আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

চলার পথে ৪

০১. সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক গণিত, পদার্থবিদ্যাসহ বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারীদের ভর্তি পরীক্ষা ব্যতীত পছন্দসই বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। অনেকে বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখলেও আমি এমন চমৎকার পদক্ষেপ নেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কৃতি ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করার এ ফর্মূলা বাকিসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনুসরণ করা উচিত। ভর্তি পরীক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহারের মত এখানেও প্রথম শাবিপ্রবি। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ডঃ জাফর ইকবাল স্যার এ জন্য একটু বেশিই ধন্যবাদ পেতে পারেন।

প্রসঙ্গক্রমে এসে গেল চলমান মেডিকেলে ভর্তি নিয়ে জটিলতা প্রসঙ্গ। আমি, তারিক আদনান মুনসহ প্রথমে যারা বিভিন্ন ব্লগে এ নিয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম তখন ব্যক্তিপর্যায় থেকে অনেকে আমাদের দাবিগুলোকে যৌক্তিক অভিহিত করলেও ত্ত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেস্টা রাশেদা কে চৌধুরীসহ কেউ কেউ সরকারের প্রস্তাবকে কোন কিছু না ভেবে সমর্থন দিয়েছিল। এ ইস্যুতে মুন যে ভূমিকা রেখেছে তার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালেও কম বলা হবে। পরবর্তিতে তার মতামত `প্রথম আলো`তে প্রকাশিত হয়। হার্ভার্ডে ফেরার আগে সমকাল তাকে নিয়ে মিথ্যা খবরও ছেপেছিল।

৮ আগস্টে মুন আমাকে বলেছিল ব্যক্তি পর্যায় থেকে সে তার প্রচেস্টা চালিয়ে যাবে। সে তার কথা রেখেছে। আসলে যেটি বলতে চেয়েছিলাম সেটা না বলে ধান ভানতে গিয়ে শীবের গীতই বেশি গেয়ে ফেলছি মনে হয়। মেডিকেলে ভর্তি ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বেশ দেরিতে হলেও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জাফর ইকবাল স্যারকেই কেবল এগিয়ে আসতে দেখেছি। এখন যারা শাবিপ্রবির এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কথা বলছেন, তাদের জেনে রাখা উচিত যে উন্নত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কৃতি শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোর জন্য একধরনের প্রতিযোগিতা হয়! ফুলব্রাইট স্কলার, কর্ণেল ফেলো ও টিচিং এ্যাসিসট্যান্ট বুয়েটের শিক্ষক ইশতিয়াক ভাই থেকে প্রাপ্ত একটা উদাহরণ দিই।

কর্ণেলে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে অধ্যয়নরত ১৬ বছর বয়স্ক অসম্ভব প্রতিভাবান রাশিয়ান এক মেয়ে শিক্ষার্থীকে বিশ্বের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পিএইচডি করার জন্য অফার দিয়ে রেখেছে। অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশীরা এরই মাঝে তাদের মেধার পরিচয় দিয়েছেন। তাহলে কেন নেতিবাচক ভাবনা? যারা বাউন্সার ছুঁড়ছেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, এ সকল অলিম্পিয়াডদের একাডেমিক ফলাফলও ঈর্ষণীয়। আমার জানামতে , শেষ কয়েক বছরে অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন হার্ভার্ড, ক্যালটেক, এমআইটিসহ বিশ্বের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ছে। উল্টো আমার প্রশ্ন, দেশে কি তাদের প্রতিভা বিকাশের সঠিক পরিবেশ আছে? আমরা কি পারব তাদের সঠিকভাবে যত্ম নিতে? ঐদিকে আর বেশি না গিয়ে বলি, পরিবর্তনের এ পূর্বাভাসকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত।

০২. ভালো রেজাল্ট করলেই কেউ ভাল শিক্ষক হয়ে যান না। প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ভালো ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ডিজিটের একটি সংখ্যা বললেও বেশি বলা হবে না! যে দেশে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সেখানে ভালো ফলাফলকারীই ভাল শিক্ষক ও মেধাবী এ ধারণা যারা করেন তাদেরকে দোষ দিই বা কি করে! বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পড়ানোর মত শতকরা ৩১ ভাগ যোগ্য শিক্ষক আছেন বলে গবেষণায় পাওয়া গেলেও বাস্তবে এর পরিমাণ আরো কম হতে পারে। ভালো ফলাফল করা নিঃসন্দেহে অন্যতম অর্জন। চলমান বুয়েট ইস্যুতে এক স্যারের সাথে সম্প্রতি আমার আলাপ হল। জানতে পারি, বেশ কয়েকজন শিক্ষক উচ্চ শিক্ষার জন্য কাঙ্খিত ছুটি না পেয়ে চাকরি ছেঁড়ে দিয়েছেন।

আমি বললাম `বুয়েট থেকে মেধাবী শিক্ষক/শিক্ষিকারা চলে যাচ্ছেন ঐ দিকে কারও কোন নজর নেই। ` উনি জবাবে যা বললেন সেখানে `ডেডিকেটেড` শব্দটি আমাকে আলাদাভাবে নাড়া দিয়েছে। আমাদের দেশে ডেডিকেটেড শিক্ষকদের বড়ই অভাব। কেউ হয়তো শিক্ষকদের নানা রোষের কারণে মেধা তালিকায় ১ম, ২য়, ৩য় ... হতে পারেন নি অথচ ডেডিকেটেড ও উদ্যমী তাদেরকে নিয়োগ দিলে শিক্ষার্থীরা বরং বেশি উপকৃত হয়! এমনও আছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢা.বি. তে দলীয় নিয়োগে কোন একটি মেধাতালিকায় অনেক পিছনে থেকেও শিক্ষক হয়েছেন অথচ অন্য একজন একটি বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে ভাল ফলাফল করেও একজন প্রভাবশালী শিক্ষকের হস্তক্ষেপের কারণে যথাসময়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করতে পারেন নি। সেলুকাস! শিক্ষকতা পেশায় সবার আসা উচিত নয়।

এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেটা নিয়ে নিরীক্ষা করাও ঠিক নয়! একজন শিক্ষার্থী যদি ভুল পথে চলেন তাহলে শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজনের ক্ষতি হতে পারে কিন্তু একজন অযোগ্য, অদক্ষ শিক্ষকের কারণে একটি সমাজ এমনকি একটি দেশও ধবংস হয়ে যেতে পারে। কোন শিক্ষক যদি কোন কোর্স বিষয়ে এক্সপার্ট না হন সে শিক্ষকের সে কোর্স না নেওয়া উচিত। প্রশ্ন আসতে পারে, গাইতে গাইতে গায়েন হলে সময়ের চলমান ধারায় তো একজন শিক্ষক দক্ষ হয়ে উঠবেন। এ কথাটাও মেনে যদি নিই তবুও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ন্যূনতম মানদণ্ড থাকা উচিত। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তো সাধারণত কোর্সভিত্তিক স্পেশালাইজড, তাই না? বাকি কোর্সগুলো সম্পর্কে উনারা মোটামুটি ধারণা রাখেন।

পরিসংখ্যানের ছাত্র যদিও নই তবুও স্ট্যাণ্ডার্ড ডেভিয়েশন নামে টার্ম আছে বলে শুনেছি। যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানরত শিক্ষকদের মানের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে স্ট্যাণ্ডার্ড ডেভিয়েশনের মান যত বেশি সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তত বেশি (শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য)! ক্রিকেটে তিনটি টির (ট্যালেন্ট, টেকনিক, টেমপ্যারামেন্ট) গুরুত্ব অনেক বেশি। একজন শিক্ষকেরও এ গুণগুলো থাকা উচিত। যারা শিক্ষকতা পেশায় আসেন অথচ কোন না কোন কারণে সঠিকভাবে ক্লাস নিতে পারেন না তাদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া দরকার। আর উন্নত দেশসমূহের মত আমাদের দেশেও লেকচারার, রিডারের ক্ষেত্রে যেমন ক্যাটেগরি থাকা দরকার ঠিক তেমনি টিএ, সিএ, রিসার্চ এ্যাসিসটেন্ট প্রভৃতি সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা দরকার।

যারা নবীন তাদের প্রবীণ শিক্ষকদের সহকারী হিসেবে কাজ করা উচিত। ওডেস্ক, ফ্রিল্যান্সারে যারা কাজ করেন তারা জানেন কাজের পর নিয়োগদাতা একটি রেটিং দেন। শিক্ষকদের পাঠদানের উপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কর্তৃপক্ষেরও এ রকম ফিডব্যাক নেওয়া উচিত। শিক্ষকদের আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে আপ টু ডেট থাকা থাকা অপরিহার্য। গুগলে সার্চ দিয়ে শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে যে সকল তথ্য পেয়েছি তার কত শতাংশ উনারা মেনে চলেন তা সংশ্লিস্টরাই ভাল বলতে পারবেন।

প্রত্যেকটি কোর্সে দক্ষ একাধিক শিক্ষক থাকা দরকার যেন প্রয়োজনের সময় ব্যাকআপ হিসেবে কর্তৃপক্ষের কাজে লাগে। আমাদের দেশে শিক্ষকদের মধ্যে যে বিষয়টির প্রতি সবচেয়ে বেশি অনীহা দেখা যায় সেটা হল উনারা ক্লাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পড়েন না। আমি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অধ্যাপনায় নিয়োজিত স্বনামধন্য শিক্ষকদের প্রতিদিন ক্লাস করার জন্য ৬-৮ ঘণ্টা পড়তে যেমন দেখেছি আবার সঠিকভাবে পড়াতে ব্যর্থ শিক্ষকদের প্রস্তুতি না নিয়েই ক্লাস নিচ্ছেন এমনও শুনেছি। যৌক্তিকভাবে প্রাসঙ্গিক ব্যাপারগুলো আরও অনেক লিখতে চেয়েছিলাম ... প্রায় ৮-১০ বছর আগে প্রথম আলোর আলপিনে প্রকাশিত `ছি:নেমা` বিভাগে ব্যঙ্গ পড়েছিলাম `তুমি আমার আন্ধার ঘরের ষাট পাওয়ারের বাতি, তুমি আমার বর্ষাকালে ডাটভাঙ্গা ছাতি। ` আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও গতানুগতিক ধারায় পাঠদানকারী শিক্ষকেরাও কি সেরকম? এ অনুচ্ছেদের ইতি টানতে গিয়ে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শিক্ষকদের প্রতি আমার যেমন নিরন্তর শ্রদ্ধা আছে ঠিক তেমনি বিপরীত মনোভাবও আছে! ০৩. বাংলাদেশে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি সঠিক নয়! ২০১০ সালের অক্টোবরে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ২৩ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ইংরেজি বিষয়ের সিলেবাস সংগ্রহ করেছিলাম।

সিলেবাসগুলো দেখে মনে হল সময় পাল্টালেও সংস্কার, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করার কোন প্রয়োজনীয়তা বিজ্ঞ সিলেবাসপ্রণেতারা অনুভব করেন নি! ইংরেজিতে স্নাতক কোর্স সম্পন্ন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ১২০-১৫৬ ক্রেডিট দরকার পড়ে। কিন্তু কোর্সগুলোকে সঠিকভাবে কোথাও বিন্যস্ত আছে বলে মনে হল না। যুগের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে কম্পিউটারের উপর কোর্স কোথাও কোথাও আছে দেখলাম। কোথাও কোথাও ইকোনমিক্স, এ্যাকাউন্টিং আছে। তবে সিলেবাস ডিজাইন, রিসার্চ মেথডোলজি, থিসিস সহ নানা কোর্স অনেক জায়গায় দেখি নি।

আর কোন কোর্সটি কোন সময়ে পড়ানোর দরকার এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ভালই জানেন বলে সবারই ধারণা। উনারা যখন শিক্ষার্থী ছিলেন তখন নানা সমস্যার সাথে লড়াই করে পড়াশুনা করার পরেও শিক্ষার্থীদের জন্য কোন সেমিস্টারে কোন কোর্স রাখলে ভাল হবে তা জেনেও যদি না রাখেন ও সঠিকভাবে সিলেবাস প্রণয়ন না করেন তাহলে এটাকে ঠিক কি বলা যায়? যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও পরিবর্তিত সিলেবাস প্রণয়ন করা অতীব জরুরি। সংশ্লিষ্টদের টনক নড়বে কি নাকি কুম্ভকর্ণের মত ঘুমাতই থাকবেন? আরেকটি বিষয় দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই প্রতি কোর্সে ৩ ক্রেডিট করে। এটা মনে হয় পাই এর মত ধ্রুবক! কোর্সের সংখ্যা বাড়িয়ে ক্রেডিট সংখ্যা গুরুত্ব অনুসারে হ্রাস/বৃদ্ধি করে যুগোপযোগী কারিকুলাম তৈরি করা সম্ভব। আবার প্রতি ক্রেডিট যদি ১৫ ঘণ্টা হয় তাহলে ৪ ক্রেডিটের জন্য ৬০ মিনিটের ৬০ টি ক্লাস নেওয়ার কথা।

সিলেবাসে বর্ণিত তত্ব অনুযায়ী শিক্ষকেরা ক্লাস নেন কি নাকি দায়সারাভাবে ১৫-২০ টি ক্লাস নিয়ে নিজের পেশাকে কনসাল্টেন্সি ও নানা কাজে বিক্রি করে দেন? আমি বলছি না যে, অন্য কাজ করা যাবে না। তবে মূল পেশাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে সব করলে তো কোন সমস্যই হয় না। আজ আর দীর্ঘায়িত করছি না। সম্ভাবনা দিয়ে শুরু করে শংকা দিয়ে শেষ করতে মন চাইছে না। উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলোর সমাধানে অর্থের প্রয়োজনীয়তা তেমন নেই বললেই চলে।

প্রয়োজন মহান এ পেশাকে সম্মান করার মানসিকতা ও সেই সাথে দৃঢ় প্রচেস্টা। এ সকল সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে আস্তে আস্তে বদলে যাবে প্রিয় এ স্বদেশ। দ্রুততার সাথে ছুটবে উন্নয়নের ধারা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দয়া করে একটু নজর দিবেন কি? ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২ ইং মোঃ মুজিব উল্লাহ: Follow me at Facebook ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।