আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গত বছর ১২ অক্টোবরে প্রথম আলোতে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন "বসুন্ধরাকে রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্র মরিয়া"

আমার সম্পর্কে বলার মতো কিছু নেই।

গত বছর ১২ অক্টোবরে প্রথম আলোতে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন "বসুন্ধরাকে রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্র মরিয়া"ঃ এনবিআর তথ্য গোপন করে বসুন্ধরার মামলা প্রত্যাহারে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে রহস্যজনক মতামত সংগ্রহ করেছে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, রায় ঘোষণার পর আপিল ছাড়া আপস করা বা মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই মিজানুর রহমান খান | তারিখ: ১২-১০-২০০৯ বসুন্ধরা গ্রুপের আয়কর ফঁাকির মামলা নিয়ে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অগ্রাহ্য এবং সব নিয়মনীতি তছনছ করে দিয়ে বসুন্ধরার প্রভাবশালী মালিকদের বঁাচাতে এখন মরিয়া গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র।

সর্বশেষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ১৬ আগস্ট তথ্য গোপন করে বসুন্ধরার মামলা প্রত্যাহারে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে একটি রহস্যজনক মতামত সংগ্রহ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো, বসুন্ধরার মালিকদের অবৈধ সুযোগ দেওয়া, যাতে তঁারা আপিল না করেও দণ্ড পাওয়া মামলা থেকে সরাসরি বেকসুর খালাস পেতে পারেন। কারণ, আপিল করতে হলে তঁাদের জেলে যেতে হবে। তাই এনবিআর আইন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে দৃশ্যত এ মর্মে একটি মতামত সংগ্রহ করে যে, আপিল না করেও এনবিআর দণ্ডিত পলাতক ব্যক্তিদের সঙ্গে আপসে যেতে পারে। তঁাদের মামলা তুলে নিতে পারে।

এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ তঁার মন্ত্রণালয়ের মতামত জেনে বিস্মিত হয়েছেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রায় ঘোষণার পর আপিল ছাড়া আপস করা বা মামলা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, Èএ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই। ' প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, বসুন্ধরার অনুকূলে উচ্চ আদালতের অনুমোদন পেতে ওই বেআইনি মতামত সংগ্রহ করা হয়।

কিন্তু এর চার দিন পর (২০ আগস্ট ২০০৯) বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বসুন্ধরার মামলাটি আর না শোনার চূড়ান্ত সদ্ধিান্ত নেন। তঁারা আদেশে উলে্লখ করেন, Èপ্রধান বিচারপতি আমাদের শুনানি ও মামলা নিষ্পত্তি করতে আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু উভয় পক্ষের আইনজীবীরা শুনানিতে আগ্রহী না হয়ে বরং প্রথম আলোর প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পীড়াপীড়ি করেন। ' ফিরে দেখা বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ওরফে শাহ আলম, তঁার স্ত্রী ও তঁাদের দুই ছেলে ২০০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আয়কর ফঁাকির মামলায় পলাতক অবস্থায় দণ্ডিত হন। বসুন্ধরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং অপর দুই কর্মকর্তা ছাড়া অন্য পঁাচ আসামিই একই পরিবারের।

এর মধ্যে বসুন্ধরার কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান কারাগারে থেকে রায় ঘোষণার আগেই একটি রিটে খালাস পান। শাহ আলম ও তঁার স্ত্রী পৃথকভাবে দুদকের জ্যেষ্ঠ কঁেৌসুলি আনিসুল হকের মাধ্যমে ২০০৮ সালে দুটি রিট দায়ের করেন। ৭২০৬/২০০৮ নং রিট করেন শাহ আলমের স্ত্রী আফরোজা বেগম ও তঁার তিন ছেলে। ৭২০৭/২০০৮ নং রিট করেন একা শাহ আলম। আদালতের নথি থেকে দেখা যায়, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মামনুন রহমানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আনিসুল হকের দরখাস্ত তাত্ক্ষণিক নাকচ না করে প্রথম দুটি পৃথক রুল জারি করেন।

২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এর শুরু। সেই থেকে ২০০৯ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত শাহ আলম পরিবারকে অসুস্থতা ও মানবিক কারণে এবং অন্যদের অসুস্থ স্বামী ও অসুস্থ বাবার সঙ্গে বিদেশে থাকার কারণ দেখিয়ে নির্দষ্টিভাবে জামিন না দিয়েও গ্রপ্তোর এড়ানোর সুবিধা করে দেওয়া হয়। শাহ আলমের স্বাস্থ্যগত সমস্যার সপক্ষে এর আগে তঁার রিটের নথিতে চিকিত্সা সনদ দেখা যায়নি। এখন তা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া একজনের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তঁার দণ্ডিত স্ত্রী ও তিন ছেলের বিচার কার্যক্রম থেকে পলাতক থাকার সুবিধা ভোগ করার এক অবিশ্বাস্য নজির সৃষ্টি হয় এই রিট মামলায়।

তবে বিচারিক আদালতের রায়ের ওপর ১০ মাসের স্থগিতাদেশের মেয়াদ ৮ জুলাই ২০০৯ শেষ হলে তা আর বাড়ানো হয়নি। এখন শুধু রুল জারি রয়েছে। তঁারা এখন নম্নি আদালতে গেলে প্রচলিত আইনের কাছে প্রকৃত আত্মসমর্পণ বলে গণ্য হবে। এর আগে তঁারা নম্নি আদালতে গেলেও রায় স্থগিত থাকার কারণে আদালত ফেৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আত্মসমর্পণ গ্রহণ করে তঁাদের কারাগারে পাঠাতে পারেননি। এখন পুলিশ তঁাদের গ্রপ্তোর করতে পারে কি না, জানতে চাইলে আইনজীবীরা বলেন, সাধারণত রুল পেলে সরকারের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।

তবে এ মামলার শুনানি কবে হতে পারে, তা একেবারেই ধারণা করা যায় না। প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যাটর্নি জেনারেল নিশ্চিত করেছিলেন যে এ মামলাটি আউট অব লিস্ট হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখন তঁার দপ্তরের ভূমিকা কী হবে, জানতে চাইলে তিনি তাত্ক্ষণিক কোনো বক্তব্য দেননি। জালিয়াতি! এনবিআর বসুন্ধরার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থায় দায়ের করা মামলাটি ২০০৯ সালে এসেও Èসঠিক ও আইনসংগত' হিসেবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছে। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের বেঞ্চে দায়ের করা হলফনামায় কথাটি এসেছে এভাবে: È২০০৪-০৫ করবর্ষের আয় সম্পর্কে রিট আবেদনকারী (শাহ আলম) ভুয়া বিবৃতি দিয়ে আয়কর আইনে অপরাধ করেছেন এবং সেই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এনবিআর তঁার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।

' এজাহার থেকে দেখা যায়, বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেড একই করবর্ষের আয় সম্পর্কে Èদুই ধরনের নিরীক্ষিত হিসাব' তৈরি করেছিল। ওই প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক থেকে ৩৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়। তারা ২০০৪-০৫ অর্থবছরে প্রায় ছয় কোটি টাকা, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রায় আট কোটি ও ২০০৬-০৭ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা আয় প্রদর্শন করে। সোনালী ব্যাংকের কাছে দেওয়া ওই একই সময়ের নিরীক্ষিত হিসাবে তারা ওই তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু রাজস্ব বিভাগের কাছে দেওয়া নিরীক্ষিত হিসাবে দেখানো হয়, ওই করবর্ষগুলোতে শূন্য টাকা আয় হয়েছে।

বসুন্ধরা নিয়োজিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট যে দুই ধরনের হিসাব তৈরি করেছিল, সে বিষয়টি বসুন্ধরা অস্বীকার করেনি। এ মামলার অন্যতম আসামি মোস্তাফিজুর রহমান হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ থেকে তিনি নিজে একজন Èবেতনভুক কর্মচারী মাত্র' উলে্লখ করে রেহাই পান। আর বসুন্ধরার মালিক শাহ আলমের যুক্তি হলো, তিনি সরল বিশ্বাসে চার্টার্ড ফার্মের অনুমোদিত কাগজপত্রে সই করেছেন মাত্র। সুতরাং যে অভিযোগে বিশেষ আদালত প্রত্যেককে ১০ বছর করে জেল দিয়েছিলেন, তা এখন পর্যন্ত বানোয়াট বলে নাকচ করা হয়নি, বরং আওয়ামী লীগ সরকারও তার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে কঁাধে তুলে নিয়েছে। উলে্লখ্য, হাইকোর্ট বিভাগের ওই দ্বৈত বেঞ্চ শুধু গ্রপ্তোর এড়ানোর সুবিধাই দেয়নি, আইন ও সব নিয়মনীতি ভেঙে বসুন্ধরার মালিকদের দেওয়া শাসি্ত শুধু নয়, তাদের দোষী সাব্যস্ত হওয়াকেও স্থগিত করে দিয়েছে।

ওই বেঞ্চের অন্তর্বর্তী আদেশের চোখে বসুন্ধরা ছিল নির্দোষ। আপস করে রায় প্রত্যাহারের আবেদন ২০০৯ সালের জুনে বসুন্ধরার মালিক শাহ আলম হঠাত্ করেই বিচারিক আদালতের রায় Èমীমাংসাপূর্বক প্রত্যাহারের' আবেদন করেন এবং এর পর পরই ২২ জুন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্ট বিভাগে আচমকা রুলের শুনানি করতে উদ্যোগী হন। প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক সময় রুল হলো কঁাঠালের আঠা, লাগলে আর ছাড়ে না। বসুন্ধরার মামলাসংশি্লষ্ট এই রুলটি আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে হলেও এটি এখনো আঠার মতো লেগে আছে। দেখা যায়, আইনের একই নীতি আপিল বিভাগে একাধিকবার মীমাংসিত হলেও তার কোনো প্রভাব বিদ্যমান রুল বা বিচারাধীন মামলার ওপর সহজে পড়ে না।

প্রত্যেকটি আবেদন বা মামলা আলাদাভাবে সুরাহার সুযোগ থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এর অপব্যবহার ঘটছে। তবে যঁারা এসব সুবিধা পান, তঁারা আমজনতা নন। পালনের অযোগ্য আদেশ জারি হাইকোর্ট বিভাগ সব সময় আদেশ দিয়ে আসছিলেন যে শাহ আলমকে নম্নি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এ জন্য দফায় দফায় সময় বাড়ানো হয়।

তবে আগাগোড়া এ ধরনের আদেশদাতা দ্বৈত বেঞ্চের নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা হোসেইন হায়দার। কিন্তু পালনের অযোগ্য আদেশ জারির পর তা অমান্য হওয়ার তথ্য জেনেও তিনি আবারও একই ধরনের আদেশ জারি করতে থাকেন। অথচ তঁার আদেশ দেখে মনে হবে, বসুন্ধরার দণ্ডিত মালিকেরা যাতে নম্নি আদালতে Èআত্মসমর্পণ' করেন, এটাই ছিল তঁার একান্ত লক্ষ্য। আর এ জন্য দেশের অধস্তন ও হাইকোর্ট বিভাগের জন্য সংবিধান ও আপিল বিভাগের রায়সম্মত একমাত্র নির্দেশক হচ্ছে ১৮৯৮ সালের সিআরপিসির ৪২৬ ধারা। এই ধারার সার কথা হলো, দণ্ডিত পলাতক ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণ করতে হলে আপিল করতে হবে।

তবে কারও দণ্ড এক বছরের বেশি না হলে ভিন্ন কথা। এমন হলে আপিল ছাড়া নম্নি আদালতের কাছে জামিন আশা করা চলে। আর বিচারিক আদালতও তঁাকে কারাগারে না পাঠিয়ে সরাসরি জামিন দিতে পারেন। তবে তাও অবিলম্বে আপিল দায়েরের শর্তে। বসুন্ধরার মামলায় বিচারিক কারসাজি কত প্রকার ও কী কী তার নমুনা নিচে দেওয়া হলো।

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ আফরোজা বেগম ও তঁার তিন ছেলের ৭২০৬/২০০৮ নং রিট আবেদন এবং শাহ আলমের ৭২০৭/২০০৮ নং একক রিট আবেদনের দুটি আদেশ বিশে্লষণ করলে দেখা যায়, একটি মাত্র বাক্যের হেরফের। শাহ আলমসহ পরিবারের পঁাচজন দণ্ডিতের প্রত্যেককে Èমানবিক' কারণে ২১ মার্চ ২০০৯ পর্যন্ত সংশি্লষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। হেরফের হলো, শাহ আলমকে আমেরিকার হাসপাতালে দ্বিতীয় বাইপাস সার্জারি ও পরিবারের অন্য চারজনকে সেখানে তঁাকে দেখভালের জন্য ওই সময় মঞ্জুর করা হয়। তবে দুটি আদেশে আত্মসমর্পণ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত কথা ছিল। সেটি হচ্ছে, È২০০৯ সালের ২১ মার্চের মধ্যে প্রত্যেক আসামি সংশি্লষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণ না করলে দণ্ড ও রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ আপনাআপনি বাতিল হবে।

' আদালতের ওই আদেশের দুটো দিক ছিল। একটি রুল ও অন্যটি স্থগিতাদেশ। স্থগিতাদেশ নিয়ে ২৬ জানুয়ারি প্রথম এ ধরনের চূড়ান্ত আদেশ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, Èপ্রতীয়মান হচ্ছে, এ পর্যন্ত তঁারা কোনো আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। সেই মতে সংশি্লষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য এই তারিখ থেকে চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হলো।

এটা পালন করতে না পারলে স্থগিতাদেশ আপনাআপনি বাতিল হবে। ' ফাংটাস অফিসিওর পরে আইনের একটি ল্যাটিন পরিভাষা হলো ফাংটাস অফিসিও। এর অর্থ আদালতের আদেশদানের ক্ষমতা রহিত হওয়া। উলি্লখিত ধরনের চূড়ান্ত আদেশের পর বসুন্ধরার মামলার রায়ের উপর স্থগিতাদেশ প্রদান প্রশ্নে হাইকোর্ট বেঞ্চ ফাংটাস অফিসিও হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অন্তত তিনবার এর ব্যত্যয় ঘটে।

২৬ জানুয়ারি ২০০৯ চার সপ্তাহ সময় বঁেধে দিয়ে বলা হলো, Èএর মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে ব্যর্থ হলে স্থগিতাদেশ আপনাআপনি বাতিল হবে। ' ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ওই সময় অতিক্রান্ত হয়। কিন্তু কেউ কোনো আদালতে আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেননি। সে অনুযায়ী স্থগিতাদেশের বিষয়টি ২২ ফেব্রুয়ারিতে বাতিল হওয়ার বিষয়টি কারও অনুমতির অপেক্ষায় ছিল না। কিন্তু এর পরও আদালত নিজের রায় বিস্ময়করভাবে পুনরায় লেখেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ দ্বিতীয়বার একই ভাষায় Èসংশি্লষ্ট আদালতে' আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত আদেশ দেওয়া হলো। কিন্তু তা দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যেকে অগ্রাহ্য করেন। ২১ মার্চ ২০০৯ স্থগিতাদেশ আপনাআপনি বাতিল হয়। এরপর যথাক্রমে ২৩ মার্চ ও ২৫ মার্চ হাইকোর্ট বেঞ্চ দুটি রিটের সময় বাড়ানোর দরখাস্ত সম্পর্কে সদ্ধিান্ত দেন। এতে শাহ আলমের ক্ষেত্রে তঁার Èঅবনতিশীল হূদযনে্ত্রর' চিকিত্সা ও তঁার এক ছেলের পক্ষে বাবাকে তদারকির দোহাই দেওয়া হয়।

আর শাহ আলমের স্ত্রী ও দুই ছেলে এদিন প্রথমবারের মতো হাইকোর্ট বেঞ্চে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হন। এবারও দেখা যায়, তৃতীয়বারের মতো একই শর্তে তিন মাসের সময় বেড়েছে। আত্মসমর্পণ নাটক আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বৃহত্তর বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেন, আত্মসমর্পণ মানে যে আদালত দণ্ড দিয়েছেন, সেই আদালতের কাছে নিজকে সোপর্দ করা। দণ্ডিত আসামি আপিল ছাড়া কোনো কারণে উচ্চ আদালতে হাজিরা দিলে তঁাকে আত্মসমর্পণ বলা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই নিয়মের কখনো কোনো বিচু্যতি ঘটেনি কিংবা ঘটলেও আপিল বিভাগ দ্বারা তা কখনো সমর্থিত হয়নি।

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি বোরহান উদ্দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ শাহ আলমের স্ত্রী আফরোজা বেগমের ৭২০৬/২০০৮ নং রিটের আদেশে লিখেছেন, Èআমাদের আদেশ অনুসারে তঁারা সংশি্লষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আত্মসমর্পণ গৃহীত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে এক, দুই ও চার নম্বর (আফরোজা ও দুই ছেলে) পিটিশনার এই আদালতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়েছেন। ' আপিল বিভাগ যদিও সাফ বলেছেন, আইনের চোখে পলাতক ব্যক্তি উচ্চ আদালতের কোনো সহানুভূতি পেতে পারেন না। কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগ ওই আদেশেই লিখেছেন, Èতঁারা এখানে হাজির হয়ে নিজেদের আদালতের অনুকম্পার ওপর সঁপে দিয়েছেন।

তঁারা আমাদের আদেশ পালন করতে গিয়েও পুরোপুরি পালন করতে পারেননি। ' এখানে সবচেয়ে পরিহাস হলো, নম্নি আদালতের অক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরও হাইকোর্ট বেঞ্চটি আগের মতোই অভিন্ন শর্তে তঁাদের ওই আদালতের কাছেই আত্মসমর্পণের জন্য সময় বাড়িয়ে দেন। নম্নি আদালতের বিচারক এ কে রায় ১৬ মার্চ ২০০৯ যথার্থই আত্মসমর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ নির্দষ্টি করেছিলেন যে বিশেষ আদালতের দণ্ডের রায় হাইকোর্ট বিভাগ কতর্ৃক স্থগিত থাকা অবস্থায় তঁারা আত্মসমর্পণের আবেদন বিবেচনায় নিতে পারেন না। ২৩ মার্চ ২০০৯ শাহ আলমকে অসুস্থতার কারণে তিন মাস ও দুই দিন পর ২৫ মার্চ ওই বেঞ্চ অন্য চারজনকে আগের মতোই রায় স্থগিত রেখে তথাকথিত আত্মসমর্পণের জন্য তিন মাস সময় বাড়িয়ে দেন। এভাবে হাইকোর্ট বেঞ্চ আপিল বিভাগকে উপেক্ষা করে একটি অভাবনীয় স্বেচ্ছাচারিতার নজির স্থাপন করেন।

২৫ মার্চ বেঞ্চটি তৃতীয়বারের মতো উলে্লখ করেন, Èতিন মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে স্থগিতাদেশ আপনাআপনি বাতিল হবে। ' কিন্তু বাস্তবে তাও বাতিল হয়নি, বরং আত্মসমর্পণ নাটকের আরেকটি অঙ্ক মঞ্চস্থ হয় ২৫ মে। এদিন শাহ আলম ও তঁার পরিবারের দণ্ডিত সদস্যরা ঢাকার বিশেষ আদালত-৩-এ কথিতমতে আত্মসমর্পণ করতে যান। ওই আদালতের বিচারক মোজাম্মেল হোসেন প্রকারান্তরে হাইকোর্ট বিভাগ ও বসুন্ধরার আইনজীবীদের আকাঙ্ক্ষা আংশিক পূরণ করেন। সিআরপিসির ৪২৬ ধারামতে, তঁাদের আবেদন তঁার পূর্বসূরি বিচারক এ কে রায়ের মতোই তাত্ক্ষণিক নাকচ করার কথা।

তিনি তা করেছেনও। কিন্তু তা করতে গিয়ে আদেশের মধ্যে লিখে দিয়েছেন, আসামিরা তঁার আদালতে Èআত্মসমর্পণ' করেছেন। কিন্তু আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী এটাকে আত্মসমর্পণ বলা যায় না। আসামিরা আইনের চোখে পলাতকই থেকে গেছেন। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৯ একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে এনবিআর ও আইন মন্ত্রণালয়ের কাণ্ডকীর্তির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।

বলেন, তঁারা তাহলে এখনো আত্মসমর্পণ করেননি! উলে্লখ্য, এ বছরের ২৫ মার্চ-পরবর্তী হাইকোর্ট বিভাগের আদেশগুলোতে আর আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গ উলি্লখিত হয়নি। হাইকোর্ট বিভাগের নথিতে ২৫ মের ওই উদ্ভট আদেশটি রয়েছে, কিন্তু সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই। দুটি আইনের দুটি ধারা আয়কর আইনের আওতায় কোনো মামলা আপসে প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে আয়কর আইনের ১৭০ ধারা ও ফেৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫(৫) ধারা একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ১৭০ ধারায় বলা আছে, Èএই অধ্যায়ের অধীন শাসি্তযোগ্য অপরাধের জন্য কোনো বিভাগীয় কার্যক্রম (প্রসিডিংস) শুরু বা মামলা দায়েরের (প্রসিকিউশন) আগে বা পরে রাজস্ব বোর্ড অনুরূপ অপরাধের মীমাংসা করতে পারবেন। ' উপমহাদেশে ১৯২২ সালে প্রথম আয়কর আইন হয়।

এতে কর ফঁাকি শাসি্তযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার আগের ৮৫ বছরে এই অপরাধে এই ভূখণ্ডে কোনো মামলা হয়েছে বলে জানা যায় না। সে কারণে কখনো কোনো আপসের ঘটনাও ঘটেনি। এনবিআর কর্মকর্তারা অবশ্য নিশ্চিত করেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোসাদ্দেক হোসেন ফালু একই ধরনের আয়কর ফঁাকির মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু বোর্ড তা প্রত্যাখ্যান করে।

জনাব ফালু তঁার মামলার রায় ঘোষণার আগেই ওই আবেদন করেছিলেন। ফেৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫(৫) ধারায় বলা আছে, Èযখন আসামিকে বিচারের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে অথবা যখন সে দণ্ডিত হয়েছে এবং তার আপিল নিষ্পন্নাধীন অর্থাত্ সুরাহার অপেক্ষায় আছে, তখন যে আদালতে তাকে প্রেরণ করা হয়েছে বা ক্ষেত্রমতে যে আদালতে তার আপিল শুনানি হবে, সেই আদালতের অনুমতি ব্যতীত অপরাধের আপস মীমাংসার অনুমতি দেওয়া যাবে না। ' ইউএনবির খবর: ২৩ আগস্ট ২০০৯ বার্তা সংস্থা ইউএনবির বরাতে দৈনিক সমকাল-এ বিস্ময়কর খবর ছাপা হয় যে Èএনবিআরকে শাহ আলমের মামলা নিষ্পত্তির অনুমতি দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। ' প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মামলায় আসামিদের সাজা হওয়া সত্ত্বেও এনবিআর সমঝোতার ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিচ্ছে। আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ায় মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণে এখন আর কর কমিশনারের সামনে আইনগত বাধা থাকল না।

' অজ্ঞাতনামা কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে ২ সেপ্টেম্বর জানতে চাইলে এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ তঁার দপ্তরে এই প্রতিবেদককে বলেন, Èআমরা বিষয়টি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। ' এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে তিনি এনবিআরের সদস্য (আয়কর আপিল ও অব্যাহতি) আশরাফ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরদিন বিকেলে জনাব আশরাফ সাক্ষাত্ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এই প্রতিবেদক ওই দিন পুনরায় এনবিআরের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানালে তিনি জনাব আশরাফের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু জনাব আশরাফ তঁার দপ্তরে আলোচনাকালে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত, এ বিষয়ে বোর্ডের প্রস্তাব ইত্যাদি দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় মতামত দিয়েছে, Èযদি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের বা অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে ১৭০ ধারা প্রযোজ্য হবে। অবশ্য আইনগত অনুমোদন লাগবে। ' বারবার অনুরোধ ও বর্তমানে বলবত্ তথ্য অধিকার আইনের কথা তঁাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি নথি না দেখে উলে্লখ করেন, Èএখানে আইনগত অনুমোদন বলতে আমরা অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদন বুঝি এবং সে কারণে তঁার মতামত চেয়ে তঁাকে পত্র দিয়েছি। এখন আমরা তঁার জবাবের অপেক্ষায় আছি। ' আশরাফ নিশ্চিত করেন, এনবিআরের সর্বসম্মত রেজু্যলেশনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল নীরব প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, এনবিআর সুপরিকল্পিতভাবে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের সঙ্গে আপস করতে ফেৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫(৫) এবং এই বিধান বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রিতিষ্ঠিত ব্যাখ্যার হানি ঘটিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে বেআইনি ও বিকৃত ব্যাখ্যা জোগাড় করে তারা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সমর্থন আদায়ের চষ্টো করেন। জানা গেছে, তিনি এতে সায় দেননি। শাহ আলম পরিবারের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও অ্যাটর্নি জেনারেল এর আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, শাহ আলমকে অবশ্যই কারাগারে যেতে হবে। ২৫ মে ২০০৯ নম্নি আদালত তঁাকে কারাগারে না পাঠানোয় তিনি আদালতের সমালোচনা করেছিলেন।

আইনজ্ঞরা মনে করেন, এনবিআরের রেজু্যলেশনটাই অবৈধ। নয় সদস্যের এনবিআরের প্রত্যেকের দুই থেকে আড়াই দশকের চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রায় ছয় মাস হলো চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অন্যতম অঙ্গ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব। তঁারা দৃশ্যত প্রত্যেকে প্রমাণ করেছেন, এই রাষ্ট্রে বীরদর্পে রেজু্যলেশন নিয়ে দণ্ডিত পলাতকের জন্য বেআইনি সদ্ধিান্ত নেওয়াও সম্ভব এবং সে কাজে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের বেআইনি অনুমোদন অর্জন করাও সম্ভব।

এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন ও সদস্য আশরাফ উদ্দিন আহমেদ ৫ জুলাই ২০০৯ উপকরকমিশনার কবির উদ্দিন মোল্লাকে এনবিআরের পক্ষে বসুন্ধরার রিট আবেদনের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে হলফনামা দিতে ক্ষমতা অর্পণ করেন। কবীর উদ্দিন মোল্লাই ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই বসুন্ধরার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। হাইকোর্টে এনবিআরের ওই অবস্থান এবং আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চাওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য গোপন ও স্ববিরোধী অবস্থান সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত ৬ সেপ্টেম্বর এনবিআরের চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। দুই পৃষ্ঠার এই চিঠির জবাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ১৪ সেপ্টেম্বর যোগাযোগ করা হলে এনবিআরের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব আবু বকর সিদ্দিক বলেন, তিনি ওই চিঠি চেয়ারম্যানের কাছে পঁেৌছে দিয়েছিলেন।

আইন মন্ত্রণালয়ের কাণ্ড আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্ভট মতামত হলো, শাহ আলম গং আপিল ছাড়াও Èঅন্য কোনোরূপ কার্যক্রম' অর্থাত্ রিট আবেদনের আওতায় মীমাংসার সুযোগ পাবেন। বসুন্ধরার আইনজীবীদের আবদার, আপিল না করেই তঁারা আপস করবেন। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, আইনসচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের দপ্তর গত ৩ আগস্ট এনবিআরের চিঠি প্রথম গ্রহণ করে। এরপর এটি যায় মতামত-৩ শাখায়। মতামত প্রদানে নিয়োজিত তিনটি শাখার মধ্যে কোনটি কোন মতামত দেবে, তা ঠিক করে দেন সচিব।

আইনসচিবের আদেশে শাখা-৩-এর উপসচিব হোসেন শহীদ আহমেদ আলোচ্য মতামতের খসড়া তৈরি করেন। উপসচিব এবং ওই শাখার যুগ্ম সচিব মো. মজনুল আহসান (উভয়ে জেলা জজ) মতামতে সই দেন ৯ আগস্ট। পরদিন সই দেন আইনসচিব। এরপর আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ ও প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সই দেন ১২ আগস্ট। মোট পঁাচজনের সই করা ওই মতামতে বিস্ময়করভাবে বলা হয়েছে, Èআপিল করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এনবিআরের নথিতে কিছু বলা হয়নি।

তবে আলোচ্য মামলায় প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বা অন্য কোনোরূপ কার্যক্রম গৃহীত হয়ে থাকলে আয়কর অধ্যাদেশের ১৭০ ধারার আলোকে বিষয়টি মীমাংসা করতে আইনগত কোনো বাধা নেই। ' ৭ সেপ্টেম্বর বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী তঁার দপ্তরে বসে মতামতটি পাঠ করে প্রথম আলোকে বলেন, Èযখন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো আইনগত বিষয়ে মতামত প্রার্থনা করে, তখন তাদের উচিত প্রয়োজনীয় সব তথ্য প্রকাশ করা। ' তঁার কাছে প্রশ্ন ছিল, আপনি কি মনে করেন, সিআরপিসির ৩৪৫(৫) এড়িয়ে আপিল ছাড়া আদেৌ অন্য কোনো উপায়ে আপসের পথ খোলা আছে? জবাবে অভিজ্ঞ আইনজীবী শফিক আহমেদ তাত্ক্ষণিক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, Èনা। আপিলই একমাত্র বিকল্প। ' কীভাবে ও কোন উদ্দেশে Èঅন্য কোনোরূপ কার্যক্রম' কথাটি জুড়ে দেওয়া হলো এবং কেন আইন মন্ত্রণালয় বোর্ডের কাছে দরকারি তথ্য জানতে চায়নি এবং এনবিআর কেন দরকারি তথ্য গোপন করল∏সে বিষয়টি আপনি খতিয়ে দেখবেন? আইনমন্ত্রীর জবাব, Èঅবশ্যই।

' অবশ্য সংশি্লষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, উপসচিব ও যুগ্ম সচিব দুজনই আসলে একমত যে সিআরপিসির ৩৪৫(৫)-এর অধীনে আপিল ছাড়া মীমাংসার অন্য কোনো পথ খোলা নেই। গতরাতে যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করতে পারেননি যে, আইনমন্ত্রী ওই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না। গত ৭ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ওই কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কঠোর গোপনীয়তা হাইকোর্টের রেওয়াজ অনুযায়ী কোনো বেঞ্চ যদি কোনো কারণে কোনো মামলা আউট অব লিস্ট বা কার্যতালিকা থেকে বাদ দেন, তাহলে সাধারণত ওই দিনই মামলার নথি সংশি্লষ্ট বিভাগে চলে আসে। কিন্তু এ মামলায় তার ব্যতিক্রম ঘটে।

২০ আগস্ট আউট অব লিস্ট করার পরদিন নথি দেখতে বেঞ্চ কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানালে তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নথি খাস কামরায় আছে। প্রথম আলোর বিরুদ্ধে এর আগে ওই বেঞ্চে আনীত আদালত অবমাননার অভিযোগ এবং সে বিষয়ে প্রধান বিচারপতির আদেশ পরিদর্শনে ২৫ আগস্ট এই প্রতিবেদক হাইকোর্ট রুলসের আওতায় প্রধান বিচারপতির কাছে একটি আবেদন করেন। এই রুলস Èআগন্তুক'কে নথি পরিদর্শনের অধিকার দিয়েছে। জানা যায়, এরপর সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার সংশি্লষ্ট বেঞ্চকে তা অবহিত করেন।

এভাবে Èআউট অব লিস্ট' করার ১৪ দিন পর ৩ সেপ্টেম্বর মামলার নথি ওই বেঞ্চ থেকে সংশি্লষ্ট শাখায় আসে। রিট শাখা থেকে ৫ জুলাই নথিটি তলব করেন সংশি্লষ্ট বেঞ্চ। এটি ফিরে আসে প্রায় দুই মাস পর ৩ সেপ্টেম্বর। এই দুই মাস ওই বেঞ্চ কর্মকর্তারা ওই নথি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন। পীড়াপীড়ি প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন ১২ জুলাই হাতে লেখা যে আদেশ দিয়েছিলেন, তার নিচেই বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি বোরহান উদ্দিন আলোচ্য মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কারণ বর্ণনা করেন।

আদেশে লেখা হয়েছে, È২০ আগস্ট ২০০৯ বসুন্ধরার আইনজীবী ফিদা এম কামাল ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান প্রথম আলোর প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুনঃ পুনঃ পীড়াপীড়ি করেন। আমরা যদিও তঁাদের রুলের মেরিটে শুনানি করার জন্য বলেছিলাম, কিন্তু তঁারা কেবল প্রথম আলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েই বিশেষ আগ্রহ দেখান। প্রয়োজনীয় আদেশের জন্য ৯ জুলাই ২০০৯ আমরা বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়েছিলাম। আমরা অবশ্য বিজ্ঞ অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও রিট আবেদনকারীর বিজ্ঞ আইনজীবীর পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও আমরা নিয়মের বাইরে যেতে পারি না। কারণ এ মামলাটি আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল শুনানি ও মামলা নিষ্পত্তির জন্য।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখেছি, বিষয়টি আমাদের শোনা উচিত হবে কি না। বিশেষ করে যেখানে এই বেঞ্চ কতর্ৃক সুরাহার জন্য স্বয়ং মাননীয় প্রধান বিচারপতি ফেরত পাঠিয়েছেন। তাই আমরা চিন্তা করেছি, এখন এটা আর না শোনাই হবে অধিকতর বিচক্ষণ কাজ। ' আদালত সবশেষে বলেন, Èএটা রেকর্ডে রাখা দরকার যে অন্যান্য আংশিক শ্রুত মামলার সঙ্গে এই রিট পিটিশনটির শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য শুধু আজকের দিনের জন্য এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছিল। উপরিউক্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই রিট পিটিশনটি আর আংশিক শ্রুত বলে গণ্য হবে না এবং তা কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো।

' বিচারিক Èনৈরাজ্য' যেভাবে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মামনুন রহমান ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮ দুর্নীতির মামলায় ওরিয়ন গ্রুপের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ওবায়দুল করিমের রিট আবেদনের (নং ৭৩৯৩/২০০৮) পরিপ্রেক্ষিতে তঁাকে গ্রপ্তোর না করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তঁার মামলার রায়ের কার্যকারিতাও তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছিলেন। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মামনুন রহমানের একই বেঞ্চ এর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে বসুন্ধরার দায়ের করা দুটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারিক আদালতের রায় তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছিলেন। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ওই দুটি রিট মামলার যাত্রা অভিন্ন হলেও ইতিমধ্যে তা দুই ধরনের ফল বয়ে এনেছে। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মামনুন রহমানের বেঞ্চ ভেঙে গিয়েছিল।

কিন্তু বসুন্ধরার মালিকদের মতো ওরিয়ন গ্রুপ আর বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দারের কাছ থেকে এ ধরনের প্রতিকার পায়নি। ওরিয়নের দণ্ডিত পলাতক মালিক গ্রপ্তোর ও আত্মসমর্পণ এড়ানোর অন্যায্য প্রতিকার নেন বিচারপতি মীর হাশমত আলীর নেতৃত্বাধীন অন্য একটি বেঞ্চ থেকে। বসুন্ধরার মামলায় বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার প্রথম আদেশ দেন ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮। আর শেষ আদেশসংবলিত নথি তঁার হাত থেকেই শেষবারের মতো আসে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯। মোট সময় ৩৫১ দিন।

এর মধ্যে আমরা রাষ্ট্রপক্ষকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তারা আপিল বিভাগে যায়নি। ওরিয়নের ক্ষেত্রেও একইভাবে লুকোচুরি চলছে। সাংসদ শেখ হেলাল উদ্দিন হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া Èপ্রশ্নবদ্ধি' জামিন ভোগ করে চলেছেন। শাহাজাহান ওমরের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ একই ধরনের জামিন নাকচ করেছিলেন।

কিন্তু দণ্ডিত পলাতক হেলাল ও তঁার স্ত্রীর প্রশ্নবদ্ধি জামিনের বৈধতা আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহও দণ্ডিত পলাতক হিসেবে তথাকথিত জামিন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবার আইন লঙ্ঘন! বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দারকে প্রধান বিচারপতি Èআইন' অনুযায়ী শুনানি ও তা নিষ্পত্তি করতে আদেশ দিয়েছিলেন। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ৬১ ডিএলআরএ বর্ণিত দুদক বনাম মাহমুদ হোসেন মামলায় আপিল বিভাগের রায়টি নির্দষ্টিভাবে উলে্লখ করেন। এতে বলা আছে, দণ্ডিত পলাতক আসামি সরাসরি হাইকোর্টে আসতে পারবেন না।

৬ জুলাই ২০০৯ আদালতে হলফনামা দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বলেন, আপিল বিভাগের ওই রায়ের পর আর এই রিট চলতে পারে না। প্রধান বিচারপতি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির যে আদেশ দেন, তা শুধু আদালত নয়, সংশি্লষ্ট সব পক্ষের জন্য প্রযোজ্য ছিল। বসুন্ধরার আইনজীবীর সামনে একমাত্র বিকল্প ছিল তঁার মক্কেলকে নম্নি আদালতে আত্মসমর্পণ করে আপিল দায়ের করতে পরামর্শ দেওয়া। রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের করণীয় ছিল বসুন্ধরার পক্ষে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়া। অন্যথায় অন্তত এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে আপনি যে আইনি প্রশ্নে শুনানি করতে চাইছেন, তা নির্দষ্টিভাবে আপনারই দেওয়া আরেকটি অন্তর্বর্তী আদেশে আপিল বিভাগ চূড়ান্ত ফয়সালা করে দিয়েছে।

সুতরাং রুলটি খারিজ করে দিন। কিন্তু উভয় পক্ষ তা না করে বরং প্রথম আলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই উচ্চকিত থাকেন। আর আদালতের যেখানে আপিল বিভাগের Èআইন'মতে উচিত ছিল, ১১ মাস আগে জারি করা রুলটি খারিজ করে আসামিদের নম্নি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেওয়া, সেখানে তঁারা রিট মামলাটি আউট অব লিস্ট করলেন। এর মানে হলো, ওই আদালত এখনো মনে করেন, রিট আবেদনটির শুনানি হাইকোর্ট বিভাগে হতেই হবে। অথচ আপিল বিভাগের আইন হলো, কোনো অবস্থায়ই তঁার কোনো প্রকারের আবেদনই শোনা যাবে না।

কারণ যে লোক আইন থেকে পালিয়ে বেড়ান, আদালত তঁাকে প্রতিকার দিতে পারেন না। বসুন্ধরা বলেই... আইনজ্ঞরা বলেন, ৬ জুলাই ২০০৯ পর্যন্ত বেআইনিভাবে হলেও বসুন্ধরার সপক্ষে একটি স্থগিতাদেশ ছিল। এখন স্থগিতাদেশ না থাকায় জারি করা রুলের কার্যকরিতা কমেছে। রুল জারি করা হয়েছিল কেন, তঁার বিরুদ্ধে ঘোষিত দণ্ডের রায় বাতিল করা হবে না। পলাতক ব্যক্তির জন্য জারি করা রুল গুরুত্বহীন।

তঁাদের গ্রপ্তোরে কোনো বাধা নেই। বসুন্ধরার পলাতক মালিকেরা কখনো হাইকোর্টে, কখনো ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।