এই ঠিকানায় আর নেই, ফিরে আসবো কিনা জানিনা। **
জয় গোস্বামীর কাব্য সমগ্র হাতে নিয়ে কখন যে উল্লাস ঘুমিয়ে পড়েছিল সেটা নিজেও মনে করতে পারছে না। যতদূর মনে পড়ে রাতে অমিতাকে ফোনে কয়েকটা কবিতা আবৃতি করে শুনিয়েছিল। নাছোড়বান্দা মেয়ে একটা অমিতা। তবে অমিতার কাব্য প্রেম দেখে মাঝে মাঝে উল্লাস খুব অবাক হয়।
লোকে বলে এযুগের মেয়েরা নাকি কবিতা বুঝেনা, এই কথাটি উল্লাস মানতে নারাজ। কথা নেই বার্তা নেই রাত বিরাতে ফোন করে কবিতা শুনতে চায়। উল্লাসেরও কবিতা খুব পছন্দের তাই নিঃসঙ্কোচে কবিতা পড়ে শুনায় সে।
উল্লাসের ঘুম ভাঙ্গে মায়ের বকুনি খেয়ে, সবে মাত্র অনার্স শেষ করেছে উল্লাস, ঘরে শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছে আর এটাই এখন মায়ের বকুনির প্রধান কারন। প্রতিদিন এক কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছে উল্লাস, কানে ঢুকায় না এখন আর এসব কথা।
তবে আগের চাইতে অনেকটা নীরব আর কাঠখোট্টা হয়ে গেছে। তাছাড়া উল্লাসের মায়েরই বা দোষ কিসে! স্বামীকে হারিয়ে দু সন্তান নিয়ে বহু কষ্টে দিন পার করে যাচ্ছে। চেয়ে আছে কেবল ছেলের দিকে, লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করেছে, এই ছেলেই একমাত্র ভরসা।
নাস্তা করে প্রতিদিনের মত মন খারাপ করে নিজের রুমে এসে হাত ঘড়িতার দিকে তাকাতেই ঘড়ির ডায়ালে তারিখ দেখতে পেল। আজ ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ।
বই মেলার শেষ দিন। উল্লাসের কাছে এ এক প্রানের মেলা। ঠিক তখনি অমিতার ফোনে সম্বিৎ ফিরে পায় উল্লাস
-বই মেলায় যাবি উল্লাস?
-না রে অনেকটা রোবটের মত উত্তর দেয় উল্লাস।
-চলনা , আজই তো শেষ।
-একবার বলেছি যাব না, তো যাবই না।
কর্কশ ভাবে বলে ফোনটা রেখে দেয় উল্লাস।
অমিতার খুব ইচ্ছে ছিল উল্লাস কে নিয়ে বই মেলায় যাবে। কবিতা পাগল ছেলেটাকে দুটো বই কিনে দিবে। আর তার প্রতিদানে রাতের বেলায় বায়না করবে কবিতা শোনার। উল্লাসের এমন ব্যাবহারে বেশ কষ্ট পেয়ে অনেকটা রাগ করে একাই বই মেলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অমিতা।
খুব ইচ্ছে উল্লাসের বই মেলায় যাওয়ার কিন্তু নিজের উপরে রাগ জমেছে আজ। পরিবারের সবার আড়চোখ, কথা শোনানো ভালো লাগেনা উল্লাসের। জীবনের রঙ যেন ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে দিন দিন, উল্লাসের মা কিছুতেই বুঝতে চাইছে না যে, কেবল অনার্স পাশ এই ছেলেকে কে চাকরি দেবে? এখন চাকরির বাজারে শ্রমের যেন খুব মূল্যস্ফীতির মত শ্রমস্ফীতি। কত বেকার ছেলে ঘুরে বেরাচ্ছে। এসব ভাবতে গেলেই দমটা বন্ধ হয়ে আসে উল্লাসের।
দিন দিন মনটা মরে যাচ্ছে, বেচে আছে গুটি কয়েক কবিতার বই নিয়ে।
অমিতার দেয়া বই মেলায় যাওয়ার আহবান ফিরিয়ে দিয়ে খারাপ লাগছে উল্লাসের। যদিও এই পর্যন্ত ৪ বার ঘুরে এসেছে ও মেলা থেকে। পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে যাওয়ার একটাই যায়গা ছিল যেখানে গেলে প্রান খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারে, কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকতে পারে নিজের সাময়িক কষ্টগুলো। যতবার বই মেলায় গিয়েছে ঘুরে ঘুরে স্টল গুলো দেখেছে, কখনো দু একটা কবিতা স্টলে দাড়িয়েই পড়ে নিয়েছে।
বই মেলায় যেতে লজ্জা করে উল্লাসের। যখন কাউকে দেখে ব্যাগ ভরে বই কিনে নিয়ে যাচ্ছে তখন খুব খারাপ লাগে উল্লাসের। নিজের বই কেনার সামর্থ্য নেই। মায়ের কাছে বই কেনার জন্য টাকা চাইতে পারেনা। এসব ভাবলেই ভেতরটা কেঁদে ওঠে উল্লাসের।
এবারের বইমেলা থেকে খুব কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা বই কিনেছে। মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়েছিল ছোট বোনকে বই কিনে দেয়ার জন্য। হ্যা, শুধুই বই কিনে দেয়ার জন্য। কারন অমিত স্কুলের ক্লাসের বই ছাড়া গল্প, উপন্যাস, কবিতা , আত্মজীবনী ইতিহাস নিয়ে লেখা বই খুব একটা পড়তে পারেনি কারন অমিতের বাবা মা এসব ব্যাপারে কখনই আগ্রহী ছিলেন না, তার উপরে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে পরিবারের অবস্থাটাও খারাপ হতে থাকে দিনকে দিন।
উল্লাসকে কেউ বই পড়তে বলেনি, নিজের ইচ্ছায় হাতের কাছে যা পেয়েছে এবং পড়েছে।
তখন থেকেই বুঝতে পেরেছে মানসিক বিকাশে বইয়ের গুরুত্ব কতটা। তাই সে ঠিক করেছিল নিজে বই পড়ার সুযোগ পায়নি কিন্তু নিজের সাধ্যমত নিজের ও ছোটবোনের জন্য এই সুযোগ করে যাবে সে।
এবার বই মেলায় গিয়ে খুব অবাক হয়েছে উল্লাস। অনেকেই বই মেলায় এসেছে কেবল আড্ডা দিতে। বইয়ের প্রতি তাদের যেন ওন আগ্রহই নেই, আড্ডাটাই মূল! তাদেরকে দেখে করুনা হয়, উল্লাস ভাবে, বই মেলার স্টল থেকে বই না কিনুক এটলিস্ট বাংলা একাডেমির পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র থেকে তো কটা বই কিনতে পারে এরা, যেখানে নামমাত্র মূল্যে অনেক ভালো বই পাওয়া যায়।
যাবে যাবেনা করতে করতে দুপুরে খেয়ে ঠিক করল এবার ঘুরে আসবে বই মেলা থেকে কিন্তু সেটা অমিতাকে জানাতে পারছিলোনা উল্লাস। একেতো ফোনে ব্যালেন্স নেই তার উপরে সকালে অমন খারাপ ব্যাবহার করার পর নিজের কাছেই খুব খারাপ লাগছিলো, লজ্জা হচ্ছিলো খুব।
**
অমিতা মেয়েটা পাগলের মত ভালবাসে উল্লাসকে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা। ভার্সিটিতে থাকতে একবার ক্লাস শেষে উল্লাসের কাছ থেকে কোর্স রেফারেন্স চাইতে গেলে উল্লাস তার কাধ ব্যাগটা অমিতাকে দিয়ে বলে, ‘’ব্যাগের ভেতরে রেফারেন্স বইগুল আছে নিয়ে নে’’ বলেই ভার্সিটি বাসের দিকে পা বাড়ায় সিট রাখার জন্য, কারন বাস মিস হয়ে গেলেই ভাড়া গুনতে হবে।
অমিতা ব্যাগ খুলে রেফারেন্স নেয়ার সময় দেখলো ব্যাগের সাইড পকেটে কয়েকটা চিরকুটের মত। পকেটটা খোলাই আছে। কি মনে করে হাত ঢুকিয়ে বের করে পড়তে থাকে অমিতা
সূর্যগন্ধী কোন মেঘের ঠিকানায় পোষ্ট করা
চিঠিটি যখন তোমার হাতের স্পর্শ পাবে,
যেনে রেখ তোমার হৃদয়ে তখন প্রবল ঝড়ের
পূর্বাভাস। রেডিওতে নব ঘুরিয়ে আমি শুনে যাবো
তোমার ভাবনার আকাশবানী, আবহাওয়ার খবরে
১০ নং বিপদ সঙ্কেতের অপেক্ষা কেবল, লাইটহাউজে
লাল পর্দাটা উড়তে দেখেই মন দড়িয়ায় পাল উরাবো।
কবিতাটা পড়ে অবাক হয় অমিতা! উল্লাস যে কবিতা লিখে কখনো কাউকে বলেনি! আগ্রহ আরো বেড়ে যায় অমিতার, আরো দুটো চিরকুট পড়ে সে-
খুব সহজেয় বলে ফেলা মনের
খুব গভীরের দুটো কথা।
চোখ নামিয়ে পথের দিকে
খুব আরাধ্য প্রেমকে ডাকা।
.......
পড়ে শেষ করতে পারেনা অমিতা, অদূরে দেখতে পায় অমিত হেটে আসছে।
কাছে আসতেই উল্লাসকে প্রশ্ন করে, ‘’কবে থেকে লিখছিস?’’
উল্লাস সহজেই বুঝতে পারে। একটু লজ্জা পেয়ে দু কথায় উত্তর দেয়, ‘’এইতো বছরখানেক’’
অমিতা অবাক হয় আবার। প্রশ্ন করে, ‘’এতদিন বলিস নি কেন?’’
কি সব ছাই পাস লিখি এসব কি কবিতা হয় নাকি?’’ উল্লাসের নির্বিকার উত্তর
অমিতা অনেকটা আহ্লাদের স্বরে বলে, ‘’শোন, এইযে লিখছিস সেগুলো পড়ার জন্য কেউ না থাকলেও আজ থেকে একজন পাঠক কিন্তু হল।
লিখাগুলো যত্ন করে রাখিস কিন্তু!’’
এবার খানেকটা বিব্রত হয় উল্লাস, বলে, ‘’লিখেছি তো অনেক কিন্তু গুছিয়ে রাখা হয়নি কখনই। বেশীরভাগই হারিয়ে গিয়েছে’’
কি বলবে অমিতা বুঝতে পারেনা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হড়হড় করে বলে ওঠে ‘’তুই না পারলে আমাকে দিবি , আমি গুছিয়ে দেব এখন থেকে’’
উত্তরে উল্লাস কিছুই বলেনি, কেবল একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘’অবুঝ কবিতাপ্রেমী কোথাকার’’
**
উল্লাস বাসা থেকে বের হয় দুপুরে খেয়েই। বাসা থেকে বেশ অনেক দূরে বাস স্ট্যান্ড, বাস ভাড়ার অভাবে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত হেটেই যায়, তারপর লোকাল বাসে চড়ে বই মেলা চত্বরে পৌঁছে যায় সে। আজ বই মেলা ঢুকতে খুব খারাপ লাগছিলো উল্লাসের।
একেতো বই কেনার মত টাকা উল্লাসের নেই। তার উপরে অমিতার কথা ভাবতেই খারাপ লাগাটা দিগুন আকার হয়েছিল।
বইয়ের স্টল ঘুরে ঘুরেই বিকেল পার করতে হবে। দেখা স্টল গুলো আবারো দেখে সে। বইয়ের কাগজের ঘ্রান নেয়।
বইয়ের এই ঘ্রাণটা যান উল্লাসের প্রাণবায়ু। প্রান ভরে ঘ্রান নেয়ার পর এক অজানা ভালোলাগা কাজ করে। এই ভেবে কিছুতা শান্তি পায় যে, এভাবে কজন পারে বইয়ের এতো কাছাকাছি যেতে?
বই মেলার বটতালার কাছাকাছি যেতেই উল্লাস খেয়াল করে বটতলার নিচে পরিচিত চেহারার কাউ একজন বসে আছে। একটু কাছে যেতেই অবাক হয়ে দেখে অমিতা মন খারাপ করে বসে আছে। হাতে দুটো বই।
একটাতে কলম দিয়ে কি যেন লিখছে। কাছে যেতেই অমিতা বইটা আড়ল করে ফেলে।
বটতলার বেদিতে উঠে বসে উল্লাস বলে, ‘’সকালের ঘটনার জন্য সরি’’
‘’হয়েছে হয়েছে, আমি জানতাম তুই আসবি। এজন্যই এসে বসে রয়েছি’’ অভিমানের সুর অমিতার
‘’হুম, আমিও না এসে আর থাকতে পারলাম না’’ উল্লাসের সহজ স্বীকারোক্তি
‘’শোন, তোর জন্য দুটো বই কিনেছি, দুটোই কবিতার বই’’ বলেই বই দুটো উল্লাসের হাতে তুলে দেয় অমিতা।
উল্লাস হাতে নিয়ে দেখে একটা নির্মলেন্দু গুনের প্রেমের কবিতা সামগ্র, আরেকটা মহাদেব সাহার কাব্য গুচ্ছ।
আনন্দে ভুক ভরে যায় উল্লাসের। লাল মলাটের নির্মলেন্দু গুনের প্রেমের কবিতা সামগ্র খুলতে গেলেও বাধা দেয় অমিতা, ‘’খবরদার উল্লাস, এখন খুলবিনা, বাসায় গিয়ে খুলবি। আর খুলেই আমাকে কবিতা শোনাবি’’
ভার্সিটির সেই দিনের কথা মনে পড়ে যায় উল্লাসের। আবারো একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে বলে, ‘’অবুঝ কবিতাপ্রেমী কোথাকার’’
___________________________________ ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।