আওয়ামী লীগ সরকার সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে তার সরকার সব উদ্যোগ নেবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের পাশে থাকারও ঘোষণা দেন। আগামী নির্বাচনেও নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে দেশের প্রতি উপজেলায় একটি স্কুল ও একটি সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। গতকাল কক্সবাজারের উখিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অবিলম্বে উখিয়া কলেজকে সরকারি করার ঘোষণাও দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে।
কিন্তু দাবি উঠেছে উখিয়া কলেজকে সরকারিকরণের। আমি চেষ্টা করব। যদি সম্ভব না হয় তাহলে আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে তা বাস্তবায়ন করা হবে। ' ধর্মের আড়ালে 'তত্ত্ব' দিয়ে নারীপ্রগতি রুদ্ধ করা এবং বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের লুটপাট ও ত্রাসের বর্ণনা তুলে ধরে অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করতে আওয়ামী লীগকে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে ফের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'উন্নয়ন ও অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করতে আরেকবার নৌকা মার্কায় ভোট চাই।
একবার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন। আমরা সমুদ্র বিজয় করেছি। সমুদ্রের অফুরন্ত সম্পদ কাজে লাগাতে এখানে সমুদ্র ইনস্টিটিউট করেছি। গতবার টেকনাফ কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের কাজ করেছি। কক্সবাজারে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছিল।
তাই আপনাদের আহ্বান জানাব আরও একবার নৌকায় ভোট দিন। ' বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এ দেশে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। ' আওয়ামী লীগ সরকার যে উন্নয়ন করেছে তা অতীতের কোনো সরকার করতে পারেনি দাবি করে তিনি বলেন, 'ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে এ সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ' প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি মহল ধর্মের আড়ালে 'তত্ত্ব' দিয়ে নারীদের লেখাপড়া বন্ধ করতে চায়। এ জন্য হেফাজতের এক হুজুর তেঁতুল তত্ত্ব দিয়েছেন।
উনার নাকি মেয়েদের দেখলে মুখে লালা ঝরে। বিরোধীদলীয় নেতাকে দেখলে হয়তো উনার মুখে পানি আসতে পারে। কারণ বিরোধীদলীয় নেতাই সব সময় সাজগোজ করে থাকেন। ' ইসলাম নারীকে মর্যাদা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'নবী করিম (সা.)-এর কাছে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন একজন নারী। প্রথম শহীদও একজন নারী।
এসব তত্ত্ব দিয়ে আমাদের দেশের নারীদের আটকানো যাবে না। ' অবৈতনিক নারী শিক্ষা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, 'নারীদের শিক্ষিত করতে অবৈতনিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়েছে। বিনামূল্যে বছরের প্রথমে বই দেওয়ার পাশাপাশি উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা শিক্ষিত হয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
'
বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, 'তিনি নিজে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে উর্দু ও অঙ্কে পাস করেছিলেন। নিজে পাস করতে পারেননি বলে তিনি আমাদের মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করতে চাইছেন। ' প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'কিন্তু এ কারণে আমাদের মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হবে কেন?' বিএনপি-জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'ধর্মের নামে হেফাজত মিটিংয়ের কথা বলে মে মাসে ঢাকা ঘেরাও করল। কিন্তু শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোনাজাতের আগেই স্লোগান দিয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আগুন দেয়া হলো। কারা করল এ বিশৃঙ্খলা? জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা সেখানে শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে।
' একজন মুসলমান কীভাবে কোরআন শরিফে আগুন দেয়- প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করেছি। দেশকে উন্নত করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। আর সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি। '
তিনি শিক্ষানীতির বিষয়ে বলেন, 'দেশকে উন্নত করাই আমাদের লক্ষ্য।
এ জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। '
বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, 'বিএনপি ক্ষমতায় আসে ব্যবসা করার জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য নয়। '
বিএনপির ঘাঁটিতে অন্য এক মাত্রা
বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উখিয়ায় জনসভাস্থলে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। দুপুরে জনসভা শুরুর কিছুক্ষণ পরই মুষলধারার বৃষ্টি উপেক্ষা করে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে জনসভাস্থল।
কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও আশপাশ এলাকা থেকে স্লোগানে স্লোগানে মিছিল নিয়ে লোকজন হেঁটে, মোটরসাইকেলযোগে জনসভাস্থলে আসে। সকাল থেকেই নেতা-কর্মীরা জড়ো হন মাঠে। মিছিলের পদভারে অন্য এক জনপদে পরিণত হয় পুরো উখিয়া। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আদিল উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া জনসভায় বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, বিসিবির সভাপতি, নাজমুল হাসান পাপন এমপি, যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আহমদ হোসেন, কঙ্বাজারের জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী, সংসদ সদস্য এথিন রাখাইন, চেমন আরা তৈয়ব, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ সিআইপি, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী
সীমা বিহার উদ্বোধন শেষে সম্মেলন কক্ষে বৌদ্ধধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে তার সরকার সব উদ্যোগ নেবে। প্রধানমন্ত্রী তাদের পাশে থাকারও ঘোষণা দেন। সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বৌদ্ধধর্মীয় নেতা সংঘরাজ ধর্ম সেন মহাথের, রামু সীমা বিহারের অধ্যক্ষ সত্যপ্রিয় মহাথের। এ সময় তারা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বৌদ্ধ বিহারের স্থায়ী নিরাপত্তা বিধানের জন্য প্রশাসনের বিশেষ সেল বসানো এবং একই সঙ্গে ২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পটিয়ার মন্দিরগুলো সংস্কার হয়নি : এদিকে চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের রামুতে বিভিন্ন বৌদ্ধ পল্লীতে স্মরণকালের ভয়াবহ ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন করে নির্মিত হয় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির।
কিন্তু এক সময় পটিয়ার কোলাগাঁও ইউনিয়নে ভাঙচুর হওয়া মন্দিরগুলোতে লাগেনি সংস্কারের ছোঁয়া। ফিরে পায়নি আগের সেই অবয়ব। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা রামুর বৌদ্ধপল্লীতে ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারে এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ২৬টি বসতবাড়িতে হানা দিয়ে প্রথমে লুটপাট চালায়। এরপর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেয় বাড়িঘর।
সঙ্গে আরও ৬টি বৌদ্ধ মন্দির এবং শতাধিক বসতঘরে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা।
কক্সবাজরের রামুর বৌদ্ধমন্দির ও বসতিতে হামলার ধারাবাহিকতায় পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নের লাখেরা গ্রামে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় পর পর চারটি মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। দুর্বৃত্তরা অভয় বৌদ্ধবিহার, কোলাগাঁও রত্নাঙ্কুর বৌদ্ধবিহার, কোলাগাঁও নবারুন সংঘ দুর্গামন্দির ও জেলেপাড়া মাতৃমন্দিরে হামলা চালায়। এতে প্রতিমার মূর্তি তছনছ এবং আসবাবপত্রে অগি্নসংযোগও করে।
গত বছরের ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামুর বৌদ্ধপল্লী পরিদর্শনে গিয়ে বৌদ্ধবিহার পুনঃনির্মাণের ঘোষণা দেন। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সরকার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলী বজায় রেখে বিহারগুলো নির্মাণ ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করে।
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোকেয়া পারভিন বলেন, লাখেড়ার ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলোতে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে সংস্কারকাজ হয়েছে। তবে রামুতে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলো যেভাবে নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে, সেভাবে লাখেড়ারগুলো হয়নি।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।