আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এক মগার কাহিনী )





এক দেশে ছিল এক … না, আমি কোনো রাজার গল্প বলছি না। আমি বলবো সোজা-সরল একটা ছেলের গল্প। ছেলেটা একটা পারফেক্ট এক্সাম্পল। সে নটরডেম কলেজে পড়ে, সেকেন্ড ইয়ারে, নাম আজাদ। আজাদ অন্য যে কোনো ছেলের মতই কলেজে আসতো-যেত, আড্ডা দিত-মাঝে মাঝে বেসুরো গলায় গান গাইতো।

ওর একটা বিশেষত্ব হল যে ও কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। ও ওর মত থাকতো। পড়াশোনাও করত নিজে নিজে। অবশ্য ছাত্র যে সে খুব ভাল ছিল তা নয়। এভারেজ আরকি।



সবদিক থেকে এভারেজ অর্থাৎ আর দশটা ছেলের মত হলেও তার বড় একটা দোষ ছিল। দোষটা হল সে মেয়েদের সামনে গেলে নার্ভাস হয়ে যায় এবং মনের অজান্তেই (subconsciously) চোখ টিপ দিতে শুরু করে। অবশ্য তার দোষটা তার কলেজের বন্ধুরা এর আগে কখনোই খেয়াল করে নি। কারণ, নটরডেম ছেলেদের কলেজ। এখানে কোনো মেয়ের দেখা মেলা ভার।

ছেলেদের মাঝে থাকার কারণে তার এই দোষটা ধরা পড়ে নি। তাই বন্ধুরা তার এই দোষের কথা কিছুই জানতো না।

ভালই চলছিল সবকিছু, সবাই সবার জায়গায় সুখী ছিল। কিন্তু একদিন ঘটলো এক ঘটনা। কলেজে এক নতুন ম্যাডাম এলো, নাম জেসমিন।

ভারী সুন্দরী। জেসমিন ফুলের মনোমুগ্ধকর সুবাসের মতই জেসমিন নটরডেম কলেজের সব ছেলেদের মনে আলোড়ন তোলে। করিডোর দিয়ে যখন সে হেঁটে যায় তখন উঠতি বয়সের ছেলেগুলো ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। জেসমিন অবশ্য এতে তেমন বিরক্ত হয় না, বরং মনে মনে একটু হেসে নেয় সে। নিজের সৌন্দর্য্য সম্পর্কে নিজের ভিতরে একটা অহংকার অনুভব করে সে।

এটা তার জীবনে নতুন নয়।

যাই হোক, আজাদ অন্য যেকোনো দিনের মতই কলেজে এলো। ক্লাসের আগে বন্ধুদের সঙ্গে হাই-হ্যালো-কেমন আছিস, তারপর একটু হাসাহাসি, একটু গল্প গুজব – এই করতে করতে ক্লাস শুরু হয়ে গেল। প্রথম ক্লাসটা ছিল অর্থনীতির, রেজওয়ান স্যারের। সেই ক্লাসটা শেষ হল।



অর্থনীতি ক্লাসের পর আজাদরা যথারীতি বিশ্বজিৎ স্যারের ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করছিল – ইংরেজি ক্লাস নেন উনি। কিন্তু বিশ্বজিৎ স্যারের গলার স্বর অত একটা উচু নয়। ভাগ্য ভাল আজাদ সেকেন্ড বেঞ্চে একটা সিট পেয়েছে। একারণে সে লেকচারের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেত। তবে যদি ক্লাস মিস হয়ে যায় তাহলে তার সিট আবার পিছনে চলে যাবে।

নটরডেমে এটাই নিয়ম। তাই সে কখনো ক্লাস মিস দিত না। সামনের বেঞ্চে থাকতে হবে তো, তাই।

আজাদ তার সেকেন্ড বেঞ্চের সিটে বসে হালকা গাল গপ্পো করছিল। আজকে বিশ্বজিৎ স্যার আসতে দেরী করছে কেন সেটা তারা বুঝতে পারছে না।

উনি তো কখনো দেরী করেন না।

আজাদদেরকে অবাক করে দিয়ে একসময় টিচার এলো তাদের ক্লাসে, তবে বিশ্বজিৎ স্যার নয়, জেসমিন ম্যাডাম। সবাই তো অবাক। এই ডানাকাটা পরী নটরডেম কলেজে, তাও আবার তাদের ক্লাসে, কত ভাগ্যবান তারা!

অন্য সবাই খুশি হলেও আজাদ অতটা খুশি নয়। কারণ মেয়েদের সাথে তার অভিজ্ঞতাটা সবসময়ই তিক্ত হয়েছে।

কেন, সেটা সে জানে না। তা যাই হোক, জেসমিন নিজের পরিচয় দিল। তারপর ক্লাস শুরু করলো। আজ তাকে পড়াতে হবে A Mother in Manville নামে একটি গল্প। English for Todayতে গল্পটি আছে “Jerry” নামের শিরোনামে।

জেসমিন পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য বললো, ‘আজকে আমরা যে লেসনটা পড়বো তার শিরোনাম “Jerry” । তবে এটা কিন্তু Tom & Jerry’র কোনো কাহিনী নয়!’

সবাই একটু হাসলো।

জেসমিন পড়াতে শুরু করলো। লাইন ধরে ধরে পড়ছে জেসমিন। প্রথমে ইংরেজি একটি লাইন তারপর তার অনুবাদ তারপর তা বুঝানো।



পড়ানোর মাঝে যখন একটা লাইন সে বোঝাতে নিবে, তখন চোখ গেল আজাদের উপর। আজাদ চোখ টিপ দিলো। প্রথমে জেসমিন বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিল। মনে করলো হয়তো চোখে ময়লা গিয়েছে বা কিছু একটা হয়েছে। সে তার ক্লাস চালিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর আবার আজাদের দিকে চোখ গেল জেসমিনের। আবারো চোখ টিপ!

এবার আর জেসমিনের সহ্য হল না। সে আজাদকে বললো, ‘এই ছেলে, স্ট্যান্ড আপ। ’

আজাদ দাড়ালো। জেসমিন যতটুকু নিজেকে শান্ত রাখা যায় চেষ্টা করলো।

বললো, ‘বলো – Jerry কোথায় বড় হয়েছে?’

আজাদ বললো, ‘Orphanage-এ ম্যাডাম। ’

জেসমিন তাকে আঁটকাতে না পেরে মনে মনে বললো- সহজটা জিজ্ঞেস করেছি বলে পেরেছো বাছা। প্রকাশ্যে বললো, ‘বলো, subterfuge মানে কি। ’

আজাদ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললো, ‘অজুহাত। ’ মাঝে দিয়ে কয়েকবার চোখ টিপও দিল!

আজাদের আচরণ দেখে জেসমিন মনে মনে খুব ক্ষেপে গেল।

এবার তার মনযোগ পরীক্ষা করার জন্য বললো, ‘বলো, Jerry গল্পটি originally কোন গল্প থেকে নেয়া হয়েছে?’

আজাদ আরো ঘন ঘন চোখ টিপতে টিপতে বললো, ‘Mother Manville’ ওর উত্তর শুনে সামনের বেঞ্চে বসা মিহির একবার তার দিকে তাকালো।

জেসমিন তখন একটু বুঝতে শুরু করলো যে আজাদ ইচ্ছে করে চোখ টিপ দিচ্ছে না। বললো, ‘গল্পটির নাম Mother in Manville. তোমার নাম কি?’

‘আজাদ। ’

জেসমিন মুচকি হাসি দিয়ে বললো, ‘বসো। ’

আজাদ বসে পড়লো।

মিহির তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। মিহিরের সাথে আজাদের চোখাচোখি হল। মিহির মিটি মিটি হাসছিল। আজাদ বললো, ‘কি হইছে? সামনে তাকা। ’

ক্লাস একসময় শেষ হলো।

শেষ হবার পর মিহির আজাদকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কিরে ম্যাডামকে দেখে চোখ টিপ দিলি ক্যান?’

আজাদ তো অবাক, ‘কোন সময়?’

‘ম্যাডাম যখন তোরে দাড় করাইলো। ’

‘কি বলস? যাহ! আচ্ছা, এই লাইনটার মানে কি বলতো?’

‘মানে হলো…। ’

* * *

পরের সপ্তাহে একই দিন। প্রথম অর্থনীতি ক্লাসের পর আজাদ গিয়েছিল টয়লেটে। এসে দেখে জেসমিন ম্যাডাম ক্লাসে এসে গেছে।

সে অনুমতি নেয়ার জন্য বললো, ‘মে আই কাম ইন ম্যাডাম?’

জেসমিন মুচকি হেসে বললো, ‘ইয়েস কাম ইন। ’

আজাদ গিয়ে তার সিটে বসলো। মিহির আজকে আবার পিছনে ফিরে বললো, ‘কিরে, আবার!’

আজাদ বললো, ‘আবার কি?’

মিহির চোখ টিপ দিয়ে বললো, ‘চোখ টিপ দিলি ক্যান?’

তখনই জেসমিন জোরে অথচ নরম গলায় বলে উঠলো, ‘Please be silent.’ এবং ক্লাস চললো। একসময় শেষও হলো। জেসমিন ক্লাস ত্যাগ করলো।



মিহির দুষ্ট হাসি হেসে আজাদকে বললো, ‘কিরে মশকরা করস?’

‘কিসের মশকরা করলাম?’ আজাদ তো যেন আকাশ থেকে পড়লো।

‘ম্যাডামরে দেখলে তুই চোখ টিপাস ক্যান?’ এবার দুষ্ট হাসির সাথে দুষ্ট চাহনিও যুক্ত হল।

‘চোখ টিপাইলাম মানে? কখন চোখ টিপ দিলাম?’

‘যখন তুই ক্লাসে ঢুকলি। ’

‘কই নাতো। ’

‘আমাগো কি চউখ নাই।

মশকরা করো?!’

আজাদ প্রসঙ্গ অন্যদিকে নেয়ার জন্য বললো, ‘রাত্রে মিসকল দিছিলে যে?’

‘দিছিলাম, ইকোনোমিকসে একটা সমস্যা ছিল…’

* * *

সেদিন বাসে করে আজাদ বাসায় ফিরছিল। ও মনে মনে মিহিরের কথা ভাবছিল। এমন সময় বাসে এক সুন্দরী উঠলো। আজাদ তার দিকে তাকাতেই সে জীবনে প্রথমবারের মত “খেয়াল” করলো যে তার একটা বিরাট বড় সমস্যা আছে – সে মেয়েদের দেখলে চোখ টিপ দেয়!

জানালার পাশে এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন, তার পাশে আজাদ বসেছে। আজাদ মাথাটা একটু নুইয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।

রাস্তা দিয়ে দুটা তিনটা মেয়ে দেখতে পেল, কলেজ পড়ুয়া। বয়স তার মতই। হ্যাঁ, তাইতো! আজাদ তো আসলেও চোখ টিপ দেয়। সে নার্ভাস হয়ে গেল। আজাদ জানালা থেকে চোখ সরাবে এমন সময় খেয়াল করলো পাশের ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সে আরো নার্ভাস হয়ে বারকয়েক চোখ টিপ দিলো। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে ১০ থেকে ১ গুনে কোনোরকমে বাসযাত্রাটা শেষ করলো।

* * *

সন্ধ্যায় আজাদ পড়তে বসেছে। কিন্তু পড়ায় তার মন নেই। ক্লাসের ঘটনা, বাসের ঘটনা এসব মনে পড়ছে।

সে মনে মনে ভাবতে লাগলো, ‘আমি কি এতই খারাপ?’ সঙ্গে সঙ্গে জেসমিন ম্যাডামের হাসিটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তিনি বললেন, ‘ছিঃ তুমি এত খারাপ!’ তারপর সারাজীবনে যত মেয়েদের সাথে তার দেখা হয়েছে সবার হাসিমুখ তার মনে ভেসে উঠলো। সবাই হাসছে আর কেমন আড়চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে আর ছি ছি করছে।

( লেখক: লিখতে লিখতে যদিও আমার খুব হাসি পাচ্ছে, কিন্তু আজাদের অবস্থাটা একবার চিন্তা করুন। সে-ও একজন মানুষ, তারও আবেগ নামে কিছু একটা আছে।

তার উপর দিয়ে কি ঝড়টা বয়ে যাচ্ছে ভেবে দেখুন। অবশ্য হাসি থামাতেও পারছি না! )

রাতে আজাদ টিভি দেখতে বসেছে। সঙ্গে পরিবার। তার পরিবারে আছে ও, তার বাবা-মা আর এক বোন। টিভিতে ওরা বাংলা একটা নাটক দেখছে।

আজাদরা অবশ্য ভাগ্যবান। অন্যান্য পরিবারের মত এদের পরিবারে রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি হয় না। তারা সবাই একমত হয়ে একই চ্যানেল দেখে।

ওরা নাটক দেখছিল। মাঝে এলো একটা বিজ্ঞাপন বিরতি।

আজাদের মনে বিরক্তি জাগে, একবার বিজ্ঞাপন শুরু হলে তো পাক্কা পাঁচ মিনিট বসে থাকা, কি যে পেয়েছে চ্যানেলগুলো। আজাদ সোফায় বসেছিলো। তার পাশে রিমোটটা অলসভাবে পড়ে আছে। সে মাত্র রিমোটটা হাতে নিয়েছে এমন সময় একটা সাবানের বিজ্ঞাপন শুরু হলো। বিজ্ঞাপনের মডেলটা, বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে আজাদের পরিবারের সামনেই গোসল করা শুরু করে দিলো! আজাদের তো ঘন ঘন চোখ টিপ শুরু হয়ে গেল।

বাসের ঘটনার পর সে এখন চোখ টিপ দিলে সেটা নিজে বুঝতে পারে। এখন আর চোখ টিপ subconscious নেই। তাই বুঝতে পেরে আজাদ রিমোটটাকে শক্ত করে চেপে ধরলো। কোন রকমে Prog. up লেখা বোতামটাতে চাপ দিলো। চাপ দিয়ে ধরেই রেখেছে সে।

চ্যানেল পরিবর্তন হচ্ছে একটার পর একটা, কোন চ্যানেল আসছে-যাচ্ছে আজাদের সেদিকে খেয়াল নেই। সে একফাঁকে অন্যদের দিকে আড়চোখে তাকালো, তারা তার চোখ টেপা খেয়াল করেছে কিনা দেখার জন্য। না, কেউ খেয়াল করে নি। মনে মনে মোটামুটি স্বস্তি পেল সে।

* * *

সপ্তাহ ঘুরে আবার এলো জেসমিনের ক্লাস।

আজ অবশ্য আজাদ অনেকটা প্রস্তুত – জেসমিনের ক্লাসের জন্য। সপ্তাহভর সে চোখ টিপ না দেয়ার প্র্যাকটিস করেছে! আজকের ক্লাসে সে একবারও চোখ টিপ দেয় নি। তার অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। অন্তত মিহির তাই ভাবে। জেসমিন যখনই আজাদের দিকে তাকিয়েছে তখনই মিহির পিছন ফিরে দেখেছে ও চোখ টিপছে কিনা।

না, একবারও চোখ টেপে নি সে। মিহির ভাবলো, ও আজাদকে ঠিক করে ফেলেছে এবং মনে মনে নিজেকে খুব বড় ডাক্তার মনে করলো!

ক্লাস শেষে জেসমিন চলে যাবার পর সজল এলো আজাদের কাছে কি একটা বিষয় বুঝতে। আজাদ বুঝিয়ে দেয়ার পর সজল চলে গেল। পরে মিহির এমনিই দুষ্টামি করে বললো, ‘সজলরে দেইখ্যা চোখ টিপ দিলি যে?’ অথচ আজাদ কিন্তু চোখ টিপ দেয় নি। মিহির জাস্ট ফান করছে।

খুব ভাল মুডে আছে তো। বন্ধুর এতবড় চিকিৎসা সাক্সেসফুল হওয়ায়!

আজাদ তো অবাক। কিছু বলতে যাবে তখনই সজল আবার ফিরে এলো, আরেকটা জিনিস বোঝার জন্য। সে বুঝিয়ে দিল।

মিহির দুষ্টামি করে বললো, ‘আবার!’ আজাদ কিছু বলার আগেই মিহির বললো, ‘ও, আজকাল তুমি এমন হইছ?’

আজাদ আবার কিছু বলতে যাবে তখনই সাজ্জাদ স্যার চলে এলো।

ক্লাসও শুরু হল। কিন্তু ক্লাসে তার মন নেই। মিহিরের কথা মাথায় ঘুরছে। ও আজকাল এমন করে কেন। ক্লাস নিতে নিতে সাজ্জাদ একসময় আজাদকে দাড় করালো।

‘বলো, শব্দ বলতে কি বুঝ। ’

‘শব্দ হচ্ছে অক্ষরের সমষ্টি। কয়েকটা অক্ষর মিলে একটা শব্দ হয়। ’

‘আর?’

‘স্যার, এটাই তো শব্দ। ’

‘মনযোগ কোথায়? শব্দ হলো কয়েকটি বর্ণের সমষ্টি যা অর্থ প্রকাশ করে।

অর্থ প্রকাশের কথা কে বলবে?’

‘জ্বি, স্যার। ’

সাজ্জাদ তো রেগে গেল, ‘জ্বি স্যার? নার্সারি, প্লের পড়াই পারো না। নটরডেমে এসেছো কেন? অন্য কলেজ পাও নি?’

আজাদের চোখ টেপা শুরু হয়ে গেল। কোনমতে শুকনো গলায় বললো, ‘স্যরি স্যার। ’

সাজ্জাদ আজাদের চোখ টেপা দেখে আরো রেগে গেল।

বললো, ‘বেয়াদবি করো, না? তোমার এত বড় সাহস। তুমি জানো আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হই নি?’

আজাদ বুঝতেও পারছে না সে কি বেয়াদবি করেছে। সে মনের অজান্তেই চোখ টিপ দিয়েই যাচ্ছে।

সাজ্জাদের রাগ তো এবার দেখার মত হল। ‘এই ছেলে চলো, ডিপার্টমেন্টে চলো।

এক্ষুণি!’

ডিপার্টমেন্টে গিয়ে আজাদকে আচ্ছামত ঝাড়ি শুনতে হলো। ভাগ্যিস ডিপার্টমেন্ট তখন প্রায় খালি ছিল, তাই চেনা-জানা টিচাররা কেউ তাকে দেখে নি। শেষে পুরস্কার হিসেবে ৫ নম্বর মাইনাস করা হল – আগামী কুইজ পরীক্ষা থেকে। আর এত বড় ঘটনার কারণে সে উপলব্ধি করতে পারলো যে স্যারকে দেখে চোখ টিপ দেয়ার কারণেই তার এতবড় শাস্তি। এই কলেজ তাকে মেনে নেয় নি।

কাজেই এখন সে পুরোপুরিই নিশ্চিত যে সমাজ তাকে কখনোই মেনে নেবে না।

সেদিন আজাদ একেবারে ভেঙে পড়েছে। কলেজ ছুটি হবার পর বন্ধুরা তাকে নিয়ে ক্যান্টিনে যায় এবং সেখানে বসে আড্ডা দেয়। আজও তার অন্যথা হলো না। অবশ্য আজাদ যেতে চায় নি, বন্ধুরা ওকে জোড় করে নিয়ে গেল।

অন্যরা বেশ হাসি ঠাট্টায় ব্যস্ত ছিল কিন্তু আজাদ গোমড়া মুখে বসে ছিল, চুপচাপ। সে কি যেন ভাবছিল। মাঝে দিয়ে ক্যান্টিনের একজন স্টাফ এলো চা দিতে। আজাদ মাত্র চায়ে চুমুক দিতে যাবে তখনই মিহির বলে উঠলো, ‘মশকরা করো?’ তার ঠোটের কোণে একটা বাঁকা হাসি।

আজাদের হঠাৎ কি যেন হল।

সে কাপটা টেবিলের উপর রাখতে গিয়ে কাপটা উল্টে ফেলে দিলো। সবটুকু চা টেবিলে গড়িয়ে পড়ে গেল। আজাদ শূণ্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো টেবিলে গড়ানো চায়ের দিকে। মিহির বললো, ‘দোস, কিছু হয় নাই, আরেক কাপ অর্ডার দিতেছি। ’ কিন্তু আজাদ যেন মিহিরের কথাটা শুনতেই পায় নি।

সে ছো মেরে ব্যাগটা হাতে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল – ক্যান্টিনের বাইরে… গেটের বাইরে…। বন্ধুরা সব চুপ, বোকা বনে গেল সবাই। এত দ্রুত সবকিছু ঘটে গেল যে তারা কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না।

মিহির কিছুক্ষণ পর বিড়বিড় করে বললো, ‘আসলে এইভাবে বলাটা ঠিক হয় নাই। ’ অন্যরা শুধু চেয়ে থাকে মিহিরের দিকে।

ওদের আরো সময় লাগবে ধাতস্থ হতে।

* * *

আজাদ পরের দিন কলেজে এলো। কিন্তু সে আর আগের আজাদ নেই। কারো সঙ্গে কথা বলে না, কারো দিকে চোখ তুলে তাকায় না। সবসময়ই ক্লাসে জবুথুবু হয়ে, জড়ো হয়ে বসে থাকে।

বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে তোর কি হইছে?’ আজাদ কোনো কথা বলে না, অন্যদিকে চেয়ে থাকে। সবার মনে প্রশ্ন – কি হলো পারফেক্ট এক্সাম্পল এই ছেলেটার?

আজাদ এখন ছেলেদের রাজত্ব – নটরডেম কলেজে অসহায় অনুভব করে।

* * *

এইচএসসি পরীক্ষা সমাপ্ত। সবাই মোটামুটি উদগ্রীব হয়ে আছে রেজাল্ট জানার জন্য। কিন্তু মিহির সেরকম নেই।

ও প্রতিদিন আজাদের বাড়ির গেটের সামনে দাড়িয়ে থাকে। কিন্তু ওর ভিতরে ঢোকার অনুমতি নেই। আজাদই দারোয়ানকে বলে দিয়েছে – তাকে যেন ঢুকতে দেয়া না হয়। তবুও সে প্রতিদিন গেটের সামনে এসে দাড়িয়ে থাকে, আজাদ বারান্দায় এলে তাকে যেন দেখতে পায়, তাকে স্যরি বলতে পারে। কিন্তু আজাদ বারান্দায়ও আসে না।



প্রায় দেড়মাস অপেক্ষা করার পর একদিন আজাদকে সে দেখতে পেল বারান্দায়। মিহির চিৎকার করে বললো, ‘আজাদ, আই এ্যাম স্যরি। ’

‘তোমার কাছ থেকে আমি আর কিছুই শুনতে চাই না। ’

‘আমার জন্যই তুই পরীক্ষা দিতে পারলি না। ’

আজাদ চুপ।



মিহির আবার বলে, ‘দোস, একবার আমাকে ভিতরে ঢুকতে দে। শুধু একবার। ’

‘যা বলবি তা আমি শুনতে চাই না। চলে যা, আমি তোকে আর কখনোই দেখতে চাই না। ’ বলে ভিতরে চলে গেল আজাদ।



* * *

রবিঠাকুর নাকি বলেছেন গল্প এমন জায়গায় শেষ হতে হবে যেন সেখান থেকে আরেকটি গল্প শুরু করা যায়। তবে আমি নিয়মের ব্যতিক্রম করছি। আমি গল্পটাকে শেষ করে দিতে চাই, যাতে এত নিকৃষ্ট একটা ঘটনা নিয়ে আর গল্প না লেখা যায়। আফটার অল, এরকম ঘটনা তো সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত।

রেজাল্ট বেরুলো।

গত কয়েকবারের মতই এবারও নটরডেম কলেজ সেরা ১০ কলেজের মধ্যে একটি। মিহিরের রেজাল্ট বের হল, খুব একটা ভাল করে নি সে, এভারেজ রেজাল্ট। অন্যরা অবশ্য বেশ খুশি তাদের রেজাল্ট নিয়ে। হই হুল্লোর চলছে কলেজে। সাংবাদিক আসছে-যাচ্ছে, ফটোসেশন হচ্ছে।

ছাত্ররা আঙুল দিয়ে ভি দেখিয়ে পোজ দিচ্ছে, অর্থাৎ তাদের ‘ভিকটরি’ বা বিজয় হয়েছে। কিন্তু মিহিরের মন খারাপ। একে তো তার রেজাল্টের জন্য, তার উপর আজাদের জন্য। আজাদ আর ও হয়তো এখন অন্যদের মতই আঙুল দিয়ে ভি দেখাতে পারতো সারাদেশকে।

মিহির আর কি করবে, উদাস মনে কলেজের বাইরে চলে এল, অন্যদের বিজয় তার সহ্য হচ্ছে না।

বাইরে ফুটপাতের উপর একটা চায়ের দোকান আছে। সে ফুটপাতে দাড়িয়ে চা খাচ্ছিল। এমন সময়ে কোত্থেকে যেন একটা গাড়ি এসে মিহিরের সামনে এসে দাড়ালো। মিহির কিছুটা অবাক হল, আর কিছুটা বিরক্তও। শালায় কি আর জায়গা পাইলো না – মনে মনে ভাবলো সে।



দরজা খুলে গেল গাড়িটার। ভেতর থেকে বের হলো সানগ্লাস পরা এক স্মার্ট ছেলে, কেতাদুরস্ত পোশাক। আজাদকে এমন বেশভুষায় চিনতে মিহিরের কিছুটা সময় লাগলো। ‘কিরে, আজাদ না? তোরে তো চিনাই যাইতেছে না। ’

সানগ্লাস খুলে আজাদ বললো, ‘আরে আমারে রাখ, আমার গাড়ি দ্যাখ।



‘তর গাড়ি?!’ নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না মিহির।

‘খালি গাড়িই না, প্যাসেঞ্জারও আছে!’ মুচকি হেসে আজাদ গাড়ির ভিতরে দেখার জন্য ইশারা করছিল।

মিহির গাড়ির ভিতরে তাকালো। দেখলো এক সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। মিহির তাকে সৌজন্যসূচক ‘ভাল আছেন?’ বললো।



জবাব এলো, ‘জ্বি, আপনি ভাল?’

‘জ্বি’

আজাদের দিকে মিহির জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আজাদ বললো, ‘নীলা, তোর ভাবী, এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। ’

‘কিরে, এতসব হইলো কবে?’

‘এর মধ্যেই। ’ মুচকি হেসে বললো আজাদ।

‘ক্যামনে?’

‘তোর সঙ্গ ছিল না যে – এজন্য এত উন্নতি করতে পারছি।

’ দুজনেই একটু হাসলো।

মিহির অবিশ্বাসের স্বরে বললো, ‘কিন্তু কয়েকদিন আগেও তো তোর সঙ্গে কথা হইলো… বারান্দায়?’

‘হুম। তখন তোকে জানাই নাই। আসলে শখের বশে কিছু পোশাক আশাক ডিজাইন করসিলাম। সেই ডিজাইনগুলি বিদেশি একটা কোম্পানির কাছে দিলাম, ওদের পছন্দ হয়ে গেল।

ব্যস! ওরা চাকরিতে নিয়ে নিলো। কিন্তু তোর কাছে এসব বলি নাই, সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। ’

‘আর ভাবী?’

ও ছোটবেলার বন্ধু। অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ ফেসবুকে তার নামে সার্চ দিয়া দেখি ও সেখানে আছে।

তারপর কথাবার্তা, দেখা সাক্ষাৎ। ’

‘খুবই ভাল হইছে। তুই এতকিছু করছস, আমি খুব খুশি হইছি। ’ মিহির খুশিমনে বললো। ‘আইচ্ছা, তুই জানোস আমি কত টেনশনে ছিলাম তার জন্য।

দোস্ত দ্যাখ, আমি কিন্তু শুধু মজা করতাছিলাম। আমি যদি জানতাম তুই এত মাইন্ড করবি, তাইলে আমি ককখোনোই এইরকম কাজ করতাম না। দোস্ত প্লিজ আমারে মাফ কইরা দে। ’

‘এই যা, মাফ কইরা দিলাম। ’

‘দোস, একটা কথা বলি, কিছু মনে করবি না তো?’

‘কি কথা?’

‘তর সমস্যা ঠিক হইলো ক্যামনে?’

‘আমার পরিবার আর নীলার কারণে।

আসলে সমস্যাটার কারণে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম আমার এই সমস্যা সমাজ মেনে নেবে না, আমাকে কেউ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে মেনে নেবে না। তাই নিজেকে সমাজ থেকে আড়াল করে রাখতে শুরু করেছিলাম। আমি সারাদিন ঘরে বসে কাটাইতাম। ’

মিহির এতক্ষণে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে বাকী ঘটনা জানতে, ‘দোস্ত, তারপর তারপর।



‘তারপর আর কি, নীলার সঙ্গে দেখা। আমি প্রথমে তার সঙ্গে অত একটা মিশতে চাই নি। ভয়ে ছিলাম, সে যদি আমাকে accept না করে। কিন্তু ও-ই আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হয়। প্রথমে ফেসবুকে তারপর মোবাইলে, একসময় ফেস টু ফেস দেখা হয়।



‘ফেস টু ফেস? কই দেখা করছিলি রে?’

‘একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। সানগ্লাস পরে ভয়ে ভয়ে গিয়েছিলাম। ও এসে যখন দেখলো আমি সানগ্লাস পরে বসে আছি তখন ও-ই জোড় করে খুলিয়েছে। আমি খুব বিব্রত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ও আমাকে স্বাভাবিকভাবে নিল।

ব্যস, এই তো!’

‘এই-ই? কোনো চিকিৎসা না, কিচ্ছু না?’ অবাক হয় মিহির।

‘নাহ! এইতো। আর আমার পরিবারও খুব সাহায্য করেছে আমাকে। আমার দোষত্রুটিগুলোকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করে নি, সমস্যাটাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। ’

‘কিন্তু কিভাবে?’

‘আমিও জানি না দোস্ত ক্যামনে ঠিক হইলো।

আর জানতেও চাই না। এখন যামু লং ড্রাইভে। ’ বলে একটা মুচকি হাসি দিল সে। ‘আসি দোস্ত, তরে ফোন দিমুনে। ’

আজাদ তার গাড়িতে করে চলে গেল আর মিহির অবাক হয়ে গাড়িটা দেখতে লাগলো, যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা গেল।

পরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো, ‘পারফেক্ট। ’

আজাদ এখন আবার “পারফেক্ট এক্সাম্পল” হয়ে গেছে। আপনি পারফেক্ট শব্দটি শুনে হয়তো ভাবছেন তার চোখ টিপ দেয়ার বদঅভ্যাসটা চলে গেছে, তাই না? আসলে কিন্তু যায় নি। মিহিরের সঙ্গে কথা বলার সময়ও সে চোখ টিপ দিচ্ছিল। কিন্তু তারপরও সে পারফেক্ট।

কারণ অন্য কিছুর বেলায় ভিন্ন কথা, কিন্তু মানুষের বেলায় পারফেক্ট বলতে ১০০% ভাগ পারফেক্ট বোঝায় না। মানুষের বেলায় পারফেক্ট বলতে বোঝায় ৭০%, ৮০%, ৯০% ভাগ পারফেক্ট। হোক ৭০, ৮০, ৯০ পারসেন্ট, সে পারফেক্ট তো? তাই না?

আসলে আমরা সবাই একেকটা পারফেক্ট এক্সাম্পল, শুধু দেখার দৃষ্টি লাগে রে ভাই।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।