সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা পশ্চিমা বিশ্ব মনে করেছিল এর মধ্যে দিয়ে গোটা বিশ্বে তথাকথিত পশ্চিমা সভ্যতা স্থায়ীত্ব লাভ করতে যাচ্ছে। বিশেষত মার্কিন বুদ্ধিজীবি ও পরিকল্পনাবিদরা একবিংশ শতাব্দিকে ‘American Century’ হিসেবে মনে করতে শুরু করে। এমনকি কেউ কেউ আগামী এক হাজার বছর বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য দেখতে পায়। এর অবশ্য বাস্তব কারণও রয়েছে। কারণ পৃথিবী নিয়ন্ত্রনকারী শক্তিসমূহ যেমন সামরিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিদন্ধী হিসেবে আর্বিভূত হয়।
বিংশ শতাব্দির শেষের দশকে বিশ্বে আর কোন রাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্টের ধারে কাছেও ছিলনা। তারা প্রতিনিয়ত সারা বিশ্বের সেরা মেধাগুলোকে তাদের দেশে নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দান ও গবেষনার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ধারাবাহিক ভাবে অন্যদের তুলনায় উন্নত রাখার ব্যবস্থা করে। এবং অর্থনৈতিক ভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের অর্থনীতিবিদরা Globalization কে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ধরে নেয়। যদিও পরবর্তীতে এটাকে বিশ্বের মানচিত্রে চীনের ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতির উপর ইউরোপ ও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।
বার্লিন প্রাচীর পতনের পর সারা বিশ্বে মনস্তাতি্বক ভাবে পাশ্চাত্যর গণতন্ত্র এবং মূল্যবোধই অন্যান্য সকল সরকার পদ্ধতি এবং মূল্যবোধের থেকে উন্নততর হিসেবে ধারনা লাভ করে।
যার কারণে আমরা দেখতে পাই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সফলতা অর্জন এবং মানুষের খাওয়া-দাওযা, পোষাক-পরিচ্ছদ, শিক্ষা-দীক্ষা ইতাদি বিভিন্ন ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমেরিকার অনুকরনই সফলতা অর্জন এবং উন্নতির মাপকাঠি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
কিন্তু এই সব হল বাহ্যিক চিত্র। পুজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে চরম প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোর নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের ফলে একটি বিষয় ফোকাস থেকে বাদ পড়ে যায়। তাহলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন্ প্রান্তে একাধিক ইসলামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যারা মুসলিম বিশ্বে একদল নিবেদিত প্রাণ ও সুশৃংখল নতুন প্রজম্ন তৈরীতে সফলতা লাভ করে।
যারা মুসলিম বিশ্বের দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা গ্রহন করেও অভ্যন্তরীণ ও পাশ্চত্যর চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি, অত্যাচার-নির্যাতন, সংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রতিন্ধকতা পাড়ি দিয়ে নতুন যুগের সূচনা করে। যার ফলে আমরা প্রায় প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রে মাত্র দুটি সুসংঘটিত ও সুশৃংখল সংগঠন দেখতে পাই। যার একটি হলো সেদেশের সেনাবাহিনী এবং অন্যটি সেদেশের প্রধান ইসলামপন্থী দল।
এমনই একটি মূলধারায় ইসলামী দল হল ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। সংগঠনটি ব্যাপক সামাজিক কর্মকান্ড এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে খুব দ্রুত মানুষের মাঝে জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয়।
অপর দিকে ক্ষমতাশীল ফাতাহর ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আমেরিকা এবং ইসরাইলের কাছে নতি স্বীকারের কারণে জনগনের আস্থা হারায়। এদিকে এমন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ভূ রাজনৈতিক কৌশল (Geo- Political Strategy) পরিবর্তনে পদক্ষেপ গ্রহন করে। যার একটি উদাহরন হল সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করে ইরাকে তথাকথিত গনতন্ত্র চাপিয়ে দেয়ার চেষ্ঠা।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনে হামাসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং ফাতাহর নাজুক অবস্থা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। তারা ভেবে ছিল ফাতাহ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা আসলে তাদের নেতৃবৃন্দের উপর ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করে ফিলিস্থিন-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ার ফলাফল ইসরাইলের স্বার্থে আনা যাবে।
সেজন্য তারা দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ দেয়। কিন্তু ফাতাহ এতে রাজি ছিল না। তাদের দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এবং অন্যদিকে হামাসের জনসম্পৃক্ততার ফলে নির্বাচনে হামাসের বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটিকে গুরুত্ব দেয়নি। কারণ তারা তখন নতুন মধ্যপ্রাচ্য সাজানোর স্বপ্নে বিভোর।
যাহোক ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে। এই বিজয়ে অনেকেই খুশি হতে পারেনি। আরব রাষ্ট্রগুলো হামাসের বিজয়কে তাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখতে পায়। বিশেষ করে মিসর ও জর্ডান। কারণ হামাস প্রতিষ্ঠার পিছনে ইখওয়ানুল মুসলিম প্রধান ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল জানে যে ফাতাহ থেকে তারা যেভাবে আরব স্বার্থ পরিপন্থি্থ দাবি আদায়ে সক্ষম হবে হামাস থেকে তা হবে না। এবং জেরুসালেমসহ ফিলিস্তিন যাদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে গোটা মুসলিম বিশ্বে তাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে। এই কারণে প্রথম থেকেই হামাস সরকারকে কোণঠাসা করার জন্য বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তজাতিক শক্তি মাঠে নামে। যার কারণে হামাস নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাঙ্গা আরোপিত হয়। আরবদেশ গুলো এই নিষেধাঙ্গার নিন্দা জানায়।
কিন্তু এই অবরোধ ভাঙ্গার জন্য কোন বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। এই কারণে তাদের আন্তরিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। কারণ আরব রাষ্ট্রগুলো চাইলে এই অবরোধ টিকতে পারতো না। যাহোক অর্থনৈতিক অবরোধ সত্বেও হামাস সরকারকে পদচুত্য করতে না পেরে আমেরিকান শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হামাসকে পদচুত্য করার কথা ভাবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস এজন্য প্রথমে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে জরুরী অবস্থা জারী করে প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল হানিয়াকে পদচুত্য করে নতুন নির্বাচন দিতে বলে।
মাহমুদ আব্বাস তাদের কাছে পদচুত্য করার জন্য সময় চায়। এরই মধ্যে সৌদি উদ্দোগে ফাতাহ এবং হামাসের মধ্যে আপোষরফা করে ফিলিস্তিনে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যপারে সবাই ঐক্যমত্যে পৌছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট ফিলিস্তিনে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠাকে তাদের স্বার্থ পরিপন্থি হিসাবে গ্রহন করে নতুন উপায় খুজতে থাকে। এজন্য তারা ফাতাহ নেতা মাহমুদ দাহলানকে বাছাই করে। তারা পরিকল্পনা করে মাহমুদ দাহলাম এর নেতৃত্বে ফাতাহর একটি গ্রুপকে উন্নত অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে হামাস থেকে শক্তিশালী একটি দল তৈরী করা।
যারা পরবর্তীতে হামাসকে সামরিক ভাবে পরাজিত করে ফিলিস্তিনে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। ফলে মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনের শান্তি আলোচনায় যে পদক্ষেপই নিবে হামাস তাতে বিরোধীতা করে কিছু করতে পারবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাহমুদ দাহলান এর দলকে মিসর এবং জর্ডানে উন্নত সামরিক প্রশিক্ষন এবং সাজ-সরঞ্জাম দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেই অনুযায়ী নতুন প্রশিক্ষিত দলটি ফিলিস্তিনে আসা শুরু করে। প্রথম থেকেই তাদের পোষাক-পরিচ্ছেদ ও সাজ-সরঞ্জাম ছিল চোখে পড়ার মত।
তারা হামাস সদস্যদের ভীত-সন্ত্রস্থ করার জন্য কিডন্যাপ করে নির্যাতন শুরু করে। এক পর্যায়ে হামাসের সাথে জড়িত কেউ গাজা উপত্যাকায় নিরাপদে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এইসব কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই হামাস উদ্যোগ গ্রহন করে। প্রথমে হামাসের উদ্দেশ্য ছিল মাহমুদ দাহলান এর গ্রুপকে শান্ত করা। কিন্তু হামাস লড়াই শুরু হওয়ার পর দেখতে পায় ফাতাহ্র বিশাল সংখ্যাক সদস্য থাকা সত্বেও তারা তেমন কোন প্রতিরোধ না করেই পিছু টান দিচ্ছে।
এক পর্যায়ে নতুন প্রশিক্ষিত দলটিও হামাসের আক্রমনের মুুখে টিকতে না পেরে সাগর পথে পালিযে যায়। যার ফলে সারা বিশ্ব অবাক চোখে দেখতে পায় ফাতাহর বিশাল বাহিনী অল্প সংখ্যক হামাস সদস্যর হাতে পরাজিত হয়েছে। যদিও ফাতাহকে আমেরিকা, ইসরাইল এবং আরব রাষ্ট্রগুলো সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছিল। আর এভাবে হামাসকে উৎখাতের আমেরিকার বড় ধরনের একটি ষড়যন্ত্র মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে গোটা গাজা উপত্যাকা হামাসের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে।
এখন হামাসের সম্ম্মতি ছাড়া ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোন সিদ্বান্ত কার্যকর যাবে না।
আমেরিকার এই ধরনের সরকার উৎখাত প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়। পঞ্চাশের দশক থেকেই আমেরিকা স্বার্থের বাইরে গেলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে যেমন: ইরান, কিউবা, ভিয়েতনাম, নিকারাগুয়ায় সিআইএর মাধ্যমে সেসব দেশের জনপ্রিয় সরকার উৎখাত করে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এসব প্রচেষ্ঠা বরং ঐসব দেশে মার্কিন বিরোধী জনমত তৈরী এবং মার্কিন বিরোধী শক্তিকে প্রতিষ্ঠা লাভে সহায়তা করে।
এই ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহন করে ষড়যন্ত্রের ভয়ে ভীত না হয়ে সামাজিক ভিত্তি মজবুত করার ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
যে ইসরাইল গোটা আরব সেনাবাহিনীকে মাত্র ছয়দিনে পরাজিত করেছে। সেখানে আমরা দেখতে পাই, সেই ইসরাইল হিজবুল্লার মত শুধুমাত্র একটি দলকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। সকল বিশ্লেষণ থেকে এর কারণ হিসেবে যা বের হয়ে আসে তাহলো হিযবুল্লাহর সফলতার পিছনে এর প্রতি সাধারন মানুষের সমর্থন এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মীবাহিনীই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান খালেদ মেশাল হামাসের ব্যাপারে বলেন- (No power on the earth can defeat the power of people, Hamas is for the people, by the people and of the people)পৃথিবীর কোন শক্তি মানুষের শক্তিকে পরাজিত করতে পারেনা। হামাস হলো- মানুষের জন্য, মানুষের দ্বারা, মানুষের থেকে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।