আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

যে জলে আগুন জ্বলে

জন্মের প্রয়োজনে ছোট ছিলাম এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি বাংলাদেশ এর মানুষের এক অদ্ভুত রকমের সহনশীলতা আছে। এরা শত কষ্টেও সইতে পারে, শত দুঃখেও হাসতে পারে। অনেক বড় আঘাত বুকে নিয়েও ভুলে যেতে পারে অতীতের সব কিছু। আর সেই ভুলে যেতে পারার জন্যই রাজাকারদের সংসদেও বসতে দিয়েছে, সৈরাচার অভ্যুত্থানের পরেও সেই সৈরাচারী শাসককেও আবার নির্বাচিত করেছে। কিন্তু কতকাল সহ্য করবে, কতকাল বুকে ক্ষত নিয়ে বয়ে বেড়াবে এই জাতি? জলেও যে আগুন জ্বলে আজকের শাহবাগ এর জাগরন মঞ্চ তারই প্রতিফলন।

এই মঞ্চে আগত সকলেই যে কেবলমাত্র ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এসেছে তা নয়। এর বৃহদাংশই এসেছে এদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর অশ্রদ্ধা, অনাস্থা আর ক্ষোভ প্রকাশের জন্য। এতকাল ধরে পুরো জাতি যেনো এমন একটি প্লাটফর্ম এর জন্যই অপেক্ষায় ছিল। এমন একটি মঞ্চ যেখানে কোন রাজনৈতিক মিথ্যার ফুলঝুড়ি ফুটবেনা, যেখানে কোন মিথ্যা আশ্বাস দিবেনা, যেখানে কেবল মাত্র ক্ষমতাসীন হবার পায়াতারা হবেনা। যেখানে হবে কেবল গন মানুষের কথা, গনমানুষের জন্য কথা।

গনজাগরন মঞ্চ যেনো তেমনি একটি স্থান হিসেবে সকলে বেছে নিয়েছে, ছুটে যাচ্ছে অদৃশ্য একটি সুতোর টানে। যদিও কেবল মাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া এই গনবিস্ফরন, কিন্তু সকলের মনে আকাংক্ষা এই বিচার প্রক্রিয়ার পাশা-পাশি বর্তমানে চলতে থাকা দুষিত রাজনীতির শুদ্ধিকরনও হউক। অস্বিকার করার কোন উপায় নেই যে বাংলাদেশ এ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দল দেশ এর দ্বায়িত্ব নেবার মত অবস্থানে নেই। যতই বলা হউক তৃতীয় শক্তির উত্থান হবে তেমন কোন সম্ভাবনাও নেই। এই শাহবাগ থেকে আরেকটি কার্যকর রাজনৈতিক দল তৈরি হবে তেমন আশা করাও অবান্তর।

কিন্তু এই শাহবাগ থেকে যেটা করা যেতে পারে তা হচ্ছে এই দুই দলে প্রবাহিত দুষিত রক্ত গুলো সমূলে উৎপাটন করা। কেবল মাত্র জামাতের যুদ্ধাপরাধী নয়, একই সাথে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, জাতীয় পার্টি সহ অন্যান্য যে সকল দলে যুদ্ধাপরাধীরা আত্মগোপন করে আছে তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী, সাংসদ যাদের জনগন ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল তাদেরকে অন্তত দল থেকে বের করে দিতে হবে। স্বাধীনতারপর গত ৪০ বছর ধরে যারা দেশের স্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে তারাই এখন বড় বড় জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে হাজির হয়েছে। সেসকল চিহ্নিত দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যদি আইনের ব্যবস্থা নাও নেয়া যায় (না নেয়া যায় এই কারনেই বলছি যে সত্যি বলতে অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় না) অন্তত তারা যাতে আর কোনদিন সংসদে অথবা প্রশাসনে আসতে না পারে সেই নিশ্চয়তা এই্ বড় দুই দল থেকে নিশ্চিত করেত হবে।

যদি আমরা বড় এই দুই দলের মধ্যে এই পরিবর্তন আনতে পারি আর যদি এই দুই দল দ্বায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়, কেবল মাত্র ক্ষমতার লোভে নয় সত্যিকার দেশপ্রেম নিয়ে দেশ পরিচালনায় এগিয়ে আসে তবেই এই দেশের ভবিষ্যত উজ্বলতা আসার সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। পুরো দেশের মানুষ আজ মুখিয়ে আছে এই শাহবাগের দিকে। এমনকি এই বড় দুই দলও সতর্কভাবে পর্যবেক্ষন করতে এর গতিবিধি। আওয়ামী লীগ চায় যেনো এই আন্দোলন কেবল মাত্র জামায়েতের যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর বিএনপি চায় কোনভাবে যেনো একে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিনত করা যায়।

এখনো এই দুই দলের কাছ থেকে কোন দ্বায়িত্বশীল মন্তব্য পাওয়া যায় নি। গতকাল প্রধানমন্ত্রী সংসদে সংহতি জানিয়েছেন যদিও.. কিন্তু নিজ দলের যুদ্ধাপরাধীদের বিতারিত করার বিষয়ে কোন মন্তব্য আসেনি। কোন মন্তব্য আসেনি কাদের সিদ্দিকির করা ম.খা আলমগীরের বিষয়েও। আজ এই শাহবাগ সৃষ্টির দায় সরকারকেই নিতে হবে। বারংবার ট্রাইবুনালের কার্যক্রম নানা ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকেই।

বিচারক নিয়োগ, প্রস্থান নানা কিছুতে মানুষের সন্দেহ দিনে দিনে ঘনিভ’ত হয়েছে। শেষ দিকে জামায়াতের প্রকাশ্য সমাবেশ এবং তারই ধারাবাহিকতা কাদের মোল্লার রায় মানুষের আস্থাহীনতা মূল কারন। অপরদিকে বিএনপি কেবল মাত্র ক্ষমতায় যাবার লোভে জামায়াত এর সাথে আতাঁত করে আসছে এখনো। শাহবাগের এই আন্দোলনকে দিনে দিনে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই আন্দোলনকে নিজের পকেটে ঢোকানোর পায়াতারাতেও লিপ্ত দুই দলই।

যদিও এখন পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলই মঞ্চেও আসতে পারেনি। কিন্তু এরই মধ্যে কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি শাহবাগ হচ্ছে এখন আড্ডা মারার যায়গা। রাত জেগে আড্ডা মারে, তেহারী খায়, গান বাজনা করে আর মাঝে মাঝ স্লোগান দেয়। আবার কেউ কেউ বলছে পড়ালেখা বাদ দিয়ে দিনের পর দিন আন্দোলন এর নামে বারডেম ও পিজি হাসপাতালে সামনে গান বাজনা করে এমন অবস্থান কেবল মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। জানি এসব সমালোচনা আসবেই হবেই।

বড় কোন প্রাপ্তির জন্য এতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। অনেক বড় ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি সেটাও ভুলে যাওয়া উচিৎ না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা বড়ই অভাগা জাতী। আমাদের সব অর্জনই অন্যের পকেটে চলে যায়। যত বেশি সময় ধরে এই আন্দোলন চলবে ততই এ আন্দোলন বিতর্কিত হবে এর গুরুত্ব হারাবে এবং তীব্রতাও কমবে।

আর তারই সুযোগ নিয়ে এরই মধ্যে জামায়াত কাল বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে। কতখানি সাহস এবং স্পর্ধা তারা দেখালো তারা !! সারা দেশের এই গনজাগরনকে তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর চেষ্টা করল !!! যদিও জানি হবার নয় (মনে প্রানে বিশ্বাস করি হবে না), তবুও যদি, আবারো বলছি যদি কোনভাবে এই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নস্যাৎ করা হয় তাহলে জামায়াতের সাহস ও আস্ফালন যে কতখানি বাড়বে সেটা কল্পনা করতেও ভয় পাই। শাহবাগে আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আপনারা কেবল মাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে এই দুই দলের অসাধু লোকগুলোকে সরানোর জন্য সোচ্চার হোউন। এটাই আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ। যদি এখন না পারি আর কখনোই হয়ত সম্ভব হবেনা এই অসৎ লোকগুলোর থাবা থেকে দেশকে রক্ষা করা।

এই আন্দোলন সফল হোউক সর্বদিক দিয়ে। এই আন্দোলন যেমন করে প্রতিটি বাংলাদেশের মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে তেমনি এর ফসল যেনো প্রতিটি মানুষের মনে সাহস আর আনন্দের বন্যা বয়ে নিয়ে আসে। প্রতিটি মানুষের বুকে লালিত হোউক আর কন্ঠে প্রকম্পিত হোউক “জয় বাংলা” “জয় বাংলা” জয়-ধ্বনি।  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।