১ সম্পর্কে তার মতামতের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, যা হারেৎজ পত্রিকায় ছাপা হয়। সে ঘটনার পর থেকে আমেরিকার ইসরাইলপন্থী লবি ইসরাইলের দক্ষিণপন্থী নীতির প্রতি সমর্থন জোগাড়ের লক্ষ্যে ঘটনাটিকে ব্যবহার করেছে। এই লবি একা নয়। আমেরিকানরা যাতে মুসলমান ও আরবদের ভয় ও ঘৃণা করে, সে জন্য যে সমন্বিত ও অর্থপুষ্ট প্রয়াস, তার একটি মাত্র উপাদান হলো এই লবিটি। আমি স্বীকার করছি, আজ (২৮ আগস্ট, ২০১১) প্রকাশিত একটি রিপোর্ট পড়ার আগে পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল না, এই আন্দোলন কত বেশি সমন্বিত ও অর্থপুষ্ট, সে সম্পর্কে।

সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস (সিএপি) রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে। এর শিরোনাম ‘অঙ্গীভূত ভীতি : আমেরিকায় ইসলাম-আতঙ্ক নেটওয়ার্কের উৎস’। এটা পড়ে জানা যায়, কয়েকটি ফাউন্ডেশন এবং দাতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞদের একটি ক্ষুদ্র গ্রুপ ইসলাম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গ্রুপটিতে আছেন ফন্সাঙ্ক গ্যাফনি, ডেভিন ইয়েরুশালমি, ডানিয়েল পাইপস, রবার্ট স্পেন্সার ও স্টিভ এমার্সন। আর তাদের ঘনিষ্ঠ যেসব দাতা তাদের অনেকেও ইসরাইলপন্থী লবিকে সাহায্য করে।

সোজা কথায়, এসব কথিত বিশেষজ্ঞ, তাদের পৃষ্ঠপোষক দাতা এবং তাদের মিডিয়া মুখপত্র ফক্স নিউজ ছাড়া আপনি কখনও এ কথা শুনতে পেতেন না যে, নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে মুসলিম কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। এদের প্রচারণা ছাড়া এটা খবর হিসেবে তেমন গুরুত্ব পেত না। কিংবা প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এমনকি ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনের রিপাবলিকান (কয়েকজন ডেমোক্র্যাটসহ) প্রার্থীদের আহ্বান জানানো হতো না ইসলাম ও শরিয়াহ আইনের নিন্দা জানাতে। হুমকি দেয়া হয়েছিল, তারা এই নিন্দা না জানালে সন্ত্রাসবাদের সমর্থকরূপে চিহ্নিত হবেন। ওই মহলের কারণেই নিউট গিংরিচ, হারম্যান কেইন ও রিক স্যান্টোরাম মার্কিন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোকে তাদের প্রচারণার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ করে নিয়েছিলেন।

গোটা বিষয়টির সূচনা হয় অর্থ দিয়ে। কয়েকটি ফাউন্ডেশন ও কিছু ধনাঢ্য লোক ইসলাম-আতঙ্ক নেটওয়ার্কের প্রাণপ্রবাহ জারি রেখেছে। তাদের অর্থের জোরেই কিছু ‘থিংকট্যাংক’ মুসলিম ও ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ভীতি ছড়ায়। বইপত্র, রিপোর্ট, ওয়েবসাইট, ব্লগের মাধ্যমে এটা করা হচ্ছে। তা ছাড়া, খুব সতর্কতার সাথে কিছু ‘টকিং পয়েন্ট’ তৈরি করা হয়, যা ব্যবহার করছে তৃণমূল পর্যায়ের ইসলামবিরোধী সংগঠন আর দক্ষিণপন্থী কিছু ধর্মীয় গ্রুপ।

উপরোক্ত দাতাদের কেউ কেউ ইসলামবিদ্বেষী গ্রুপগুলোকে সরাসরি সাহায্য করে থাকে। আমাদের ব্যাপক অনুসìধানে জানা গেছে, সাতটি ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম-আতঙ্ক ছড়াতে সবচেয়ে বেশি অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। এই ‘টপ সেভেন’­ হলো ১. ডোনার্স ক্যাপিটাল ফান্ড; ২. রিচার্ড মেলন স্কাইফে ফাউন্ডেশন; ৩. লিন্ডে-হ্যারি ব্রাডলি ফাউন্ডেশন; ৪. নিউটন ডি. অ্যান্ড রোচেলে এফ. বেকার ফাউন্ডেশন ও চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট; ৫. রাসেল ব্যারি ফাউন্ডেশন; ৬. অ্যাংকরেজ চ্যারিট্যাবল ফান্ড এবং উইলিয়াম রোজেনওয়ার্ল্ড ফ্যামিলি ফান্ড এবং ৭. ফেয়ার ব্রুক ফাউন্ডেশন। এগুলোর বেশির ভাগই আমার কাছে নতুন। অবশ্য যখন ‘আইপ্যাক’-এ কাজ করতাম, তখন বুঝতে পেরেছিলাম­ এসব ফাউন্ডশনের কয়েকটি ‘আইপ্যাক’ এবং তার থিংকট্যাংক ‘ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ারইস্ট পলিসি’কে সাহায্য করত।

এবার সিএপি প্রকাশিত পূর্বোক্ত রিপোর্টে প্রকাশিত তথ্যাবলির বিস্ময়কর দিক হলো, এতে ওই সব লোকের নাম রয়েছে, যারা নিজেদের আসল পরিচয় লুকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। স্টিভ এমারসন, ডানিয়েল পাইপস ও প্যাম জেলারের মতো লোকদের সারিতে তারাও স্খান পেলেন। এই রিপোর্ট মোতাবেক, এমারসন, পাইপস ও জেলার ইসলামের প্রতি জঘন্য ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণকারী। প্যাম জেলার নামের মহিলাটি এমনকি নরওয়ের সাম্প্রতিক গণহত্যাকে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, নিহত তরুণ-তরুণীরা যে ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিল, এটা লেবার পার্টির, আর দলটি ইসরাইলবিরোধী। গত জুলাইয়ে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে রক্ষণশীল খ্রিষ্টান অ্যান্ডার্স ব্রেইভিক।

সে জানায়, রবার্ট স্পেনসার, প্যাম জেলার ও ডেভিড হ্যারোভিৎজ দ্বারা সে প্রভাবিত। শেষোক্ত জন মুসলিমবিরোধী প্রপাগান্ডা অভিযানের অন্যতম হোতা এবং ইসলামবৈরী বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের অর্থপুষ্ট। নরওয়ের ঘটনার পর এসব দাতা নিজেদের আড়াল করতে চাচ্ছে। ফাউন্ডেশনগুলোর নাম দেখে মনে হয়, এরা নির্দোষ। তবে তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে।

একটা ব্যাপার খুবই কুৎসিত। তা হলো, ইহুদিদের ধ্যানজ্ঞান হচ্ছে ইসরাইল এবং তারা দক্ষিণপন্থী খ্রিষ্টানদের দোসর হয়েছে। অথচ এই খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের পছন্দ করে না। মুসলিমবিরোধী নেটওয়ার্ক এমনকি কয়েকজন মুসলমানকেও ব্যবহার করছে। তাদের পাঠানো হয় চার্চে ও সিনাগগে।

সেখানে এসব লোক বলে, তাদের নিজেদের লোকজন (অর্থাৎ মুসলমানেরা) কতই না খারাপ। এটা অস্বাভাবিক ও অবাক করা ব্যাপার। একই সাথে, অত্যন্ত বিপজ্জনকও। নরওয়ের হত্যাকাণ্ড এরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, এটা নরওয়েতে ঘটেছে।

সিএপির আলোচ্য রিপোর্ট পড়ে অবাক হবেন এ কথা ভেবে যে, যুক্তরাষ্ট্রে তা ঘটেনি। লেখক : সিনিয়র ফেলো, মিডিয়া ম্যাটার্স অ্যাকশন নেটওয়ার্ক। (আলজাজিরার সৌজন্যে) ভাষান্তর : মীযানুল করীম ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।