আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মহাকর্ষ-2ঃ গুচ্ছস্তবক এবং সিমুলেশন



ছোটবেলায় আমার চেয়ে বছর দশেকের বড় কাজিন একবার বলেছিল সমুদ্্রের সামনে দাড়িয়ে নাকি মিথ্যা বলা যায় না, তখনও সমুদ্্র দেখি নি। এরপর অনেক সাগর মহাসাগর দেখেছি, কিন্তু কখনো মিথ্যা না বলতে পারার মতো ইমপোজিং মনে হয় নি। সমুদ্্র বা পর্বতমালা আমাকে কাবু না করতে পারলেও আকাশ আমাকে ভেতর থেকে ভয় পাইয়ে দিয়ে ছিল স্কুলে থাকতে। সিক্স-সেভেনের বাড়ন্ত সময়ে নানা রকম কাজে ব্যস্ত থাকতাম, গল্পের বই, স্কুল, ফুটবল খেলা, চটি আদান প্রদান, বিজ্ঞান মেলা। আরেকটা কাজ ছিল সন্ধ্যার পর তারা দেখা, বাসার অন্যদের ভাষায় তারা গুনতে যাওয়া, যদিও তারা গোনার চেষ্টা করার মতো বোকা আমি ছিলাম না।

আস্তে আস্তে নক্ষত্রমন্ডলীগুলো চেনা শুরু করলাম, সপ্তর্ষী মন্ডল থেকে শুরু করে কালপুরুষ (Orion), বৃশ্চিক, হাইড্রা, ক্যাসিওপিয়া ইত্যাদি। 88র বন্যায় একমাস পড়াশোনা ছাড়া ছিলাম, একটা ছোট দুরবীন ছিল, কিন্তু কাজ চলছিল না, প্লাস্টিকের পানির পাইপ আর চশমার দোকান থেকে লেন্স বানিয়ে এনে নিজেই টেলিস্কোপ তৈরী করে ফেললাম। রাস্তার অপর পাশে আম গাছের ডালে যে পিপড়া হাটাহাটি করে খালি চোখে বা দুরবীনে দেখা যেত না কিন্তু আমার টেলিস্কোপে দেখা যেত। যাইহোক সন্ধ্যার পর ছাদে টুকটাক পর্যবেক্ষন শুরু করলাম, কোন ভিউফাইন্ডার না থাকায় অ্যাডজাস্ট করায় অনেক সমস্যা ছিল। এরকম এক সন্ধ্যায় টেলিস্কোপ তাক করলাম দক্ষিন আকাশে omega centauriর দিকে, খালি চোখে omega centauri ( NGC5139) ধোয়াটে একটা তারার মতো দেখায়, ঠিক অস্বাভাবিক কিছুর মতো মনে হয় না।

অনেকদিন পর এখন বিশ্লেষন করলে মনে হয় অ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে বইগুলো পড়লেও তথ্যগুলো অনেকটা কিভাবে যেন গল্পের বইয়ের মতো প্রসেস হচ্ছিল আমার মাথায়। যেমন বইয়ে ছবি ছিল বিভিন্ন নেবুলা, গ্যালাক্সির, কোনটাই খালিচোখে দেখা যায় না বা স্পষ্ট বোঝা যায় না, স্পাইরাল গ্যালাক্সি বা সুপারনোভা বিস্ফোরনকে বইয়েই বেশী সত্য মনে হতো বাস্তবের চেয়ে। কোথায় যেন একটা কল্পকাহিনীর ভাব ছিল, কখনো টের পাইনি। ধাককা খেলাম যখন আমার কম ক্ষমতার টেলিস্কোপেও ওমেগা সেঞ্চুরী তার নক্ষত্রভাব ঝেড়ে ফেলে স্বরুপে (globular star cluster) আবির্ভুত হলো (উপরের ছবি দ্্রঃ, এটা অবশ্য ওয়েব থেকে নেয়া, আমার তোলা নয়)। হঠাৎ করেই আকাশটাকে খুব অচেনা মনে হলো, বুঝলাম বইয়ের ছবিগুলো আসলে সত্যি, মনের কোনায় যতটা ভাবতাম তার চেয়ে অনেক বেশী।

গদ্য-পদ্যের আবেগের বাইরে আকাশের আরেকটা নির্মোহ রুপ আছে, স্টারট্রেকের শুরুতে যেমন বলত space, the final frontier। রাতের বেলায় ছাদে একা নক্ষত্রের গুচ্ছস্তবক ( globular cluster) দেখে , বাকী তারা গুলোকেও কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো, আকাশতো আসলে চাদোয়া নয়, মহাবিশ্বের অর্ধেকটা খুলে বসে আছে, তাড়াতাড়ি সবকিছু গুটিয়ে বাসায় চলে আসলাম, নিজের অনাকাঙ্খিত আবিস্কারে ভয় পেয়ে। এরপর অনেক দিন চলে গেছে, এখনও পরিস্কার নিকষ কালো আকাশে, ছায়াপথ আর তারা ঝিকমিক করতে দেখলে কৌতুহল মিশ্রিত ভয় লাগে। তবে গুচ্ছস্তবকের প্রতি আগ্রহ অবশ্য এখনও আছে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে এত ঘন সনি্নবিষ্ট তারাগুলো কিভাবে সাম্যাবস্থায় আছে চিন্তা করলে।

যদিও পুরোপুরি সাম্যাবস্থায় আছে ব্যাপারটা তাও না। তবুও মহাকর্ষের কারনে কেন সবাই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ছে না তাতেই আশ্চর্য হই। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এর মধ্যেই গুচ্ছস্তবকের কম্পিউটার মডেল তৈরী করে ফেলেছেন। গত লেখায় আমি আমার লেখা সিমুলেশন প্রোগ্রামের কথা উল্লেখ করেছিলাম, ওখানে অবশ্য মিলিয়ন নক্ষত্র সিমুলেশন করা সম্ভব না, তবে ছোটখাটো যেমন হাজার খানেক বস্তু নিয়ে সিমুলেট করে দেখতে পারি। কারো হাতে সময় থাকলে নিচের লিংক থেকে ডাউনলোড করে দেখতে পারেন।

ভয় নাই কোন ভাইরাস নেই। এক হাজার অবজেক্ট নিয়ে শুরু করলে দেখব এখান থেকে কিভাবে একটা বা দুটা ভারী নক্ষত্র আর তার চারপাশে কয়েকটা গ্রহ তৈরী হতে পারে। আগের লেখায় যেমন প্রশ্ন করেছিলাম চাঁদ কিভাবে বিশেষ গতিবেগ পেল, যেন পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে পারে (পড়ে না গিয়ে)। যে কোন র্যান্ডম সিমুলেশন করলে দেখব কেউ না কেউ এরকম গতিপথ পাওয়াটাই স্বাভাবিক, চাঁদের গতিবেগ মোটেই বিশেষ কিছু নয়, বরং অনেক সম্ভাব্য পথের একটি। প্রোগ্রামটা দিয়ে সিমুলেশন সেভ করে রাখতে পারবেন।

আমি একটা স্যাম্পল সিমুলেশনের লিংক নীচে দিয়েছি। এই সিমুলেশন 100টা অবজেক্ট নিয়ে শুরু হয় (ছবি-2.1), ওপেন করার পরই দেখবেন বেশীরভাগ বস্তুগুলো নিজেদের মধ্যে আকর্ষন আর সংঘর্ষে ক্রমশ মিলিত হয়ে ওজনে ভারী হতে থাকবে (ছবি-2.2)। বস্তু গুলোর রং-এর সাথে ওজনের সম্পর্ক আছে, যেমন ব্রাউন ( brown dwarf) সবচেয়ে হালকা , তারপর ক্রমশ লাল, কমলা, হলুদ, নীল শেষমেশ খুব ভারীগুলো বেগুনী (super giant star)। মহাকর্ষের ক্রিয়াতেই অনেক বস্তুই দ্্রুত ক্লাস্টার থেকে বাইরে চলে যাবে। এই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে নাসা'র বিজ্ঞানীরা আন্তঃগ্রহ নভোযানগুলোর গতিবেগ বাড়াতে সক্ষম হন (যেমন ভেয়েজার, গ্যালিলিও বা ক্যাসিনির ক্ষেত্রে)।

এর অন্য নাম হচ্ছে gravitational sling shot। যাহোক কয়েক মিনিট অপেক্ষা করলে সবকিছু স্থিতাবস্থায় আসবে (ছবি-2.5)। ব্লু জায়ান্ট একটা নীল তারার চারপাশে লাল ছোট তারা উপবৃত্তাকারে ঘুরতে থাকবে, আর দুরে একটা ব্রাউন গ্রহ অথবা বামন তারা ঘুরতে থাকবে (ছবি-2.6)। অনেকটা আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রের মতো, আলফা সেঞ্চুরী (দুরত্ব 4 আলোকবর্ষ ) আসলে জোড়া তারা (যেমন এই সিমুলেশনে লাল এবং নীল তারাদ্্বয়), তাদের চারপাশে প্রক্সিমা সেঞ্চুরী নামে আরও ছোট একটা তারা ঘুরছে। আরেকটা ব্যাপার, সিমুলেশনে দেখা যাচ্ছে লাল নক্ষত্রের আকর্ষনে ভারী নীল নক্ষত্র অল্প হলেও অবস্থান পরিবর্তন করছে, বাস্তবে চাঁদের আকর্ষনে পৃথিবীও তার কক্ষপথে এদিক ওদিক সরে যাচ্ছে।

একই ঘটনা ঘটছে সুর্যের ক্ষেত্রেও, গ্রহগুলোর আকর্ষনে সুর্য তার গ্যালাক্টিক গতিপথে আকাবাকা ভাবে আগাচ্ছে। একে বলা যায় wobbling , সমপ্রতি আমাদের সৌরজগতের বাইরে যেসব গ্রহ আবিস্কার হচ্ছে তার অনেকগুলোই সম্ভব হয়েছে বিভিন্ন নক্ষত্রের wobbling পরিমাপের মাধ্যমে। লিংকঃ মুল প্রোগ্রাম - http://tinyurl.com/mxr2b সিমুলেশন স্যাম্পল - http://tinyurl.com/m7lok .net framework না থাকলে মাইক্রোসফটের এই লিংক http://tinyurl.com/b88mw থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।