আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

১৯৭২-১৯৭৩ সালঃ বারিয়াঁ থেকে চকদৌলত (ঝেলাম)

উন্নত দেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা
স্কুলে ক্লাশ টেন এ পড়ছিলাম, এ্যবোটাবাদে। শীতের ছুটি শুরু হয়েছে। এপিএস তথা এ্যবোটাবাদ পাবলিক স্কুলে শীতে দু মাস, গৃষ্মে (গ্রীষ্মে) এক মাস ও বসন্তে পনেরো দিনের ছুটি দিয়ে থাকতো। শীতের , গৃষ্মের (গ্রীষ্মে) ছুটিকালীন সময়ে হল (যে গুলোকে পাবলিক স্কুলের ভাষায় "হল" বলতো), খালি করা বাধ্যতামুলক ছিল। বসন্তের পনেরো দিনের ছুটিতে হল না ছাড়লেও চলতো।

শীতের ছুটিতে এবার আমাকে রাওয়ালপিন্ডি হয়ে মারী এবং মারী থেকে বারিয়া যেতে হবে। সরাসরি যাবার উপায় শীতের সময় নেই। কারন এ্যবোটাবাদ থেকে নাথিয়াগলি, আয়ুবিয়া হয়ে মারী যাবার পাহাড়ী সড়ক পথ প্রায় বন্ধ থাকবে তিন থেকে চার মাসের জন্য। সাধারন যানবাহন বা যাত্রীবাহি যানবাহন চলবে না। কেউ যেতে চাইলে গাড়ীর চাকায় চেইন লাগিয়ে বরফ কেটে নিজ দ্বায়িত্বে যেতে পারে।

নিজস্ব ছোট লোহার (বা টিনের) ট্রাঙ্ক এ কাপড় - চোপড় গুছিয়ে রওয়ানা দিলাম। প্রথমে রাওয়ালপিন্ডির উদ্দেশ্যে। থাকব এক রাত বাবার পাঞ্জাবী বন্ধুর বাসায়। পরের দিন বাসে মারী হয়ে বারিয়াঁ। বাবার এই বন্ধু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রেঙ্গুন ও চট্টগ্রামে বৃটিশ আর্মিতে কাজ করেছেন।

তিনি ততদিনে অবসরপ্রাপ্ত। হাতে গোনা কয়েকজন পাঞ্জাবীর মধ্যে যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহনুভূতিশীল ছিলেন। তিনি আমি তার রাওয়ালপিন্ডির মারী রোডের বাসায় পৌঁছুতে জানালেন। ---- "তুমি তো বারিয়াঁ যেতে পারবে না, তিন ফুট বরফ পড়েছে"। বারিয়াঁয় আজকের সেই স্লথ গতি সম্পন্ন সামুকচিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিলাম পাঁচই ডিসেম্বর, ১৯৭২ বাসায় পৌঁছুতে পারি।

ঐটিই একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম, দু থেকে তিন দিন লাগতো সামুকচিঠি পৌঁছুতে। পরের দিন সকালে খোঁজ নিয়ে জানলাম, মারী পর্যন্ত বাস যাচ্ছে। আঙ্কেল সালাম জানিয়ে চলে গেলাম। দেড় ঘন্টায় মারী পৌঁছানো তো গেল। কিন্তু বারিয়াঁয় যাবার জন্য কোন ব্যবস্থা নেই।

শীতে ঘন্টা খানিক ট্রাঙ্কটি সহ দাঁড়ানোর পর এক লোক এসে বললো, ---- "ট্যক্সি যা রাহা হেয়, সেরফ টায়ার মে চেয়ন লাগা রাহা হেয়, আপকে লিয়ে (কত টাকা বলেছিল, ভুলে গেছি) .... রুপেয়া"। টাকাট পরিমানটা ছিল, স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে, ছ সাত গুন অধিক। সংগে গোটা তিনে স্থানীয় যাত্রী। অর্থাৎ শেয়ারে ট্যক্সি। ট্যক্সি নামিয়ে দিল, বারিয়াঁ ক্যম্পের মুখে চায়ের দোকানে।

আর দু মাইল যেতে পারলেই মেইন (পাহাড়ী) রোড দিয়ে ক্যম্পে যাওয়া যেত। --- "ইয়ে গাড়ী অওর নেহি যায়েগা, সামনে রাস্তা বোত খারাপ হ্যয়। চায়ের দোকানে চা পানরত স্থানীয় লোকে ভরপুর। (এই শীতে পর্যটনের শহরে বেকার লোকজন এভাবেই সময় কাটিয়ে থাকে, পরে জানতে পারি)। আমার ট্রাঙ্ক সহ নামলাম।

ট্রাঙ্ক না থাকলে একাই হেটে যাওয়া যেত। এই পেছন দিককার পাহাড়ী পথে আমি হেটেছি। আমার ট্রাঙ্ক দেখে ওদের একজন বললো, ওরা জানতো আমাকে বাঙ্গালী ক্যম্পে যেতে হবে। --- " কিতনা দোওগে?" কত দিতে হবে এই পথে এই অপ্রিয় সময়ে, সে বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান না থাকায়, আমি অকপট বলে ফেললাম, ---- " পাঁচ রুপেয়া " সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল, বললো, ---- " চলে গা" সে আমার ট্রাঙ্ক নিয়ে সাথে হাটা শুরু করলো। আমি দেখি মাঝে সরু হাটা পথ যা জুতোর ছাপ দিয়ে বরফে তৈরী।

দুপাশে তিন থেকে চার ফুট বরফ। সে তরতর করে পাঁচ মিনিট পাহাড়ী উঁচু পথে উঠে গেল, আমার অভ্যাস না থাকলেও তাকে অনুসরন করতে হল। মনে আশংকা এই অচেনা জায়গায় আমার ট্রাংক নিয়ে যদি উধাও হয়ে পরে, তা হলে আমার বে হাল অবস্থা হবে। ম্যটৃক আর দিতে হবে না। পাঁচ মিনিট উঁচুতে হাটার পর এবার ঢালুতে নামতে হবে।

নুন্যতম দশ মিনিটের পথ। কিন্তু এই বরফের সুরঙ্গ পথে(দু পাশে তিন চার ফুট বরফ মাঝে হেটে তৈরী সরু পথ)। এ রকম পথে হাটার কোন প্রকার পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকায়, হাটছি আর পরছি, কিন্তু ব্যথা পাচ্ছি না। মনে মনে বললাম ভালই তো বরফের তুলায় ল্যন্ড করছি। পাঁচ মিনিট ঢালু পথে হাটার পর দেখলাম জুতো জোড়া ভিজে গেছে এবং প্রচন্ড ঠান্ডায় পা ব্যথা করছে।

(তখনও Frost Bite এর কথা কিছু জানি না) । পৌছুলাম, মা বোন ও বাবা দেখে তো অবাক। --- "আগে জানাবা না আজকে আসছো?" --- "জানাইসি তো, চিঠিতে!!" --- "কোন চিঠি পাই নাই" বুঝলাম বরফের জন্য কোন ডাক পিয়ন ও এখানে আসছে না। মা তাড়াতাড়ি কেরোসিনের চুলায় পানি গরম করে বউলে ঢেলে বললেন, --- "তাড়াতাড়ি পা ভিজাও" পরে বাবার কাছে জানতে পারলাম, Frost Bite হলে শরীরের ঐ জায়গাটা কেটে বাদ দিতে হয়। আরও বিশ-পচিশ দিন বারিয়াঁতে থাকতে হোল।

সন্ধ্যায় সারে সাতটায় ব্যটারী চালিত রেডিওতে বিবিসি বাংলা শুনে বাংলাদেশের খবর শুনে সবাই শুতে যেত। রাত সাতটা থেকে সকাল (ভোর) সাতটা পর্যন্ত জোড় করে ঘুমানো, কার আর কিছু করার নেই। খাবার খেতে হোত সুপ প্লেটে গরম পানি ঢেলে তার ওপর ফ্ল্যট থালা রেখে। কারন ওটা না করলে শীতের জন্য খাবার পাতে ঢালার মিনিটের মধ্যে জমে যেত। আর জমে যাওয়া খাবার কারু খেতে ভাল লাগতো না।

রুমে কোন হিটিং বা তাপায়নের ব্যবস্থা ছিল না। ডিসেম্বরের ৩১, ১৯৭২সাল, সবাইকে ঝেলামে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত হোল। ট্রাকে করে রাতে রাওয়ালপিন্ডি রেলস্টেশনে পৌঁছি। রাতে নেবার কারন এখন মনে হয়, সাধারন জনগনকে না জানানো। রাওয়ালপিন্ডি থেকে চকদৌলত ঝেলাম পাকিস্তানী মিলিটারী আমাদেরকে এক অবমাননকর পরিস্থিতিতে নিয়ে গেল।

আমি সহ অনেকে রাতে ঘুমানোর জায়গাই পাইনি। চকদৌলতে পৌঁছে অবমাননাকর আরেকটি ব্যবস্থা তারা আমাদের জন্য তৈরী করল। প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি মাত্র কক্ষ, বাথরুম শেয়ার করতে হবে দুই থেকে তিন পরিবারের মধ্যে। প্রতিবাদ, অনুনয়, বিনয় করে কোন লাভ হোল না। তার ওপর এই ক্যম্প কাটা তারে ঘেরা, এখান থেকে অসুস্থ বা কারও বাচ্চা না হলে বেরো না য়াবে না।

মাসিক ভাতা বারিয়াঁতে যা দেয়া হোত, তা থেকে নামিয়ে এক চতুর্থাংশ করা হোল। সর্বোচ্চ ভাতা মনে পরে তিনশত তে গিয়ে ঠেকেছিল। কি কারনে এতগুলো সামরিক পরিবারকে অন্তরীন করা হোল, না জানানো হোলেও আমরা অনুমান করেছিলাম ভারতের কারাগারে Pakistani POWs ছাড়তে চাপ সৃষ্টি করনের লক্ষে বাঙ্গালী সামরিক পরিবারকে অন্তরীন ও মানবেতর পরিবেশে রাখার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ নিয়েছে। ইতি পূর্বে ব্যচেলর সামরিক লোকজনকে তো আরও অমানবিকভাবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অন্তরীন করে রেখেছে।
 


সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।