বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিকদের বাঁচাতে সীমান্তে যৌথ টহলের যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে তাতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশংকা করছেন বাংলাদেশী নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যৌথ টহলের আড়ালে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার দায় মুক্তির চিন্তায় এগুচ্ছে ইনডিয়া। আর ইনডিয়ার সে প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে কার্যত নিজ হাতে নিজের অধিবাসীদের হত্যার অংশীদার হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গত ২১ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের এক সম্মেলনে যৌথ টহলের ব্যাপারে ঐক্যমত হয়।
জানা যায়, সম্মেলনে বিডিআর’র পক্ষ থেকে সীমান্তে নিরীহ বাঙালি হত্যা বন্ধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, চোরাচালান বন্ধ সর্বোপরি আন্ত:সীমান্ত অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবী জানান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এম রফিকুল ইসলাম।
জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব দুই বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সীমান্তে যৌথ টহলের একটি রূপরেখা বৈঠকে উত্থাপণ করেন। এ নিয়ে কয়েক দফায় আলোচনার পর শেষমেষ উভয়ই এ ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছেন।
কি সেই রূপরেখা- এ ব্যাপারে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এম রফিকুল ইসলাম বলেন, যৌথ টহল মানে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনী একত্রিত হয়ে টহল দেবে, তা নয়। একইসঙ্গে নিজ নিজ দেশের সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে টহল দেবে। কেবলমাত্র দুই বাহিনীর মধ্যে টহলের সময় ও দিক আদান-প্রদান করা।
ইতিমধ্যে কিছু সীমান্তে এটা করা হচ্ছে। এর ফলে সীমান্তে চোরাচালান, নিরিহ বাঙালি হত্যা বন্ধ হবে বলে মনে করেন তিনি।
সূত্রমতে, যৌথ টহলের রূপরেখা যেটাই হোক না কেন এর একটি রূপ গত বছরের ১৯ জুলাই ‘আগরতলার ১৫ কিলোমিটার উত্তরে ইনডিয়ার নরশিংগড় সীমান্তে লক্ষ্য করা গেছে। সেদিন বিডিআর (নীল পতাকা) ও বিএসএফ (কমলা পতাকা) হাতে যৌথ টহলে অংশ নিতে দেখা যায়।
সমালোচকদের মতে, যৌথ টহলের এই প্রক্রিয়াটি বিডিআর’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলামের আমলেই শুরু হয়েছিলো।
বর্তমান মহাপরিচালকের আমলে কেবলমাত্র সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে আনুষ্ঠানিক সিল মোহর যোগ করা হলো। পক্ষান্তরে দ্বিপাক্ষিক টাস্কফোর্স প্রতিষ্ঠা করে আঞ্চলিক ট্রাস্কফোর্সের উদ্যোগ বন্ধ করে দিতেই ইনডিয়ার এ প্রচেষ্টা বলে জানা গেছে। বিএসএফ-এর প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকির কারন হয়ে দাড়াবে বলে মনে করছেন তারা।
কি ধরনের সেই হুমকি - এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিডিআর’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব আ ল ম ফজুলর রহমান জানান, তিনি যখন মহাপরিচালক ছিলেন তখন প্রথম এই প্রস্তাব করে ইনডিয়া। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি।
যৌথ টহল বলতে কি বোঝায়- এ ব্যাপারে তিনি জানান, তাকে বিএসএফ’র তৎকালিন মহাপরিচালক জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত একটি সময়ে উভয় বাহিনীর সদস্যরা নিদিষ্ট একটি পয়েন্টে মিলিত হবে। এরপর সেখানে তারা একে অপরকে জানাবে কে, কোন দিকে টহল দেবে।
ফজুলর রহমান বলেন, এ ধরনের টহলে বাংলাদেশের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশী হবে। কেননা বাংলাদেশ ও ইনডিয়া পৃথক দুটি সার্বভৌম দেশ। নিজ নিজ দেশ রক্ষায় উভয়েরই পৃথক চিন্তা চেতনা আছে।
সেটি যদি পরস্পরের মধ্যে আদান প্রদান করা হয়, তবে নিজস্ব স্বকীয়তা বলতে কিছু থাকে না। আমাদের বাহিনী চলবে দেশী গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মোতাবেক। অপর আর একটি বাহিনীর তথ্য নিয়ে চলবে কেন। তাছাড়া তথ্য আদান প্রদানের যদি কোন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তা সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হওয়া উচিত, এতো নিচে না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের পররাষ্ট্র নীতির নতজানু মনোভাবের প্রকাশ বলে মন্তব্য তার।
তিনি এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে নিজেদের সরিয়ে আনার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
একই দাবী করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিডিআর’র সাবেক আরেক মহাপরিচালক। তিনি বলেন, যৌথ টহল পরিচালিত হবে দিনের বেলায় কিন্তু অধিকাংশ হত্যাকান্ড সংঘঠিত হয় রাতে। যে কারনে যৌথ টহল নিরিহ বাঙালি হত্যা বন্ধে কোন ভূমিকা রাখবে না। দিনের বেলায় যদিও বা কোন হত্যাকান্ড ঘটে সেক্ষেত্রে বিএসএফ’র সঙ্গে বিডিআরকেও সে দায় নিতে হবে।
সীমান্তে নিরীহ বাঙালি হত্যা বন্ধে রাতের বেলায় সীমান্তবর্তী এলাকায় চলাচল বন্ধ ও সীমান্ত হাটের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সাবেক সেনা প্রধান লে: জেনারেল (অব মাহবুবুর রহমান বলেন, যৌথ টহল একটি আস্থার ব্যাপার। যেটা এখনো এই দুই বাহিনীর মধ্যে হয়ে ওঠেনি। এখনো আমাদের সীমান্ত অশান্ত। বিএসএফ আমাদের নাগরিকদের হত্যা করছে।
সেখানে তাদের সাথে আমাদের তথ্য আদান প্রদানের কোন যৌক্তিকতা নেই। এই মুহুর্তে দ্ইু বাহিনীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনাটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর দেয়া সবশেষ তথ্য মতে, শেষ নয় মাসে সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের হাতে ৪৯ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনকে নির্যাতন ও ৩৫ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয় তাদের প্রতিবেদনে। একই সময়ে বিএসএফ’র হাতে ৬১ জন বাঙালি ও ইনডিয়ান অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর হাতে ১০ জন আহত হয়েছে।
বিএসএফ এর হাতে আহত ৬১ জনের মধ্যে ২৯ জন নির্যাতিত ও ৩২ জন গুলিতে আহত হয়েছে। এই সময়কালে ২৫ জন বাংলাদেশী বিএসএফ এর হাতে অপহৃত হয়েছেন। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় দুই জন ব্যাক্তি নিখোঁজ, একটি লুটের ঘটনা এবং পাঁচ জন হিন্দী ভাষাভাষী ইনডিয়ান মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে।
জানা গেছে, এসব আন্ত: সীমান্ত অপরাধ রোধে ইতিপূর্বেও নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। সবশেষ বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার জেলাগুলোয় রাতের বেলায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
যা এখনো বর্তমান আছে। কিন্তু এতো কিছুর পরেও সীমান্তবর্তী এসব অপরাধ বন্ধ হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান যৌথ টহল প্রসঙ্গে বলেন, এখন বিডিআর বিএসএফ’র এসব অবৈধ কর্মকান্ডের বিরোধীতা করতে পারছে কিন্তু যৌথ টহল হলে তা সম্ভব হবে না। কারন তখন বিএসএফ’র পাশাপাশি বিডিআরকেও এসব হত্যার দায়ভার নিতে হবে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়ে তিনি বলেন, ইনডিয়া যৌথ টহলের আড়ালে যা চাচ্ছে, তা হলো- নিজেদের হত্যার দায় বিডিআর’র ওপর চাঁপানো।
কেননা সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার বিষয়টি সম্প্রতি বেশ জোড়েসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। এতে তারা ভীতসন্তস্ত্র। আন্তর্জাতিক আদালতে এ নিয়ে ভবিষ্যতে কোন মামলা দায়ের হলে তারা রক্ষা পাবে না। আর এ জন্যেই তারা বিডিআরকে তারা তাদের সাথে সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছে। যাতে তারাও ঘটনার স্বাক্ষী দিতে না পারে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে হয়ত দেখা যাবে সীমান্তে কোন নিরীহ নাগরিক হত্যার পর দুই বাহিনীর সদস্যরা যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলবে, নিহতরা চোরাকারবারি ছিলো। কিন্বা সীমান্তে এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। বিডিআরও তখন তা বলতে বাধ্য থাকবে, কেননা নইলে হত্যার দায়ভার তার ওপরও বর্তাবে। এরপরেও যদি এ নিয়ে কোন মামলা হয় সেক্ষেত্রে বিডিআর জওয়ান বা কমান্ডাররা এর দায় এড়িয়ে যেতে পারবে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদ মত হলো- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে বিষয়গুলো নিয়ে আরো আলোচনা করা উচিত।
যৌথ টহলের ফলে ক্ষতি কিংবা লাভ কোনটাই হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন। আর সীমান্তে হত্যা বন্ধে পশ্চিম বঙ্গ তথা ইনডিয়ান মিডিয়া ও সুশিল সমাজের মধ্যে জাগরন গড়ে তোলা দরকার। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় অবস্থান থেকে চেষ্টা করা উচিত
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।