টানা দুই জয় দিয়ে শুরু। প্রথম চার ম্যাচের তিনটিতেই জয়। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল দুর্দান্ত। সোনার ডিম পাড়া হাঁস হিসেবে ক্রিকেটের নবীনতম ফরম্যাটের যখন আমদানি হলো, ভাবা হয়েছিল, এই তো চাই। এটাই তো বাংলাদেশের খেলা।
ওয়ানডে হোক কি টেস্ট, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা মারকাটারি ক্রিকেটই তখন খেলতেন। এখনো খেলেন বৈকি।
খুব স্বাভাবিকভাবেই ২০ ওভারের এই ক্রিকেটে বাংলাদেশের সফল হওয়াটাই ছিল সমীকরণের সম্ভাব্য ফলাফল। কিন্তু হলো একেবারেই উল্টো। বাংলাদেশের কাছে যেন টি-টোয়েন্টি দুর্বোধ্য এক ধাঁধা হয়ে দেখা দিল।
ঠিক কীভাবে খেললে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম এই সংস্করণে সফল হওয়া যায়, সেই সাফল্যসূত্র এখনো যেন খুঁজে পাচ্ছে না বাংলাদেশ।
টি-টোয়েন্টির সেই প্রথম চার ম্যাচের তিনটিতেই জয়ের পর বাংলাদেশ যে পথ হারালো, এখনো খুঁজে ফিরছে সেই পথ। প্রথম চার ম্যাচের পর ‘জয়’ বাংলাদেশের কাছে হয়ে গেল সোনার হরিণ। এই সময়টায় বাংলাদেশ হেরে গেল টানা ১২টি টি-টোয়েন্টিতে। ওয়ানডেতে টানা ২৩ ম্যাচে হেরে যাওয়ার লজ্জার রেকর্ডটি বাংলাদেশেরই।
ছোট্ট পুকুরে সাঁতার শিখে সোজা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মহাসমুদ্রে নেমে পড়া বাংলাদেশ তখন ছিল খাবি খেতে থাকা একটি দল। কিন্তু পায়ের নিচে ধীরে ধীরে শক্ত জমিন পাওয়ার পরও, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাকি সবার সমীহ আদায় করে নেওয়ার পরও বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে খাবি থেকে থাকল। টানা ১২ ম্যাচে হেরে যাওয়াও ছিল রেকর্ড। টানা ১৬ ম্যাচে হেরে যে লজ্জার রেকর্ডটা নিজেদের করে নিয়ে বাংলাদেশকে স্বস্তি দিয়েছে জিম্বাবুয়ে।
লজ্জার রেকর্ডটাই শুধু বাংলাদেশের গা থেকে খসে পড়েছে, টি-টোয়েন্টির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার ব্যর্থতার খোলস কিন্তু পড়েনি।
এ কারণেই আজকের ম্যাচটিসহ সর্বশেষ আট ম্যাচে বাংলাদেশের পরাজয় সাতটি!
টি-টোয়েন্টি হয় ঝড়ের বেগে। এখানে ম্যাচের পরিস্থিতিও পাল্টায় ঝড়ের বেগে। আর সেই গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাতে হয় রণকৌশলও। আজ মিরপুরের প্রেসবক্সের শীতল কক্ষে বসে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়া ম্যাচটি দেখতে দেখতে মনে হলো, বাংলাদেশ এই একটি জায়গাতেই আসলে পিছিয়ে পড়ছে—দ্রুত রণকৌশল পাল্টে নতুন কৌশল ঠিক করাতে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের মুঠো থেকে ম্যাচটা বেরিয়ে যেতে থাকল ঠিক সময়ে ঠিক কাজটা না করাতেই।
টি-টোয়েন্টি চার-ছক্কার খেলা। কিন্তু টি-টোয়েন্টি একই সঙ্গে ক্রিকেটও। আর ক্রিকেট মানে শুধু চার-ছক্কা নয়, বরং কখনো কখনো চার-ছক্কার চেয়ে সিঙ্গেল নেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রান নেওয়ার সময় প্রথম রানটা অবশ্যই খুব জোরে দৌড়ে নাও, এক রানকে দেড় রান বানাও, দেড় রানকে দুই—অস্ট্রেলিয়ার এই কৌশল একসময় ক্রিকেটে যুগান্তকারী এক আবিষ্কার হয়ে এসেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ যে কখনো কখনো সিঙ্গেল-বন্ধ্যা হয়ে যায়।
মনে হয়, জালের মতো ফাঁদ পেতে বসে থাকা ফিল্ডারদের ফাঁক গলে এক রান বের করার চেয়ে ছক্কা হাঁকানোই বেশি সহজ। বাংলাদেশের আজকের প্রথম ১০০ রানের মধ্যে তাই ১৪টি চার, ৪টি ছক্কা। ১০০ রানের মধ্যে ৮০ রানই এসেছে চার-ছক্কা থেকে। একটা ওয়াইড বাদ দিলে বাংলাদেশ মাত্র ১৯ রান নিয়েছে সিঙ্গেলস থেকে।
চার-ছক্কা হাঁকাতে ব্যাটসম্যানদের নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে না।
কিন্তু প্রতি বলেই ছক্কা হাঁকানোর দেখনদারিও বাহবা পেতে পারে না। ছক্কা হাঁকানোর চেষ্টার পরিণতি কী হয়, সেটা আজ প্রথম চার ব্যাটসম্যানের তিনজনই টের পেলেন ওভার দ্য টপ খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়ে।
অ্যান্টন ডেভচিচের করা ইনিংসে অষ্টম আর ১৪তম ওভার দুটি খেয়াল করে দেখুন। অষ্টম ওভারের প্রথম চার বলে চারটি সিঙ্গেল থেকে চার রান, পঞ্চম বল ডট। ষষ্ঠ বলে ছক্কা।
এল ১০ রান। একইভাবে ১৪তম ওভারের প্রথম পাঁচ বলে পাঁচটি সিঙ্গেল থেকে বাংলাদেশ নিয়েছে পাঁচ রান, শেষ বলে ছক্কা। ঝুঁকি না নিয়ে এই ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ১১ রান।
অষ্টম ওভার শেষে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ৯৫। ওভারে বারোর কাছাকাছি করে রান।
উইকেটে মুশফিকুর রহিম আর নাসির হোসেন বেশ আস্থার সঙ্গে ব্যাট করছেন। ওভার শেষে মুশফিককে নাসিরের কাঁধে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ কী যেন বলতে দেখা গেল। হয়তো নতুন রণকৌশল ঠিক করছিলেন অধিনায়ক। হয়তো ঠিক করেছিলেন, বেশি করে নিতে হবে সিঙ্গেলস। শট খেললেও সেটি খেলতে হবে গ্রাউন্ডে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলে যাকে বলে ‘মাটি কামড়ানো শট’। নবম ওভারে চার রান এলো সিঙ্গেলস থেকে। দশম ওভারে ১৩ রান এল দুটো চার, তিনটি সিঙ্গেলস আর দুটো লেগ বাইয়ের সৌজন্যে। একাদশ ওভারের প্রথম পাঁচ বলে চারটি সিঙ্গেলস। কিন্তু ওভারের শেষ বলে মুশফিক নিজেই ভুলে গেলেন প্রতিজ্ঞা।
ফিফটি করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়ক সেই উড়িয়ে মারতে গিয়েই বলি হলেন। সেখানেই যেন ঠিক হয়ে গেল ম্যাচের ভাগ্যও!
লক্ষ্য যখন থাকে ২০০-র বেশি, তখনো সিঙ্গেল নিতে পরামর্শ দিতে বলা অনেকের কানে ‘শিবের গীত’ শোনাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ইনিংসের যে কটি ওভারের বর্ণনা দেওয়া হলো, সেই ওভারগুলোই বলছে, প্রতি বলেই ছক্কা মারার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ঝুঁকিটা দেখেশুনে নেওয়াই ভালো। অষ্টম কিংবা ১৪তম ওভারের কৌশল যদি আরও কয়েকটি ওভারে প্রয়োগ করতে পারত বাংলাদেশ, আজ হয়তো ১৫ রানের আক্ষেপ আর হাহাকার গুমরে ফিরত না মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়াম থেকে গোটা বাংলাদেশে!
।অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।