হিমাদ্রি শেখর ভদ্র
জীবনের শুরুতে ছিলেন একজন অকুতভয় আনসার সদস্য। তারপর সঙ্গদোষে জড়িয়ে পড়েন ডাকাতিতে। একসময় ডাকাতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ৭১ এর আগের দিন গুলিতে ডাকাতিই ছিল তার একমাত্র নেশা ও পেশা। রাত-বিরাতে দলবেঁধে হানা দিয়ে বেড়াতেন অবস্থা সম্পন্ন মানুষের বাড়িতে।
লুটে নিতেন তাদের সহায়-সম্বল। ৭১এর স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের মধ্যদিয়ে বদলে যায় তার জীবন চিত্র। দুধর্ষ এই ডাকাত মুক্তিযোদ্ধার নাম মালু মিয়া। সুনামগঞ্জের মানুষ তাকে মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়া নামে চেনে। সুনামগঞ্জ উপজেলার সদরের রঙ্গারচর গ্রামের মুর্তিমান ত্রাস।
মরম ডাকাতের হাতে তার ডাকাতির হাতেখড়ি। পরে আপন মেধা ও যোগ্যতায় তিনি মরম ডাকাতের ডান হাতে পরিণত হন। ডাকাতিতে তিনি কৃতিত্বের স্বার রেখেছেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ও তার ডাকাতদল সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন দোকান ও বাসাবাড়িতে ডাকাতি করেছেন । মালু মিয়ার অত্যাচারে অতীষ্ট মানুষজন।
সে সময়ে তার মৃত্যু পরোয়ানাজারী করে। একারণে বিভিন্ন স্থানে তিনি মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে জীবনযাপন করেন। কিন্তু বিধিবাম হলে যা হয়। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ধরা পড়ে যান স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা হীরা মিয়ার হাতে। হীরা মিয়া তার জল্লাদ হতে চায়।
মৃত্যুর সব আয়োজন তার চোখের সামনে তৈরী। ঠিক শেষ মুহূর্তের মালু মিয়ার শেষ ইচ্ছে জানতে চান মুক্তিযোদ্ধা হীরা। তখন মালু মিয়া বলেন, আমি যুদ্ধ করে মরতে চাই। হীরা মিয়া একটু ভেবে তাকে জানালেন, তোমার বাঁচার উপায় হলো একটি। আর সেটি হলো কাছার ষোলঘর এলাকায় পাকবাহিনীর শক্তিশালী একটি ঘাঁটিতে গ্রেনেডচার্জ করে ধ্বংস করে দিতে হবে।
মালু মিয়া ভাবলেন। এক মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচতে যেয়ে আরেক মৃত্যুর হাতেখড়ি নেওয়া হলো তার। তখন ছিল হাড় কাঁপানো তীব্র শীত। প্রচন্ড শীতে মানুষের যখন জুবুথুবু অবস্থা। ঠিক সে সময় রাত ৯ টার দিকে হাজামজা জলাশয়ের কচুরীপানা মাথায় দিয়ে লুঙ্গি মালকুচা দিয়ে নেমে পড়লেন ঠান্ডা পানিতে।
পানিতে নামার পুর্ব মূহুর্তে তার দু‘হাতে হীরা মিয়া তোলেদেন তরতাজা চারচারটি হ্যান্ড-গ্রেনেড। কোনমতে পাকবাহিনীর ঘাঁটির কাছাকাছি গিয়ে ঘাঁটি ল্য করে গ্রেনেডের সেফটি বাল্ব (নিরাপত্তা সুইচ) খোলে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে একটি ঢিল ছোঁড়ে দেয়া। তার পরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ সে সাথে সব খেল শেষ। কিন্তু না অপারেশনটি মোটেও এরকম ছিল না। এটি ছিল মৃত্যু হাতে নিয়ে মরণ যাত্রা।
একে তো হাড় কাঁপানো তীব্র শীত। তার উপর একটু এদিক সেদিক হলে গ্রানেডের ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ওপর দিকে হাত ফসকে পানিতে পড়ে গ্রেনেড ড্যামেজ (অকার্যকর) হওয়ার সম্ভাবনা। রাত ৯ টার দিকে দুধর্ষ অপারেশন শুরু হয়। ঘড়ির কাটা তখন কাটায় কাটায় ২টা।
তিনি গ্রেনেড নিয়ে শত্র“র ঘাঁটির একবারে কাছে চলে যান। তারপর সময় সুযোগ বুঝে গ্রেডের সেফটি বাল্ব খুলে এক ঢিল। তার পর পরই হায়নাদের গগন বিদারী আর্ত্মচিৎকার। স্তব্দ হয়ে যায় সব কিছু। ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্য পুকুরের মাঝেই কচুরীপানা মাথায় দিয়ে লুকিয়ে থাকেন সারারাত।
দীর্ঘণ পানিতে থাকায় তাকে ডোরা সাঁপ (বিষ বিহীন একজাতের সাপ) জোঁক ও অন্যান্য পোকামাকড় আকড়ে ধরে তার সারা শরীর। প্রচন্ড ঠান্ডায় তার শরীরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা অনেক নিচে নেমে গিয়ে ছিল। বিষাক্ত পোকার কামড়ে তার সারা শরীর ফুলে যায়। পরে ডাক্তার দেখানোর পর শরীর কিছুটা ভালো হয়। ষোলঘরের একটি সম্মুখ যুদ্ধে তিনি মারাত্মক আহত হয়ে একটি পা হারান।
সে যুদ্ধে তিনি একজন পাকসেনা কে সরাসরি গুর্লি করে হত্যা করেন। এভাবে তিনি বেশ কয়েকটি সফল অপারেশন করেন। যুদ্ধ শেষে ফিরে আসেন আপন ডেরায়। জীবন বাচঁনোর তাগিদে অথবা দেশমাতৃকার টানে যে কারণেই হউক এভাবেই একজন পেশাদার ডাকাত জড়িয়ে পড়েন ৭১ এর মহান মুক্তিযোদ্ধে। এক এক করে শুরু হয় তার নবজীবনের জয়যাত্রা।
অতীতের সবকিছু পিছনে ফেলে। আবার নতুন করে সংসার জীবন শুরু করেন।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।