বিয়ের পর মেয়েদের শ্বশুড়বাড়ি নিয়ে কত যে উৎকন্ঠা আর দুঃশ্চিন্তা থাকে। জামাই হোক যেমন তেমন তাকে তো ম্যনেজ করাই যায়, খুশিও রাখা যায়, কিন্তু শ্বশুড়বাড়ির কথা ভাবলেই অনেকেরই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। আর সত্যিই কিছু কিছু মেয়েদের শ্বশুড়বাড়ি ভাগ্য এত ভয়াবহ হয়। বাঙ্গালী মেয়েদের তো হাজারটা দোষ, আর তা আঙুল তুলে দেখিয়ে দেবার মধ্যে যে উল্লাস আর আনন্দ, মাঝে মাঝে নিজকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়—আমার গ্যাদার বাপ (নুশেরার কাছে ধার করা) তার মা বাপের একমাত্র পোলা হওয়ায়।
বর্তমানে ফ্লোরিডায় থাকে আমার দোস্ত ঝুমি, আজকের কাহিনী তাকে নিয়ে।
আমার সঙ্গে পরিচয় কনকর্ডিয়ায় পড়ার সময়, ডাউন টাউনএ স্যার জর্জ উইলিয়ামস ক্যম্পাসে। সে পরিচয় আরো গাঢ় হয় পরবর্তী কালে টরন্টো আসার পরে। খাঁটি চাটঁগাইয়া ঝুমি বাংলা বলে শুদ্ধ বাংলায়, চট্টগ্রামের লোকেরা একধরনের শুদ্ধ বাংলা বলার চেষ্টা করে, আমার শুনতে খুব মজা লাগে।
কনকর্ডিয়ায় প্রথম ঝুমিকে আমার নজর পরে তার বয় ফ্রেন্ডের জন্য। দুজনে ছিল খুব চোখে পড়ার মত জুটি, ক্যাম্পাসের অনেকেরই নজর কাড়তো।
অসম্ভব রুপবান লম্বা মতন ছেলেটি ছিল একজন শ্বেতাঙ্গ। আমি বর্ণবাদি নই, তবুও এই জু্টিকে দেখলে আমার এক ধরনের ভয় আর মেয়েটার জন্য কষ্ট হতো। কবে যে পোলাটা তাকে ছেড়ে যাবে আর মেয়েটার জীবনটা তছনছ হয়ে যাবে। প্রায় মাস ছয়েক পরে ঝুমির সাথে আমার যখন সখ্যতা গভীর হলো, (ততদিনে জানা গেলো আমার শ্বসুরবাড়ির দিকের দূর সম্পর্কের ননদ হয় ঝুমি) তখন জানলাম ঐ শ্বেতাঙ্গ যুবক একজন কিউবান, এবং তার নামও ফিদেল। ফ্লোরিডার স্থায়ী বাসিন্দা, পড়তে এসেছে কনকর্ডিয়ায়।
দুবছর পরে টরন্টো চলে আসার পরও ঝুমির সাথে যোগাযোগ রয়েই যায়, কিন্ত ঘনিষ্ঠতা অনেক বেড়ে যায়। বান্ধবহীন টরন্টো তখন আমার কাছে প্রায় অসহ্য লাগতো, সহজ সরল মন্ট্রিয়লের জীবনের সাথে টরন্টোর দ্রতগামী (ধান্ধাবাজীতে ভরা?) জীবনের কোন মিলই নাই। আমি যেন প্রায় আঁকড়ে ধরলাম ঝুমিকে। প্রায়ই কথা হতো ফোনে, সুখ দুঃখের, হাসি কান্নার, ফ্যাসাদ আর ঝামেলার। আমরা হয়ে উঠলাম পরানের দোস্ত।
এর মধ্যেই খবর পাই ফিদেল তাকে প্রপোজ করেছে, নিজ পরিবারের কিছুটা আপত্তি সত্ত্বেও দুজনে বিয়ে করে ফেলে। বিয়ের সময় আমি কিছুটা ব্যস্ত ছিলাম, তাই পরের মাসে মন্ট্রিয়লে গেলে একটা উইকএন্ড আমি তাদের সাথে কাটিয়ে আসি। তখনই খবর পাই তারা ফ্লোরিডায় শিফট করার পরিকল্পনা করছে, ওখানেই থেকে যাবে।
কানাডিয়ানদের জন্য কিউবায় যাওয়াটা সহজ হলেও, মার্কিন পাসপোর্ট নিয়ে ফিদেল এর পক্ষে কিউবায় যাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। আমেরিকার মুল ভুখন্ড থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে, অথচ দুই দেশের মধ্যে বৈরি সম্পর্কের কারনে যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব।
ফিদেল এর পরিবারের সে নিজেই শুধু আমেরিকায়, কিন্ত বাকী সবাই থাকে হাভানাতে। ফলে আমি অবাক হয়ে শুনি ফিদেল এর পরিবারের অনেকের সাথেই নাকি তার জীবনেও দেখা হয় নাই।
দেখা যাচ্ছে, আমার মতো ঝুমিরও একই অবস্থা, শ্বশুড়বাড়ি থেকেও নাই। ভারী মজার বিষয় তো!
ঘটনা এভাবেই চলছিল এতদিন, কিন্ত গতমাস থেকে সবকিছু বদলে দিল আমাদের বারাক ওবামা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন লাতিন আমেরিকান নীতিতে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সিদ্ধান্ত, ফলাফল এখন কিউবানরা আগের চাইতে সহজে কিউবা সফর করতে পারবে, টাকা পয়সা পাঠাতে পারবে।
দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর পর আগামী মাসে ফিদেল সস্ত্রীক হাভানা যাওয়ার প্লান করছে। দেখা হবে তার পরিবারের বাকী সদস্যদের সাথে।
গতরাতেও ঝুমির সাথে টেলিফোনে কথা হচ্ছিল, হাভানা সফর নিয়ে ফিদেল কি পরিমান উত্তেজিত হয়ে আছে, এটা বলতে গিয়ে ও খুশিতে যেন ঝলমল করছিল। হাভানাতেও সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে তাদের দেখবে বলে।
আমাদের গপ্প গুজব প্রায় শেষের দিকে, হঠাৎ করে ঝুমিকে কিছুটা অন্যমনস্ক লাগে আমার কাছে।
কিছুটা যেন বিষন্নও। গলার স্বরে একটু ভেজা ভেজা ভাব।
শ্বশুড়বাড়ি নিয়ে সব বাঙালী মেয়েদেরই কেন যেন একটু একটু দুশ্চিন্তা রয়েই যায়, হোক না সেটা হাভানায়!!!
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।