হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে...
কবিতা সাহিত্যের অন্যান্য সকল শাখাকে ছাপিয়ে অন্যতম জটিল ও বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে পরিচিত। কবিতায় শিল্পীর স্বতঃস্ফূর্ত সাবলীল আবেগ জড়ানো বহিঃপ্রকাশ যত্রতত্র। জন্মাবধি পরিবর্তনের ধারায় সবকিছুর মতোই কবিতাও পরিবর্তিত হয়েছে নানান ঢঙে-আঙ্গিকে; সমকালে পৌঁছে গেছে আধুনিক ধারার শেষ প্রান্তে। আমাদের দেশেও আজ চলছে-- আধুনিক উত্তর কালের কবিতা বিষয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আধুনিক কবিতা সাহিত্য-শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমগুলোর মতোই অত্যন্ত জটিল ও দুর্বোধ্য।
কেননা পাঠক সহজেই কাব্য-পরিমণ্ডলে পরিক্রমণের সময খেই হারিয়ে ফেলেন কবির বর্ণিত ভাবের রাহস্যময় দুর্ভেদ্য-আবর্তে। সাহিত্য-সমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, 'আধুনিক কবিতা আবেগকে কাটে ধারালো ছুরি দিয়ে; হৃদয়কে অধীনস্থ করে বুদ্ধি এবং পাঠকে একটা বুদ্ধিগত প্রতিক্রিয়া দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এসব কাজ দূরত্ব রচনা করে সাধারণ পাঠকের সঙ্গে কবিতা, কবিতা হয়ে দাঁড়ায় প্রশিক্ষিত পাঠকের বিষয়। ' সমালোচকের এ-কথা সামনে রেখে আমরা বলতে পারি, কবি বাবলু জোয়াদার-এর সবকিছু ভুলে যাও নারী আধুনিক কাব্যের পাঠক সমাজের সাথে অতখানি দূরত্ব তৈরি করে না। তাঁর কবিতা শুধু 'প্রশিক্ষিত' সুধীজনের জন্যই নয়, এতে সাধারণ পাঠকেরও আছে সমান হিস্যা।
সত্যি কথা বলতে গেলে এ-কাব্যের রস একেবারে সাদামাটা পাঠকও আহরণ করতে পারবেন অনায়াসে।
সবকিছু ভুলে যাও নারী কাব্যগ্রন্থে ছোট-বড় মোট চল্লিশটি মুদ্রিত কবিতার শরীরের বাঁকে-বাঁকে আছে কাব্য রসের সমহার। নতুন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের সবগুলো কবিতাই নন্দিত হওয়ার যোগ্য তা বলা না গেলেও এ-কাব্যের অনেকগুলো কবিতা ভালো লাগার মতো; যা সর্বজন গ্রাহ্যও হবে বলে বিবেচনা করা যায়। একটি কবিতার বইয়ে শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা সর্বদাই নগণ্য; তারপরও ঐ কয়েকটি পরিশুদ্ধ কবিতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে একটি কাব্যগ্রন্থ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও প্রেমের কবিতা নিয়ে-ই সবকিছু কিছু ভুলে যাও নারী।
বলাবাহুল্য, প্রেমের কবিতার আধিক্য এ-গ্রন্থে চোখে পড়ার মতো।
সবকিছু ভুলে নারী শীর্ষক গ্রন্থের নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। 'আদম হাওয়া' কবিতার একটি পংক্তি সবকিছু ভুলে যাও নারী; সম্ভবত এই পংক্তি অনুসরণে কবি কবি গ্রন্থের নামকরণ করেছেন। এই কবিতায় নারীকে আহ্বান জানানো হয়েছে-- আদিমতার এক অন্ধকার বিবরে; নর-নারী যেখানে মিলিত হবে নগ্ন যৌন বিলাসে; আর নারীকে ভুলে যেতে হবে-- 'শস্য শ্যামল মাঠ, দোয়েল শ্যামার গান, শচীনের মনোহারী সেঞ্চুরী, কিম্বা সন্ত্রাসী জনপদ'। অর্থাৎ সমস্ত নান্দনিকতার ভুবন ও বাস্তবতা ভুলে গিয়ে নারীকে শুধু ডুবে যেতে হবে' পুরুষতান্ত্রিক অবক্ষয়িত যৌন বিলাসের অতল-তলে।
প্রশ্ন সেখানেই নর কেন সবকিছু নারীর মতো ভুলে যাবে না, যৌনক্রিয়ার সময়? শুধু নারীকে কেন সমাজের, জীবনের এতসব বাস্তবতা ভুলে ভ্রান্ত যৌনবিলাসে নিমগ্ন হতে হবে? বলা বাহুল্য, কাব্যের নামকরণের মধ্য দিয়ে শিল্প সার্থকতার পূর্বেই নারী হয়েছে-- পুরুষ শাসিত সমাজের ভোগ্য পণ্যে। নিশ্চয় এ-অর্থে নারীর মনুষ্যত্বের অমর্যাদা হয়েছে। তবে নারীর মর্যাদা-অমর্যাদারও অধিক হয়ে যায়, তখন যখন গ্রন্থের নামকরণ এক শৈল্পিক সুষমায় নিবব্ধ। যেহেতু এটি বিতর্কের বিষয় নয়। কেননা গ্রন্থে নারীকে আহ্বান জানানো হয়েছে, শিল্পীর বিশাল ক্যানভাসে উৎকলিত আবেগঘন নান্দনিক ভুবনে।
সমালোচনায় মানবিক বিচারে কাব্যের নামকরণ যথার্থ না হলেও শৈল্পিক বিচারে সবকিছু ভুলে যাও নারী উত্তীর্ণ হয়েছে। কেননা কাব্যের প্রায় সবগুলো কবিতায় কবি নারীকে আবেগের নন্দনস্বর্গে আহ্বান জানিয়েছেন-- মর্ত্য পৃথিবীল অস্থির যন্ত্রণা ও সমস্ত রকমের অসহ্যতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য।
আধুনিক কবিতার পরতে-পরতে যে দুর্বোধ্য জটিলতার বিষফোঁড়া দেখে পাঠকেরা মুখ ফিরিয়ে নেয়; বাবল জোয়াদার-এর সবকিছু ভুলে যাও নারী কাব্যের সহজ-সরল পরিচিত বাতাবরণ হতে চয়িত উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও শব্দ সুষমা পাঠককে সেই যন্ত্রণা কাতর অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি দেবে। পাঠক সহজেই কাব্যের ভাবাবেগের স্রোতে হারিয়ে যায়, কাব্যরসের অতল গহীনে নিজের ভেতর ফল্পুধারার মতো বহমান হয় একটি অনুভূতি একটি উপলব্ধি। এ-ক্ষেত্রে নির্দ্ধিধায় বলা যায়, শব্দ নির্বাচন ও উপমা ব্যবহারে কবির প্রাঞ্জল প্রাতিস্বিকতা কাব্যের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি।
আধুনিক জটিলতার যুগের কাব্য-ঘরাণায় যে-জটিলতার চাষবাস চলছে সেখানে সবকিছু ভুলে যাও নারী কাব্যগ্রন্থে তা নেই বললে অত্যুক্তি হয় না। অবশ্য এ-কথাও স্বীকার্য যে, কবির আধুনিক শব্দ চযন ও নতুন নতুন উপমা ব্যবহারের শৈল্পিক দক্ষতা আছে। এ-ক্ষেত্রে কবির প্রথম প্রয়াস প্রশংসার দাবিদার সন্দেহাতীতভাবে; কেননা তিনি অবলীলায় ছুঁয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন আধুনিক নগর জীবনের যন্ত্রণাক্লিষ্ট হৃদয়ের উষ্ণভূমি।
এই আলোচনায় কাব্যের কতকগুলো চমৎকার কবিতার সক্ষিপ্ত পরিচয় না দিলে কবির প্রতি অবিচার করা হবে। এই প্রসঙ্গে 'হৃদপিণ্ডে রক্তক্ষরণ', 'আদম হাওয়া', 'স্মৃতির সুবর্ণ মন্দিরে একা', 'অতঃপর তুমি এলে', 'ছেলে বেলায় সাধ ছিল', 'মাধবী আমি খুউব ভাল আছি', 'হেমন্তের প্রথম জ্যোৎস্না', 'সুতীক্ষ্ণ তরবারি হয় সুবর্ণ মন্দিরে', 'বুকের জড়ুল', ইত্যাদি কবিতার নাম উল্লেখযোগ্য।
উল্লেখিত কবিতাগুলো নিঃসন্দেহে অসাধারণ কাব্যিক সুষমা মণ্ডিত। এ-গ্রন্থের অনেকগুলো কবিতা-ই রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে রচিত হলেও কাব্যটি সর্বাঙ্গিন প্রেমের কাব্য হিসেবে চিহ্নিত করা ভুল হবে না। মানুষ, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদির উর্ধ্বে নয়; তাই হয়তো কবি কাব্যের বাঁকে-বাঁকে নদী-নারী ও নিটোল-নিসর্গের মাঝেও তাঁর অধিকারের কথা ও সর্বস্ব হারানো ব্যথায় কাতর হয়েছেন। তবে প্রেমের কবিতাগুলো অধিকতর সৌন্দর্যমণ্ডিত।
'হৃদপিণ্ডের রক্তক্ষরণ' কবিতার 'নন্দিতা' অসাধারণ কাব্য সুষমামণ্ডিত নায়িকা' যার জন্যে আজীবন সকল পুরুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে।
সে জানতেও পারে না তারই কারণে কবি ব্যথার সাগর পেরিয়ে ‘লাশ কাটা ঘরে’ পড়ে আছেন। এখানে নন্দিতা এক চপলা কিশোরীর নাম, যে 'খেলতে খেলতে' 'নির্বিঘ্নে ছুঁয়ে' যায় 'হৃদয়'। এ কারণেই সৌন্দর্য পিয়াসী পুরুষের পূঁজার ফুল হয়ে ওঠে নন্দিতা। অথচ তার মননগত বিকাশ নেই পুরুসের সেই নৈবেদ্য অর্ঘ্য গ্রহণ করার। যখন নন্দিতার পুরুষকে জানার বয়স হয়েছে তখন সে বলেছে, ‘ক্যামন আছ?’ তখন হয়তো সে অন্য বনানীর শোভিত পুষ্প।
‘আদম হাওয়া’ কবিতায় নর-নারীর একান্ত জৈবিক গোপন বিষয় কিবর শিল্পিত দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে কোন এক আবেগময় মুহূর্তে। কবির চমৎকার বর্ণনায় মানব-মানবীর এই শ্বাশত আদিমতার চিত্র অত্যন্ত শৈল্পিক হয়েছে। কবি পৃথিবীর সমস্ত রুক্ষ্মতার উর্ধ্বে এ-খেলায় নারীকে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন :
সবকিছু ভুলে যাও নারী
শস্য শ্যামল মাঠ
দোয়েল শ্যামার গান
শচীনের মনোহারী সেঞ্চুরী
কিম্বা
সন্ত্রাসী জনপদ
স্কাইস্ক্র্যাপার
বিত্তবৈভব। [আদম হাওয়া]
‘অতঃপর তুমি বিশ্বাস ভাঙলে’ ছলনাময়ী নারীর ক্যানবাস কবি এ-কবিতায় ছন্দে উপামায় বিভোর হয়ে ধারণ করেছেন। তিনি মনে করেছেন, নারী চিরদিন-ই ছলনা ব্যতিরেকে আর কিছুই করতে শেখেনি।
নারীর ছলনার চিত্র কবির চোখে নিম্নরূপে ধরা পড়েছে :
অতঃপর হাসতে হাসতে চলে গেলে
আহত দোয়েল পড়ে থাকে মরে
পড়ে থাকে আমর সরল বিশ্বাস [অতঃপর তুমি বিশ্বাস ভাঙলে]
‘স্মৃতির সুবর্ণ মন্দিরে’ কবিতায় এক বিদগ্ধ বয়সী কবির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। যে-কবির ‘মেঘে মেঘে’ বয়ে গেছে ‘অনেক বেলা’; স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা সেই সোনালি যৌবনের ‘লাল গালিচা পাত হিজল তলায় চুপচাপ বসে’ থাকে। বয়সী কবির একরাশ নিঃসঙ্গতায় আছে শুধুই-- ‘দুই হাতে কেবলই সোনা; সন্ধ্যার সোনাপাত’ কুড়োনো। ‘ছেলে বেলায় সাধ ছিল’ কবিতায় মধ্যবিত্ত জৈবনিক টানাপোড়েনের এক অসাধারণ চিত্র উপহার দিয়েছেন কবি। মধ্যবিত্ত অনেক বাঙালির মতোই কবিরও অনেক হাতি-ঘোড়া হওয়ার স্বপ্ন-সাধ ছিল; অথচ আধুনিক বুর্জোয়া মানবতাবাদী সমাজব্যবস্থার অনিবার্য ধ্বসের মুখে মধ্যবিত্ত আহ্লাদের স্থান হয় না।
তাই হতাশ কবির উচ্চারণ অত্যন্ত নির্মম শোনায় :
বুকের মধ্যে অমাবস্যার অন্ধকার আমার
পূর্ণিমা উপচে পড়ে ভাঙে কাদের বাগান। [ছেলেবেলায় সাধ ছিল]
নিটোল প্রেমের আধুনিক চিত্রকল্প ‘মাধবী আমি খুউব ভাল আছি’ কবিতাটি। প্রেমের কবিতার প্রাচীন উপমা-উৎপ্রেক্ষার জীর্ণ দেয়াল ভেঙে নবতর উপমার বৈচিত্র্যে কবিতাটির জন্ম হয়েছে। ‘হেমন্তের প্রথম জ্যোছনা’ কবিতাটিও প্রেমের কবিতা; তবে এখানে প্রেমের প্রকাশ ভিন্নতর। যা পাঠককে নতুন মাত্রার দ্যোতনা দেয়।
এ-গ্রন্থের একটি অসাধারণ চমৎকার কবিতা ‘সুতীক্ষè তরবারি বিদ্ধ হয় সুবর্ণ মন্দিরে’। তরবারি বিদ্ধ কবি ‘মরে যেতে’ থাকে ‘প্রতিদিন’; কবি অবশেষে ‘মরে যায়’। মধ্যবিত্ত জীবনে অষ্টপ্রকার যন্ত্রণায় অসহ্যতায় ক্ষত-বিক্ষত কবি ‘প্রতিদিন’ মরে যেতে থাকে ধুকেধুকে।
আলোচনার শেসে এসে বলা যায়, বাবলু জোয়ারদার রচিত ‘সবকিছু ভুলে যাও নারী’ সর্বাংশে সফল কাব্যগ্রন্থ-- একবাক্যে এরকম হয়তো বলা অবকাশ নেই কিংবা আধুনিক কবিতার সকল তোরণ এই নবীন কবি সাফল্যের সাথে উতরাতে পারেননি। তারপরও তাঁর কবিতাসমূহ পাঠক হৃদয় ছুঁয়ে যেতে সক্ষম অনায়াসে; এবং এখানেই কবি হিসেবে বাবলু জোয়ারদারের সার্থকতা।
বলা বাহুল্য, নতুন কবির কাঁচা হাতে আনাড়ী শব্দ চয়ন, উপমা থাকা সত্ত্বেও পাঠকের অবকাশ নেই বইটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। বরং আধুনিক সময়ের কবিতায় দুর্বোধ্যতা যখন পাকাপোক্ত আসন করে নিয়েছে তখন কবি বাবলু জোয়ারদার-এর সবকিছু ভুলে যাও নারী কবিতার তুলনায় অধিকতর আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
গ্রন্থ-পরিচিতি :
বাবুল জোয়ারদার, সবকিছু ভুলে যাও নারী, ঢাকা : শব্দ সাহিত্যচক্র প্রকাশন, প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; প্রচ্ছদ : মাহবুব কামরান, মূল্য : পঞ্চাশ টাকা, পৃষ্ঠা : ৬+৪২=৪৮
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।