আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

একেলে-সেকেলে

,,,কুয়াশার আড়ালে লুকানো ঘটনা কুয়াশার চাদরে জড়ানো সকালের মোহনীয় রূপের মত নিস্পাপ, নিস্কলঙ্ক, নির্মোহ নয়,,,

‘চল না দোস্ত, ঘুরে আসি। ’ ‘কই যাবি?’-ঘুমজড়ানো কন্ঠে একটু বিরক্তি নিয়েই জিজ্ঞেস করল রাসেল। ‘আরে কি মেয়েমানুষের মত কথা শুরু করলি, তোরে কি সব প্লান ঠিক করে বাসা থেকে পাজাকোলা করে নিয়ে আসতে হবে নাকি?’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি পলাশী আসছি। ১২ টার মধ্যে তুই থাকিস ওখানে’- সবুজের যুক্তির কাছে সব সময়িই হার মানা রাসেল এই বলেই ফোনের লাইন কেটে দেয়। রাসেল আর সবুজ দুজনই খুব ভাল বন্ধু।

ছোটবেলা থেকেই একসাথে বেড়ে উঠেছে ওরা। পড়েছেও একই স্কুল-কলেজ়ে। এখন রাসেল পরে বুয়েটে আর সবুজ কুয়েটে। প্রতি টার্ম পরীক্ষার শেষে সবুজ যখন ঢাকায় আসে তখন দুজনের সময় প্রায় একসাথেই কাটে। ‘তুই কি জীবনেও টাইমলি আসবি না?’- একঘন্টা লেটে আসা রাসেলকে দেখে তেতে ওঠে সবুজ।

‘তোর জন্যে এমনি দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখবি একদিন গাছ হয়ে গেছি আমি। ’ ‘তুই গাছ হলে অশথ গাছ হোস। আমি ওই গাছের নিচে বসে ধ্যান করে বৌধ্য ভিক্ষু হয়ে যাব। ’ ‘আইসে আমার ভিক্ষু সাহেব। সারাদিন ডেট করে বেড়াও আর তুমি করবা ধ্যান!!’ হাসতে হাসতে সবুজের রাগ পানি হয়ে যায়।

‘কেন দোস্ত, মেয়েদের সাথে কথা বলা কি খারাপ?’ ‘না না, মেয়েদের সাথে কথা বলা মোটেও খারাপ না, কিন্তু দুইটা মেয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম করে তিন নাম্বার মেয়েরে প্রোপজ করার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরা খারাপ। ’ ‘তুই কি আমারে খোঁচা দিলি?’- ব্রান্ডনিউ রে-ব্যান এর সানগ্লাসটা পরে মুখে হাসি নিয়ে বলে রাসেল। ‘কিন্তু তুই কেমনে জানলি এইসব? চল টি.এস.সি. দিকে যাই। ’ ‘সেদিন নাতাশা ফোন দিসিলো। ’– হাটতে হাটতে বলল সবুজ।

‘ও,,,তাহলে ত তুই সবকিসুই জানিস। ’ ‘সব কিছুই জানি মানে? তোর কি ধারনা আমি সারারাত ধরে নাতাশার জীবন কাহিনী শুনসি?’ ‘না তা ভাবব ক্যান। তর মত নীতিবান একটা ছেলে তার বেস্টফ্রেন্ডের সাবেক গার্লফ্রেন্ডের সাথে রাত জেগে কথা বলবে এইটাতো আমি সপ্নেও ভাবি না দোস্ত। ’– বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কথাগুলো বলে রাসেল। ‘দোস্ত, ব্যাপারটাতো নীতির না, ব্যাপারটা বিশ্বাসের।

তুই তো নাতাশাকে অনেক ভালোবাসতি। ওর কাছে চিঠি লিখতে লিখতেই তো তোর হাতের লেখা এত সুন্দর হইসে, তা কি জানি না মনে করিস। সেই প্রেম কই গেল?’ ‘কি করব বল, কলেজে থাকতে তো আম্মু আর আমাকে মোবাইল কিনে দেয় নাই। । আগে লিখতাম চিঠি, এখন পাঠাই টেক্সট ম্যাসেজ।

ঝামেলা নাই। কিছু ফরম্যাট সেভ করে রাকসি। সিচুয়েশান বুঝে খালি সিলেক্ট এন্ড সেন্ড করি’– হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে সবুজের উপর হেলে পরে রাসেল। ‘প্রেম-ভালোবাসা এখন ব্যাকডেটেড, বুঝলি দোস্ত। এখন হছে বিএফ-জিএফ এর যুগ।

ছবি দেখো, নাম্বার নাও, ফোন করো, কথা বলো, প্রোপোজ কর, ডেট করো, পারলে কোন খালি ফ্ল্যাটে নিয়ে যাও, এরপর আবার চেঞ্জ করো। বুঝলি?’- বলেই মুখ বাকিয়ে তাকায় রাসেল। দেড়টার সূর্য কখনোই মাথার উপর থাকে না। কিন্তু সবুজের মনে হচ্ছে তার মাথার ঠিক উপরে বেলা ১২ টার মধ্যাকাশের সূর্য। ওর মাথা হঠাৎ কেমন যেন করে ওঠে।

‘আয় আইস্ক্রিম খাই। কোনটা খাবি? কাপ না কোন?’ ‘কোন খেতে গেলে লেপ্টে যায়। আমার জন্যে কাপ ই নে। ’– রাস্তার পাশে বসতে বসতে বলে সবুজ। ‘চল শহীদ মিনারের দিকে চল।

’– হঠাৎ বলে ওঠে সবুজ। ‘ক্যান এখানে প্রবলেম কি? দ্যাখনা কত মজা। কি সুন্দর সুন্দর কাপলরা বসে আছে’– চোখ টিপে বলে রাসেল। ‘শালারে,,,তুই আসলেই অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছিস। ’– বলেই রাসেলকে কনুই এর গুঁতো দেয় সবুজ।

‘নারে এটা চেঞ্জ না, এটা হছে আপডেট হওয়া, সফটওয়্যারের নতুন ভারসন ইন্সটল করার মত। ’ ‘থাক তোর ইঞ্জিনিয়ারিংগিরি আর ফলাতে হবে না, তুই যে সি.এস.ই. তে পড়িস তা আমি গত তিন বছর ধরেই জানি। ’– বলেই শহীদ মিনারের দিকে পা বাড়ায় সবুজ। ‘তুই কেয়াকে চিনিস?’ ‘কোন কেয়া?’- ভ্রু কুঁচকে তাকায় সবুজ ‘আরে ব্যাটা, তোর ভার্সিটির কেয়া’ ‘ও,,হমম, না চেনার কি আছে’ আসলেই কেয়াকে না চেনার কিছু নাই। কুয়েটের সব ডিপারমেন্টের সিনিয়ার-জুনিয়ার সবাই চেনে কেয়াকে।

‘তুই চিনিস কিভাবে?’- বলেই বুঝল বোকার মত প্রশ্ন করে ফেলেছে। রাসেলের এখন যা অবস্থা তাতে তো মনে হয় বাংলাদেশের সব সুন্দরী মেয়েদেরকেই ও চেনে। আর প্রায় ৬ ফুট লম্বা সুদর্শন, স্মার্ট রাসেলের আবেদন হয়তো খুব কম মেয়েই ফেলতে পারে। তা না হলে দুইটা মেয়ে একই সময়ে রাসেলের প্রেমে হাবুডুবু খেত না। ‘এবার যাবার আগে কেয়ার নাম্বারটা আমাকে দিয়ে যাবি, বুঝলি?’ আমি তোর রেফেরেন্সে কথা বলব।

‘ক্যান, আমার রেফেরেন্সে ক্যান, কথা বলতে ইচ্ছা হলে তুই ডিরেক্ট কথা বলবি’ ‘তোর রেফেরেন্সে কথা বললে ওর সাথে আলাপ জমানো যাবে। ’ ভার্সিটিতে তোর যা সুনাম। ক’দিন পর যখন টিচার হবি, তখন তো আমি তোরে স্যার ডাকব’– হাসতে হাসতে বলে রাসেল। ‘বাট ইউ আর গোউউনা টু বি অ্যা বাচকডেটেড টিচার। আই হ্যাভ নো ডাউট অ্যাবাউট দ্যাট।

‘ ‘তোমার এই অন্তসারশূন্য আপডেট এর চেয়ে আমার রিচ ব্যাকডেটেড ভার্সন বহুত ভাল’– কথা ফিরিয়ে দেয় সবুজ ‘তোর ফোন বাজে’ ‘এক মিনিট দোস্ত’- বলেই কল অ্যাটেন্ড করে রাসেল। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আসব তো, আমি একটু টিউশূনিতে। শেষ হলেই চলে আসব। একটু ওয়েট করো প্লিজ। ওকে, বাই.’ ‘কিরে ফোনের ওপাশে কে ছিলোরে?’– রাসেল ঘুরে তাকাতেই প্রশ্ন করে বসল সবুজ।

‘তোর নতুন ভাবী দোস্ত। ’- হেসে বলে রাসেল। ‘কোথায় ওয়েট করাচ্ছিস ওকে?’ ‘মিউজিক ক্যাফেতে’ ‘মিউজিক ক্যাফে,,মানে বসুন্ধরা সিটির এইটথ ফ্লোরের অই ঘুপরি ঘর?’- আশ্চর্য চোখে তাকায় সবুজ। ‘ঘুপরি বলিস আর ছাপড়াই বলিস। ওটাই এখন হট ডেটিং প্লেস।

’ ‘কিন্তু ওইখানে তো দেখতাম পোলাপান সিগারেট খাইত’ ‘আগে সিগারেট খাইত, আর এখন সিগারেটের সাথে অন্য কিছুও খায়,,আর ইনফ্যাক্ট স্বর্ণা মানে তোর নতুন ভাবী সিগারেট অপছন্দও করে না দোস্ত’– স্বাভাবিক ভাবেই বলে রাসেল। ‘তাহলে যা দোস্ত, ও তোর জন্য ওয়েট করবে’ ‘থাকতে দে না, যত বেশী ওয়েট করবে তত বেশী টান বাড়বে’– চোখ টিপে বলে রাসেল। ‘বেশী টানাটানি খেলিস না, ছিঁড়ে যাবি। তুই যা, আমি কিছুই মনে করব না। ’ ‘তুই শিওর? কিছুই মনে করবি না?’ ‘না, প্লিজ যা তুই’– বলেই রাসেলকে আলতো ধাক্কা দেয় সবুজ।

‘ওকে দোস্ত, রাত্রে ফোন করে জানাস কাল কই যাবি’– বলেই উঠে পরে রাসেল। ‘সাবধানে যাস’ প্রায় দৌড়ে রিকশার দিকে ছুটটে থাকা রোমিও রাসেল সবুজের শেষ কথাটুকু শুনল কিনা কে জানে। । সবুজ একা বসে রইল। ঠিক একা না, শহীদ মিনারের এত লোকের ভীড়ে সবুজ এখন আপন ভূবনে একা।

আজ শুভ, জাহিদ, রুমি ওদের সবারই আসার কথা ছিল। কিন্তু রুমির কি একটা অসুবিধার কারনে এই গেট-টুগেদারটা দুদিন পিছিয়ে গেছে। সবুজ মনে মনে ভাবে, গত মাসে ‘পাওয়ার সিস্টেম’ পরীক্ষার আগের রাতে পাওয়া ফোনে নাতাশার কথাগুলো হয়তোবা সত্যি। রাসেলকে সবুজ চেনে ক্লাশ ওয়ান থেকে। খুবই ভদ্র, লাজুক প্রকৃতির ছেলে।

কলেজে উঠে কোচিং সেন্টারে গিয়ে পরিচয় নাতাশার সাথে। দুজনে ক্লাশ নোট আদান-প্রদান একসময় চিঠি চালাচালিতে রূপ নেয়। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ব্যাপারটা বাইরের কেবল একজনই জানত- ওদের দুজনেরই বেস্টফ্রেন্ড সবুজ। আগে ঢাকায় এলে তো রাসেলের মুখে নাতাশা ছাড়া আর কোন গল্পই শোনা যেত না। কিন্তু হঠাত করেই যেন চেঞ্জ হয়ে যায় সবকিছু।

গত বছর থেকেই নাকি ওদের সমস্যার শুরু। একদিন ক্লাশে এসে নাতাশা শুনতে পেল আজ কোন এক কারনে ওর ফ্যাকাল্টির সব ক্লাশ সাস্পেন্ড করা হয়েছে। রিকশা নিয়ে বাসায় যাবে এ সময় টি.এস.সি. তে দেখে ওর ক্লাশের স্বর্ণার সাথে রাসেল খুবই ঘনিষ্টভাবে কথা বলছে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই কাকতালীয় ছিল না। নাতাশা দেখেও না দেখার ভান করে বাসায় চলে আসে।

। তখন থেকেই দূরত্ব বাড়তে থাকে। । কিছুদিন আগে রাসেল ফোন করে খুব বাজ়ে ধরনের একটা প্রপোসাল নাকি দেয় ওকে। মার্জিত রুচির নাতাশার পক্ষে ওটা মানে নেয়া কখনোই সম্ভব ছিল না।

সে সেদিনই কেদেকেটে ফোন করে সবুজকে জানিয়ে দেয় ওদের ব্রেকআপের কথা। সবুজ ওই কথা সেদিন তেমন পাত্তাই দেয়নি। ছোটবেলা থেকেই চেনা রাসেলের এই পরিচয় সবুজের বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু আজ যেন অন্য এক রাসেলকে আবিস্কার করলো সবুজ। এই রাসেল এখন খুবই স্মার্ট, অনেক বেশী আপডেটেড।

আকাশে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে আসছে। হঠাৎ সবুজের মনে পড়ে ওর ছোটবোন লাবণ্যর কথা। ওর কোচিং শেষ হবে ৬ টায়। ফেরার পথে ওকে নিয়ে যেতে হবে। শহীদ মিনারের চত্বর থেকে নেমে সবুজ পা বাড়ায় আজিমপুরের দিকে।

‘তুই বড্ড সেকেলেরে,’– সবুজের মাথার ভেতর প্রতিধ্বনির মত বাজতে থাকে রাসেলের সেই একটি কথাই। সে মনে মনে ভাবে আমার ‘সেকাল’ই আলোকিত, মার্জিত, পরিশীলিত। তোমার ভদ্রোচিত, পরিপাটি বেশের আড়ালে লুকানো তথাকথিত হাইসোসাইটির লেবেল আটা বিকৃত ‘একাল’ যেন আমায় কখনো স্পর্শ না করে। ‘সত্যিই আমি সেকেলে আর তুমি একেলে। ।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।