আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নূর ইনায়েত খান: ‘রাজকন্যা’ থেকে গুপ্তচর হওয়া এক অসমসাহসী নারীর কথা

ক খ গ ঘ ঙ চ ছ জ ঝ ঞ ট ঠ ড ঢ ণ ত থ দ ধ ন প ফ ব ভ ম য র ল শ ষ স হ ড় ঢ় য় ৎ ং ঃ ঁ

নূর সবসময় ১৫ কেজি ওজনের গুরুত্বপূর্ণ রেডিও সেটটি সঙ্গে বহন করতেন। একদিন তিনি প্রায় ধরা পড়তে যাচ্ছিলেন। জার্মান গেস্টাপো তাঁকে তাঁর রেডিও সেটসহ চ্যালেঞ্জ করলে তিনি এটিকে সিনেমা প্রোজেক্টর হিসেবে চালিয়ে দিয়ে পার পেয়ে যান। এভাবে দূঃসাহস আর বুদ্ধির জোরে ধরা পড়ার চরম বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে এবং তাঁর সম্পর্কে প্রশিক্ষকদের মূল্যায়ন ভুল প্রমাণ করে তিনি একাই ছয়জন রেডিও অপারেটরের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য তাঁর সহায় থাকেনি।

তবে নিজের কোন ভুলে নয়, বরং এক পরিচিতজনের অপ্রত্যাশিত বিশ্বাসঘাতকতায় প্রায় সাড়ে তিনমাস পর তিনি ধরা পড়েন। সেদিন, ১৩ অক্টোবর ১৯৪৩, কাজ শেষে নূর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে দেখেন সশস্ত্র গেস্টাপো তাঁকে ধরার জন্য ওঁত পেতে রয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য তাঁকে একটি পিস্তল দেওয়া হলেও অহিংস-নীতিবাদী নূর কখনই সেটি সাথে রাখতেন না। তাই ধরা পড়ার সময় খালি হাতে একাকী লড়া ছাড়া তাঁর আর কিছুই করার ছিল না। কিন্তু তাই বলে তিনি বিনা যুদ্ধে ধরা দেননি।

বরং গ্রেফতারের সময় তাঁর দুধর্ষ আচরণের কারণে জার্মানরা তাঁকে ‘অতি-বিপদজনক বন্দী’ আখ্যা দেয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ধরা পড়ার আগে নূর সবশেষ যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেটি ছিল প্যারিসে গেস্টাপোর সদরদপ্তর থেকে মাত্র দু’শ গজ দূরে! ধরা পড়ার পর তাঁকে গেস্টাপো সদরদপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাঁর ওপর নেমে আসে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের ভয়ংকর খড়্গ। কিন্তু অকথ্য নির্যাতনের জন্য ইতিহাস-কুখ্যাত জার্মান এসএস গেস্টাপো তাঁর কাছ থেকে কোন কথাই বের করতে পারেনি। নির্যাতনের সীমাহীন যন্ত্রণা তিনি মুখ বুঁজে সয়েছেন, তবুও নিজের নাম ‘নোরা বেকার’ ছাড়া আর কোন তথ্য দেননি।

পরবর্তীতে যুদ্ধশেষে আত্মসমর্পণকারী ও নূরকে জিজ্ঞাসাবাদকারী জার্মান গোয়েন্দা অফিসারও স্বীকার করেছিল, তারা নূরের কাছ থেকে কিছুই জানতে পারেনি, বরং তিনি একজন সুদক্ষ গুপ্তচরের মত ক্রমাগত ভুল তথ্য দিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করেছেন! প্রায় একমাস নূরকে প্যারিসে বন্দী করে রাখা হয় এবং এর মধ্যেই তিনি দুইবার পালানোর চেষ্টা করেন। যেদিন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, সেদিনই তিনি বাথরুমের জানালা গলে, পানির পাইপ বেয়ে প্রথমবার পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। তারপর ২৫ নভেম্বর ১৯৪৩ তারিখে তিনি আরও দুইজন বন্দী গুপ্তচর সহকর্মীকে নিয়ে বন্দীশালার ছাদ উঠে পালান। কিন্তু কপাল খারাপ! তখনই বিমান-হামলার সাইরেন বেজে ওঠায় বন্দীশালার প্রহরীরা নিয়মানুযায়ী বন্দীর সংখ্যা গুনতে গিয়ে পালানোর ঘটনা টের পেয়ে যায় এবং বেশি দূর যাওয়ার আগেই নূর আবারও ধরা পড়েন। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, বন্দী অবস্থায়ও জার্মানরা তাঁকে দিয়ে ইংল্যান্ডে স্বাভাবিক বেতার-বার্তা পাঠানোর অভিনয় চালিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং এরকম একটি বার্তায় তিনি তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধরা পড়ার পূর্ব-নির্ধারিত সংকেত পাঠান।

কিন্তু বার্তায় উল্লেখিত তাঁর গ্রেফতার হওয়ার সেই সংকেতটি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যায়। নূরের ধরা পড়ার বিষয়টি তারা তখনও বুঝতে পারেনি। নূর বারবার পালানোর চেষ্টা করায়, ‘তিনি আর পালাবেন না’–এই মর্মে তাঁর কাছে থেকে জার্মান গোয়েন্দারা লিখিত মুচলেকা নিতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। এরপর জার্মানরা তাঁকে আর প্যারিসে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। ২৭ নভেম্বর ১৯৪৩ তারিখে তারা তাঁকে প্রথম বন্দী গুপ্তচর হিসেবে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে জার্মানিতে স্থানান্তর করে একটি কারাগারে রাখে।

পরে তাঁকে অন্য একটি দুর্ভেদ্য, নিরাপদ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ‘বিপদজনক ও অসহযোগী কয়েদি’ বিবেচনা করে তাঁকে মূল কারাগার থেকে দূরে একটি বিচ্ছিন্ন, নির্জন সেলে রাখা হয় এবং তাঁর হাতে পায়ে লোহার ডাণ্ডাবেড়ি ও কোমরে শিকল পরানো হয়। তিনি তখন এমন এক কয়েদি–বিস্মৃতি ও মৃত্যুই যার একমাত্র পরিণতি। পরের দশটি মাস কারাগারে অবর্ণনীয়, অমানুষিক, অসহ্য নির্যাতনের এক জীবন কাটান নূর। কিন্তু কোন কিছুই তাঁকে মচকাতে পারেনি।

সব কষ্ট, সব যন্ত্রণা তিনি সহ্য করে গেছেন দিনের পর দিন। শেষ পর্যন্ত জার্মানদের কাছে নতি স্বীকার করেননি। বরং এত চেষ্টা করেও তারা কোনদিন তাঁর আসল নামটা পর্যন্ত জানতে পারেনি–অন্যান্য তথ্য তো দূরের কথা। অবশেষে ১৯৪৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে নূরকে দাচাউ বন্দীশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন ভোরে জার্মানরা আরও তিনজন বন্দিনীসহ তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করে।

অসম সাহস, অনন্য কর্তব্যনিষ্ঠা আর সীমাহীন যাতনার এক জীবনের অবসান হয় এভাবেই

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।