আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এসো কোয়ান্টামের রাজ্যে- ৮ (অথবা, আমি কোথায় পাব তারে)

০১। “সম্ভাবনা” একটা বিটকেল জিনিস। এ বস্তুর জন্ম হয়েছিল জুয়ো খেলায় হারজিতের আগাম হিসাব করতে। অথচ, কে ভেবেছিল- এ জিনিস একদিন পদার্থবিজ্ঞানের মতন ভাবগম্ভীর একটা বিষয়ের সবচেয়ে আকর্ষনীয় অংশের সঙ্গী হবে! দুনিয়া অদ্ভুদ! আগে পদার্থবিজ্ঞান যখন বড় বড় জিনিসের হিসেবপত্র করত তখন তার ভাষ্য ছিলঃ “হবেই হবে”। আর, পরমানুর এই এত্তটুকুন ফ্লাটবাড়িতে এসে তা পালটে হয়ে গেলঃ “হতে পারে”।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স যখন বিংশ শতকের প্রথম দিকে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিল, তখন তাঁর রথীমহারথী দের প্রায় সবার বয়স ছিল ২২ থেকে ২৫ বছর। যুগটাকে ঠাট্টা করে বলা হয় “বালকদের পদার্থবিজ্ঞান”। সেই সময়, আরভিন শর্ডিঙ্গার নামে এক আধবুড়ো (তখন তাঁর বয়স প্রায় ৪০) অস্ট্রিয়ান, এই “হতে পারে” টাকে পদার্থবিজ্ঞানের উপযোগী করে একেবারে গনিতের খাঁচায় বেধে ফেললেন। সেই সঙ্গে তাঁর নামটাও বাঁধা হয়ে গেল কোয়ান্টাম মেকানিক্সে। এখনও স্নাতক পর্যায়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র থেকে পরমাণু-পদার্থবিজ্ঞানী সবাইকে শর্ডিঙ্গারের এই কীর্তি আয়ত্ব করে তবেই এগুতে হয়।

খবর্দার, কোনও পদার্থবিদের সঙ্গে বাজী ধরতে যাবেন না যেন।
০২। কোনও বস্তুর শক্তি থাকে মোটা দাগে দু’রকম। আপাতত তাদের নাম দেই ‘অচলশক্তি’ আর ‘সচলশক্তি’। কোনও জিনিসকে ঘাড় ধরে কিছু করতে গেলে তাতে জমা হয় অচলশক্তি।

যেমন, স্প্রিংকে টেনে লম্বা করলেন- আপনার শক্তিটুকু কই? অচলশক্তি হয়ে জমা হয়ে গেছে। একটা বল মাটি থেকে তুলে ঝুলিয়ে রাখলেন- আপনার খরচ করা শক্তিটুকু অচলশক্তি হিসাবে জমা হয়ে গেল। এখন স্প্রিংটা ছেড়ে দেন, ছুটে যাবে। কিংবা বলটা ছেড়ে দেন- ধুম করে পড়বে। এখন পড়ার সময় বা ছুটে যাবার সময় যে শক্তি- সেটাই সচলশক্তি।

তা, এটা পেল কোথা থেকে? নিশ্চয় জাতিসঙ্ঘ চিঠি দিয়ে শক্তি পাঠায় নি। তবে? ঠিক ধরেছেন- আপনার জমা করা অচলশক্তিটুকুই জোগান দিচ্ছে সচলশক্তির। প্রকৃতি বড্ড হিসেবি, সে একেবারে কাটায় কাটায় মোট শক্তির পরিমান (অচল+সচল) ঠিক রাখে। মানে- যতটুকু অচলশক্তি খরচ হয়, ঠিক ততটুকুই সচলশক্তি তৈরি হয়। এই হিসেবের পোশাকী নাম “শক্তির সংরক্ষনশীলতা”।

আর অচল ও সচল শক্তির কেতাবী নাম যথাক্রমে ‘বিভবশক্তি’ ও ‘গতিশক্তি’। অর্থাৎ, শক্তির সংরক্ষনশীলতা নীতি মোতাবেক মোটশক্তি=বিভবশক্তি+গতিশক্তি।
০৩। সমীকরন মানে হল দুটো জিনিস সমান করে দেয়া, তবে অবশ্যই তা অর্থবোধক হতে হবে। যেমন ধরুন,
কাদের মোল্লা+যুদ্ধাপরাধ+আইসিটি=ফাঁসি কিংবা, ওয়ার্সি+ক্যাডম্যান+বার্গম্যান+নাভিপিল্লাই+মতিউর্হ্মান+এমনেস্টি=০ অথবা, চাল+পানি+তাপ=ভাত
এখন যদি বলেন, আলু+সাইকেল=রামছাগল
তাহলে ব্যাপারটা ঠিক সমানে সমানে দাঁড়াল না, তাই এটা ঠিক সমীকরন না।

হোমো স্যাপিয়েন্স হলেই যেমন মানুষ হয়না, সমান চিহ্ন থাকলেই তেমন সমীকরণও হয়না। যাকগে, এখন বিজ্ঞানে- বিশেষত পদার্থবিজ্ঞানে সমীকরণ বানানো হয় ‘পরিমাপযোগ্য’ (অর্থাৎ, মাপা যায়) এমন কিছু ব্যাবহার করে। সেখানে সমীকরনের চরিত্রেরা হয়- ভর, সময়, দৈর্ঘ, বেগ, শক্তি ইত্যাদি কুশীলব। যেমনঃ E=V+K এই সমীকরনটা আগের প্যারায় পড়ে আসা শেষ লাইনের সাঙ্কেতিক প্রকাশ। এখানে “E” মানে মোটশক্তি, “V” মানে বিভবশক্তি আর “K” মানে গতিশক্তি।

পরমাণুর ইলেকট্রনেদের জন্য এই সমীকরনটাকেই একটু নতুনভাবে লিখেছিলেন শর্ডিঙ্গার। খালি বিপদে পড়েছিলেন “মাপা যায়” এমন ‘কিছু একটা’ খুজতে গিয়ে। তবে বিজ্ঞানী মানুষ তো, ভেবে-টেবে ঠিকই বার করেছিলেন কি করে কি করতে হবে।
০৪। সবচেয়ে সহজ সমীকরণগুলি বানান হয় সঙ্খ্যা দিয়ে।

ছোটকালে বাক্সওলা অঙ্ক করেছেন না? যেমন, ২+[_] = ৫ এইরকম? বাক্সে কত হলে সমীকরণ ঠিক থাকে? ৩, তাইনা? একদম ঠিক। এখন এই ‘৩’ কে বলে এই ‘সমীকরণের সমাধান’। কখনও এটা এভাবেও লেখা হয় ক+৩=৭ বা, X+3=7., তফাৎ কিছুই না, বাক্সের বদলে ক কিংবা X ব্যবহার হয়েছে শুধু। এখন ক কিংবা X এর বদলে যত বসালে (এক্ষেত্রে যেমন ৪) সমীকরণ ঠিক থাকে সেই সংখ্যাটাই সমীকরণের সমাধান। এখন সব সমীকরণ তো আর এত সহজ-সরল-নান্নামুন্না-বাবুসোনা হবেনা।

কোনোটা আবার ব্যারিস্টার রাজ্জাকের মত জিলাপির আড়াই প্যাঁচ নিয়েও হয়। এইরকম প্যাঁচানো একজাতের সমীকরণ হল ‘ডিফারেন্সিয়াল সমীকরণ’। এই জাতের সমীকরণ সমাধান করে সংখ্যা পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় আরেকটা সমীকরণ। এক্কেবারে দাশুর সেই বাক্সের মত। ভাগ্য খারাপ হলে শেষ বাক্সে গিয়ে পাওয়া যায় ‘কাঁচকলা খাও’, আর ভাল হলে সেটাকে আবার সমাধান করে ফেলা যায়।

শর্ডিঙ্গারের বিখ্যাত সমীকরনটাও আদতে একটা ডিফারেন্সিয়াল সমীকরণ। খালি সমীকরণ বানাতে X এর মত কিছু একটা খুজে পাওয়াটাই বাকি ছিল।
০৫। শর্ডিঙ্গার সমীকরণের মূল উপাদান ছিল- ‘সাই’ (লালন সাঁই না কিন্তু) নামে বিটকেলে একটা গ্রীক অক্ষর। নিচে বিখ্যাত সেই সমীকরণের ছবি দিলাম।

এতে ঐযে ত্রিশুলের মত যে বস্তুখানা দেখা যায়, সেটার নামই সাই। এখন সাই নিজে আবার আরেকটা সমীকরণ যার উপাদান ২টা, X (অবস্থান) আর t (সময়)। এখন কাহিনী ভেদে X আর t এর সম্পর্ক বিভিন্ন হতে পারে, কোনও খানে তারা হয়ত যোগ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও বা গুণ করে ২ দিয়ে ভাগ। সকালে হয়তা তারা মামাত-ফুপাত ভাই আবার বিকালে হয়ত জামাই-শ্বশুর এমন। কিন্তু যেভাবেই সম্পর্কিত হোকনা কেন, তাদের সম্পর্কটার নামই সাই।

এখন, X আর t নাহয় অবস্থান আর সময়, তা সাই জিনিসটা নিজে কি? এইবার আবার শুরুতে ফিরে যাই। একদম শুরুতে সম্ভাবনার কথা বলেছিলাম না? সাই মানে হল সম্ভাবনা। অর্থাৎ সাই (X, t) মানে হল t সময়ে X অবস্থানে ইলেকট্রনকে পাওয়ার সম্ভাবনা। যেমন, কাদের মোল্লার সাই(ফাঁসিকাঠ, গতকাল)=প্রায় শূন্য। আবার কাদের মোল্লার সাই(ফাঁসিকাঠ, আজ রাত ১০টা)=প্রায় ১০০%।

এই সাইয়ের মান যেখানে যেখানে বেশি, সেখানে ইলেকট্রনকে পাবার সম্ভাবনা বেশি; সাইয়ের মান যত কম, ইলেকট্রনকে পাবার সম্ভাবনাও তত কম। (গেছোদাদার কথা মনে আছে? গেছোদাদা কোথায় আছেন জানতে হলে আগে জানতে হবে কোথায় কোথায় তিনি নেই- অর্থাৎ কোথায় কোথায় তাঁর সাই অল্প)। ক্রিকেট খেলায় মোট রানের গ্রাফ দেখে বেশ করে যেমন বোঝা যায়- কোন ওভারে রান কেমন ছিল, বা কখন রানের গতি কম/বেশি ছিল; তেমনি বিজ্ঞানীরাও হিসেব করে আঁকা সাইয়ের গ্রাফ দেখে বলে দেন কোথায় ইলেকট্রনের ঘনবসতি, আর কোথায় বিরানভূমি। সাইয়ের গ্রাফগুলোই ইলেকট্রনের ফ্লাটবাড়িগুলোর ব্লু-প্রিন্ট। আর শর্ডিঙ্গার সমীকরণ তার মালিকানার দলিল।


পাদটীকাঃ এই সাইয়ের আমদানী করেই পদার্থবিজ্ঞানে “জুয়ো খেলার গনিত” কিংবা “সম্ভাবনা” ঢুকে গেল। আইনস্টাইন একে মোটেই পছন্দ করতেননা। অথচ, পরীক্ষাগারের নানা সুক্ষ্ণাতিসুক্ষ্ণ পরীক্ষা ভোট দিয়েই যাচ্ছিল সম্ভাবনাভিত্তিক হিসাবকেই। শর্ডিঙ্গার নিজেও এতে বেশ অস্বস্তিতেই ছিলেন। তাঁর জবানীতেঃ “আমি ভাবতেই পারিনা, ইলেকট্রন একটা মাছির মত লাফিয়ে বেড়াবে।

” এই নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানী মহলে বেশ দলাদলিও ছিল। সেই গল্প শেষ পর্বে। আজকে এই খুশির দিনে সেদিকে না যাই। আল্লাহপাক সদ্যপ্রয়াত কসাই, কাদের মোল্লার সাই(জাহান্নাম, চিরকাল) = ১০০% নসীব করুন, সবাই বলুন- আমীন।


সোর্স: http://www.sachalayatan.com/

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।