আমি আমার পৃথিবীর রাজা
এই ঘটনাটা জানা কিন্তু অপ্রত্যাশিত। প্রত্যাশিত প্রতিদিনকার সকালের মতই একটা বা একাধিক দিনে অন্তত একবার না একবার ঘটনাটা ঘটবেই। ঘটনাটা না ঘটলেই বরংচ আশ্চর্যের মতো দেখায়। যার কারণে তাকে প্রত্যাশিত’র মতই দেখতে হয়। তাছাড়া কোন উপায়ও যে দেখছি না।
কিন্তু ভেতর থেকেই কেমন যেন একটা অপ্রত্যাশিত আচরণ বের হয়ে আসে আমার। আমি এইখানে নিরূপায়। কোন বিকল্প পথ নেই বলেই হয়তো তাকে নীরবে মেনে নেয়ার মত আচরণ করে যাচ্ছি প্রত্যেকটা ঘটনার সময়। এবার তো রীতিমত অপো! কখন সেই কাল? কখন সেই মুহূর্ত আসবে? তারপরেই আহা মুক্তি! সত্যি মুক্তি! আহা! প্রথম মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম এই রকম কোনো ঘটনায় কবে ঠিক তার দিন তারিখ মনে না থাকলেও ঘটনাটা স্পষ্ট মনে আছে। লজ্জায় আমার চোখ অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল বলে অনুভব করছিলাম।
মনে হয়েছিলো আমি বোধ হয় আর কিছুই দেখতে পারবো না। কিন্তু যখন আমি আবারও সবকিছু দেখতে পেরেছিলাম তখন মনে হলো এই অপরাধ বোধ হওয়ার কোন কারণ দেখি না। বোধ হয় আমার দূর্বলতার কারণেই এই অপরাধ বোধ পেয়েছিলো আমাকে। দ্বিতীয় বার, হ্যা দ্বিতীয় বার আমার সাথে এইরকম বিরক্তীর শিকার হয়েছিলো আরো কয়েকজন। যেমন আজও আমি ছাড়াও আরও একজন বিরক্তীর শিকার।
কিন্তু যদিও এখানে আমার করার কোন কিছু ছিলো না মনে করে আমি অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
এইবার সেই ঘটনার জন্য প্রতীাই রীতিমত! আগের রাতের মধ্য প্রহড় থেকেই অনুভব করলাম আমার পাশে শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। সে ঘর থেকে বেড় হয়ে গেছে। তার সাথে বের হয়েছে তার সবচেয়ে কাছের যন্ত্র সেলফোন। শুরু হয়ে গেছে তাহলে! বুঝলাম প্রতীা শুধু আমারই ছিলো না।
সাথে আরও দুয়েক জনেরও। যাক, ভেবে তৃপ্তি বোধ করলাম যে আমি একা একাই ভাবনার সাগরে ডুবে যাই নি কেবল। আমার পাশের শূন্যতা ঠিক কতণ চলেছিলো তা আমি আমার স্মৃতিতে ধরতে পারলাম না। আমার কেবলই ঘুম পাচ্ছিল। হয়তো আমি আমার অপোর ট্রান্সপারেন্টেশন দেখে একটু নির্ভার লাগছিলো বলেই কিনা আমি অল্প কিছুণের ভেতর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।
প্রত্যেকদিন সকালের মতই আমার ঘুম ভাঙে। কিন্তু প্রত্যেকদিনের চেয়ে একটু সকালেই বলতে হবে তাকে। নিয়মিত আমার ঘুম যদিও ভাঙে সকাল আটটা থেকে সারে আটটার মাঝে আজ ভাঙলো সাতটায়। বালিশে মাথা রেখেই ঘড়িতে সময় দেখেই চোখকে আর টেনে তুলতে ইচ্ছে হলো না। আবার সেই একই আবর্তের ভেতর প্রবেশ করার মনোবাঞ্ছায় যখন চোখ বন্ধ করতে ইচ্ছে হলো তখনই মনে হলো ঘরে কিসের যেন শূন্যতা অনুভব হচ্ছে।
তাকিয়ে দেখলাম আমার ঘরবন্ধু, মানে সে ঘরে নেই। বুঝতে আর বাকি রইলোনা যে, গতকাল রাত থেকে আমার যে বিরক্তীকর অভিজ্ঞতার জন্য আমি অপোয় আছি, সেও তেমনি আনন্দের উছিলায় বসে ছিলো। এখনই কোথায় যেন বেড়িয়ে গেল। হায় আমার কপাল রে! ঘুমানোর সময়ও তার মুখ দর্শন করতে পারলাম না আর ঘুম থেকে উঠেও না। এই যদি হয় ঘরবন্ধুর রূপ তবে তো ভালোই! আমার ঘরবন্ধু তো আর ‘বাউল’ বা ‘উদাসি টাইপ’ কেউ না।
তাহলে না হয় মানা যেত। কিন্তু এরকম সহজ সরল মানুষটারও তাহলে এই রকম হয়। যা হউক আমি পূণর্বার ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি দিয়ে আমার চোখের ঘুম পালিয়ে গেল কোন দূর দেশে। আমি তার ঠিকানা জানিনা।
আহ ঘুম- একটু আগে তো শান্তিতেই তোমাতে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু দিলেনা, দিলেনা আমার সেই শান্তিকে বইতে। ঘুম না আসায় জোড় করেই শুয়ে ছিলাম। মনে মনে তখন প্রতিজ্ঞা- যে করেই হোক ঘুম আবার আনবো এবং আমি ঘুমাব। কিন্তু আমি জানতাম আমার একবার ঘুম ভাঙলে তা আর জোড়া লাগে না বা সেই ঘুম আমি আর ফিরে পাই না।
সেই যন্ত্রণাকে আরো যন্ত্রণাবিধুর করে তোলার জন্য যতণ সহ্য হয় মটকা মেরে শুয়েই থাকব বলে আরও একটা প্রতীজ্ঞা করলাম। এর ভেতর আমার ঘরবন্ধু একবার দরোজাটাকে সটান খুলে রেখে ভেতরে আসলো। আমি এক চোখ খুলে দেখতে গিয়ে প্রচণ্ড আলোর একটা ধাক্কা খেলাম চোখে। আবার চোখ বন্ধ। কিন্তু চোখের সামনে মনে হচ্ছিল প্রখর রোদ্রের তাপ ঘরের ভেতর উপস্থিত হয়ে আমাকে ঘুম থেকে উঠাবে বলে মনস্থির করেছে।
তারসাথেও কিছুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে করতে গিয়ে মনে হলো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি আর কুলিয়ে উঠতে পারছিনা। ততণে নয়টা বেজে প্রায় চল্লিশ মিনিট। হঠাৎই দেখলাম পাশের ঘরে হকার তাজা পত্রিকা রেখে গেল। আমি আর তাজা পত্রিকার লোভ সামলাতে না পেরে উঠে পত্রিকার পাতায় হানা দিলাম। সংবাদ চোখে পড়ে না কেবল বিজ্ঞাপন।
পত্রিকার প্রথম পাঠক তার পড়া ছেড়ে দিয়ে আমাকে আমার ঘরের দিকে ইশারা করে বলে উঠল ‘ছেলেটাতো কথা বলতে বলতে পাগল হইয়া যাইবো। ’ আমার কি করার আছে? বলে আমি নিজের গা বাঁচাবার চেষ্টা করি। পরণে মনে হয় আজতো একটু বেশিই বলার কথা। যার জন্য আমরা দুইজন দুই রকম ভাবে অপোয় আছি। আমারও খবরের কাগজ পড়া খতম! আমি উঠে এলাম।
মনে হয় কিছুণের ভেতর ুধা লাগবে। ঘরে এসে বসলাম। প্রতিদিন সকালেই ুধাটা তার আগে লাগে, আমি ভাবলাম আজকেও তারই আগে লাগুক। এতে খাবার পানি আনার ঝামেলা আমার পোহাতে হবে না। কিন্তু খাবার সম্পর্কে সে আজ মনে হয় একেবারেই উদাসীন।
প্রত্যেকদিন খবরের কাগজটা এলেই সে পাত্র চাই বিজ্ঞাপনগুলো একটু মনযোগ সহকারে পড়ে। আর নিজের সাথে তুলনা করে। পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দেওয়া পাত্রীর জামাই হতে হলে যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় তা তার আছে কি না? যদি থাকে তবে ডেকে ডেকে আমাকে শোনাবে। কিন্তু আজ খবরের কাগজের দিকেও তার কোনও খেয়াল নেই। তার মন শুধু পরে আছে সেই সময়ের দিকে।
এতই প্রতীা তার। আর আমি? আমার কথাই বা আর কি বলি। যথারীতি সকালের নাস্তাপর্ব শেষ।
সাধারণত প্রত্যেকবার সকাল দশটা থেকে এগারটার সময় আমার দিকে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝানো হয় যে এইবার সেই সময় হইছে এইবার তুমি ভাগো। কিন্তু না; এইবার কিন্তু এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো না।
আমি আমার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সময় দেখি। কোন ব্রেকিং নিউজ নেই। থাকলে আমার জন্য ভালো হতো। তবুও মনে মনে আশা ধরে রাখি। মনে কয় এই বুঝি আসলো তিনি, আর আমার দিকে চোওরে ইশারা।
বাস্ বাস্ যথেষ্ঠ হইছে। এইবার আমার নিজের পালা। মনে হয় সহযোগীতার হাতটা আমাকেই বাড়াতে হবে। আমি আমার সেলফোন হাতে নিয়ে গতকালের পূর্ব পরিকল্পিত কাজের জন্য তাগাদা দেওয়ার প্রস্তুতি নিই নিই করছি। এমন সময়ই আমার সেলফোন বেজে উঠল।
ভালোই হলো প্রত্যাশা অনুযায়ি কাজ হয়ে যাবে বলেই আশা করছি। ফোনে কথা বলার পর পরই আমার সেই আশায় গুড়ে বালি হয়ে গেল। ওপাস থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো- ‘দাদাভাই তোমাকে আজ আর কষ্ট করে আসতে হবে না। আমি এখন একটু ব্যস্ত সময় পেলেই তোমাকে ফোন করব। ’ আহারে কি দরদের গলা আমার! মেজাজটা আমার আগুনের মতন গরম হয়ে যায়- কিন্তু কিচ্ছু করার নাই।
‘ঠিক আছে সময় হলো ফোন দিও। ’ বলে আমি আমার ােভটা আমার ভেতরই রাখলাম। আমার তখন কি অবস্থা তা কারে বুঝাই? এমনি করে করে দুপুর বারোটা বাজলো। মনে হয় আমারও বারোটা বাজলো। আমার তখন ‘কি হয়? কি হয়?’ অব¯া’! যা হয় হবে বলে আমার যাপিত জীবন চালাচ্ছি।
কিন্তু মনে মনে আমি বলতে গেলে চাপেই আছি । যতণ না এই চাপ কেটে উঠে ততণ আমার নিস্তার নেই। এভাবেই চলছে...। চলুক! কি আর করা! প্রত্যেক দিন তো এমন হয় না। ভেবেই আমি স্বস্তিতে থাকার চেষ্টা করি।
এই রকম ভাবনার ভেতরই চলে এলো দুপুরের খাবার। আমি মনে মনে ভাবলাম এবার বোধহয় শুধু ফোনের উপর দিয়েই প্রত্যাশার বেলুন ফুটানোর সময় হলো। ইতিমধ্যে আমার যে কখন ুধায় কলিজা শোকানোর মত অবস্থা তা টেরই পাই নি। আমি øানের উদ্দেশ্যে বেরুলাম। আমি øান সেরে ফেরার সাথে সাথেই আমার ঘরবন্ধু হাতে সেভিংয়ের আনুষাঙ্গিক নিয়ে øানঘরের দিকে রওনা হলো।
ভাবলাম এ প্রস্তুতি বিকেলের। এবং তার কর্ম চাঞ্চল্যতা শুরু হবে দুপুরের খাবার বাইরে খাওয়ার সাথে এই ভেবে স্ব¯িততে আমার খাবার খাওয়া শুরু। খাওয়ার পর গতরাত থেকে যে প্রতীায় ছিলাম তার অবসান হলো। সাথে সাথে আমার নিজেরও সেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হয় নি ভেবে আমার প্রচণ্ড কান্তি পেল। মনে হয় দুপুর বেলা আমার দীর্ঘদিন পর ঘুম আসবে।
এই কথা ভেবেই বিছানার পাশে থাকা জীবনানন্দের অবসরের গান পড়তে পড়তে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। হায় জীবনানন্দ! তুমি আমাকে এখন অবসরের গান শোনাতে গিয়ে ঘুমের দেশের গান শুনিয়ে দিলে! আমি ঘুমিয়েই পড়ছিলাম বোধ হয়। বোধ হয় না, সত্যি সত্যিই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার ঘুম ভাঙলো প্রকৃতির ডাকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সময় এখনো দুটো বাজে নি।
কিন্তু আমার ঘরবন্ধু ঘরে নেই। ও! সম্ভবত দুপুরের খাবারের ডাকে গেছে। ভালোই হলো একেবারে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলের অভিসার। আমি আরামসে ঘুমাই। প্রকৃতির কাছ থেকে ফিরে এসে দরোজা বন্ধ করে আমি পুনরায় ঘুমের দেশে ফেরার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু অসম্ভব গরম আর দরোজা জানালা বন্ধ থাকায় আবহাওয়া আরো গুমোট লাগছিলো বলে ঘুমটা তখন ধরতে একটু সময় নিচ্ছিল। মনে হলো আর কিছুণের ভেতর পূর্ণাঙ্গ ঘুমের দেশে চলে যেতে পারবো। অনেকদিন বিকেলে শান্তিতে ঘুমাই না! ভাবতেই ঘুম মনে হয় প্রিয়তমার মত আরও জড়িয়ে ধরতে চাইছিলো। ঠিক এমন সময়েই ঘরের দরোজায় কড়া আঘাত। মনে মনে কাজের বুয়ার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে দরোজা খুলে দেখি আমার ঘরবন্ধু।
আমার চোখ আর ভালো করে খুলতে হবে না ভেবে আমি পুনরায় ঘুমানোর চেষ্টা করতে গেলাম। মনে হয় দুপুরের প্রোগ্রামের পর ছোট্ট একটা বিরতি। সমস্যা নেই। আমি ঘুমাই।
‘ঘুমাইয়া পড়ছিস?’ আমি মনে মনে ভ্যবাচেকা খাইলাম কিন্তু চোখ খুললাম না।
আবার ‘ঘুমাইয়া পড়ছিস?’ এবার তো তাকাইতেই হয়। তাকিয়ে দেখি গতকাল রাত থেকে আমি যে ঘটনাটার জন্য প্রতীায় ছিলাম সেই ঘটনা এখন ঘটার জন্য মঞ্চ একেবারে প্রস্তুত। আমি আড়মোড়া দিয়ে বিছানার দিক বদল করে চোখ খুললাম। হ্যা, তাই। পাশ থেকে আমার ঘরবন্ধুর কণ্ঠ ভেসে এলো- যা মুখ ধুইয়া আয়।
কেন? মনে মনে প্রশ্ন করি নিজেকে। আশপাশে তাকিয়ে দেখি উত্তর আমার পাশেই- এক প্লেট বিরিয়ানি। আমি ঘোষণা করলাম- আমি খাব না। কিন্তু কে শোনে কার কথা আমাকে খেতেই হবে। দু’জনেরই একরকম চাপাচাপি।
আমি বললাম আমি কিছুণ আগে মাত্র পেটপুড়ে ভাত খেলাম। এখন খাওয়ার জো নেই। কিন্তু কোন কথাই টিকবে না জানতাম না। এবং তাই হলো। আমাকে মুখ ধুয়ে আসতে হলো।
আমি এবং আমরা আমার জন্য এক প্লেট সহ মোট তিন প্লেট বিরিয়ানি সাবার করলাম। আমার এতে যথেষ্ঠ কষ্ট হলেও সাবার ঠিকই করলাম। সাথে ফ্রি পেলাম এক গ্লাস ড্রিংকস। আহা! মনে হলো একটু প্রকৃতির ডাকে একটু সাড়া দেওয়া দরকার। আমি ফ্রেস রুমে গেলাম।
ফেরত আসার সময় সেই লজ্জাজনক বাক্যটা হঠাৎই আমার কানে ভেসে এলো- বাইরে যাবি না? আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমি ঘরে ফিরে এলাম। সযতনে তৈরি হয়ে বাইসাইকেলটা চেপে বেড় হয়ে এলাম। আমার চারপাশ থেকে বাইসাইকেলের গতির সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে শহরের মানচিত্র। ধিরে ধিরে চোখে ভেসে আসছে গ্রামের প্রতিচ্ছবি।
আমার চারপাশের শহর আমার থেকে দূরে সরে চলে যাচ্ছে। আমি যাচ্ছি কোথায় ভেবে পাচিছ না। এগিয়ে চলছে আমার সাইকেল আর মনে হচ্ছে পেটের ভেতর হজম হয়ে যাচ্ছে এক প্লেট বিরিয়ানি।
এই ঘটনাটা জানা কিন্তু অপ্রত্যাশিত। প্রত্যাশিত প্রতিদিনকার সকালের মতই একটা বা একাধিক দিনে অন্তত একবার না একবার ঘটনাটা ঘটবেই।
ঘটনাটা না ঘটলেই বরংচ আশ্চর্যের মতো দেখায়। যার কারণে তাকে প্রত্যাশিত’র মতই দেখতে হয়। তাছাড়া কোন উপায়ও যে দেখছি না। কিন্তু ভেতর থেকেই কেমন যেন একটা অপ্রত্যাশিত আচরণ বের হয়ে আসে আমার। আমি এইখানে নিরূপায়।
কোন বিকল্প পথ নেই বলেই হয়তো তাকে নীরবে মেনে নেয়ার মত আচরণ করে যাচ্ছি প্রত্যেকটা ঘটনার সময়। এবার তো রীতিমত অপো! কখন সেই কাল? কখন সেই মুহূর্ত আসবে? তারপরেই আহা মুক্তি! সত্যি মুক্তি! আহা! প্রথম মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম এই রকম কোনো ঘটনায় কবে ঠিক তার দিন তারিখ মনে না থাকলেও ঘটনাটা স্পষ্ট মনে আছে। লজ্জায় আমার চোখ অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল বলে অনুভব করছিলাম। মনে হয়েছিলো আমি বোধ হয় আর কিছুই দেখতে পারবো না। কিন্তু যখন আমি আবারও সবকিছু দেখতে পেরেছিলাম তখন মনে হলো এই অপরাধ বোধ হওয়ার কোন কারণ দেখি না।
বোধ হয় আমার দূর্বলতার কারণেই এই অপরাধ বোধ পেয়েছিলো আমাকে। দ্বিতীয় বার, হ্যা দ্বিতীয় বার আমার সাথে এইরকম বিরক্তীর শিকার হয়েছিলো আরো কয়েকজন। যেমন আজও আমি ছাড়াও আরও একজন বিরক্তীর শিকার। কিন্তু যদিও এখানে আমার করার কোন কিছু ছিলো না মনে করে আমি অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
এইবার সেই ঘটনার জন্য প্রতীাই রীতিমত! আগের রাতের মধ্য প্রহড় থেকেই অনুভব করলাম আমার পাশে শূন্যতা দেখা যাচ্ছে।
সে ঘর থেকে বেড় হয়ে গেছে। তার সাথে বের হয়েছে তার সবচেয়ে কাছের যন্ত্র সেলফোন। শুরু হয়ে গেছে তাহলে! বুঝলাম প্রতীা শুধু আমারই ছিলো না। সাথে আরও দুয়েক জনেরও। যাক, ভেবে তৃপ্তি বোধ করলাম যে আমি একা একাই ভাবনার সাগরে ডুবে যাই নি কেবল।
আমার পাশের শূন্যতা ঠিক কতণ চলেছিলো তা আমি আমার স্মৃতিতে ধরতে পারলাম না। আমার কেবলই ঘুম পাচ্ছিল। হয়তো আমি আমার অপোর ট্রান্সপারেন্টেশন দেখে একটু নির্ভার লাগছিলো বলেই কিনা আমি অল্প কিছুণের ভেতর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।
প্রত্যেকদিন সকালের মতই আমার ঘুম ভাঙে। কিন্তু প্রত্যেকদিনের চেয়ে একটু সকালেই বলতে হবে তাকে।
নিয়মিত আমার ঘুম যদিও ভাঙে সকাল আটটা থেকে সারে আটটার মাঝে আজ ভাঙলো সাতটায়। বালিশে মাথা রেখেই ঘড়িতে সময় দেখেই চোখকে আর টেনে তুলতে ইচ্ছে হলো না। আবার সেই একই আবর্তের ভেতর প্রবেশ করার মনোবাঞ্ছায় যখন চোখ বন্ধ করতে ইচ্ছে হলো তখনই মনে হলো ঘরে কিসের যেন শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। তাকিয়ে দেখলাম আমার ঘরবন্ধু, মানে সে ঘরে নেই। বুঝতে আর বাকি রইলোনা যে, গতকাল রাত থেকে আমার যে বিরক্তীকর অভিজ্ঞতার জন্য আমি অপোয় আছি, সেও তেমনি আনন্দের উছিলায় বসে ছিলো।
এখনই কোথায় যেন বেড়িয়ে গেল। হায় আমার কপাল রে! ঘুমানোর সময়ও তার মুখ দর্শন করতে পারলাম না আর ঘুম থেকে উঠেও না। এই যদি হয় ঘরবন্ধুর রূপ তবে তো ভালোই! আমার ঘরবন্ধু তো আর ‘বাউল’ বা ‘উদাসি টাইপ’ কেউ না। তাহলে না হয় মানা যেত। কিন্তু এরকম সহজ সরল মানুষটারও তাহলে এই রকম হয়।
যা হউক আমি পূণর্বার ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি দিয়ে আমার চোখের ঘুম পালিয়ে গেল কোন দূর দেশে। আমি তার ঠিকানা জানিনা। আহ ঘুম- একটু আগে তো শান্তিতেই তোমাতে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু দিলেনা, দিলেনা আমার সেই শান্তিকে বইতে।
ঘুম না আসায় জোড় করেই শুয়ে ছিলাম। মনে মনে তখন প্রতিজ্ঞা- যে করেই হোক ঘুম আবার আনবো এবং আমি ঘুমাব। কিন্তু আমি জানতাম আমার একবার ঘুম ভাঙলে তা আর জোড়া লাগে না বা সেই ঘুম আমি আর ফিরে পাই না। সেই যন্ত্রণাকে আরো যন্ত্রণাবিধুর করে তোলার জন্য যতণ সহ্য হয় মটকা মেরে শুয়েই থাকব বলে আরও একটা প্রতীজ্ঞা করলাম। এর ভেতর আমার ঘরবন্ধু একবার দরোজাটাকে সটান খুলে রেখে ভেতরে আসলো।
আমি এক চোখ খুলে দেখতে গিয়ে প্রচণ্ড আলোর একটা ধাক্কা খেলাম চোখে। আবার চোখ বন্ধ। কিন্তু চোখের সামনে মনে হচ্ছিল প্রখর রোদ্রের তাপ ঘরের ভেতর উপস্থিত হয়ে আমাকে ঘুম থেকে উঠাবে বলে মনস্থির করেছে। তারসাথেও কিছুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে করতে গিয়ে মনে হলো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি আর কুলিয়ে উঠতে পারছিনা। ততণে নয়টা বেজে প্রায় চল্লিশ মিনিট।
হঠাৎই দেখলাম পাশের ঘরে হকার তাজা পত্রিকা রেখে গেল। আমি আর তাজা পত্রিকার লোভ সামলাতে না পেরে উঠে পত্রিকার পাতায় হানা দিলাম। সংবাদ চোখে পড়ে না কেবল বিজ্ঞাপন। পত্রিকার প্রথম পাঠক তার পড়া ছেড়ে দিয়ে আমাকে আমার ঘরের দিকে ইশারা করে বলে উঠল ‘ছেলেটাতো কথা বলতে বলতে পাগল হইয়া যাইবো। ’ আমার কি করার আছে? বলে আমি নিজের গা বাঁচাবার চেষ্টা করি।
পরণে মনে হয় আজতো একটু বেশিই বলার কথা। যার জন্য আমরা দুইজন দুই রকম ভাবে অপোয় আছি। আমারও খবরের কাগজ পড়া খতম! আমি উঠে এলাম। মনে হয় কিছুণের ভেতর ুধা লাগবে। ঘরে এসে বসলাম।
প্রতিদিন সকালেই ুধাটা তার আগে লাগে, আমি ভাবলাম আজকেও তারই আগে লাগুক। এতে খাবার পানি আনার ঝামেলা আমার পোহাতে হবে না। কিন্তু খাবার সম্পর্কে সে আজ মনে হয় একেবারেই উদাসীন। প্রত্যেকদিন খবরের কাগজটা এলেই সে পাত্র চাই বিজ্ঞাপনগুলো একটু মনযোগ সহকারে পড়ে। আর নিজের সাথে তুলনা করে।
পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দেওয়া পাত্রীর জামাই হতে হলে যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় তা তার আছে কি না? যদি থাকে তবে ডেকে ডেকে আমাকে শোনাবে। কিন্তু আজ খবরের কাগজের দিকেও তার কোনও খেয়াল নেই। তার মন শুধু পরে আছে সেই সময়ের দিকে। এতই প্রতীা তার। আর আমি? আমার কথাই বা আর কি বলি।
যথারীতি সকালের নাস্তাপর্ব শেষ।
সাধারণত প্রত্যেকবার সকাল দশটা থেকে এগারটার সময় আমার দিকে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝানো হয় যে এইবার সেই সময় হইছে এইবার তুমি ভাগো। কিন্তু না; এইবার কিন্তু এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো না। আমি আমার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সময় দেখি। কোন ব্রেকিং নিউজ নেই।
থাকলে আমার জন্য ভালো হতো। তবুও মনে মনে আশা ধরে রাখি। মনে কয় এই বুঝি আসলো তিনি, আর আমার দিকে চোওরে ইশারা। বাস্ বাস্ যথেষ্ঠ হইছে। এইবার আমার নিজের পালা।
মনে হয় সহযোগীতার হাতটা আমাকেই বাড়াতে হবে। আমি আমার সেলফোন হাতে নিয়ে গতকালের পূর্ব পরিকল্পিত কাজের জন্য তাগাদা দেওয়ার প্রস্তুতি নিই নিই করছি। এমন সময়ই আমার সেলফোন বেজে উঠল। ভালোই হলো প্রত্যাশা অনুযায়ি কাজ হয়ে যাবে বলেই আশা করছি। ফোনে কথা বলার পর পরই আমার সেই আশায় গুড়ে বালি হয়ে গেল।
ওপাস থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো- ‘দাদাভাই তোমাকে আজ আর কষ্ট করে আসতে হবে না। আমি এখন একটু ব্যস্ত সময় পেলেই তোমাকে ফোন করব। ’ আহারে কি দরদের গলা আমার! মেজাজটা আমার আগুনের মতন গরম হয়ে যায়- কিন্তু কিচ্ছু করার নাই। ‘ঠিক আছে সময় হলো ফোন দিও। ’ বলে আমি আমার ােভটা আমার ভেতরই রাখলাম।
আমার তখন কি অবস্থা তা কারে বুঝাই? এমনি করে করে দুপুর বারোটা বাজলো। মনে হয় আমারও বারোটা বাজলো। আমার তখন ‘কি হয়? কি হয়?’ অব¯া’! যা হয় হবে বলে আমার যাপিত জীবন চালাচ্ছি। কিন্তু মনে মনে আমি বলতে গেলে চাপেই আছি । যতণ না এই চাপ কেটে উঠে ততণ আমার নিস্তার নেই।
এভাবেই চলছে...। চলুক! কি আর করা! প্রত্যেক দিন তো এমন হয় না। ভেবেই আমি স্বস্তিতে থাকার চেষ্টা করি।
এই রকম ভাবনার ভেতরই চলে এলো দুপুরের খাবার। আমি মনে মনে ভাবলাম এবার বোধহয় শুধু ফোনের উপর দিয়েই প্রত্যাশার বেলুন ফুটানোর সময় হলো।
ইতিমধ্যে আমার যে কখন ুধায় কলিজা শোকানোর মত অবস্থা তা টেরই পাই নি। আমি øানের উদ্দেশ্যে বেরুলাম। আমি øান সেরে ফেরার সাথে সাথেই আমার ঘরবন্ধু হাতে সেভিংয়ের আনুষাঙ্গিক নিয়ে øানঘরের দিকে রওনা হলো। ভাবলাম এ প্রস্তুতি বিকেলের। এবং তার কর্ম চাঞ্চল্যতা শুরু হবে দুপুরের খাবার বাইরে খাওয়ার সাথে এই ভেবে স্ব¯িততে আমার খাবার খাওয়া শুরু।
খাওয়ার পর গতরাত থেকে যে প্রতীায় ছিলাম তার অবসান হলো। সাথে সাথে আমার নিজেরও সেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হয় নি ভেবে আমার প্রচণ্ড কান্তি পেল। মনে হয় দুপুর বেলা আমার দীর্ঘদিন পর ঘুম আসবে। এই কথা ভেবেই বিছানার পাশে থাকা জীবনানন্দের অবসরের গান পড়তে পড়তে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। হায় জীবনানন্দ! তুমি আমাকে এখন অবসরের গান শোনাতে গিয়ে ঘুমের দেশের গান শুনিয়ে দিলে! আমি ঘুমিয়েই পড়ছিলাম বোধ হয়।
বোধ হয় না, সত্যি সত্যিই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার ঘুম ভাঙলো প্রকৃতির ডাকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সময় এখনো দুটো বাজে নি। কিন্তু আমার ঘরবন্ধু ঘরে নেই। ও! সম্ভবত দুপুরের খাবারের ডাকে গেছে।
ভালোই হলো একেবারে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলের অভিসার। আমি আরামসে ঘুমাই। প্রকৃতির কাছ থেকে ফিরে এসে দরোজা বন্ধ করে আমি পুনরায় ঘুমের দেশে ফেরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অসম্ভব গরম আর দরোজা জানালা বন্ধ থাকায় আবহাওয়া আরো গুমোট লাগছিলো বলে ঘুমটা তখন ধরতে একটু সময় নিচ্ছিল। মনে হলো আর কিছুণের ভেতর পূর্ণাঙ্গ ঘুমের দেশে চলে যেতে পারবো।
অনেকদিন বিকেলে শান্তিতে ঘুমাই না! ভাবতেই ঘুম মনে হয় প্রিয়তমার মত আরও জড়িয়ে ধরতে চাইছিলো। ঠিক এমন সময়েই ঘরের দরোজায় কড়া আঘাত। মনে মনে কাজের বুয়ার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে দরোজা খুলে দেখি আমার ঘরবন্ধু। আমার চোখ আর ভালো করে খুলতে হবে না ভেবে আমি পুনরায় ঘুমানোর চেষ্টা করতে গেলাম। মনে হয় দুপুরের প্রোগ্রামের পর ছোট্ট একটা বিরতি।
সমস্যা নেই। আমি ঘুমাই।
‘ঘুমাইয়া পড়ছিস?’ আমি মনে মনে ভ্যবাচেকা খাইলাম কিন্তু চোখ খুললাম না। আবার ‘ঘুমাইয়া পড়ছিস?’ এবার তো তাকাইতেই হয়। তাকিয়ে দেখি গতকাল রাত থেকে আমি যে ঘটনাটার জন্য প্রতীায় ছিলাম সেই ঘটনা এখন ঘটার জন্য মঞ্চ একেবারে প্রস্তুত।
আমি আড়মোড়া দিয়ে বিছানার দিক বদল করে চোখ খুললাম। হ্যা, তাই। পাশ থেকে আমার ঘরবন্ধুর কণ্ঠ ভেসে এলো- যা মুখ ধুইয়া আয়। কেন? মনে মনে প্রশ্ন করি নিজেকে। আশপাশে তাকিয়ে দেখি উত্তর আমার পাশেই- এক প্লেট বিরিয়ানি।
আমি ঘোষণা করলাম- আমি খাব না। কিন্তু কে শোনে কার কথা আমাকে খেতেই হবে। দু’জনেরই একরকম চাপাচাপি। আমি বললাম আমি কিছুণ আগে মাত্র পেটপুড়ে ভাত খেলাম। এখন খাওয়ার জো নেই।
কিন্তু কোন কথাই টিকবে না জানতাম না। এবং তাই হলো। আমাকে মুখ ধুয়ে আসতে হলো। আমি এবং আমরা আমার জন্য এক প্লেট সহ মোট তিন প্লেট বিরিয়ানি সাবার করলাম। আমার এতে যথেষ্ঠ কষ্ট হলেও সাবার ঠিকই করলাম।
সাথে ফ্রি পেলাম এক গ্লাস ড্রিংকস। আহা! মনে হলো একটু প্রকৃতির ডাকে একটু সাড়া দেওয়া দরকার। আমি ফ্রেস রুমে গেলাম। ফেরত আসার সময় সেই লজ্জাজনক বাক্যটা হঠাৎই আমার কানে ভেসে এলো- বাইরে যাবি না? আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমি ঘরে ফিরে এলাম।
সযতনে তৈরি হয়ে বাইসাইকেলটা চেপে বেড় হয়ে এলাম। আমার চারপাশ থেকে বাইসাইকেলের গতির সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে শহরের মানচিত্র। ধিরে ধিরে চোখে ভেসে আসছে গ্রামের প্রতিচ্ছবি। আমার চারপাশের শহর আমার থেকে দূরে সরে চলে যাচ্ছে। আমি যাচ্ছি কোথায় ভেবে পাচিছ না।
এগিয়ে চলছে আমার সাইকেল আর মনে হচ্ছে পেটের ভেতর হজম হয়ে যাচ্ছে এক প্লেট বিরিয়ানি।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।