দৈনিক ভোরের কাগজ রিপোর্ট
ডিসেম্বর ২৭, ২০০৭, বৃহস্পতিবার :
------------------------------------------------------------------------
প্রকাশনা শিল্পের পথিকৃৎ চিত্তরঞ্জন সাহা আর নেই
================================
ইমরুল ইউসুফ :
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এবং এদেশে বইমেলার পথিকৃৎ, মুক্তধারা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, মুক্তিযোদ্ধা চিত্তরঞ্জন সাহা আর নেই। গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী বিজলীপ্রভা সাহাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।
চিত্তরঞ্জন সাহার প্রতি শেষবারের মতো শ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় তার মরদেহ ৩৮ বাংলাবাজার চত্বরে আনা হবে এবং পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে। আজ তার প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাবাজার, নর্থব্র"ক হল রোড ও প্যারিদাস রোডের সকল বইয়ের দোকান দুপুর ১২টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
প্রকাশনা শিল্পের অনন্য কারিগর চিত্তরঞ্জন সাহার জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার লতিবপুর গ্রামে। তার পিতার নাম কৈলাশ চন্দ্র সাহা। মাতার নাম তীর্থবাসী সাহা।
পিতামাতার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
চিত্তরঞ্জন সাহা ১৯৫১ সালে বিএ পাস করার পর পৈতৃক বণিক ব্যবসা পরিত্যাগ করে নোয়াখালীতেই বইয়ের ব্যবসা শুর" করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি তার স্ত্রীর মালিকানায় ছাপাঘর নামে একটি প্রেস স্থাপন করেন। ১৯৫৭ সালে বই বাঁধাইয়ের জন্য তিনি বাঁধাইঘর নামে নিজ মালিকানায় পুস্তক বাঁধাইয়ের কাজ শুর" করেন। তার এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশির ভাগই প্রকাশিত হতো মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নোট বই।
১৯৬৭ সালে তিনি গঠন করেন পুথিঘর প্রাইভেট লিমিটেড নামে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন মুক্তধারা নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। মুক্তধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সৃজনশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই প্রকাশ শুর" করেন। মুক্তধারা প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছেÑ ছড়া, রূপকথা, বিজ্ঞান, কাব্য, নাটক, উপন্যাস, রম্যরচনা, জীবনী, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনী, প্রবন্ধ, সমালোচনা প্রভৃতি।
৩৫ বছর আগে ১৯৭২ সালে মুক্তধারাকে নিয়ে বাংলা একাডেমীতে চাদর বিছিয়ে এদেশে প্রথম তিনি বইমেলার গোড়াপত্তন করেন।
যে বইমেলা আজ সময়ের পরিক্রমায় বাংলা একাডেমীর অমর একুশে গ্রন্থমেলা নামে পরিচিত। শুধু বাংলা একাডেমী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় মুক্তধারার আয়োজনে বইমেলার আয়োজন করতেন তিনি।
একুশে পদকসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সম্মাননাপ্রাপ্ত চিত্তরঞ্জন সাহা অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশ মুদ্রণ সমিতির সহসভাপতি ছিলেন তিনি। প্রকাশনাকে শিল্প হিসেবে মর্যাদা দান ও বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য ১৯৮১ সালে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।
বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার ‘কাগজ উপদেষ্টা বোর্ডে’র সদস্য ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা সমিতির সভাপতি ও আজীবন সদস্য। বাংলা একাডেমী, এশিয়াটিক সোসাইটি, ইতিহাস পরিষদের আজীবন সদস্য। বইয়ের ওপর বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তিনি অংশগ্রহণ ও প্রবন্ধ পাঠ করেছেন।
তার স্বাস্থ্য সব সময় ভালো ছিল।
১৯৭৭ সালে তার একবার স্ট্রোক হয়। এরপর থেকে তিনি কাজের পরিমাণ কমিয়ে দেন। সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি দৈনিক ১৮ ঘণ্টা তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে সময় দিতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পুরান ঢাকার ২২, প্যারীদাস রোডের বাড়িতে বসবাস করে গেছেন।
মুক্তধারা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, বাংলা একাডেমীর জীবনসদস্য চিত্তরঞ্জন সাহার মৃত্যুতে বাংলা একাডেমী গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
একাডেমীর মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তার শোকবার্তায় বলেন, প্রকাশনা জগতে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কবি-সাহিত্যিক-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তার ছিল গভীর যোগাযোগ। তার একান্ত নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফলে এ দেশের সৃজনশীল সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী পুস্তক প্রকাশনায় নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়। বইকে পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। বাংলা একাডেমীর অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুর"র প্রাক্কালে তার অবদানের কথা বাংলা একাডেমী কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছে।
তিনি আরো বলেন, চিত্তরঞ্জন সাহার মৃত্যুতে জাতি একজন গুণী মানুষকে হারালো। দেশের প্রকাশনা জগতে যে ক্ষতি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বাংলা একাডেমী মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করছে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মোঃ আবু তাহের এক বিবৃতিতে সমিতির প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক, ঐতিহ্যবাহী মুক্তধারা ও পুঁথিঘর লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিত্তরঞ্জন সাহার মৃত্যুতে প্রকাশনা জগত শোকাভিভূত উল্লেখ করে বলেন, তিনি একুশে পদকসহ অসংখ্য পদক এবং সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। সমিতির পক্ষ থেকে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনকে গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি জানানো হয়।
প্রকাশনা জগতের সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব চিত্তরঞ্জন সাহার মৃত্যুতে আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি, শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবীন আহসানসহ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।